ছদ্মবেশী সময় (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

দশ

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, কয়েক মিনিটের মধ্যেই মিস্টার হোল্ডব্ৰুক ফোন শেষ করে ফিরে এলেন। “সরি, আপনাদের বসিয়ে রাখলাম, কলটা একটু দরকারি ছিল।”

 

“আরে না স্যার, তাতে কী হয়েছে।”

 

কেস ফাইলটা টেবিল থেকে তুলে পাতা উলটোতে উলটোতে হোল্ডব্রুক সাহেব বললেন, “মিন্ডির সম্পর্কে জানতে চাচ্ছিলেন, তাই তো?”

 

“হ্যাঁ, স্যার।”

 

ভদ্রলোক সত্যি গুছিয়ে গল্প করতে পারেন। যে-ভাবে পুরো ব্যাপারটা বললেন, আমি সেভাবে লিখে উঠতে পারব কিনা জানি না। তবু চেষ্টা করি।

 

“লুসির সঙ্গে মিন্ডির বন্ধুত্ব হলিউডেই শুরু হয়। মিন্ডি সেখান থেকে নেভাডার বোল্ডার সিটি লাইব্রেরিতে কাজ নিয়ে আসে, কিন্তু লুসির সঙ্গে ভালো যোগাযোগই ছিল। লুসি হলিউড ছেড়ে মিন্ডির বাড়িতেই প্রথমে উঠেছিল। মেডিক্যাল সেন্টারে কাজ পাবার পর লুসি নিজে একটা বাড়ি ভাড়া নেয়। লুসি যেখানে কাজ করত, সেখানে মিন্ডিও মাঝে মাঝে আসত।”

 

হোল্ডব্রুক সাহেব যখন ফাইলের দিকে চোখ রেখে বলে যাচ্ছেন তখন একেনবাবু ওঁর কাঁধের কাছে মাথা এনে ফাইলটা দেখার চেষ্টা করছেন। হঠাৎ বলে উঠলেন, “ওটা কী স্যার, ‘দ্য অপোজিট অ্যাট্রাক্টস?”

 

“ওটা আমার লেখা নোট। কেন লিখেছিলাম? ও হ্যাঁ,” পাতাগুলোতে আরেক বার চোখ বুলিয়ে হোল্ডব্রুক সাহেব বলে চললেন, “এক দিক থেকে দু-জনেরই মিল ছিল, কারোরই বাবা-মা ছিল না, বয়সও ছিল দু-জনের কাছাকাছি। কিন্তু মিলটা শেষ সেখানেই। মিন্ডির চেহারা ছিল সাদামাটা, অন্যপক্ষে লুসি ছিল সত্যিই সুন্দরী। কিন্তু লুসি ছিল পেরিনিয়ালি পুওর, আর মিন্ডি পারিবারিক সূত্রে প্রচুর টাকাকড়ি পেয়েছিল। ওর ঠাকুরদা নেভাডায় রিয়েল এস্টেট বিজনেসে প্রচুর টাকা কামিয়েছিলেন। স্বচ্ছলতা থাকলেও মিন্ডির টিন-এজটা কেটেছিল রেস্ট্রিকশনের মধ্যে— অল-গার্লস স্কুলে আর বইপত্র পড়ে। কলেজ লাইফ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত বাইরের জগতের সঙ্গে সেভাবে মেশা হয়ে ওঠেনি। এই সময়েই লুসির সঙ্গে ওর পরিচয় হয়। বরের সঙ্গে লুসির তখনও ছাড়াছাড়ি হয়নি, কিন্তু লুসি একা একাই ঘোরাঘুরি করত আর পার্টি করে বেড়াত— জীবন কাটাত হাই-ফাই স্টাইলে। লুসি হয়ে উঠল মিন্ডির ফ্রেন্ড, ফিলোজফার, আর গাইড। কিন্তু ঠাকুরদা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মিন্ডিকে নেভাডায় চলে আসতে হয়। কয়েক মাসের মধ্যে ঠাকুরদা মারা যান। এর মধ্যে লুসিও নেভাডায় চলে আসে।”

 

“ঠিক স্যার, ঠিক। এই ম্যাডাম মিন্ডির কথাই মিস্টার র‍্যান্ডো আমাদের বলেছিলেন যখন আমাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল,” একেনবাবু বলে উঠলেন।

 

“হতে পারে, মিন্ডি নামটা খুব কমন নয়। লুসির জীবনযাত্রা ছিল অসংযমী, ধারদেনায় জর্জরিত হয়ে থাকত। সবচেয়ে বেশি ধার ছিল মিন্ডির কাছে। ক্রেডিট কার্ডে জিনিসপত্র কিনে মান্থলি পেমেন্ট পর্যন্ত দিয়ে উঠতে পারত না। মিন্ডি ওকে উদ্ধার করত। লুসি আর মিন্ডি দু-জনকেই ক্যাথি ভালো করে চিনত। লুসির অফিস ছিল ক্যাথির অফিসের পাশে। ক্যাথি আর লুসি মাঝে মাঝে একসঙ্গে লাঞ্চ করত, এক-আধ সময়ে মিন্ডিও যোগ দিত।”

 

“ভেরি ইন্টারেস্টিং। এবার কেস ফাইলে ম্যাডাম লুসি আর মিন্ডিকে নিয়ে যা-যা আছে, একটু বলবেন স্যার। আর হ্যাঁ, ম্যাডাম লুসির সেই বয়ফ্রেন্ড, যিনি আগুনে পুড়ে মারা যান, তাঁর সম্পর্কেও।”

 

“ক্যাথি যে ডেন্টিস্ট্রি অফিসে কাজ করত, সেখানে কাজ করত ডেন্টিস্ট টম ভোলকার্ট। মিন্ডি বেশ কয়েক বছর ধরে ছিল টমের পেশেন্ট। ক্যাথির বয়ান অনুসারে ডেন্টিস্ট টম তার পেশেন্টদের সঙ্গে মাঝে মাঝে ডেট করত। অবভিয়াসলি খুব একটা এথিক্যাল ডাক্তার ছিল না। তার ওপর টাকার লোভ একটু বেশিই ছিল। জুয়োর নেশা ছিল, ক্যাসিনোতে গিয়ে টাকা ওড়াত, আর সেই নেশা মেটাতে নানান অছিলায় পেশেন্টদের এক্সট্রা চার্জ করত। ক্যাথি সেটা বুঝত পারত সেন্টারের অন্যান্য ডেন্টিস্টদের কথাবার্তা থেকে। টমের জন্য সেন্টারের বদনাম হচ্ছে বলে তারা চিন্তিত ছিল। লুসি নেভাডায় এসে মিন্ডির রেকমেন্ডেশনে টমের পেশেন্ট হল। লুসির সঙ্গে টমের যে একটা আলাদা সম্পর্ক শুরু হয়েছে, সেটা কিন্তু সেন্টারের অনেকেরই নজরে পড়েছিল। লুসি সময় পেলেই টমের প্রাইভেট অফিসে এসে গল্পগুজব করে যেত। শুধু তাই নয় ক্যাথি শুনেছিল টম নাকি মাঝে মাঝে লুসির অ্যাপার্টমেন্টে রাত কাটাচ্ছে! খবরটা পেয়েছিল লুসির এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। তাই ক্যাথি ভীষণ অবাক হয়েছিল একবার অনেক রাতে কোনো একটা বিশেষ কাজে অফিসে এসে মিন্ডির সঙ্গে টমকে খুব ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে! ক্যাথি দেখেনি দেখেনি করে বেরিয়ে এসেছিল। তবে ক্যাথির ধারণা এটা নিশ্চয় এক বারের ঘটনা নয়, আরও দু-এক বার ঘটেছিল। কারণ ওদের এই কম্প্রোমাইজিং পজিশন আরও কয়েক জনের চোখে পড়ায় ওদের নিয়েও একটা গুঞ্জন মেডিক্যাল সেন্টারে ছড়িয়ে পড়ে। ডক্টর টম ভোলকার্টকে গ্রুপ থেকে সরানো হচ্ছে এমন কানাঘুষো যখন শুরু হয়েছে, লুসি একদিন সকালে অফিসে এল। ক্যাথি তখন নিজের ডেস্কে নেই। সেদিনের পেশেন্টদের ফাইলগুলো জোগাড় করতে রেকর্ডরুমে গেছে। সেটাই সকালে ক্যাথির প্রথম কাজ, যাতে অ্যাপয়েন্টমেন্টের আগেই ডাক্তারদের কাছে পেশেন্টদের রেকর্ডগুলো সব রেডি থাকে। ক্যাথিকে খুঁজতে খুঁজতে লুসি সেখানে এসে হাজির। বোঝাই যাচ্ছে বেশ উত্তেজিত।

 

ক্যাথিকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি জানো, মিন্ডি আজ রাতের বাসে এখান থেকে চলে যাচ্ছে?”

 

“না তো! কী ব্যাপার?”

 

“ওকে আর টমকে জড়িয়ে নানা রকমের কুৎসা বাইরে রটেছে!”

 

ক্যাথি পড়ল সংকটে। আমতা আমতা করে বলল, “না, না, সেরকম তো কিছু আমি জানি না।”

 

ইতিমধ্যে একটা ফোন আসায় তাড়াহুড়ো করে ক্যাথি নিজের ডেস্কের দিকে এগোল। কিন্তু লুসিকে এড়াবে কী করে? ফোনটা ধরে মেসেজ নিয়ে এসে দেখে লুসি তখনও ফাইল ক্যাবিনেটের সামনে ওর আসার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাথি আসতেই লুসি বলল, “ক্যাথি, তুমি আমাদের এত বন্ধু, নিশ্চয় সব জানো। আমায় প্লিজ বলো কী হয়েছে! আমি, টম আর মিন্ডি দু-জনকেই সন্ধ্যায় বাড়িতে ডেকেছি, এই গুজবটা কী করে বন্ধ করা যায় আলোচনা করতে, আর মিন্ডিকে আটকাতে। ‘

 

লুসি এত ইমোশানাল হয়ে আছে দেখে ক্যাথি ওকে শান্ত করার চেষ্টা করল। বলল, “ভেবো না, আমি দেখছি। আমিও মিন্ডিকে লাঞ্চের সময় ফোন করব। এর জন্য ও শহর ছাড়বে? সেটা কেমন কথা!” ইত্যাদি, ইত্যাদি।

 

লুসি বলল, “লাঞ্চের সময় মিন্ডিকে পাবে না, তবে যে-করে হোক আমি ওকে আটকাব। কাল অবশ্যই মিন্ডিকে একটা ফোন কোরো।”

 

হোল্ডব্রুক সাহেব কিছুক্ষণ নিজের নোটের ওপর চোখ বুলিয়ে চুপ করে রইলেন।

 

আমরা সবাই প্রায় রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি। বললাম, “তারপর?”

 

“তারপর তো রাতের সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। গোটা পাঁচেক দমকল ইঞ্জিন লেগেছিল সেটা নেভাতে। কিন্তু কিছুই রক্ষা করা যায়নি। লুসির বাড়ির অংশ পুরোপুরি পুড়ে ছাই। ফায়ার চিফ জনি বেত্তোর লোকেরা লাগল আগুন লাগার কারণ ইনভেস্টিগেট করতে, ইন্সিয়োরেন্সের লোকেরাও তাদের তদন্ত চালাল। আমরা এটাকে আসন অর্থাৎ ইচ্ছকৃতভাবে কেউ আগুন লাগিয়েছে ধরে নিয়ে কাজ শুরু করলাম।

 

“দুটো পুড়ে ছাই হওয়া বডি উদ্ধার হল। সে দুটো কার হতে পারে একটা ধারণা ইতিমধ্যেই আমাদের ছিল। লুসির সঙ্গে মাঝে মাঝেই রাত কাটাত টম। সেই রাতে টম নিজের বাড়িতে ফেরেনি, ওর পাশের বাড়ির মহিলা জানালেন। অন্যজন নিশ্চয় লুসি, বাড়িটা যার। এর ওপর ভিত্তি করে তো রিপোর্ট লেখা যায় না, ফরেন্সিক এভিডেন্স লাগবে। আর যদি এই দু-জনকে খুন করার জন্য কেউ আগুন জ্বালিয়ে থাকে, তাহলে তারা কে বা কারা? একজন অবভিয়াস ক্যান্ডিডেট হল লুসির বর, র‍্যান্ডো। তার কথা তো আগেই বললাম। আরেক জন যে এই ব্যাপারে জড়িত থাকতে পারে, সে হল মিন্ডি। টম, লুসি, আর মিন্ডি যে একটা লাভ-ট্রায়াঙ্গেলে জড়িয়ে গেছে, সেটা শুধু ক্যাথির কথা নয়, আরও দু-এক জন মেডিক্যাল সেন্টারের কর্মীর বিবৃতিতে স্পষ্ট। আমি নিজে চিন্তা করছিলাম এইভাবে— টম লাস্যময়ী সুন্দরী লুসির প্রতি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু ওকে সামাল দেওয়াটা সহজ ব্যাপার ছিল না। লুসি ছিল হাই মেন্টেনেন্স পার্সন। লুসির প্রেমে হাবুডুবু খেলেও ওর অর্থের প্রয়োজন মেটানো সাধারণ এক ডেন্টিস্ট টমের পক্ষে ছিল কঠিন। জুয়ো আর লুসি – দুটোকে একসঙ্গে সামাল দিতে টম নিশ্চয় হিমশিম খাচ্ছিল! মিন্ডির ব্যাপারটা আলাদা। মিন্ডি ছিল টমের বেশ কয়েক বছরের লাইফ বোট— বিপদে-আপদে অর্থ জোগাত।”

 

“একটা কথা স্যার, ডক্টর টম কি বিবাহিত ছিলেন?”

 

“না, সেটা হলে তো আর্সনের আরেকটা সাসপেক্ট থাকত।”

 

“ঠিক স্যার।”

 

“যেটা বলছিলাম— মিন্ডির টাকাপয়সা, আর লুসির দৈহিক আকর্ষণ, এই দুইয়ের ফাঁদে আটকা পড়েছিল টম। লুসি-মিন্ডির দু-নৌকোয় পা দিয়ে ভেসে থাকা ছাড়া টমের আর কোনো উপায় ছিল না! টম আর মিন্ডি দু-জনেই খুব সাবধানে ওদের সম্পর্ক লুকিয়ে রেখেছিল। হঠাৎ করে জানাজানি হয়ে যাওয়ার লজ্জাটা মিন্ডি নিতে পারেনি, তাই সে পালাবার প্ল্যান করেছিল। ওদিকে লুসি সম্পর্কটা জানতে পেরেও মিন্ডিকে আটকাতে চেয়েছিল, তার সবচেয়ে বড়ো কারণ মিন্ডি ওরও এক্সট্রা মানির সোর্স ছিল!”

 

হোল্ডব্রুক সাহেব আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, ম্যাডাম ক্যাথি কি ম্যাডাম মিন্ডির সঙ্গে পরের দিন যোগাযোগ করেছিলেন?”

 

“চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ধরতে পারেনি। আর অগ্নিকাণ্ডের পরে তদন্তের স্বার্থে আমরাও নানানভাবে ওর খোঁজ করেছি, কিন্তু পাইনি।”

 

এতক্ষণ আমি কোনো কথা বলিনি। কিন্তু মিন্ডির এই হঠাৎ অদৃশ্য হওয়াটা ঠিক মানতে পারলাম না। হোল্ডব্রুক সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “কেউ হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে যায় কী করে? এদেশে তো মিসিং পার্সন ট্র্যাক করার অনেক কৌশল আছে!”

 

“তাও তো বছরে ছ-লক্ষ লোক অদৃশ্য হয়। তার মধ্যে নব্বই পার্সেন্টকে অবশ্য পরে পাওয়া যায়, বেশ বড়ো অংশ মৃত অবস্থায়। তবে এর মধ্যে আরও একটা ব্যাপার ঘটেছিল, যার জন্য তদন্তে সেই জোরটা আর ছিল না। ফায়ার চিফ জনি বেত্তো আগুন লাগার আরেকটা সম্ভাবনার কথা বলায় আসনের যুক্তিটা আর তেমন জোরদার রইল না। গ্যাস স্টোভের কন্ট্রোল নবটা ওপেন ছিল। নিশ্চয় বাড়ির কেউ খেয়াল করেনি। আগুন জ্বলুক বা না-জ্বলুক, এটা ডেঞ্জারাস। জ্বলন্ত স্টোভের ওপর কিছু চাপানো না-থাকলে আশেপাশে থাকা কাপড় বা পেপার টাওয়েলে আগুন লেগে যেতে পারে। আর আগুন না জ্বালিয়ে ভুল করে কন্ট্রোল নব খুললে তো আরও ঝামেলা! ঘর যাবে গ্যাসে ভরে, তখন সিগারেটে আগুন লাগাতে গেলে, এমনকী আলো জ্বালানোর সুইচেও যে স্পার্ক হয় তাতেই পুরো ঘরটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে।

 

“এই ঘটনার প্রায় দু-বছর বাদে মিন্ডির খোঁজ মিলেছিল টরোন্টোতে। আমার ডিপার্টমেন্টের এক ডিটেকটিভ রুটিন তদন্তে গিয়ে মিন্ডিকে জিজ্ঞাসবাদ করেছিল। মিন্ডির বক্তব্য সে আগুন লাগার আগেই বোল্ডার সিটি ছেড়ে লস এঞ্জেলেস হয়ে নিউ ইয়র্কে আসে। সেখান থেকে ক্যানাডায়। শুধু মুখের কথা নয়, ফ্লাইট রিজার্ভেশন, ইত্যাদি বেশ কিছু কাগজপত্রও তার কাছে ছিল। অর্থাৎ লুসি যে ক্যাথিকে বলেছিল মিন্ডি বোল্ডার সিটি থেকে চলে যাচ্ছে, তাতে কিছুমাত্র ভুল ছিল না। আসন প্রমাণিত হলেও, কোনোমতেই মিন্ডিকে চার্জ করা সম্ভব হত না।”

 

“এখনও ম্যাডাম মিন্ডি কি টরোন্টোতে?”

 

“না, এখন ও নিউ ইয়র্কের কোথাও থাকে বলে শুনেছি, ঠিক কোথায় অবশ্য জানি না। আমার সেই জুনিয়র হয়তো জানবে।”

 

“আপনার সঙ্গে কি ম্যাডাম ক্যাথির কোনো যোগাযোগ আছে?

 

“মাঝে মাঝে কথাবার্তা হয়। কেন বলুন তো?”

 

“আমি ওঁকে দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চাই। তার থেকেও ভালো হয় স্যার, আপনি যদি আমার হয়ে প্রশ্নটা করেন।”

 

“তা করতে পারি, কিন্তু প্রশ্নটা কী?”

 

“ম্যাডাম লুসির ঠাকুরদার একটা খাতার প্রসঙ্গে। মিস্টার র‍্যান্ডো সেটা চুরি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেটা কী এমন দামি জিনিস হতে পারে আমার মাথায় ঢুকছে না!”

 

“ঠাকুরদার খাতা!” হোল্ডব্রুক সাহেব কনফিউজড মুখে তাকালেন।

 

আমরা ব্যাপারটা জানি, কিন্তু হোল্ডব্রুক সাহেব ইমেলটা দেখেননি। কনফিউজড হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রমথ ব্যাপারটা বিশদ করে দিল।

 

“একটা খাতা নিয়ে তিরিশ বছর আগের কোনো কথা কি ক্যাথির মনে থাকবে!” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “থাকতেও পারে। ওর তো আবার হাইপারথাইমেসিয়া সিনড্রোম আছে।”

 

“সেটা কী স্যার?”

 

“হাইলি সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমারি। তদন্তের সময় লুসির ব্যাপারে ওকে যখন প্রশ্ন করেছিলাম এত ডিটেলে সব কিছু বলছিল, আমি অবাকই হয়েছিলাম। তখনই জেনেছিলাম ওর এই স্পেশাল মেমারির কথা। কারও এই বিশেষ স্মরণশক্তি থাকলে অনেক সময় দশ বছর আগে ডিনার খেতে খেতে কার সঙ্গে কী কথা হয়েছিল, সেটাও সে হুবহু বলতে পারে! ক্যাথির এই অস্বাভাবিক ক্ষমতার জন্য, হাইপারথাইমেসিয়া সিনড্রোম-এর ওপর কয়েকটা ন্যাশনাল রিসার্চে ও একজন সাবজেক্ট ছিল।” তারপর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, “ক্যাথি খুব সকালে ঘুম থেকে ওঠে… দাঁড়ান, ওকে ফোন করছি।”

 

.

 

ক্যাথিকে পাওয়া গেল। কিন্তু কিছুই মনে করতে পারলেন না ক্যাথি, না-পারাই স্বাভাবিক। আমরা যখন প্রমথর বানানো দ্বিতীয় প্রস্থের কফি খাচ্ছি, হোল্ডব্রুক সাহবের মোবাইলটা বাজল।

 

“আরে ক্যাথি, বলো… মনে পড়েছে… আচ্ছা… ঠিক আছে, ওঁকে জানিয়ে দিচ্ছি।”

 

মোবাইল পকেটে ঢুকিয়ে হোল্ডব্রুক সাহেব একেনবাবুকে বললেন, “ক্যাথি বলল, ওর মনে পড়েছে। সকালে নাতনির সঙ্গে বসে টিভি-তে ‘দ্য উইজার্ড অফ ওজ’ শুরু হতেই মনে পড়েছে। বহু বছর আগে ক্যাথি, মিন্ডি আর লুসি একসঙ্গে ‘রিটার্ন টু ওজ’ সিনেমাটা দেখেছিল। তখন কথায় কথায় মিন্ডি বলেছিল, ওর ঠাকুরদার কাছে শুনেছে অরিজিনাল ‘ওজ-এর লেখক এল. ফ্র্যাঙ্ক বম নাকি বড়োদের জন্যেও অনেকগুলো বই লিখেছিলেন। সেগুলো প্রিন্টিং প্রেস থেকে হারিয়ে যায়।

 

সেটা শুনে লুসি বলেছিল, ওর ঠাকুরদারও একটা প্রেস ছিল, আর ঠাকুরদা ওর জন্য দুটো খাতা রেখে গিয়েছেন। কিন্তু দুটোই লস এঞ্জেলেসের বাড়িতে ফেলে এসেছে।

 

মিন্ডি রিচার্ড র‍্যান্ডোকে চিনত। বলেছিল, ‘এখুনি রিচার্ডকে বলো ওগুলো তোমাকে পাঠাতে।’ এইটুকুই ক্যাথির হঠাৎ মনে পড়ল।”

 

“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার, ভেরি ইন্টারেস্টিং।”

 

“বুঝলাম না। কোনটে ইন্টারেস্টিং?”

 

“জানি না স্যার।”

 

একেনবাবুর মাথায় কী ঘুরছে ভগবান জানেন! হোল্ডব্রুক সাহেব একটু অবাক হয়ে একেনবাবুর দিকে তাকালেন।

 

দ্বিতীয় কাপ কফিও ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। মিস্টার হোল্ডব্রুক বললেন, “আমাকে এক জায়গায় যেতে হবে, আর কি কোনো প্রশ্ন আছে?”

 

“এই মুহূর্তে নেই স্যার, কিন্তু কাল কি পরশু আপনার একটু সময় হবে?”

 

“নিশ্চয়। তবে কাল নয়, পরশু আমি সারাদিনই ফাঁকা।”

 

“থ্যাংক ইউ স্যার। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ।”

 

.

 

হোল্ডব্রুক সাহেব চলে যেতে-না-যেতেই প্রমথ পড়ল একেনবাবুকে নিয়ে।

 

“কী একটা বাজে সমস্যা নিয়ে আপনি বেগার খাটছেন! আমি এক বার বলেছি, আবার বলছি, যে-লোকটা আপনাকে অ্যাপয়েন্ট করেছিল, সে ব্যাটা জেলে এবং যথেষ্ট দুশ্চরিত্র লোক। আর আপনি কেন ভাবছেন যদি বারও করতে পারেন ওই মিন্ডি না পিন্ডিই র‍্যান্ডোকে ইমেল পাঠিয়েছিল- র‍্যান্ডোর উকিল বার্ড সাহেব উচ্চবাচ্য না করে আপনাকে বিশ হাজার ডলার দিয়ে দেবেন!”

 

“বিশ নয় স্যার, তিরিশ।”

 

“ওই হল, যেটা পাবেন না, সেটা এক মিলিয়ন হলেই-বা সমস্যা কী?”

 

“আপনি কিন্তু স্যার একটা ইম্পর্টেন্ট পয়েন্ট মিস করছেন।”

 

“কী?”

 

“দুটো খাতার কথা।”

 

“আপনার মুণ্ডু!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *