ছদ্মবেশী সময় (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

সাত

নিউ ইয়র্কে ফিরেছি প্রায় এক মাস হল। ব্রুকলিনের একটা মার্ডার কেস নিয়ে একেনবাবু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ঘটনাটা হল, খুনি সন্দেহে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লোকটির বিরুদ্ধে পুলিশ যে কেস খাড়া করেছে, সেটা যথেষ্ট মজবুত। লোকটি বলছে সে খুন করেনি। কিন্তু কোর্টে তো সেটা প্রমাণ করতে হবে। উকিলমশাই সেইজন্যেই একেনবাবুর সাহায্য চেয়েছেন।

 

ডিনারে বসে একেনবাবু আলতুফালতু অনেক কিছু নিয়ে বকবক করেন, কিন্তু এই মার্ডার কেসটার কথা এড়িয়ে যান। প্রমথর ধারণা ব্যাপারটা নিয়ে উনি ব্লু-লেস। সকালে বেরোনোর আগে রোজ জিজ্ঞেস করি, “আজকে কি ডিনারের আগে ফিরবেন?” একেনবাবুর উদ্‌বেলিত উত্তর, “অবশ্যই ফিরব স্যার। প্রমথবাবুর রান্না মিস করব!”

 

প্রমথ অবশ্য খোঁচা দিতে ছাড়ে না। “আমার রান্নার জন্য? না, বাড়িতে খেলে টু-পাইস বাঁচবে সেই কারণে?”

 

একেনবাবু আমার দিকে করুণভাবে তাকিয়ে বলেন, “প্রমথবাবু না স্যার, সত্যি!”

 

এর মধ্যে হঠাৎ একদিন ফিরলেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে। বললেন, “বুঝলেন স্যার, আজকে দু-জন ইন্টারেস্টিং লোকের সঙ্গে দেখা হল।

 

এটা একেনবাবুর স্টাইল। যদি কারোর সম্পর্কে কিছু বলতে চান, এইভাবেই শুরু করেন। এরপর আমাকে প্রশ্ন করতে হয়, ‘কার কথা বলছেন?’ উনি একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর দেন। তার পিঠে আমি বা প্রমথ আরেকটা প্রশ্ন করি, উনি তার উত্তর দেন… এইভাবে ব্যাপারটা বিশদ হয়। আজকের প্রশ্নোত্তর থেকে জানা গেল, প্রথম ইন্টারেস্টিং লোক হচ্ছেন একজন মহিলা—মিজ জনসন। এক্সপার্ট উইটনেস হিসেবে ওঁর মতামতকে কোর্ট নাকি খুব সম্মান করে, আর ওঁর জন্যেই মনে হচ্ছে ব্রুকলিন মার্ডারে পুলিশ যাকে দোষী ভেবেছে, সে ছাড়া পেয়ে যাবে।

 

প্রমথ বলল, “আপনি মশাই যা-তা। কেসটা কী সেটাই তো এতদিন বলেননি, দুম করে এখন একটা কনক্লুশন ছাড়ছেন!”

 

“বলিনি বুঝি স্যার? আসলে কেসটা তেমন ইন্টারেস্টিং নয়। ব্রুকলিনে একজন ওল্ড লেডি খুন হয়েছেন। তাঁর দুই ছেলে। ছোটো জন নিজের, আর বড়ো জন সৎ-ছেলে, মানে ওঁর দ্বিতীয় স্বামীর আগের পক্ষের। এই ছোটো ছেলেকেই পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। আপাতত মহিলার দুই স্বামীর কেউই বেঁচে নেই। কোনো ছেলেই মাকে দেখত না, ফলে বুড়ি একাই থাকতেন। টাকাকড়ি ওঁর যা ছিল, তাতে দিব্যি চলে যেত। আর বাড়িটাও ছিল নিজের। ব্রুকলিনে বাড়ি— পুরোনো হলেও মিলিয়ান ডলার তো হবেই, তাই না স্যার?”

 

“তা হবে, নিউ ইয়র্ক বলে কথা,” উত্তরটা আমিই দিলাম।

 

“এই ওল্ড লেডিকেই কেউ রাত্রে এসে গুলি করে খুন করেছে। পুলিশের ধারণা টাকাকড়ি কিছুই খোয়া যায়নি, যদিও আলমারি খোলা ছিল, কিন্তু কেউ সেখানে হাত দিয়েছে বলে পুলিশের মনে হয়নি।”

 

“এ ধারণাটা পুলিশের হল কেন?” জিজ্ঞেস করলাম।

 

“ওল্ড লেডির বাড়ির খুব কাছেই ছিল ওঁর ব্যাঙ্ক। সোশ্যাল সিকিউরিটির চেক ওখানে জমা পড়ত। তিনি সেই টাকা আর যা পেনশন পেতেন, প্রতি মাসে সংসার খরচের জন্য তা তুলতেন। টাকার অঙ্ক খুব একটা বড়ো নয়, কিন্তু ওঁর চলে যেত।”

 

“মানে দিনে আনি দিনে খাই?”

 

“ঠিক তা নয় স্যার, ওঁর জমানো টাকাও ব্যাঙ্কে ছিল। কিন্তু তাতে হাত লাগাননি বেশ কয়েক বছর। ওঁর লকারে ছিল প্রায় দশ বছর আগে তৈরি একটা উইল, তাতে ওঁর স্থাবর-অস্থাবর পুরো সম্পত্তি সমানভাবে দুই ছেলেকে ভাগ করে দেবার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু ওঁর ডেস্ক-এর ড্রয়ারে পুলিশ পেয়েছিল আর একটা উইল, যেটা লেখা হয়েছিল উনি খুন হবার সাত দিন আগে। মনে হয় সেটাকে ব্যাঙ্কের লকারে রাখার সময় পাননি। এই উইলে পুরো সম্পত্তিই দিয়েছেন সৎ ছেলেকে। প্রথমে এই সৎ ছেলেই ছিল পুলিশের প্রাইম সাসপেক্ট। তার কোনো অ্যালিবাই নেই। আর সেই রাত্রে সে একাই নিজের বাড়িতে ছিল, যেটা ওল্ড লেডির বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। কিন্তু ব্যাপারটা পরে অন্যদিকে ঘুরে যায়। পুলিশের রিপোর্ট অনুসারে খুন হবার দিন দশেক আগে দুই ছেলে এসেছিল ওল্ড লেডির জন্মদিন উপলক্ষ্যে। কোনো কারণে বুড়ির সঙ্গে তখন ছোটো ছেলের তুমুল ঝগড়া হয়। পুলিশ দুয়ে দুয়ে এক করেছিল, কারণ ওর মা উইলে ওকে বাদ দিয়েছে শুনে ছোটো ছেলে খুব অবাক হয়েছিল! আগের উইলের একটা কপি ওর কাছে ছিল। সেটা থেকে ওর ধারণা হয়েছিল অর্ধেক সম্পত্তি ও পাবে। তবে ওর সঙ্গে যে মায়ের খুব ঝগড়া হয়েছিল, সেটা পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে। বার্থ-ডে পার্টি থেকে মা ওকে প্রায় তাড়িয়েই দিয়েছিল। কিন্তু ওর বক্তব্য মা পুরোপুরি খামখেয়ালি…”

 

একেনবাবুর কাহিনি হয়তো আরও কিছুক্ষণ চলত, প্রমথ ওঁকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “বুঝলাম। এখন বলুন, এই মিজ জনসন এমন কী করলেন, যাতে ছোটো ছেলে ছাড়া পেয়ে যাবে।”

 

“বলছি স্যার। ব্যাঙ্ক লকারের উইলের সইয়ের সঙ্গে নতুন উইলের সই একদম মিলে গেছে। সেখানেই সমস্যা।”

 

“আজব কথা, সেটাই তো হওয়া উচিত!” আমি বললাম।

 

“না স্যার, সই হুবহু মেলা মানেই সেটা অথেন্টিক নয়,” একেনবাবু বললেন।

 

একেনবাবুর মাথাটা কি গ্যাছে! আমি বললাম, “কী বলছেন যা-তা! শুনুন একেনবাবু, সই মেলেনি বলে কলকাতাতেই আমার ব্যাঙ্ক চেক বাউন্স করে দারুণ ঝামেলা হয়েছিল! ফোন করে কাজ হয়নি, শেষ পর্যন্ত সশরীরে উপস্থিত হতে হয়েছিল। ম্যানেজার মশাই আমাকে চিনতেন। তাও সামনে বসিয়ে আমাকে দিয়ে চেক সই করিয়েছিলেন। তাতেও মিলছে না বলে, ওঁদের রেকর্ড থেকে আমার পুরোনো সইয়ের ফোটোকপি বার করে সেটা মিলিয়ে সই করতে বলেছিলেন। সেটা কি মিছিমিছি!”

 

ব্যাপারটা এখানে একটু বিশদ করে বলি। আসলে আমি বাপি দে-র ডি-টা একটু কায়দা করে লিখি। ডি-এর যে শুঁড়টা দিই সেটাই একটু অন্যরকম হচ্ছিল! এদেশে এসে দেখি সই মেলার ব্যাপারে অতটা কড়াকড়ি নেই। আমার লেখা সই কখনো বাতিল হয়নি। অথচ আমি জানি সবসময় সইগুলো একদম একরকম হয় না। তাড়াহুড়ো করে একসময়ে সইটা একটু বাঁকাভাবে করি, ডি-র শুঁড় তো নানানরকম হয়। আবার এও শুনি ইলেকশনের সময় ব্যালট পেপারে সই করে যারা চিঠিতে ভোট দেয়, সই মেলেনি বলে তাদের অনেক ভোট গ্রাহ্য করা হয় না। ফলে ন্যায্য ভোট বাতিল হয় সই না-মেলার জন্য। পুরো ব্যাপারটাই আমার কাছে রহস্য। এ নিয়ে প্রমথ আমাকে অনেক জ্ঞান দেয়। লক্ষ লক্ষ ব্যালট পেপার নাকি কম্পিউটারে সর্ট করা হয়। সেখানে সই মেলানো হয় প্যাটার্ন রেকগনিশনের স্পেশাল কিছু সফটওয়্যার- পিক্সেল ম্যাচিং, সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন টেকনিক, কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্কের ব্যাক প্রোপাগেশন মেথড, ইত্যাদি, কতগুলো দুর্বোধ্য টেকনিক দিয়ে। সবসময় সেগুলোও ঠিকমতো কাজ করে না। শেষে স্যাম্পল বেসিসে স্পেশালিস্টদের দিয়ে চেক করানো হয়। অনেক ভুল ধরা পড়লে তাদের দিয়ে নতুন করে ব্যালটগুলো গোনানো হয়। আমাদের দেশে সই মেলানোর জন্য ব্যাঙ্কে যাঁদের রাখা হয়, এঁরা নিশ্চয় তাদের মতো নয়! তাহলে তো বহু লোকের লেজিটিমেট ভোটই বাতিল হয়ে যাবে!

 

.

 

যাইহোক, একেনবাবু দেখলাম আমার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা শোনার পরও খানিকটা নির্বিকার। বললেন, “না না, তা কেন স্যার, তবে কিনা সই মেলাটাই ফাইনাল নয়।”

 

“কথাটা একটু বুঝিয়ে বলুন তো! সই মিলে গেলে সমস্যাটা কোথায়? ইট মেকস নো সেন্স।”

 

“বলছি স্যার। এক্ষেত্রে মিজ জনসন অনেকগুলো যুক্তি দিয়েছেন, কেন দুটো সই হুবহু এক হতে পারে না। সময়ের ব্যবধান ছাড়াও, বৃদ্ধার আথ্রাইটিস রোগের বিষয়টা একটা বড়ো ফ্যাক্টর। একটু করে ওঁর হাতের লেখা আর সইয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা দ্বিতীয় উইলে ধরা পড়েনি। সুতরাং ওটা নকল। এটার পর অঙ্ক অত্যন্ত সোজা। অর্থাৎ আগের উইলটাই ভ্যালিড, ছোটো ছেলে সম্পত্তির অর্ধেক পাবে।”

 

“শুধু অর্ধেক নয়, পুরোটাই পাবে।” প্রমথ বলল, “বড়ো ছেলেই নিশ্চয় জালিয়াতি করে পুরোটাই আত্মসাৎ করতে চেয়েছিল সমা-কে খুন করে, সে সম্পত্তির অর্ধেক পায় কী করে!”

 

আইন এ ব্যাপারে কী বলে জানি না, কিন্তু প্রমথর যুক্তিতে ধার আছে। “আপনার কি মনে হয় বড়ো ছেলেই খুন করেছে?” একেনবাবুকে প্রশ্ন করলাম।

 

“পুলিশ সে নিয়ে স্যার মাথা ঘামাক, আমার কাজ ছিল ছোটো ছেলের উকিলকে সাহায্য করা।”

 

“কীরকম সত্যান্বেষী আপনি, সত্যকে পাশ কাটিয়ে নিজের ফি নিয়ে কেটে পড়ছেন!” প্রমথ খোঁচা দিল।

 

“কী যে বলেন স্যার, আমি কি ব্যোমকেশ বক্সী নাকি! একটু-আধটু গোয়েন্দাগিরি করি মাত্র!

 

“ভারি আপনার গোয়েন্দাগিরি, গোয়েন্দা তো আপনার মিজ জনসন। ভালো করে তাঁর পরিচয়টা দিন তো?”

 

“মিজ জনসন একজন ফরেন্সিক সিগনেচার এক্সপার্ট। তিনিই নাকি ইস্ট কোস্টের টপ ডকুমেন্ট এক্সামিনার।”

 

“কোথায় থাকেন মহিলা?” এবার আমি প্রশ্ন করলাম।

 

“বস্টনে।”

 

“দাঁড়ান দাঁড়ান, মহিলার নাম কি হেলেন?” আমি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

 

“হ্যাঁ, স্যার। আপনি কী করে জানলেন!”

 

“শুধু আমি না, আপনার ফ্যামিলি, মানে বউদিও তাঁকে চেনেন। আপনিও তাঁকে দেখেছিলেন শান্তিনিকেতনে প্রথম দিন যখন আমরা লাঞ্চ খাচ্ছিলাম। কেমন গোয়েন্দা মশাই আপনি, ক-দিন আগে যাঁকে দেখলেন তাঁকে চিনতে পারলেন না!” সুযোগ পেয়ে আমি একেনবাবুকে একটু ঠুকলাম।

 

“কী মুশকিল স্যার, আমি তো মিজ জনসনের সঙ্গে শুধু ফোনে কথা বলেছি। তবে উনি দু-দিন বাদেই নিউ ইয়র্কে আসছেন কেসটা ফলো-আপ করতে। কিন্তু আপনি তো একটা দারুণ কথা বললেন… শান্তিনিকেতনে কী করতে গিয়েছিলেন?”

 

“দেখুন, ওঁকেও র‍্যান্ডো সাহেব তলব করেছিলেন কিনা! সাহেব তো কম ধান্দাবাজ নয়!”

 

“মন্দ বলেননি স্যার, ওই খাতা দুটোর মূল্য নিশ্চয় কিছু আছে, নইলে এতদিন বাদে ওই নিয়ে কেউ ইমেল করত না। আর এই ইমেল পেয়ে র‍্যান্ডো সাহেবও গুচ্ছের টাকা খরচ করে মেল সাহেবকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করতেন না!”

 

“শুধু খাতা দুটোর জন্য, না ওই আজেবাজে ছবিগুলোর জন্য? “ওটাও অন্য একটা সমস্যা। তবে দুটোর ভ্যালু কিন্তু আলাদা।”

 

“তা তো বটেই— একটা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইম, বহু বছরের জেল, অন্যটা স্রেফ মানিটরি লাভ।” প্রমথ গম্ভীরভাবে বলল।

 

“আপনি না স্যার সত্যি! আচ্ছা স্যার, আজকে কি কফি পাব না?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *