তেরো
একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কখন সন্দেহ করলেন যে লুসিই হচ্ছেন মিন্ডি?”
“মিস্টার র্যান্ডো যখন আমাকে ইমেল দুটো দিলেন, পড়ে মনে হল অনেক গোপন খবর সেখানে আছে, যেগুলো একমাত্র ম্যাডাম লুসির পক্ষেই জানা সম্ভব। ম্যাডাম লুসি কাউকে সেগুলো বলতে পারেন ঠিকই, কিন্তু সেই শোনা কথা মনে রেখে এত বছর বাদে মিস্টার র্যান্ডোকে কেউ হেনস্থা করবেন বিশ্বাস করা কঠিন! এদিকে লুসি তো মারা গেছেন! তাহলে? তখনই মাথায় এল স্যার, এটা কি সম্ভব যে ম্যাডাম লুসি সত্যি সত্যিই মারা যাননি, যিনি মারা গেছেন তিনি অন্য কেউ? এই প্রশ্নটার উত্তর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে শুরু হল মিস্টার হোল্ডব্রুকের সঙ্গে পরিচয় হবার পর। উনি যেসব তথ্য দিলেন, তাতে এটা বুঝলাম, ডেন্টিস্ট টম আর ম্যাডাম লুসি দু-জনেই হাইফাই স্টাইলে থেকে টাকা ওড়াতে ভালোবাসতেন। ডক্টর টম খুব একটা চরিত্রবান ছিলেন না। গ্ল্যামারাস ম্যাডাম লুসির প্রতি মোহ থাকলেও টাকার লোভে টম সাহেব অন্য কারও হাতে ধরা দেবেন না, এটা মেনে নেওয়া মুশকিল। বিশেষ করে হাতের কাছেই ছিলেন ম্যাডাম লুসির বন্ধু ম্যাডাম মিন্ডি, পৈতৃক সূত্রে যাঁর অজস্র টাকা। তার ওপর ম্যাডাম মিন্ডি ছিলেন ডক্টর টমের প্রতি অনুরক্ত। সেটা আবছা আবছা সন্দেহ করলেও ম্যাডাম লুসি হঠাৎ করেই জানতে পারলেন ওঁদের দু-জনের সম্পর্ক দৈহিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
“ম্যাডাম লুসি বুঝতে পারছিলেন এবার দু-জনকেই উনি হারাবেন। এমনিতেই ম্যাডাম লুসি ছিলেন অত্যন্ত পজেসিভ। ডক্টর টম ওঁর সঙ্গে প্রেম করলেও শেষ পর্যন্ত ম্যাডাম মিন্ডির কাছেই ধরা দেবেন—এই চিন্তা ওঁকে খেপিয়ে তুলল। এটা ঘটা মানে একইসঙ্গে ওঁর বয়ফ্রেন্ড এবং সম্ভবত ওঁর ফাইনান্সের মস্ত বড়ো সোর্স হাতছাড়া হওয়া! কী করে সেটা আটকানো যায় এই চিন্তা থেকেই ম্যাডাম মিন্ডির আইডেন্টিটি চুরি করার ব্রিলিয়ান্ট প্ল্যানটা ওঁর মাথায় আসে। ম্যাডাম মিন্ডি আর ডক্টর টমকে খুন করে ম্যাডাম মিন্ডির আইডেন্টিটিতে তাঁরই ব্যাঙ্কের টাকায় ভবিষ্যৎ জীবন কাটাবেন! খুবই রিস্কি এবং কমপ্লিকেটেড প্ল্যান। এমনভাবে ওঁদের মারতে হবে যাতে বডি থেকে বোঝার উপায় না থাকে যে কার মৃতদেহ। অর্থাৎ বাড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে মারা। ফায়ার ভিক্টিমদের আইডেন্টিফিকেশনের একটা উপায় ডেন্টাল রেকর্ড পরীক্ষা করা। হয়তো মিস্টার টমের কাছেই এটা শুনেছিলেন ম্যাডাম লুসি। আর্সন সন্দেহ না করলে ডিএনএ অ্যানালিসিস নিয়ে পুলিশ মাথা ঘামাবে না। এটা করার পর তিনি নিজে ম্যাডাম মিন্ডির মতো চুল কেটে সাজগোজ হাবভাব ইত্যাদি করবেন। নিজে মেক-আপ আর্টিস্টের ট্রেনিং নিয়েছিলেন। তার ওপর সই নকল করতেও অভ্যস্ত। র্যান্ডো সাহেবের সই নকল করে যে অথরিটিকে ধোঁকা দিয়েছিলেন, সেটা তো র্যান্ডো সাহেবের কথা থেকেই জেনেছি। ম্যাডাম মিন্ডির সঙ্গে বন্ধুত্বের জন্য মিন্ডি ম্যাডামের সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর, জন্মদিন, জন্মস্থান, ঠিকানা, ইত্যাদি জোগাড় করা ম্যাডাম লুসির পক্ষে মোটেই কঠিন কাজ ছিল না। ওঁর অন্য বন্ধু ক্যাথির কাজের রুটিনও ম্যাডাম লুসির জানা ছিল। তিনি জানতেন ম্যাডাম ক্যাথি সকালে অফিসে গিয়েই রেকর্ডরুম থেকে সেদিনের পেশেন্টদের ফাইলগুলো নিয়ে আসেন ডাক্তারদের জন্য। তাই সকাল বেলাই রেকর্ডরুমে গিয়ে ম্যাডাম ক্যাথিকে জানান যে ম্যাডাম মিন্ডি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু উনি ওকে আটকাবেন। এগুলো সবই পার্ট অফ দ্য প্ল্যান। সেই দিনই ডেন্টিস্ট অফিসের রেকর্ডরুমে ম্যাডাম মিন্ডির ডেন্টাল রেকর্ডের সঙ্গে নিজের রেকর্ডের ফোল্ডার পালটাপালটি করে নেন। ম্যাডাম ক্যাথির বয়ানেই ছিল তিনি যখন ফোন ধরতে রেকর্ডরুম থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন ম্যাডাম লুসি সেখানে ছিলেন, অর্থাৎ ফাইল পালটানোর সুযোগ ছিল। ম্যাডাম মিন্ডির কার্ডে লস এঞ্জেলেস-এ যাবার বাস-টিকিট কিনে ম্যাডাম মিন্ডির জন্য একটা অ্যালিবাই খাড়া করলেন। রাতে মিন্ডি ম্যাডামকে বাড়িতে ডেকেছিলেন ম্যাডাম লুসি। ডক্টর টমকেও ডেকেছিলেন। তিনি তো মাঝে মাঝেই রাতে আসতেন। ধরে নিচ্ছি সেখানেই ড্রিঙ্কের মধ্যে হেভি ডোজে ঘুমের ওষুধ বা কিছু মিশিয়ে ডক্টর টম এবং ম্যাডাম মিন্ডিকে খেতে দেন। সেই ওষুধ আর মদের প্রভাবে দু-জনে যখন প্রায় অচেতন, তখন ম্যাডাম মিন্ডির ব্যাগ থেকে টাকাকড়ি, সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড, ড্রাইভার্স লাইসেন্স, ইত্যাদি হাতিয়ে নেন। ক্রেডিট কার্ডটা আগেই সরিয়েছিলেন বাসের টিকিট কেনার জন্য। তারপর গ্যাস স্টোভ অন করে কাছাকাছি সহজদাহ্য কিছু জিনিসপত্র রেখে বাইরে গিয়ে দরজা লক করে অদৃশ্য হন। আরও অনেক কিছুই নিশ্চয় করতে হয়েছে, কিন্তু মূল সিনারিওটা এই। এখন ক্লার্ক কাউন্টির কাজ হবে পুরো কেসটা খাড়া করা, তবে উনিই যে ম্যাডাম লুসি সেই সত্যটা এড়াতে পারবেন না।”
“আপনার এই এক্সপ্ল্যানেশনে কিন্তু একটা জিনিস মোটেই ক্লিয়ার হল না।” প্রমথ বলে উঠল।
“কী স্যার?”
“এত বছর বাদে লুসি কেন র্যান্ডো সাহেবের সঙ্গে ইমেল-এ যোগাযোগ করল?”
“কী মুশকিল, আপনিই তো সেদিন বলে দিলেন কারণটা।”
“আমি!”
“সেদিন যে ট্রেনে নিউ ইয়র্কার-এর লস্ট ম্যানাস্ক্রিপ্টের আর্টিকলটা পড়লেন! আপনিই তো বললেন ওগুলো পাওয়া গেলে লক্ষ লক্ষ ডলারে বিক্রি হবে। আমি পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম ওটা নিয়ে বেশ হইচই হয়েছিল সে সময়ে, মানে মাস চারেক আগে। তখনই নিশ্চয় সেটা ম্যাডাম লুসির নজরে পড়েছিল অথবা ওঁর বার-এ কেউ তা নিয়ে আলোচনা করেছিল। ম্যাডাম লুসির তখনই আবার মনে পড়ে ওঁর ঠাকুরদার খাতা দুটোর কথা। র্যান্ডোর কাছে ও দুটো এখনও আছে কি? এ ছাড়া র্যান্ডো যে এখন খুবই বড়োলোক- সেটাও নিশ্চয় জানা ছিল। ওঁকে যদি একটু ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেল করে কিছু টাকা আদায় করা যায়, মন্দ কি? সেইজন্যেই ওই ছবিগুলোর কথাও তুললেন। যেটা লেগে যায়! আর কী জানেন স্যার, নিশ্চয় ম্যাডাম মিন্ডির ব্যাঙ্কের টাকা ফুরিয়ে আসছিল, আর এই বার-এর ব্যবসায়ও বেশি টাকা আসছিল না। দেখলেন তো বার-এর ভগ্নদশা!”
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “যেমন দেবা, তেমন দেবী!”
প্রমথ বলল, “আরেকটু বুদ্ধি খাটালে উনি একেবারেই ধরা পড়তেন না।”
“সেটা কী স্যার?”
“দাঁতগুলো সব তুলে ফেলে ডেঞ্চার লাগালে।’
“আপনি না স্যার, সত্যি!”
“কেন? কিছু ভুল বললাম?”
“আপনি আর কবে ভুল বলেন স্যার!”
পরিশিষ্ট
এইভাবেই একেনবাবুর কল্যাণে তেত্রিশ বছর আগের একটি হত্যাকাণ্ডের রহস্যের সমাধান হল। যার জন্য এই রহস্য কাহিনির সূত্রপাত, সেই রিচার্ড র্যান্ডো অর্থ তছরূপ এবং মানি লন্ডারিং করার অপরাধে এখনও জেলে। তাঁর স্ত্রী ম্যাডাম লুসির কেসও যে-ভাবে এগোচ্ছে, তাঁর কপালেও প্রাণদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ঝুলছে। প্রমথর মতে এই কেসে একমাত্র টাকা পিটেছেন একেনবাবু। কড়কড়ে তিরিশ হাজার ডলার! হেলেন জনসন আর হোল্ডব্রুক সাহেবও শুনলাম কিছু পেয়েছেন, যদিও টাকার অঙ্কটা জানি না। আমি আর প্রমথ তো আমাদের যা প্রাপ্য ইতিমধ্যেই হজম করে ফেলেছি— মানে ইন্ডিয়া যাবার ফ্রি ট্রিপ। তবে এই রহস্য উদ্ঘাটনে সঙ্গী ছিলাম বলে একেনবাবু কথা দিয়েছেন রেস্টুরেন্টে ডিনার খাওয়াবেন! কঞ্জুস, কঞ্জুস!
