ছদ্মবেশী সময় (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

নয়

বাড়িতে এসে দেখি বাইরের ঘরে টার্টলনেক সোয়েটার আর কর্ডরয় প্যান্ট পরা এক সুপুরুষ ভদ্রলোক একেনবাবুর সঙ্গে বসে আছেন। প্রমথ কফি বানাচ্ছে। ভদ্রলোকের চুল, গোঁফদাড়ি সবই সাদা। এই বয়সেও ভদ্রলোক অত্যন্ত সুপুরুষ।

 

আমাকে দেখে একেনবাবু বললেন, “আসুন স্যার, আসুন। আর একটু দেরি হলেই প্রমথবাবুর তৈরি ফ্রেশ কফি মিস করে যেতেন!”

 

প্রমথ সঙ্গে সঙ্গে কিচেন থেকেই উঁচু গলায় বলল, “এখনও মিস করবে, ওর জন্য বানাইনি।”

 

“কী যে বলেন স্যার, আপনি সেরকম মানুষই নন।”

 

আমাদের কথা শুনে ভদ্রলোক মুচকি মুচকি হাসছেন। রসিক লোক।

 

একেনবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন। “এঁর কথাই সেদিন আপনাকে বলেছিলাম স্যার, নেভাডা পুলিশের বিখ্যাত ডিটেকটিভ, মিস্টার হোল্ডব্রুক। এখন রিটায়ার করে এখানে।”

 

আমি নিজের পরিচয় দিলাম।

 

“বিখ্যাত মোটেও নই,” একেনবাবুর দিকে হাসিমুখে একটু তাকিয়ে আমাকে বললেন, “তবে এটা ঠিক, পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করতাম নেভাডায়। এখন অবসরপ্রাপ্ত।”

 

বোঝাই যায় অত্যন্ত ভদ্রলোক।

 

একেনবাবু ওঁকে প্রমথ আর আমার সম্পর্কে কী বুঝিয়েছিলেন জানি না। নিশ্চয় বিরাট কোনো কাহিনি। বাপের বয়সি একজন ‘প্রফেসর, ‘প্রফেসর’ সম্বোধন করছেন বলে লজ্জাই লাগছিল। এর মধ্যে প্রমথর তিন রকমের কফি বিন গ্রাইন্ড করে স্পেশাল কফি বানানো শেষ হয়েছে। সবাই বসলাম কফি নিয়ে। হোল্ডব্রুক সাহেব একটা ফোল্ডার নিয়ে এসেছেন। নেভাডার ক্লার্ক কাউন্টির পুরোনো কেস ফাইল থেকে লুসি-র‍্যান্ডো সংক্রান্ত কাগজপত্রের ফাইল। ফোল্ডারটা আধ-খোলা অবস্থায় কফি টেবিলের ওপরে রাখা। একেনবাবুর সঙ্গে নিশ্চয় আগেই এ নিয়ে কথা হয়েছিল। আমি ঘরে ঢোকার আগেও মনে হয় ওই নিয়েই কথাবার্তা শুরু হয়েছিল। আমার চোখে পড়ল টাইপ করা রিপোর্টের পাশে হাতে লেখা কিছু নোট। নোটগুলো বেশ ক্রিপ্টিক।

 

কফিতে চুমুক দিয়ে হোল্ডব্রুক সাহেব একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার কোনো স্পেসিফিক প্রশ্ন আছে? এখানে বহু লোকের বয়ান আছে, বেশিরভাগই ইউজলেস। পুরোটা পড়ে সময় নষ্ট করার মানে হয় না।”

 

“ঠিক আছে স্যার, প্রথমে নাহয় প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি। তার আগে বলি কেন আমরা এই কেসটা নিয়ে এত ভাবনাচিন্তা করছি। আমার ক্লায়েন্ট মিস্টার র‍্যান্ডো ছিলেন ম্যাডাম লুসি-র স্বামী। মিস্টার র‍্যান্ডো কতগুলো গোলমেলে ইমেল পেয়েছেন মেল ব্রুকস নামে এক ভদ্রলোকের কাছ থেকে। মিস্টার ব্রুকস দাবি করছেন ম্যাডাম লুসিকে খুন করেছেন মিস্টার র‍্যান্ডো।”

 

“হ্যাঁ, এই নিয়ে তো গতকালই আপনার সঙ্গে কথা হয়েছিল। এই কেস ফাইলে কাল রাতে আমি চোখ বুলিয়েছি। আসলে আমরা ইনভেস্টিগেশন শুরু করেছিলাম, লুসি বা লুসির বয়ফ্রেন্ডকে খুন করার জন্য কেউ ওদের ঘরে আগুন লাগিয়েছিল কিনা দেখতে। লুসির হাজবেন্ড রিচার্ড র‍্যান্ডো আমাদের সাসপেক্ট লিস্টে ছিল। লাকিলি যে সময় লুসির বাড়িতে আগুন লাগে সে সময় র‍্যান্ডো অনেক দূরে ছিল। শুধু র‍্যান্ডোর বিবৃতি অনুসারে নয়, যে-রেস্টুরেন্টে ও কাজ করছিল, সেখানে অনেকে ওকে দেখেছে। সুতরাং ওখান থেকে কোনোমতেই লুসির অ্যাপার্টমেন্টে র‍্যান্ডো আসতে পারে না।”

 

“হ্যাঁ স্যার, সেটাই উনি আমাদের বলেছেন। তবে এই মিস্টার মেল আরও উলটোপালটা কিছু চার্জ এনেছেন মিস্টার র‍্যান্ডোর নামে। মনে হচ্ছে উনি মিস্টার র‍্যান্ডোকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন ম্যাডাম লুসিকে জড়িয়ে। কিন্তু সেই নিয়ে বোঝাপড়া করতে গেলে মিস্টার মেল-এর পরিচয়টা আগে জানা দরকার। সেটা না-জানা পর্যন্ত র‍্যান্ডো সাহেব এ ব্যাপারে এগোতে পারছেন না। আমাকে ভার দিয়েছেন, তাঁকে ফিজিকালি খুঁজে বার করার।”

 

“র‍্যান্ডো আপনার ক্লায়েন্ট আমি জানি, কিন্তু এই র‍্যান্ডো সম্পর্কে আপনি কতটুকু জানেন জানি না। লোকটি ছিল আন-সাকসেসফুল স্ক্রিপ্ট রাইটার, লুসির টাকায় বহুদিন জীবন কাটিয়েছে, ডোমেস্টিক ভায়োেলন্সের জন্যেও র‍্যান্ডোকে একাধিক বার সতর্ক করা হয়েছিল। একদিন মারামারি, ঝগড়াঝাঁটির পর লুসি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। পরিচিত বন্ধুর বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে মাস কয়েক ছিল। সেখান থেকে পাততাড়ি গুটিয়ে নেভাডায় চলে যায়। যেটা বলতে চাচ্ছি, লুসিকে খুন না করলেও খুব একটা চরিত্রবান লোক র‍্যান্ডো নয়। তার জন্য এত ভাবছেন কেন?”

 

“আসলে আমি ভাবছি স্যার, আমার একটা খটকার জন্য।”

 

“খটকা?”

 

“মিস্টার র‍্যান্ডো বুঝতে পারছেন না এই মিস্টার মেল ব্রুকস লোকটি কে? এই নামের কাউকে তিনি চেনেন না!”

 

মিস্টার হোল্ডব্রুক বললেন, “মেল যে একজন ছেলে, এটা তিনি মনে করছেন কেন?”

 

“মানে?” একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।

 

“মেল তো একটা জেন্ডার নিউট্রাল নাম- মেলভিন, মেলিসা, মেলভিনা, মেলানি, মেলিন্ডা- অনেক কিছুই হতে পারে। ইন ফ্যাক্ট লুসি একজন মেলিন্ডাকে চিনত— খুবই ভালো বন্ধু ছিল। এই ফাইলে তার নাম বেশ কয়েক বার আছেও, কিন্তু মেল বলে নয়, মিন্ডি বলে।”

 

একেনবাবু মাথা নাড়তে নাড়তে বললেন, “ভেরি কনফিউজিং তো স্যার। মেল মেলিন্ডা, আবার মেলিন্ডা মিন্ডি।”

 

সাহেবদের এই ডাকনামগুলোতে একেনবাবু এখনও মাঝে মাঝে গোলমাল করে ফেলেন।

 

“এত কনফিউশানের কী আছে!” প্রমথ বিরক্ত হয়ে বলল, “আমাদের সেক্রেটারি মেলিন্ডারই তো দুটো ডাকনাম চালু। কেউ ডাকে লিন্ডা, কেউ ডাকে মিন্ডি।”

 

“না না, বুঝতে পারছি স্যার। যিনি ইমেল পাঠিয়েছেন তিনি ম্যাডাম লুসির বন্ধু ম্যাডাম মিন্ডিও হতে পারেন— তাই তো?” এবার প্রশ্নটা হোল্ডব্রুক সাহেবকে।

 

“অসম্ভব নয়।” ভদ্রলোকের মুখ দেখে মনে হল মিন্ডি ওঁর পরিচিত।

 

“ওঁর সম্পর্কে কোনো খবর আছে স্যার আপনার কাছে?”

 

“এই ফাইলে অনেক তথ্যই আছে মিন্ডির সম্পর্কে। এগুলো সবই জানতে পারা গিয়েছিল লুসির মৃত্যুর পর বোল্ডার সিটি সেন্টার ফর ডেন্টিস্ট্রির রিসেপশনিস্ট ক্যাথির কাছ থেকে। আর এই ক্যাথিকে আমি প্রথমে অন্য সূত্রে চিনতাম। আমার প্রয়াত স্ত্রীর বন্ধু ছিল। স্মল ওয়ার্ল্ড, তাই না?”

 

“তা আর বলতে স্যার! বলুন স্যার বলুন, কী আছে শুনি।”

 

মিস্টার হোল্ডব্রুক শুরু করার আগেই ওঁর একটা ফোন এল। “এক্সকিউজ মি,” বলে উঠে একটু দূরে গিয়ে কথা বলতে শুরু করলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *