ছদ্মবেশী সময় (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

এগারো

একেনবাবুকে সকাল থেকে পাচ্ছি না। ব্রেকফাস্ট না করেই বেরিয়ে গেছেন। মাথায় কিছু চাপলে ওঁর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। কলেজে আমার ঘরে লাঞ্চের সময় এসে হাজির। দেখে মনে হল বেশ এক্সাইটেড।

 

“বুঝলেন স্যার, সেদিন ট্রেনে প্রমথবাবু প্রসঙ্গটা না তুললে এই লাইনে চিন্তাই করতাম না।”

 

“কী প্রসঙ্গ?”

 

“ওই যে বিখ্যাত লেখকদের হারিয়ে যাওয়া পাণ্ডুলিপির ব্যাপারটা। সকাল থেকে লাইব্রেরিতে ম্যাডাম হেলেনের সঙ্গে ছিলাম। ম্যাডাম হেলেনের মনে হচ্ছে র‍্যান্ডো সাহেবের কাছ থেকে পাওয়া দুটো পাতার হ্যান্ডরাইটিং সম্ভবত এল. ফ্র্যাঙ্ক বম-এর। অরিজিনাল খাতাটা পেলে সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবেন। র‍্যান্ডো সাহেবের অ্যাটর্নি মিস্টার বার্ডকে সেটা জানাতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে মনে হচ্ছে রহস্যটা বেশ ঘন হয়ে উঠেছে। র‍্যান্ডো সাহেবের বাড়িতে আবার কেউ ঢুকে জিনিসপত্র তছনছ করেছে। কয়েক মাস আগেও এক বার বার্গলারির চেষ্টা হয়েছিল, র‍্যান্ডো সাহেবই বলেছিলেন। মনে আছে স্যার?”

 

“নিশ্চয় আছে।”

 

“বাড়িতে এখন কেউই থাকে না। র‍্যান্ডো সাহেবের অনুরোধে এক প্রতিবেশী বাড়িটার ওপর নজর রাখতেন, এ ছাড়া একজন ক্লিনিং লেডি মাসে এক বার করে বাড়িটা পরিষ্কার করে যেত। সেই প্রতিবেশী ক-দিন আগে খেয়াল করেন, বাড়ির পেছনের দরজা খোলা। অর্থাৎ বাড়িতে কেউ ঢুকেছিল। র‍্যান্ডো সাহেবকে সেটা জানাবার জন্য ফোন করেন। কিন্তু তিনি তো ইন্ডিয়ার জেলে। দু-দিন চেষ্টা করে ধরতে না পেরে পুলিশকে জানান। পুলিশ এখন খুঁজে বার করার চেষ্টা করছে কী চুরি হয়েছে।”

 

“আপনি কী ইমপ্লাই করছেন বলুন তো, লোকগুলো সেই খাতা দুটোর খোঁজে এসেছিল?”

 

“কে জানে স্যার, কিছু চুরি গেছে কিনা সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না, দামি কিছু চুরি যায়নি। ড্রয়ার, ফাইল ক্যাবিনেট, আর ক্লজেটে ঘাঁটাঘাঁটির চিহ্ন। কিন্তু রুপোর দামি কিউরিওর বাক্স, ল্যাপটপ, ড্রেসিং ড্রয়ারে জুয়েলারির বক্স… সবই রয়েছে।”

 

“জুয়েলারির বক্স?”

 

“সেটাই তো বার্ড সাহেব বললেন, সম্ভবত ওটা ওঁর আঙ্কলের কাছ থেকে পাওয়া। মোট কথা ভেরি কনফিউজিং! বার্ড সাহেব জানালেন পুলিশের ধারণা এটা পাড়ার কমবয়সি ছেলেদের কীর্তি। কয়েকটা খালি বিয়ারের বোতল পড়েছিল। তার মানে বাড়িতে কয়েক জন ঢুকেছিল লুকিয়ে মদ-ফদ খেতে বা স্রেফ মজা করার লোভে— মাঝে মাঝে এটা নাকি এদেশে ঘটে। হাতের কাছে টাকাকড়ি কিছু পেলে পকেটস্থ করে। ছুটকোছাটকা কিছু চুরিও করে, যেগুলো ‘ইউজড গুড্‌ড্স’ হিসেবে বিক্রি করা যায়। হয়তো তাই।”

 

“আপনার কি মনে হচ্ছে, পুলিশের ধারণাটা ঠিক নয়?” একেনবাবুর চোখ-মুখ দেখে আমার মনে হল অন্য কিছু ওঁর মাথায় ঘুরছে।

 

“না, না, স্যার, সেটা বলছি না। তবে কিনা এখানে একটা হাইব্রিড ব্যাপার থাকতে পারে।”

 

“তার মানে?”

 

“আরও একটা ইম্পর্টেন্ট খবর পেয়েছি হেলেন ম্যাডামের কাছ থেকে। উনি এল. ফ্র্যাঙ্ক বম সম্পর্কে বেশ কিছু নতুন তথ্য আবিষ্কার করেছেন। বম সাহেব বড়োদের জন্য দুটো বই লিখেছিলেন, ‘আওয়ার ম্যারেড লাইফ,’ আর ‘দ্য মিস্ট্রি অফ বনিতা,’ বা ওরকম কিছু একটা নামে। পাণ্ডুলিপি দুটো প্রিন্টারের কাছে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু তারপর সেগুলোর খোঁজ পাওয়া যায়নি। আসলে উনি খুব অর্থকষ্টের মধ্যে ছিলেন। হতে পারে বই ছাপাতে প্রিন্টার পয়সা চেয়েছিল, উনি সেটা জোগাড় করে উঠতে পারেননি। পাণ্ডুলিপি দুটো পড়েই ছিল প্রিন্টারের অফিসে।”

 

“আরে, এই কথা তো মিন্ডিও জানতেন! মনে আছে ক্যাথি কী বলেছিলেন সেদিন ওঁর সুপিরিয়র অটোবায়োগ্রাফিক্যাল মেমারি থেকে? এটা যদি লুসির দাদুর রেখে যাওয়া খাতা হয়, তাহলে তো এর মূল্য অপরিসীম! চার-পাঁচ মিলিয়ন তো হবেই।”

 

“হতে পারে স্যার, কেউ একজন জানেন এই মহামূল্য ম্যানাস্ক্রিপ্টের কথা, আর সেটা হাতাতে কিছু কমবয়সি ছেলেমেয়েদের লাগিয়েছেন। বড়োলোকদের টিন-এজার ছেলেপুলেরা এসব অপরাধ করলে অনেক সময়েই পার পেয়ে যায়। সুতরাং তাদের হাত দিয়ে ওগুলো উদ্ধার করা গেলে তো সোনায় সোহাগা। ম্যানাস্ক্রিপ্ট নিয়ে এলে তাদের হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দেবেন। পরে নিজে সেটা আন্ডার-ওয়ার্ল্ড মার্কেটে বেচে বড়ো রকমের দাঁও মারবেন!”

 

“দাঁড়ান, দাঁড়ান, এটা আপনার মনে হচ্ছে কেন?”

 

“কারণ দামি কিছু চুরি হয়নি, কিন্তু ফাইল ক্যাবিনেট, ড্রয়ার, আর ক্লজেট-এর জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি হয়েছে।”

 

“আপনি কি বলতে চান, এর মধ্যে সেই মিন্ডি না কে, তিনি জড়িত থাকতে পারেন?”

 

“বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি স্যার! তবে ম্যানাস্ক্রিপ্ট চুরি করে সেটা বিক্রি করতে হলে পেশাদার ‘আর্ট-চোর’ হতে হবে। স্পেশাল আন্ডারগ্রাউন্ড কনট্যাক্ট না থাকলে এইসব জিনিস বাজারে বিক্রি করা সহজ ব্যাপার নয়।”

 

“মিন্ডির যে সেই কনট্যাক্ট নেই, তা জানলেন কী করে?”

 

“ঠিকই বলেছেন স্যার। তবে কিনা আমাদের কাজ ছিল ইমেল যিনি পাঠিয়েছিলেন, সেই মেল বা ম্যাডাম মিন্ডিকে খুঁজে বার করা, ম্যাডাম লুসির দাদুর খাতা খোঁজা তো নয়। ওই নিয়ে ভেবে আর কী হবে!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *