ছয়
পরের দিন সকালে একেনবউদিকে নিয়ে শান্তিনিকেতন ঘুরতে বেরোচ্ছি, একেনবাবু দেখি গভীর চিন্তায় মগ্ন।
“আপনারা যান স্যার, আমার এখন বেরোতে ইচ্ছে করছে না।”
“কী ব্যাপার একেনবাবু, আপনাকে রহস্য-কাবু মনে হচ্ছে?” প্রমথ জিজ্ঞেস করল।
“আরে না, স্যার।”
“শুনুন, ভেবে ভেবে সময় নষ্ট করবেন না,” প্রমথ বলল, “আমি যা বুঝছি- পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে খ্যাপামি, র্যান্ডো লোকটা ভুগছে প্যারানয়াতে। কোত্থেকে দু-একটা উড়ো ইমেল এসেছে। তার ভয়ে হাজার হাজার ডলার গ্যাঁটগচ্চা দিয়ে আপনাকে লাগিয়েছে রহস্য উদ্ঘাটন করতে! টোটাল ননসেন্স!”
“শুধু একেনবাবুকে দোষ দিচ্ছিস কেন, এখানেও তো লক্ষ লক্ষ টাকা খরচা করছেন। সেখানেও তো রহস্য নেই।” তারপর একেনবাবুকে বললাম, “একা একা সারাদিন বাড়িতে বসে থাকবেন! আমরা কিন্তু লাঞ্চ খেয়ে একেবারে বিকেল বেলায় আসব।”
“তাহলে তো ভালোই হল স্যার, আমাকেও বোলপুরে একজনের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে হবে, তা ছাড়া কয়েক জনের সঙ্গে দেখাও করতে হবে।”
জিজ্ঞেস করলাম, “হঠাৎ? কাদের সঙ্গে?”
প্রমথ বলল, “সেটা কি আর আমাদের বলবেন? ঝেড়ে তো কাশেন না!”
“কী যে বলেন স্যার!”
.
পুরো দিনটা এদিক-ওদিক বউদিকে নিয়ে ঘুরলাম। আমি বউদিকে নিয়ে যখন ‘সুবর্ণরেখা’ বইয়ের দোকানটা দেখছি, প্রমথ চট করে গিয়ে রেলের রিজার্ভেশনটা করে এল। জানতাম না যে, কাছেই ইস্টার্ন রেলের রিজার্ভেশন কাউন্টার। তারপর সবাই মিলে চীনা ভবন, ডিয়ার পার্ক, উপাসনাগৃহ, প্রকৃতি ভবন, সোনাঝুরি ফরেস্ট, রবীন্দ্র ভবন, আমার কুটির, ছাতিম তলা… বলতে গেলে একটা ঝটিকা সফর।
প্রমথ জায়গাগুলো ভালো করে চেনে। ওই আমাদের গাইড। সবচেয়ে সময় লাগল মিউজিয়ামটা ঘুরে ঘুরে দেখতে। বাঁচা গেছে একেনবাবু নেই, থাকলে ওঁর বকবকানি আর উলটোপালটা প্রশ্নে প্রমথ খেপে যেত। ভালো করে কিছুই দেখা হত না। মধ্যে রতনপল্লীর একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ খেয়ে নিলাম। সেখানেই দেখা হল আবার সেই মেমসাহেবের সঙ্গে যিনি প্রথম দিন আমাদের দিকে বার বার তাকাচ্ছিলেন। প্রমথর চোখেই সেটা পড়েছিল। আজকে উনি একটা জিন্স আর টপ পরেছেন। টপটা নিশ্চয় শান্তিনিকেতনের কোনো দোকান থেকে কেনা। কাঁথা-স্টিচ করা। আজকে আর লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের দেখা নয়, সোজা একেনবউদির কাছে এসে বললেন, “আমার নাম হেলেন। এত অ্যাট্রাক্টিভ কাঁথা স্টিচের কাজ এখানে কোথাও দেখিনি। এর আগেও আপনাকে একটা রেস্টুরেন্টে দেখেছি তখন জিজ্ঞেস করব করব করেও জিজ্ঞেস করিনি, আপনার এই স্কার্ফ কোত্থেকে কিনেছেন?”
একেনবউদিকে আগে ইংরেজি বলতে শুনিনি, কিন্তু দেখলাম একেনবাবুর থেকে ভালো বলেন। হেলেনের প্রশ্নের উত্তর সপ্রতিভভাবেই দিলেন, “আমি তো জায়গাটা কোথায় বলতে পারব না, এঁরা জানেন,” বলে আমাদের দেখালেন।
যে-স্কার্ফটির কথা হেলেন জিজ্ঞেস করছেন, সেটা আমরাই আগের বার শান্তিনিকেতনে এসে কিনেছিলাম। প্রমথ ফ্র্যান্সিস্কার জন্য গিফট খুঁজছে শুনে প্রমথ মাসি কলাভবনের এক প্রাক্তন ছাত্রের কথা আমাদের বলেছিলেন। ভদ্রলোকের একটা বুটিক শপ আছে জামবুনিতে। সেখানে শ্রীনিকেতনি চামড়ার ব্যাগ, শান্তিনিকেতনি বাটিকের কাজ আর লোকাল সাঁওতালি শিল্পীদের এমব্রয়ডারি করা কামিজ, স্কার্ফ, চাদর ইত্যাদি মেলে। বাইরের মার্কেটে যা পাওয়া যায়, তার থেকে অনেক ভালো কোয়ালিটির। প্রমথর সঙ্গে আমিও বেভের জন্য গোটা দুই স্কার্ফ কিনেছিলাম। সেটা দেখে একেনবাবু আমাদের ধরেছিলেন, “আমার জন্যেও একটা কিছু বেছে দিন না স্যার, ফ্যামিলিকে দেব।
প্রমথ বলল, “কেন মশাই নিজে বাছতে পারেন না! বউদিকে উপহার দিয়ে বাহাবা কুড়োবেন তো আপনি!”
“কী যে বলেন স্যার! আপনারা তো জানেন এসব সূক্ষ্ম ব্যাপারগুলো আমি একেবারেই বুঝি না।”
“ঠিক আছে আমরা বেছে দেব, কিন্তু এর জন্য নিজে আপনি ক্রেডিট নেবেন না!”
“না না স্যার, আপনাদের সাহায্যের কথা তো আমি সবসময় ফ্যামিলিকে বলি।”
আমি আর প্রমথ তখন তিনটে কাঁথা-স্টিচ স্কার্ফ বেছেছিলাম বউদির জন্য- সবগুলোতেই সাঁওতালি মোটিফ—- নানান জিগজ্যাগ প্যাটার্নের।
“একেবারে তিন-তিনটে নিতে হবে স্যার!”
“কসি করবেন না তো! দিচ্ছেন তো নিজের ফ্যামিলিকে!” প্ৰমথ ধমক দিয়েছিল।
বউদি স্কার্ফগুলো পেয়ে এত খুশি হয়েছিলেন যে, এবার এসেই আমাদের সঙ্গে সেখানে গিয়েছেন। আরও কয়েকটা স্কার্ফ কিনেছেন কয়েক জনকে উপহার দেবেন বলে।
আমি হেলেনকে বললাম, “এটা কেনা হয়েছিল জামবুনির একটা দোকান থেকে, কিন্তু ঠিক এইরকম স্কার্ফ আর পাওয়া যাবে কিনা জানি না। হাতের কাজ তো! এক-একটা এক এক রকম ডিজাইনের হয়।”
“বুঝেছি, ডিজাইনার স্কার্ফ। তাও ঠিকানাটা দিন।”
“ঠিকানাটা তো বলতে পারব না, ডিরেকশনটা দিতে পারি।”
.
হেলেনের খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমাদের টেবিলে এসে বসলেন। আমি রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারের কাছ থেকে একটা কাগজ জোগাড় করে একটা স্কেচ করে দেখালাম। শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতন রোড ধরে বড়ো রাস্তার মোড়ে বাঁ-দিকে গেলেই বোলপুর বাস স্ট্যান্ড। সেখানে শক্তি-বুটিকের খোঁজ করলেই লোকে বলে দেবে জায়গাটা।
হেলেন সেটা যত্ন করে ব্যাগে ঢোকানোর পর কিছুক্ষণ গল্প হল। বয়সে আমাদের থেকে বেশ একটু বড়োই হবেন— বস্টনে থাকেন, কিন্তু ইন্ডিয়ার প্রেমে পড়েছেন। বছরের অনেকটা সময় পন্ডিচেরিতে কাটান।
আমরা নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে কাজ করি শুনে খুব খুশি হলেন। বললেন, “আমি মাঝে মাঝেই নিউ ইয়র্কে যাই। আমার ছেলেবেলার বান্ধবী আপনাদের ইউনিভার্সিটিতেই কাজ করে!”
“তাই নাকি? কোন ডিপার্টমেন্টে?”
“অ্যানথ্রপলজি”
নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্টগুলো এক-একটা এক এক জায়গায়, তবে কাছাকাছি। অ্যানথ্রপলজি ডিপার্টমেন্ট প্রমথর কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের খুবই কাছে। প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “আপনি কী করেন?”
“ফরেন্সিক হ্যান্ডরাইটিং অ্যানালিসিস।”
প্রমথ তো সবজান্তা, বলল, “ও, গ্রাফোলজিস্ট?”
“না, না, আমরা ফরেন্সিক ডকুমেন্ট এক্সামিনার। গ্রাফোলজিস্টরা লেখা দেখে লেখকের পার্সোনালিটি ট্রেইট বলতে পারে, আমাদের কাজ দুটো লেখা দেখে একই লোকের লেখা কিনা বলা।”
“আচ্ছা! এখন ছুটিতে?”
হেলেন হাসলেন। “কাজ এবং ছুটি। কাজ প্রায় শেষ, রিপোর্ট জমা দিলেই পুরো ছুটি।”
কী কাজে এসেছেন আর জিজ্ঞেস করা হল না। বলতে চাইলে নিশ্চয় বলতেন। বেশিক্ষণ গল্পও করা গেল না। হেলেনের কোথাও যাবার কথা ছিল। আমাদের ওঁর কার্ড দিলেন। আমরাও আমাদের নম্বর দিলাম। আমি বললাম, “দেশে ফিরে আমাদের ইউনিভার্সিটিতে কখনো এলে হয়তো দেখাও হয়ে যাবে।”
এগুলো কথার কথা। হেলেন হাসলেন, একেনবউদিকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে জামবুনি ছুটলেন স্কার্ফ কিনতে।
.
বিকেল বেলায় ফিরে দেখি একেনবাবু খুব সিরিয়াস মুখ করে চেয়ারে বসে পা নাচাচ্ছেন। ইন্টারেস্টিং সাইন।
“কী ব্যাপার, কী হল আজকে?”
“খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার স্যার। মিস্টার র্যান্ডোকে নিয়ে আমাদের আর দুর্ভাবনা করতে হবে না।”
“তার মানে?”
“ভদ্রলোক একটা হাওলা-চক্রে জড়িত থাকার জন্য সকালেই অ্যারেস্ট হয়েছেন।”
“বলেন কী, আপনি জানলেন কী করে?”
“ইন্ডিয়ার এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট আর মার্কিন মুলুকের ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রেজারি এই ব্যাপারে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছিল।”
“দাঁড়ান, দাঁড়ান, ইন্ডিয়ার হাওলা-চক্রের সঙ্গে মার্কিন মুলুকের সম্পর্ক কী?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“একটু কমপ্লিকেটেড স্যার। মার্কিন মুলুকে ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টে টেররিজম আর ফাইনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সের একটা অফিস আছে।”
“বুঝলাম না, হাওলা-চক্রের সঙ্গে টেররিজম-এর সম্পর্ক কি?” প্রমথ প্ৰশ্ন তুলল।
“সন্ত্রাসবাদের অনেক টাকা আসে এইসব হাওলা স্কিম থেকে।”
“হাওলা স্কিমটা কী?” একেনবউদি জিজ্ঞেস করলেন।
‘হাওলা’ শব্দটার অর্থ আমার জানা ছিল। একজনকে সরাসরি টাকা না দিয়ে অন্য একজনের মারফতে টাকা দেওয়া। যখন ছাত্র ছিলাম স্টাইপেন্ডের টাকা থেকে বাঁচিয়ে মাঝেমধ্যে মাকে কিছু ডলার পাঠাতাম। ব্যাঙ্ক ফি আর বাজে এক্সচেঞ্জ রেট তার একটা বড়ো অংশ খেয়ে নিত! আর টাকা হাতে পেতে মায়ের সময়ও লাগত। সেটা জেনে আমার এক গুজরাতি বন্ধু বলেছিল, এরকম টাকা পাঠাবার দরকার হলে ওকে ক্যাশ ডলার দিতে, পরের দিনই ওর চেনাজানা একজন কলকাতায় মায়ের হাতে অনেক ভালো এক্সচেঞ্জ রেটে ক্যাশ টাকা দিয়ে দেবে। আমি অবশ্য সাহস পাইনি। পরে শুনেছিলাম ওটাই হচ্ছে হাওলা। সরকারের চোখের আড়ালে টাকার হাতবদল। কিন্তু হাওলা স্কিম ব্যাপারটা আমার জানা ছিল না।
“মানি লন্ডারিং স্কিম, মিনু। কালো টাকা সাদা করার কারবার।”
“তার মানে?” প্রশ্নটা শুধু বউদির নয়, আমার মাথাতেও এল। কালো টাকা সাদা করার কয়েকটা উপায়ের কথা শুনেছিলাম। যেমন, কালো টাকা বন্ধুকে ‘ধার’ দিয়ে সেই ধার শোধ করছে বলে তার কাছ থেকে ব্যাঙ্কের চেক নেওয়া; জমির দাম খাতায়-কলমে অনেক কম দেখিয়ে, আসল দামের বাকি অংশ কালো টাকায় দেওয়া (এতে দু-দিক থেকেই লাভ-কালো টাকা হাত থেকে বেরিয়ে যাবে, আবার বিক্রিতে রেজিস্ট্রেশন ফি-ও কম দিতে হবে); ইত্যাদি। কিন্তু এখানে কী হচ্ছে? একেনবাবু ব্যাপারটা বউদিকে বুঝিয়ে বললেন।
“আসলে মিনু, প্রথম থেকেই আমার মাথায় একটা প্রশ্ন ছিল, র্যান্ডো সাহেব তো বিদেশি— এদেশে ফার্মল্যান্ড কিনছেন কী করে? বাপিবাবুও সেই একই প্রশ্ন তুলেছিলেন। লাকিলি এইসময় আমার এদেশের কানেকশনগুলো কাজে লাগল। বোলপুরের এসডিপিও রমেনের কাছ খবর পেলাম যে-জমিটাতে উনি আছেন সেটা ওঁর নয়, এক গুজরাতি ব্যবসায়ীর। এর আগে ভেদিয়াতে যে জমি ছিল, সেটাও ওই একই ব্যবসায়ীর। কো-অপারেটিভ কোম্পানি ‘অর্গানিক ফার্ম হাউস’ একটা ভুয়ো কোম্পানি, যার নামে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। অ্যাকাউন্টের সিগনেচার অথরিটি ওঁর। সেটা কী করে সম্ভব হয়েছে জানি না, কারণ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নানানরকম নিয়মকানুন আছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা আর ব্যবহার করা নিয়ে। করা হয়েছে সবই ভুয়ো ডকুমেন্ট আর অসৎ ব্যাঙ্ক ম্যানেজারদের সাহায্যে…”
“অবাক করলেন মশাই,” প্রমথ কথার মাঝেই বলে উঠল, “আপনি এত সব খবর এক দিনের মধ্যে পেয়ে গেলেন!”
“আরে না স্যার, আমি তো কিছু জানতামই না- আজকেই জানলাম। রমেনের কাছে জমি আর কোম্পানিটার কথা শুনলাম।”
“এই প্রমথ, তুই চুপ করবি? বউদির প্রশ্নের জবাবটা আগে ওঁকে দিতে দে! বলুন একেনবাবু, হাওলা স্কিমের কথা তো মাঝে মাঝেই শুনি, কিন্তু ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলুন?”
“পুরো ব্যাপারটা এখনও ভালো করে জানি না, কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই এই অর্গানিক ফার্ম হাউস থেকে কালো টাকা সাদা করা হচ্ছে।”
“কী করে?” এবার আমিই প্রশ্নটা করলাম।
“ভেবে দেখুন স্যার, ওইরকম ছোট্ট বুটিক আর কয়েক একর জমি থেকে দু-শো জন মেয়েকে পার্ট-টাইম কাজের জন্য প্রতিদিন দু-শো টাকা করে মজুরি দেওয়া সম্ভব? সেটা যদি-বা মানা যায়, কিন্তু রোজগার তো শুধু দু-শো টাকা নয়, প্রত্যেকে পাচ্ছে এক হাজার টাকা ক্যাশ, তার থেকে জমা দিচ্ছে আটশো টাকা অর্গানিক ফার্ম হাউসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে। অর্থাৎ প্রতি মাসে চব্বিশ হাজার টাকা জমা পড়ছে প্রত্যেকটি মেয়ের কাছ থেকে। দু-শো জন মেয়ে, তার মানে মাসে আটচল্লিশ লক্ষ টাকা আসছে এই কোম্পানিতে। বারো দিয়ে গুণ করলে বছরে প্রায় ছ’কোটি টাকা।”
“পাঁচ কোটি ছিয়াত্তর লক্ষ।” প্রমথ শুদ্ধ করে দিল।
“ওই হল স্যার, মোট কথা অনেক। এই ক্যাশগুলো সব কালো টাকা। এসেছিল অসৎ উপায়ে ড্রাগ বিক্রি করে, বেআইনি জুয়ো চক্র, বা চুরির জিনিস বিক্রি করে… ভগবান জানেন কোত্থেকে! ওগুলো সব সাদা হয়ে গেল। প্রশাসন মনে করছে মেয়ে কর্মীরা নিজেদের কোম্পানিতে টাকা জমা দিচ্ছে অল্প অল্প করে কিছু টাকা, তাতে তো কোনো অপরাধ নেই।
“এটা কী বললেন আপনি? কোম্পানিতে যে এত টাকা আসছে, সেগুলো খরচা হচ্ছে কোথায়? তার জন্য কোনো হিসেব দিতে হয় না?” আমি প্রশ্ন তুললাম। “আরে না স্যার, ওগুলো তো খাতায়-কলমে দেখানো হচ্ছে বিদেশি জিনিসপত্র কেনার জন্য খরচ হচ্ছে। নিশ্চয় কেম্যান আইল্যান্ড বা কোনো অফশোর ব্যাঙ্কের সাহায্য নিচ্ছে।”
“ওই কতগুলো মেড-ইন চায়না আর মেড ইন মেক্সিকো-র শস্তা মালের জন্য?”
“ওইখানেই তো ভুল করলেন স্যার। যেটা আপনি দেখছেন পঞ্চাশ টাকা, খাতায়-কলমে ওটা হল পঞ্চাশ হাজার টাকা। ধরতে যাচ্ছে কে? আর এদিক-ওদিক কিছু ঘুষের খরচ।”
“তুমি জানলে কী করে, এটাই ওরা করছে?” একেনবউদি জিজ্ঞেস করলেন।
“আমি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলছি মিনু।”
“আপনি অত্যন্ত সিমপ্লিস্টিক ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করছেন।” প্রমথ বলল, “এসব ব্যাপারে অনেক প্যাঁচঘোঁচ থাকে। এদেশেও সরকারকে ফাঁকি অত সহজে দেওয়া যায় না।”
“এটা ঠিক বলেছেন স্যার, আমিও পরিষ্কার বুঝিনি বলেই বোঝাতে পারলাম না। ব্যাপারটা নির্ঘাৎ আরও অনেক কমপ্লিকেটেড।”
“যেটা আন-কমপ্লিকেটেড সেটা হল আপনি কোনো কাজ না করে ফোকটে র্যান্ডো সাহেবের টাকায় ইন্ডিয়া বেড়িয়ে যাচ্ছেন!” প্রমথ খোঁচা দিল।
“আপনি না স্যার, সত্যি! কিন্তু র্যান্ডো সাহেবের কাজটা যে আমি করব না আপনি কেন সেটা ভাবছেন?”
“কীভাবে করবেন শুনি। আপনার ক্লায়েন্ট তো এখন জেলে?”
“সেটাই একটু মুশকিল হয়ে গেল স্যার, কিন্তু যিনি চিঠিগুলো র্যান্ডো সাহেবকে পাঠিয়েছিলেন তিনি তো জেলে নন।”
“আপনার মুণ্ডু!”
.
এরপর আমাদের মধ্যে এই নিয়ে আর কোনো আলোচনা হল না। একেনবাবু আমাকে আর প্রমথকে বেভ আর ফ্রান্সিস্কার কথা জিজ্ঞেস করে একটু মজা করার চেষ্টা করলেন। প্রমথই ওঁকে সামাল দিল। “আপনার যখন এত দুশ্চিন্তা, ফোন করে জেনে নিন না! এখন তো হোয়াটসঅ্যাপ আছে, একটা পয়সাও খরচা হবে না আপনার!
“কী যে বলেন স্যার, আপনাদের ফোন আর আমার ফোন— দুটো কি ম্যাডামদের কাছে এক হবে!”
এইসব আগড়ম-বাগড়ম কথাবার্তাই ডিনার পর্যন্ত চলল।
.
পরের দিন সকালটা বাড়ির বারান্দায় বসে কয়েক কাপ চা, আর রতনপল্লী থেকে আনা গরম গরম কচুরি খেয়ে দিব্যি কাটল। দুপুরে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস ধরে কলকাতা ফিরব। তবে একেনবাবুর প্রবল দুশ্চিন্তা, গতকাল প্রমথ যে-রিজার্ভেশনটা করে এনেছে, সেখানে প্রমথর হাতের লেখা পড়তে না-পারায় একেনবাবুর বয়স সাতানব্বই বছর হয়ে গেছে! প্রমথকে চিনি, হয়তো বজ্জাতি করেই কীর্তিটা করেছে। কিন্তু মুখে-চোখে প্রচণ্ড আন্তরিকতা ফুটিয়ে প্রবোধ দিচ্ছে, “আহা, এত চিন্তা করছেন কেন, মাথায় একটু পাউডার দিয়ে চুলগুলো সাদা করে দেব!” তারপর একটু বকুনিও দিচ্ছে, “আর কীরকম গোয়েন্দা মশাই আপনি, ছদ্মবেশ ধরতে জানেন না!”
“আপনি না স্যার, সত্যি! ফ্যামিলির বয়স পঁয়ত্রিশ, আর আমাকে বানাচ্ছেন বুড়োহাবড়া!”
“এটা কী বলছেন, বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা হয় না?”
এই সবের মধ্যেই আমাদের স্টেশনে যাবার সময় প্রায় এসে গেল। বাড়িতে করা খিচুড়ি, বেগুন আর ডিম ভাজা খেয়ে বেরোতে যাচ্ছি, এমন সময় শুকনো মুখে সমীর এল। সঙ্গে গাড়ি নেই, সাইকেলে এসেছে। ওর কাছে শুনলাম, পুলিশ এসে র্যান্ডো সাহেবকে তো অ্যারেস্ট করেছেই, পুরো ফার্মটাই সিল করে দিয়েছে। সমীরকে অনেক জেরা করেছে, লাকিলি ওকে ছেড়ে দিয়েছে। কিন্তু বুটিক শপের ম্যানেজারও জেলে।
