পাঁচ
খানিক বাদেই ফুলমনির কাঁধে হাত রেখে ফিরে এসে চেয়ারে বসলেন মিস্টার র্যান্ডো। একটু চুপ করে থেকে শুরু করলেন।
“সত্যি কথা বলতে কী, লুসির পরিবার সম্পর্কে আমি কিছুই বিশেষ জানতাম না। লুসি নিজের থেকে কিছু বলত না। ওর টুকরো টুকরো কথা থেকে যেটুকু জেনেছিলাম, তা হল ওর বাবা ছিলেন এক মদ্যপ জুয়াড়ি। লুসির মাকে এত মারধোর করতেন যে একদিন মা পালিয়ে বাঁচলেন। বাবাও একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে অদৃশ্য হলেন। লুসির বয়স তখন পনেরো। ওর আপন বলতে কেউই ছিল না’। দূর-সম্পর্কের দু-এক জন যারা ছিল তারা কেউই ওর দায়িত্ব নিতে চায়নি। ফলে মাইনর মেয়ে লুসি হয়ে গেল স্টেট-এর দায়িত্ব। লুসিকে পাঠানো হল একটা ফস্টার হোম-এ। লুসির নিজের বলতে ছিল অল্প কিছু জামাকাপড়, বইপত্তর, আর ওর ঠাকুরদা-র রেখে যাওয়া একটা বাক্স, যেটার কথা আপনাকে বলেছি। লুসির সেই ঠাকুরদাকে মনেও নেই, তবে ছোট্ট লুসিকে তিনি নাকি খুব ভালোবাসতেন। বোধহয় সেইজন্যেই নিজের পরিবারের ওই একটি মাত্র জিনিসই লুসি স্মৃতি হিসেবে আঁকড়ে রেখেছিল। ফস্টার হোমে থেকেই লুসি ওর হাই স্কুল শেষ করে।”
কথাগুলো বলে একটু চুপ করে থেকে আবার শুরু করলেন র্যান্ডো, “আমি যখন সিনিয়র ইয়ারে পড়ি, লুসি তখন ঢুকল ফ্রেশার হয়ে।”
“সিনিয়র ইয়ার মানে তো ফোর্থ ইয়ার, আর ফ্রেশার মানে ফার্স্ট— তাই তো স্যার?”
“ঠিক। কলেজে ক্যাফেটেরিয়াতে পার্ট-টাইম কাজ করত লুসি, সেখানেই পরিচয়। এক এক জনের সঙ্গে হঠাৎ ক্লিক করে যায়। লুসির সঙ্গে সেটাই ঘটল। খুব স্ট্রাগ্ল করে ও পড়াশুনো করছিল, আঠেরোতে পৌঁছোবার পর আইনত ফস্টার বাবা-মা’র ভরণ-পোষণের কোনো দায়দায়িত্ব থাকে না। নিজের সব খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হয়। অনেক সময় ফস্টার বাবা-মা কিছুটা সাহায্য করে। ওর ক্ষেত্রে সেটা ছিল একেবারেই শূন্য। থাকা-খাওয়া-পরা থেকে শুরু করে খাতা বইপত্তর, পড়াশুনোর পুরো খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হত। ক্যাফেটেরিয়ার পার্ট- টাইম কাজ আর একটা লোকাল রেস্টুরেন্টে নাইট-শিফট— এই দুই উপার্জন থেকে কোনোমতে জীবনধারণ। আমার ওকে ভালো লাগত, কারণ এত পরিশ্রম করার পরও ওর স্পিরিটটা ছিল অটুট। জীবনের এই স্ট্রাগ্ল ওর চেহারায় কোনো ছাপ ফেলত না। একটু সাজলেই শি লুকড গ্ল্যামারাস। অল্পদিনের মধ্যেই আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে গেলাম। আমার স্বপ্ন ছিল স্ক্রিপ্ট রাইটার হব। ক্লাসে আমার লেখা স্ক্রিপ্ট সবসময়ে A+ গ্রেড পেত, কিন্তু গ্র্যাজুয়েশনের পর দেখি আমার কলেজ-গ্রেডের মূল্য হলিউডে শূন্য। কেউই কোথাও আমাকে সুযোগ দিচ্ছে না। কিছুদিন রেস্টুরেন্টে ওয়েটারগিরি করলাম, কিছুদিন প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিপ্ট রাইটারদের জন্য Ghost writing। অল্প কিছু টাকা পেলাম, কিন্তু স্বীকৃতি পেলাম না। ইতিমধ্যে লুসিকে বিয়ে করেছি। লুসিও পাশ করে ছোটোখাটো চাকরি করছে, কিন্তু হলিউডে যেখানে থাকতাম সেখানে আমাদের দু-জনের রোজগারে ভালোভাবে থাকা কঠিন। লুসিও চেষ্টা করছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এক মেক-আপ আর্টিস্টের শাগরেদি করল কিছুদিন। এক-আধটা কোর্সও করল। কিছুই হল না। লুসি আমাকে চাপ দিতে শুরু করল, হলিউডে কিছু পাবার আশা ছেড়ে আমরা অন্য কোথাও যাই, সেখানে অন্য কোনো কাজের চেষ্টা করি। আমারও গোঁ, কোনোমতেই সেটা করব না। খটাখটি সেখান থেকেই শুরু। তার ওপর লুসি ছিল অত্যন্ত পজেসিভ, অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে একটু হেসে কথা বললেই প্রচণ্ড অশান্তি শুরু করত, যার জের চলত দিনের পর দিন। মোটকথা, আমার ওপর অধিকারবোধটা ছিল ওর ষোলো আনা, ভালোবাসা কতটা অবশিষ্ট ছিল জানি না। কথাবার্তায় ঘৃণাই প্রকাশ পেত বেশি মাত্রায়। একদিন হলিউডের এক প্রডিউসারের কাছে প্রবলভাবে অপমানিত হয়ে ফিরে এসে যখন গুম হয়ে বসে আছি, সহানুভূতি তো পেলামই না, উলটে তিক্তভাবে বলল, ‘ইউ ডিজার্ভ ইট।’
“সেদিন থেকে লোকাল বার-এ গিয়ে মদ খাওয়া শুরু করলাম। রেস্টুরেন্টের কাজ শেষ করে বেশ রাত পর্যন্ত সেখানেই কাটাতাম। লুসিও বাইরে বাইরে ঘুরত। খেয়াল করতাম অনেক সময়েই কিছু খেয়ে ঝিম হয়ে আছে। ঝগড়াঝাঁটি চেঁচামেচি প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। এর মধ্যে একদিন আমার ব্যাঙ্ক থেকে নোটিস পেলাম, ওভার ড্রাফট করেছি বলে কুড়ি ডলার চার্জ করেছে। এমনিতে ব্যাঙ্কের ব্যাপারে আমি খুব হিসেব করে চলি। ব্যাঙ্কে যেতেই ওরা আমাকে লোকাল ডিপার্টমেন্ট স্টোরের নামে পাঁচশো ডলারের একটা চেক দেখাল, নীচে আমার সই। আমার সঙ্গে কথা না বলে আমার সই নকল করে চেক লিখেছে লুসি! সেদিন ব্যাপারটা দৈহিক পর্যায়ে পৌঁছোল, লুসি একটা প্যান-এর বাড়ি মেরে আমার কপাল ফাটাল, আমিও ঘুসি মেরে ওকে মাটিতে ফেললাম। লুসি ব্যথায় কাতরাচ্ছে আর কাঁদছে… যাইহোক, এইসবের মধ্যে একদিন আমি রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়েই গেলাম। এক বন্ধুর বাড়ি রাতটা কাটিয়ে সকালে ফিরে দেখি, লুসি নেই। একটা নোট, ‘আই অ্যাম ডান উইথ ইউ। খোঁজার চেষ্টা কোরো না।’ ক্লজেট খুলে দেখলাম ওর জামাকাপড় নেই, ড্রেসার ড্রয়ারও ফাঁকা
“কেন আমি পুলিশকে জানাইনি জানি না। আসলে লুসি চলে যাওয়ায় মাথার থেকে মস্ত একটা বোঝাই যেন নেমে গেল। লুসিও যোগাযোগ করেনি। কিছুদিন বাদে এক পরিচিত আমাকে জানাল নেভাডার বোল্ডার সিটি-তে লুসিকে দেখেছে, একটা লোকের সঙ্গে থাকে। কথাটা শুনে একটু রাগ যে হয়নি তা নয়। মনে হচ্ছিল আমার সম্পত্তি কেউ যেন ভোগ করছে! তবে কিনা আমিও অন্য মেয়েদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছি। পার্মানেন্টলি নয়, তবে তার একটা নেশা তো আছেই। আমাদের বিয়েটা ভাঙেনি, কিন্তু দু-জনে দু-জায়গায়, কেউই কারোর খবর রাখি না। ভাড়াবাড়িতে থাকতাম, ফার্নিচার, খাট, এমনকী রান্নার বাসনপত্রগুলোও বাড়ির সঙ্গেই এসেছিল। তাই ভাগ-বাঁটোয়ারার ঝামেলা ছিল না। এইভাবে বছর দুই ধরে একা-একাই আছি হলিউডে, হঠাৎ মে মাসের এক বৃহস্পতিবার খুব সকালে দু-জন পুলিশ অফিসার বাড়িতে এসে হাজির। জিজ্ঞেস করল, আমার স্ত্রী-র নাম লুসি কিনা! আমি হতচকিত! তাঁদের জানালাম যে লুসি আর আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে দু-বছর আগে
“ফর্মাল সেপারেশন অবশ্য হয়নি, সেটা আর বললাম না। অফিসার জানতে চাইল সোমবার কোথায় ছিলাম। সে সময়ে ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টে দিন-রাত কাজ করছি— সকালের শিফট আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত, রাতের শিফট আটটা থেকে মিড-নাইট। তারই ফাঁকে একটু লেখালেখি, আর অন্যান্য যা কাজকর্ম। ওটাই ছিল আমার রুটিন। সোমবারও সেখানেই কাজ করেছি। বিকেল বেলায় মিটিং করেছি হলিউডের এক ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের সঙ্গে।
“কোন রেস্টুরেন্ট, তার ঠিকানা, ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টরের নাম-ধাম ইত্যাদি লিখে নিয়ে একজন প্রশ্ন করলেন, লুসির বন্ধুদের খবর কিছু জানি কিনা। একজনের খবরই শুধু জানতাম, মিন্ডি। আমাদের বাড়িতে বার দুই এসেছিল। একটু কাঠ কাঠ টাইপ। আমার খুব একটা পছন্দ হত না। পরে নেভাডায় না কোথায় একটা লাইব্রেরিতে চাকরি পেয়ে চলে যায়।
“সেদিনই জানতে পারলাম লুসি-র অপঘাতে মৃত্যুর কথা। যারা এসেছিল তাদের কাছ থেকে এর বেশি আমি কিছু জানতে পারলাম না। তবে আমার এক পরিচিত ছিল পুলিশ ফোর্সে। তার কাছ থেকে পরে জানলাম, শুধু লুসি নয়, ওর সঙ্গে আরও একজন লোক আগুনে পুড়ে মারা গেছে। ধরে নিলাম যে লোকটা লুসির সঙ্গে থাকত সে-ই। আমাকে ছাড়া লুসির পরিবারের কাউকেই ওরা খুঁজে পায়নি। একজন বন্ধুর রেফারেন্স ওর বাড়িওয়ালা দিয়েছিল, কিন্তু তার সঙ্গেও পুলিশ যোগাযোগ করতে পারছে না। যেখানে সে কাজ করত, সেখানেও সে আর আসছে না। মোটামুটি ডেড এন্ড। এরকম শুনেছি অনেক সময়েই হয়। আর এই হল আমাদের দু-জনের জীবনকাহিনি।” মিস্টার র্যান্ডো চুপ করলেন।
“থ্যাংক ইউ স্যার। এখন দুয়েকটা প্রশ্ন করি?”
“করুন।’
“মিস্টার মেল-এর প্রথম ইমেল-এ আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ম্যাডাম লুসির ঠাকুরদার খাতা চুরি করার। যে-খাতাগুলো আপনি দেখছেন বললেন, সেগুলো কীসের খাতা?”
“সত্যি কথা বলতে কী, ভালো করে দেখিনি। হাতে লেখা কাটাকুটি করা পাতার পর পাতা। আত্মজীবনী হতে পারে, গল্প-কাহিনি বা রম্যরচনাও হতে পারে… যদ্দূর মনে পড়ে বাক্সে মাত্র দুটো খাতাই ছিল। খাতা দুটোর মলাট আর কয়েকটা পাতা ছেঁড়া… ওর ঠাকুরদার খাতা… বুড়ো বয়সে অনেকেরই এরকম লেখালেখির শখ চাপে।”
“ঠিক স্যার, আমার দাদুও শ্যামাসংগীত লিখতেন— পাতার পর পাতা।”
র্যান্ডো সাহেব বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “সেটা আবার কী?”
“স্পেশাল প্রেয়ার টু গডেস কালী স্যার। ও কথা থাক, খাতা দুটো ছাড়া আর কি কিছু সেখানে ছিল? চিঠিপত্র বা অন্য কিছু?”
মাথা নাড়লেন র্যান্ডো সাহেব, “আর কিছু ছিল বলে তো মনে করতে পারছি না। পুরো বাক্সটা নিউ ইয়র্কেই ফেলে এসেছি। আমাদের কোনো ছেলেপুলে নেই, লুসিও বেঁচে নেই—কেন যে ওগুলো বাড়িতে এখনও রয়ে গেছে নিজেই জানি না।”
একেনবাবুর মুখ দেখে আমি আঁচ করতে পারছিলাম, উনি ক্লু-লেস। সেটা স্বীকারও করলেন, “যে-খাতাগুলো চুরি করার অপবাদ ইমেল-এ দেওয়া হয়েছিল, তার ইম্পর্টেন্স কিন্তু আমার মাথায় ঢুকছে না! ম্যাডাম লুসি কি শুধু সেন্টিমেন্টাল কারণে ওগুলো রেখেছিলেন, না অন্য কোনো কারণে? কোনো গুপ্তধনের রেফারেন্স বা ওই ধরনের কিছু কি ওতে ছিল? কিন্তু যদি থেকেও থাকে, সেই খবরটা মিস্টার মেল জানবেন কী করে?” শেষের প্রশ্নটা একটু বিড়বিড় করে যেন নিজেকেই করলেন। তারপর বললেন, “এবার একটা অবান্তর প্রশ্ন স্যার, আপনি বললেন আপনার স্ত্রী আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিলেন। ধরে নিচ্ছি ওটা অ্যাক্সিডেন্ট?”
“তাই তো জানি। ওর অ্যাপার্টমেন্ট ছিল নেভাডার বোল্ডার সিটি-তে, আর আমি ক্যালিফোর্নিয়ায়— ধারে-কাছে ছিলাম না।
“তাহলে স্যার, আপনি ম্যাডাম লুসির হত্যাকারী-ইমেল-এর এই অভিযোগে এত ভয় পাচ্ছেন কেন?”
“আসলে, আসলে…” মিস্টার র্যান্ডো একটু কিন্তু কিন্তু করলেন। “লুসি আমাকে ছেড়ে চলে যাবার কিছুদিন আগে আমি একটা স্ক্রিপ্ট লিখেছিলাম… স্ক্রিপ্টে এক ট্রাক-ড্রাইভার কাজের জন্য দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে থাকত, আর ওর স্ত্রী সেই সময়ে হাজবেন্ডেরই এক বন্ধুর সঙ্গে রাত কাটাত। এ নিয়ে লোকটার মনে সন্দেহ ছিল, কিন্তু সে নিয়ে কথা উঠলেই, স্ত্রী শুধু অস্বীকার করত না, হাজবেন্ডকে নোংরা মনের লোক বলে অপমান করত! একবার, যেদিন ফেরার কথা তার আগে গভীর রাতে বাড়ির ড্রাইভওয়েতে সেই বন্ধুর গাড়ি দেখে মেয়েটির হাজবেন্ড নিজেকে সামলাতে পারল না, বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দিল। ওই স্ক্রিপ্ট থেকে মুভি হবার কথা হচ্ছিল।”
“কিন্তু স্যার, যেদিন আগুন লেগেছিল আপনি তো বাড়ির ধারে-কাছে ছিলেন না!”
“একটা অ্যালিবাই আমার স্ক্রিপ্টেও ছিল।”
“বুঝলাম স্যার।”
একেনবাবু আর কিছু বলার আগে, মিস্টার র্যান্ডো বললেন, “আমার কী মনে হচ্ছে জানেন, কেউ আমাকে ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে।”
“এটা স্যার, আমার মাথায়ও ঘুরছে। তার মানে এই মিস্টার মেল জানেন, আপনি অনেক টাকার মালিক।”
“হতেই হবে, নইলে ব্ল্যাকমেল করতে চাইবে কেন?”
“ঠিক স্যার। আচ্ছা, আপনি তো হলিউডে অনেকদিন খুব স্ট্রাগল করেছিলেন, কিন্তু হলিউডে আপনার ভাগ্য খোলেনি। খুলেছিল পরে— তাই না?”
“হ্যাঁ, হলিউডে কিছুই হচ্ছিল না। লুসি আমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর দু- বছর যেতে-না-যেতেই মারা গেল। তারপর আরও অনেক বছর হলিউডে ছিলাম। একে-তাকে আমার স্ক্রিপ্ট আইডিয়া গছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। একজন তো সেটা নিয়ে নিজের নামে একটা প্রোডাকশন হাউসে বেচে দিল। কিছুই করতে পারলাম না। তখনই মনে হয় আপনার সঙ্গে আমার পরিচয়।”
“হ্যাঁ স্যার, আমার মনে আছে।”
“যাইহোক, যখন স্ক্রিপ্ট রাইটার হবার ইচ্ছে প্রায় ছেড়ে দিচ্ছি, জানতে পারলাম এক দূর সম্পর্কের আঙ্কল অজস্র টাকা রেখে ক্যানাডাতে অটো-অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছেন। সেই আঙ্কল ছিলেন মায়ের কাজিন। মাকে খুব পছন্দ করতেন, সেই সূত্রে আমাকেও। উইলে ওঁর সম্পত্তি মাকে, মায়ের অবর্তমানে আমাকে দিয়ে গিয়েছেন! ব্যাপারটা আমি জানতাম না। ওঁর উকিলই খুঁজেপেতে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আর আমিও রাতারাতি মাল্টি-মিলিয়নিয়ার হয়ে যাই। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল তার কিছুদিন পরে লং আইল্যান্ডে, স্টুয়ার্টও ছিল আপনার সঙ্গে। মনে আছে?”
“আছে স্যার। কিন্তু এই ইতিহাসটা জানতাম না।”
“হ্যাঁ, হলিউড থেকে আমি কিছু পাইনি। কিন্তু আঙ্কলের কাছ থেকে যা পেয়েছিলাম, হলিউডে চার-পাঁচটা ব্লক-বাস্টার মুভির স্ক্রিপ্ট বেচেও তা পেতাম না।”
“বুঝলাম স্যার। কিন্তু এখন আমাকে কী কাজ করতে বলছেন?”
“আমি চাই আপনি এই মেল লোকটাকে খুঁজে বার করুন। হঠাৎ কেন এভাবে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছে এবং আমার শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে? মনে হচ্ছে এর হাতে আমার আর লুসির কিছু ব্যক্তিগত জিনিস আছে, যা দিয়ে আমার রেপুটেশন স্পয়েল করে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করবে।”
“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান। এমন কী জিনিস এঁর কাছে থাকতে পারে যার জন্য আপনি এত দুশ্চিন্তা করছেন!”
মিস্টার র্যান্ডো কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। “আমার দুশ্চিন্তার কারণ আপনাকে বলতেই হবে, নইলে আপনি ব্যাপারটা ঠিক বুঝবেন না। কম বয়সে আমরা সবাই নানান অপরাধ করি, যার গুরুত্ব বোঝার ক্ষমতা তখন থাকে না। পরে যখন বোধবুদ্ধি হয়, তখন সতর্ক হই। কলেজে ঢুকে প্রথম দিকে অনেক ওয়াইল্ড পার্টি করেছি, যে-সব মেয়েরা তাতে আসত, তাদের কেউ কেউ কলেজেও পড়ত না, আশেপাশের হাইস্কুলের— চোদ্দো-পনেরো বছরের অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক, মাইনর। তাদের সঙ্গে নানানভাবে সেক্স করতাম… বুঝতে পারছেন কী বলছি?”
একেনবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে স্যার, বুঝতে পারছি।”
“আমাদের বন্ধু টোনি কাজ করত একটা ফোটো স্টুডিও-তে। সে ছবি তুলত। আর লুকিয়ে লুকিয়ে রাত্রি বেলায় দোকানে গিয়ে ছবিগুলো ডেভলপ করে নিয়ে আসত। ছবিগুলো থাকত আমার জিম্মায়। পার্টিতে ড্রিঙ্ক করতে করতে সেগুলো দেখে ফূর্তি করতাম, আর নতুন মেয়েদের ড্রিঙ্ক করিয়ে সেগুলো দেখিয়ে তাদের লজ্জা ভাঙাতাম। কিছুদিন বাদে পার্টি করার দলটা ভেঙে গেল, কিন্তু একটা খামে সেই ছবিগুলো আমার কাছে রয়ে গিয়েছিল। লুসি সেই খামটা একদিন আবিষ্কার করে। একজন কমবয়সি মেয়েকে ও চিনত। লুসি যখন চলে যায়, খামশুদ্ধ ছবিগুলো নিয়ে গিয়েছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম ওটা ছিল পরে আমাকে ঘায়েল করার মারণাস্ত্র।’
“মারণাস্ত্র কেন?” ফস করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল।
“কারণ সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ অফ চিলড্রেন ইজ অ্যান ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম, যার কোনো স্ট্যাচ্যুট অফ লিমিটেশন নেই।”
এতক্ষণে বুঝলাম র্যান্ডো সাহেবের দুর্ভাবনার কারণ এবং কেন খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন কে ইমেল পাঠাচ্ছে। কিন্তু লোকটাকে খুঁজে পেলে কী করবেন, সেটাই ভাবছিলাম।
একেনবাবু একটু চুপ করে থেকে বললেন, “সবগুলোই কি স্যার একই ইমেল অ্যাড্রেস থেকেই এসেছে?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি কি কোনো উত্তর দিয়েছেন?”
“না।”
“আমি অবশ্য ইমেল-টিমেল-এর ব্যাপার ভালো বুঝি না… যাইহোক, ইমেল- এর একটা কপি আমাকে দিন।
র্যান্ডো সাহেব বিছানার পাশে সাইড টেবিল-এর ড্রয়ার থেকে একটা কাগজ বার করে দিলেন। আমার মাথায় অবশ্য ঢুকল না ইমেল-এর কপি নিয়ে একেনবাবু কী করবেন! ইমেল অ্যাড্রেস থেকে ফেসবুক সার্চ করে অনেক সময় নাম খুঁজে পাওয়া যায়, অবশ্য যদি ওই নামের কেউ ফেসবুকে থাকে। অনেক সময় একই নামের একাধিক লোক ফেসবুকে থাকে। অর্থাৎ, ফেসবুকে নামটা পেলেও নিশ্চিতভাবে পরিচয় জানার উপায় নেই। তার ওপর অনেকের প্রোফাইল আবার লক্ড থাকে। সেখান থেকে কিছুই উদ্ধার করা যায় না। ফেসবুকে না থাকলে নামটাও জানা যাবে না। কোন আইপি অ্যাড্রেস থেকে ইমেলটা এসেছে সেটা অবশ্য র্যান্ডো সাহেবের কম্পিউটার থেকে বার করা যায়। পৃথিবীর কোন অঞ্চল থেকে এসেছে, সেটাও বোঝা যায়। কিন্তু কেউ যদি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে, সেখানেও সুবিধা হবে না। মনে হবে আসছে মুম্বই থেকে, কিন্তু আসলে আসছে নিউ ইয়র্ক থেকে। আমার টেকনোলজি জ্ঞান এখানেই খতম। পুলিশের সাইবার ক্রাইম এক্সপার্টরা র্যান্ডো সাহেবের ল্যাপটপ পেলে সেখান থেকে নিশ্চয় অনেক কিছুই উদ্ধার করতে পারত। কিন্তু সেসব তথ্য ইমেলের প্রিন্ট আউট থেকে পাওয়া অসম্ভব! তবে পুলিশের কাছে তো র্যান্ডো সাহেব যেতে চান না ঝামেলায় পড়বেন বলে! আমার মন বলছিল এসব ঝুটঝামেলার মধ্যে একেনবাবুরও জড়ানো অনুচিত। একেনবাবুকে কিন্তু বিশেষ উদ্বিগ্ন মনে হল না। এক বার চোখ বুলিয়ে কাগজটা পকেটে পুরলেন।
“একটা কথা স্যার, আপনার কি মনে হচ্ছে যিনি এই ইমেলগুলো পাঠিয়েছেন, তিনি এখন ইন্ডিয়াতে আছেন?”
“কেন বলুন তো?” র্যান্ডো সাহেব চমকে প্রশ্নটা করলেন!
একেনবাবু তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, “না না স্যার, প্রশ্নটা এমনিই করলাম।”
ওঁর এই চমকানি আমাদের দৃষ্টি এড়ায়নি বুঝেই র্যান্ডো সাহেব একটু চুপ করে থেকে বললেন, “কেন একটু চমকালাম জানেন, আসলে আপনার প্রশ্নে মনে পড়ল দিন পনেরো আগে নীচে আমার বুটিক-এ একজন মহিলা এসেছিল আমার সঙ্গে দেখা করতে। আমার বুটিক আর অর্গানিক ফার্মে বহু লোক কাজ করে, তারা সমীরকেই চেনে, আমাকে নয়। লোকজন থেকে আমি একটু দূরেই থাকি। সমীরের কাছ থেকে পরে জানতে পারি, যে-মহিলা আমার খোঁজ করছিল, সে আমার সম্পর্কে অনেক খবর রাখে। আমি যে স্ক্রিপ্ট লিখতাম, একসময় ক্যালিফোর্নিয়াতে ছিলাম, ইত্যাদি, ইত্যাদি। এর মধ্যে একদিন ঘরে ঢুকে দেখি আমার আলমারির পাল্লা খোলা। আমি সবসময় পাল্লা দুটো বন্ধ করে রাখি। আমার ব্যাঙ্কের পাসবই, হিসেবের কাগজপত্র সব আলমারিতে থাকে। এমনিতে এই জায়গাটা খুবই সেফ এবং সিকিওর, আর এ দুটো ব্যাপার হয়তো আনরিলেটেডও। তবে এত বছর বাদে লুসিকে নিয়ে ইমেল পাওয়া, আর এই মহিলার আমার খোঁজে আসা…..”
“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার। ভদ্রমহিলা কি হোয়াইট লেডি?”
“হ্যাঁ।”
“এর পরে তিনি আর আসেননি বা যোগাযোগের চেষ্টা করেননি?”
“না। আর সেটা নিয়েও আমার বেশ অস্বস্তি। হঠাৎ করে এরকম একটা অখ্যাত-অজ্ঞাত জায়গায় এসে আমার খোঁজ করা!”
“একটা কথা স্যার, আপনি যে এখানে থাকেন, আপনার পুরোনো পরিচিতদের মধ্যে কেউ কি সেটা জানেন না?”
“আমার উকিল আর বিশেষ পরিচিত কয়েক জন শুধু জানে!”
“বিশেষ পরিচিত বলতে স্যার?”
“যেমন স্টুয়ার্ট আর আমার হলিউডের এজেন্ট। কিন্তু ওরা শুধু জানে আমি ইন্ডিয়াতে থাকি।”
“তাহলে এত অবাক হচ্ছেন কেন স্যার, হয়তো তাঁদেরই চেনাজানা কেউ এসে খোঁজ করছিলেন।”
“মনে হয় না, কারণ আমি স্ক্রিপ্ট লিখতাম ছদ্মনামে। আমার হলিউডের এজেন্ট আর আমার স্ত্রী ছাড়া কাউকেই সেটা জানাইনি। স্বপ্ন ছিল কোনোদিন অস্কার পেলে সবাইকে সারপ্রাইজ দেব। এই মহিলা এখানে এসে সেই ছদ্মনামে আমার খোঁজ করছিল।”
কথাগুলো শুনতে শুনতে আমার মনে পড়ল সেই সাদা মহিলাকে, যিনি খুব মন দিয়ে রেস্টুরেন্টে আমাদের কথা শুনছিলেন। খটকা লেগেছিল, কিন্তু ভালো করে দেখিনি।
“খুবই কনফিউজিং স্যার!” একেনবাবু মাথা চুলকোলেন।
এরপর আরও কয়েকটা কথা হল, আমি সেগুলো আর লিখে রাখিনি। একেনবাবু দেখলাম একদৃষ্টিতে র্যান্ডো সাহেবের খাটের নীচে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎ মিস্টার র্যান্ডোকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি শেষ কবে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন স্যার?”
প্রশ্নের আকস্মিকতায় মিস্টার র্যান্ডো অবাক হলেন, “আমি?”
“হ্যাঁ, স্যার, আপনি!”
“এমনিতে বছরে বার দুই যাই। শেষ বার গেছি তিন মাস আগে। ব্যাঙ্কের একটা কাজে হঠাৎ করেই আমাকে দিন কয়েকের জন্য যেতে হয়েছিল। কেন বলুন তো?”
“জানতে চাচ্ছিলাম ইমেলগুলো খোলার আগে না পরে?”
“আগে। ফিরে এসেই প্রথম ইমেলটা খুলি, আর তার পরের দিনই তো দ্বিতীয় ইমেলটা এল! সেটাও খুব চিন্তায় ফেলেছে আমাকে। মনে হচ্ছে কেউ যেন বুঝতে পেরেছে কখন আমি ইমেল খুলছি!”
একেনবাবুও মনে হল কিছু একটা ভাবছেন। কিন্তু ইমেল খোলার এই ব্যাপারটা আমি জানি। অনেক ইমেল প্রোগ্রামেই ট্র্যাকিং থাকে। কখন কে ইমেল খুলছে বা ইমেল-এ দেওয়া লিংকে ক্লিক করছে, যে-লোক ইমেল পাঠাচ্ছে সে জানতে পারে। তাই যে-মুহূর্তে র্যান্ডো সাহেব প্রথম ইমেলের অ্যাটাচমেন্ট খুলেছেন, মেল নামে যে লোকটা ইমেল পাঠিয়েছে সে জেনে গেছে। আর জানা-মাত্র দ্বিতীয় ইমেলটা পাঠিয়েছে। এটা কোনো ম্যাজিক নয়। পরে একেনবাবুকে এটা বলে দিতে হবে।
“আর কিছু জানতে চান?” র্যান্ডো সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
“আপাতত স্যার এইটুকুই, দেখি কদ্দূর এগোতে পারি,” একেনবাবু বললেন। তারপর “দু-এক দিনের মধ্যে আবার আসব,” বলে র্যান্ডো সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
.
নীচে সমীর, প্রমথ আর একেনবউদির বুটিক ঘুরে দেখা সবে শেষ হয়েছে। একেনবউদির হাতে একটা বড়ো প্যাকেট। একটা ছবি কিনেছেন। প্রমথও টুকিটাকি কিছু কিনেছে, নিশ্চয় ফ্র্যান্সিস্কার জন্যে। মেয়েটা হ্যান্ডিক্র্যাফট খুব পছন্দ করে। ওদের বাইরে দাঁড়াতে বলে আমিও এক বার ঢুঁ মারতে বুটিক-এ গেলাম, একেনবাবুও গুটিগুটি এলেন। টুকিটাকি অজস্র জিনিসে ভরতি। মোটেই সাজানো-গোছানো নয়। তার ওপর একদিকে প্রচুর মনিহারি জিনিস— তেল, ডাল, ঢেঁকি-ছাঁটা চাল, চিঁড়ে, মুড়ির সঙ্গে নানান ধরনের ড্রাই ফ্রুট, আচার, বড়ি, আমসত্ত্ব, ইত্যাদি, যেগুলো খাবার জায়গার পাশের দোকানেও আছে দেখেছিলাম। অন্যদিকে ডাঁই করে আর্টস- ক্র্যাফটস-এর জঙ্গল! বেশ কিছু লোকাল আর্টিস্টদের আঁকা ছবি, কাঠ-খোদাই করা জন্তুজানোয়ার, বাঁশের কঞ্চির ল্যাম্পশেড, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, ছোটোদের জামা, বড়োদের পাঞ্জাবি, টেবিল ক্লথ, বেড কভার–কী যে নেই সেখানে! তবে উদ্ধার করতে প্রচুর সময় লেগে যাবে। আরও সময় লাগবে জিনিসটার দাম আবিষ্কার করতে। প্রাইস-ট্যাগ বলতে কতগুলো সংখ্যা লেখা, যেগুলো আবার ভালো পড়া যায় না। মায়ের জন্য শ্রীনিকেতনি কাঠের কাজ করা হরিণ কিনব ভেবেছিলাম। কমবয়সি যে-মেয়েটি দোকান সামলাচ্ছে, সে কিছুই প্রায় জানে না। খাতা মিলিয়ে দাম বলতে হিমশিম খেল। প্রথমে বলল, ‘ছ-শো!’
ছ-শো দিয়ে কখনোই ওটা কিনব না। সেটা বুঝতে পেরেই বোধহয় বলল, “না, না, দু-শো। ভুল নম্বর দেখছিলাম!”
আরেকটা ব্যাপার, বেশ কিছু হাবিজাবি বিদেশি জিনিস চোখে পড়ল ‘মেড ইন চায়না,’ ‘মেড ইন মেক্সিকো,’ ‘মেড ইন ইটালি,’ ইত্যাদি। কোয়ালিটি খুবই বাজে, মার্কিন মুলুকে বিক্রি হবে না। প্রথমে একটু অবাক হয়েছিলাম। তারপর ভেবে দেখলাম এখানকার লোকাল ক্রেতাদের কাছে এগুলোর একটা আলাদা মূল্য আছে। একেনবাবু কিছু কিনলেন না, কিন্তু নেড়েচেড়ে অনেক কিছু দেখলেন।
ফেরার পথে গাড়িতে উঠতে উঠতে সমীরের সঙ্গে একটু গল্প হল। এই অর্গানিক ফার্ম-হাউস আর বুটিক শপ সম্বন্ধে জ্ঞান বাড়ল। সমীরের মতে এটা হল বীরভূমের স্থানীয় দরিদ্র মেয়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য র্যান্ডো সাহেবের স্কিম। এটা চলে কো-অপারেটিভ হিসেবে, কিন্তু পেছনে টাকা জোগান র্যান্ডো সাহেব। তার মানে? সমীর বুঝিয়ে বলল, প্রায় শ’দুয়েক মেম্বার আছে কো-অপারেটিভের। তারা প্রত্যেকে দিনে প্রায় এক হাজার টাকা করে পায়। কিন্তু তার মধ্যে থেকে রাখতে পারে দু-শো টাকা, বাদবাকি জমা করতে হয় কো-অপারেটিভের অ্যাকাউন্টে। যাতে কো-অপারেটিভ বড়ো হয়ে ওঠে, পরে আরও নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশি মালপত্রগুলো আসে ওই টাকায়। মেয়েরা সবাই খুশি। এই অঞ্চলে মাসে ছ’হাজার টাকা এভাবে রোজগার করা সহজ ব্যাপার নয়।
“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান। বুটিক, জমিজমা, মুর্গি, ছাগল— সবই তো দেখলাম। কিন্তু এত টাকা ইনকাম হয় কোত্থেকে?”
“ওই যে বললাম, ওটা হল স্যারের দান, বলতে পারেন সমাজসেবা। এইভাবেই ভেদিয়াতে শুরু করেছিলেন কো-অপারেটিভ, এখন এখানে। আরেকটা চালু করছেন রামপুরহাটের কাছে একটা গ্রামে। দারুণ না?”
“একদম, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। ভগবান ওঁকে মাল্টি-বিলিয়নিয়ার করুন, আপনাদের বীরভূম তাহলে পালটে যাবে। কী বলেন একেনবাবু?”
প্রমথর শেষটা সমীর ধরতে পারল না। বলল, “আমরাও তাই ভাবি।”
