বারো
পরের দিন সকাল বেলাতেই হোল্ডব্রুক সাহেব আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে এসে হাজির! বুঝলাম একেনবাবুর সঙ্গে আগেই কথা হয়ে গিয়েছিল।
একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কি স্যার, কোনো খোঁজ পেলেন ম্যাডাম মিন্ডির?”
“পেয়েছি। কাল রাতেই আমার সেই জুনিয়র ছেলেটির সঙ্গে কথা হয়েছে। মিন্ডি এখন লং আইল্যান্ডে আছে। ওখানে একটা বার-এর মালিক।”
“বাঃ, তাহলে ওঁর সঙ্গে তো এক বার দেখা করতেই হবে। তবে সত্যি কথা বলতে কী স্যার, জানি না দেখা করে কী করব।”
একেনবাবুর কথার মাথামুণ্ডু নেই। হোল্ডব্রুক সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
“কারণটা বলি স্যার। র্যান্ডো সাহেব এখন ইন্ডিয়ার জেলে, কবে ছাড়া পাবেন কোনো ধারণাই নেই।”
“বলেন কি!”
“হ্যাঁ স্যার, হাওলা… মানে মানি লন্ডারিং কেস!”
“মাই গড! লোকটার সম্পর্কে উঁচু-ধারণা আমার ছিল না, কিন্তু এতটা যে খারাপ আমি ভাবিনি!”
“একটা কথা স্যার, ভুলে যাবার আগে জিজ্ঞেস করি। আপনাদের নেভাডাতে কি ফায়ার ভিক্টিম আইডেন্টিফিকেশনের জন্য ডিএনএ টেস্টিং হত?”
“সবসময় নয়। সাধারণভাবে ফায়ার ভিক্টিম আইডেন্টিফিকেশনের জন্য ওডন্টোলজিক্যাল টেকনিক, মানে ফরেন্সিক ডেন্টিস্ট্রি ব্যবহার করা হত। লাকিলি যদি ডেন্টাল রেকর্ড থাকে, তাহলে সেটা করা যেত। নইলে তো সবসময়েই ঝামেলা।”
“লাকিলি বলছেন কেন স্যার?”
“কারণ ডেন্টাল রেকর্ড শুধু ভিক্টিমের ডাক্তারের অফিসে থাকে— ইউনিভার্সাল কোনো ডেটাবেস নেই। এই জন্যেই ফরেস্ট ফায়ারে অনেক সময়েই চট করে সবাইকে আইডেন্টিফাই করা যায় না।”
“ম্যাডাম লুসি বা ডক্টর টমের ক্ষেত্রে তো সেই ঝামেলা হয়নি।”
“ঠিক।”
.
এইসব কথাবার্তার মধ্যেই স্টুয়ার্ট সাহেবের একটা ফোন। র্যান্ডো সাহেবের বাড়ির বার্গলাররা ধরা পড়েছে। আর একেনবাবুর সন্দেহটা ঠিক, ওরা পুরোনো ম্যানাস্ক্রিপ্ট চুরি করতেই এসেছিল। চোরেরা হল পাড়ারই কয়েক জন টিন-এজার। একজন মহিলা ওদের বলেছিলেন, ম্যানাস্ক্রিপ্টটা পেলে পাঁচশো ডলার দেবেন। সেইজন্যেই তিন বন্ধু মিলে এই কীর্তি করেছে। পুলিশ সেই মহিলাকে খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে।
একেনবাবুর কথা থেকেই এগুলো বুঝতে পারলাম। একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “চুরি করতে পেরেছিল কি স্যার? …তার মানে খুঁজে পায়নি।”
একেনবাবুর মুখ উজ্জ্বল, “স্যার, মনে হয় হোল্ডব্রুক সাহেব ওই মহিলাটিকে চেনেন। উনি এখন আমার এখানেই আছেন। আপনি এলে সবাই মিলে মহিলার সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারি।”
ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট কী বললেন শুনতে পেলাম না, কিন্তু মিনিট পনেরোর মধ্যেই তিনি সদলবলে এসে হাজির।
একেনবাবু প্রমথ আর আমাকে বললেন, “আপনারা কি ফ্রি স্যার? চলুন না, সবাই মিলেই যাই।”
আমরা তো এক পায়ে খাড়া।
ক্যাপ্টেন বললেন, “একেন্ড্রা, তুমি শিওর এই মহিলাই এর পেছনে আছেন?”
“মনে তো হয় স্যার, তবে আপনি দলবল নিয়ে পেছনে থাকবেন। আমি আগে দু-একটা কথা বলে দেখি, উনি সত্যিই এতে জড়িত কিনা!”
“ঠিক আছে।”
.
আমার গাড়িতে হোল্ডব্রুক সাহেব, প্রমথ, আর একেনবাবু। পেছনে ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা। হোল্ডব্রুক সাহেবের কাছে ঠিকানা ছিল। জিপিএস লাগিয়ে পৌঁছোতে কোনো অসুবিধা হল না। জরাজীর্ণ একটা বার-এর ওপরেই মালকিন মিন্ডির বাড়ি। বাড়িতেই ছিলেন। বেল বাজাতে যিনি দরজা খুললেন, তিনিই মনে হয় মিন্ডি। যথেষ্ট বয়স হয়েছে মহিলার। প্রসাধনহীন রুক্ষ মুখ, চোখে-মুখে ক্লান্তির ছাপ। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা কে? কী ব্যাপার!”
হোল্ডব্রুক সাহেব বললেন, “আমি জ্যাক হোল্ডব্রুক, আপনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্টকে চিনবেন, বোল্ডার সিটি, নেভাডা পুলিশের ডিটেকটিভ জনাথন।”
মহিলাটি কেমন যেন হতভম্ব হয়ে মিস্টার হোল্ডব্রুকের দিকে তাকালেন।
“ইনি মিস্টার একেন্ড্রা সেন,” পরিচয় করিয়ে দিলেন হোল্ডব্রুক সাহেব। “উনি আপনাকে দুয়েকটা প্রশ্ন করতে চান।”
“হু ইজ হি?” ভদ্রমহিলা একটু সামলে উঠে প্রশ্ন করলেন।
“আমি একজন ডিটেকটিভ ম্যাডাম, মিস্টার র্যান্ডো আমার ক্লায়েন্ট। তাঁকে কি আপনি কয়েকটা ইমেল পাঠিয়েছিলেন? অস্বীকার করবেন না ম্যাডাম, আমরা কিন্তু ইমেল-এর সোর্স ট্রেস করতে পেরেছি।”
একেনবাবু মিথ্যে কথা বলছেন আমি জানি, কিন্তু কথাটা শুনে মহিলাটি একটু থতোমতো খেয়েই বললেন, “যদি পাঠিয়েও থাকি, সো হোয়াট!”
“সেই ইমেল-এ দুটো খাতার কথা ছিল। ক-দিন আগে কয়েক জন টিন এজার সেগুলো চুরি করার জন্য র্যান্ডো সাহেবের বাড়িতে গিয়েছিল।”
“আর ইউ ইনসেন!” এবার ভদ্রমহিলা রাগে ফেটে পড়লেন, “তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক কী?”
“কারণ ম্যাডাম, সেগুলো ওদের চুরি করতে বলেছিলেন একজন মহিলা।”
“আমিই যে সেই মহিলা, সেটা আপনার মনে হয় কী করে—ওরা কি আমাকে আইডেন্টিফাই করেছে?
“না, ম্যাডাম।”
“তাহলে?”
“আসলে আমি ভাবছিলাম একটা সিনেমার কথা। এই ক-দিন আগে বাংলাদেশের একটা সিনেমা দেখছিলাম। বাংলাদেশের নাম নিশ্চয় আপনি শুনেছেন ম্যাডাম। সেই সিনেমার হিরো ছিল পড়াশুনোয় ফেলমারা এক ফোক্কর ফাঁকিবাজ। সেই ছেলে সুন্দরী হিরোইন টিচারের মন জয় করতে নিজের পুরো চেহারা-চরিত্রই বদলে ফেলল। চোখে-মুখে সেই ছ্যাবলামি বা বজ্জাতি ভাব নেই, তার বদলে হয়ে গেল সিরিয়াস চেহারার এক ভারিক্কি ইন্টেলেকচুয়াল। একই লোক কিন্তু একদম অন্য রকমের মানুষ।”
একেনবাবুর মাথাটা কি গেছে! এর সঙ্গে ইমেল, চুরি, খাতা— এগুলোর সম্পর্ক কী?
“হোয়াট ননসেন্স!” মহিলা ভীষণ রেগে চেঁচিয়ে উঠলেন।
“ননসেন্স নয় ম্যাডাম, আপনি তো মেক-আপের অনেক কোর্স করেছিলেন, আপনি নিশ্চয় বলতে পারবেন কী করে এগুলো করা হয়— মুহূর্তে মুহূর্তে কী করে ছদ্মবেশী হওয়া যায়। আমি নিশ্চিত ওই টিন এজাররা এখন আপনাকে দেখে চিনতেও পারবে না।”
ভদ্রমহিলার মুখ দেখলাম রাগে লাল হয়ে গেছে। হাতটাও থরথর করে কাঁপছে।
একেনবাবুর তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। বললেন, “ম্যাডাম, একটা জিনিস কিন্তু মেক-আপে পালটানো যায় না। সেটা হল নিজের দাঁত। আপনার ডেন্টিস্টের নামটা কী ম্যাডাম?’
“গেট আউট! গেট আউট রাইট নাও। এইভাবে হ্যারাস করার জন্য, আপনাদের দু-জনকেই আমি স্যু করব!”
“অবশ্যই করবেন ম্যাডাম, কিন্তু তার আগে আপনার ডেন্টাল রেকর্ড বোল্ডার সিটির ম্যাডাম লুসির সঙ্গে ম্যাচ করে কিনা, আমরা দেখব। কারণ আপনার অপরাধ কিন্তু শুধু চুরি করানোর চেষ্টা নয়, দু-জন নিরপরাধীকে আগুনে পুড়িয়ে মারা।
.
ঘরে বাজ পড়লেও এরকম এফেক্ট হত না। মহিলা কাঁপতে কাঁপতে সোফায় বসে পড়লেন। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টও দলবল নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন।
