বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শুনে তো আমি অবাক। সরস্বতী এর আগেও দু’বার যতীন বাগচি রোডের এই ফ্ল্যাটে এসেছে? হতভম্ব হয়ে বললুম, “তার মানে?”

“মানে আবার কী!” ভাদুড়ি ণাই হালকা গলায় বললেন, “এসেছে মানে এসেছে।”

“অর্থাৎ আপনাকে ও চেনে?”

“চেনে বই কী। শুধু আমাকে কেন, এ-বাড়ির সক্কলকেই ও চেনে। ও খুব ভালই জানে, মালতী আমার বোন, হার্ট-স্পেশালিস্ট অরুণ সান্যাল আমার ভগ্নীপতি, আর কৌশিক আমার ভাগ্নে। … এমন কী, কৌশিক যে খুব শিগগিরই সি. বি. আই.-এর কর্তা হতে চলেছে, সরস্বতীর তাও অজানা নেই।”

এবারে আমার চতুর্গুণ অবাক হওয়ার পালা। অনেক কষ্টে বললুম, “সে কী, আমি তো দেখছি কোনও খবরই রাখি না। তা এত অল্প বয়সে কি সেন্ট্রাল ব্যুরো অভ ইনভেস্টিগেশানসের কর্তা হওয়া যায় নাকি?”

“আমি তো ওই সি. বি. আই. এর কথা বলিনি, আমি বলছি আর এক সি. বি. আই. এর কথা।” কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না। বললুম, “যাচ্চলে, দেশে আবার আর-একটা সি.বি. আই. ক.ব গজিয়ে উঠল?”

“নতুন করে গজায়নি, বেশ কয়েক বছর ধরেই তার কাজ চলছে। …বুঝতে পারছেন না, কেমন? আচ্ছা, বাঙ্গালোরে আমার যে গোয়েন্দা ফার্ম, তার নামটা আপনি জানেন তো?”

“তা কেন জানব না। চারুচন্দ্র ভাদুড়ি ইনভেস্টিগেশানস্।”

“অর্থাৎ সংক্ষেপে সেটাও সি.বি.আই.। তা-ই না?”

“আরে, তাই তো! এটা তো কখনও ভেবে দেখিনি। বললুম, “তা কৌশিক কি এই প্যারালেল সি. বি. আই.তে জয়েন করছে নাকি?”

“শুধু জয়েন করেছে বললে কমই বলা হবে। ভাবছি, ও যখন তৈরি হয়ে উঠেছে, তখন আর ভাবনা কী, ফার্মের পুরো দায়িত্ব ওর উপরে ছেড়ে দিয়ে এবারে আমি রিটায়ার করব। …কিন্তু এ কী, সবাই দাঁড়িয়ে কেন? চলুন কিরণবাবু, বসা যাক।”

সবাই গিয়ে ড্রয়িংরুমে বসলুম বটে, কিন্তু আমার অস্বস্তি তবু যাচ্ছিল না। ভাদুড়িমশাই সেটা বুঝতে পেরেছিলেন। বললেন, “সরস্বতীর কথা ভাবছেন তো? ওর কোনও দোষ নেই। আসলে আমিই একটু মজা করতে চেয়েছিলুম। তাই সরস্বতীকে আজ সকালেই ফোন করে বলেছিলুম যে, অনেক আগেই যে আমার সঙ্গে ওর দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, আপনার কাছে সেটা যেন চেপে যায়।”

সবাই হাসছিল। এক সরস্বতী ছাড়া। সম্ভবত একটু বিব্রতই বোধ করছিল সে। কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “আই হোপ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, মিঃ চ্যাটার্জি। বড়দা এমন করে হুকুম করলেন যে, বাধ্য হয়ে ওই মিথ্যে কথাটা বলতে হল। আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।”

ভাদুড়িমশাই চোখ পাকিয়ে বললেন, “এইয়ো পাজি মেয়ে, যেমন আমাকে তেমনি কিরণবাবুকেও তোর মা চাচাজি বলত, আর তুই কিনা ওঁকে মিঃ চ্যাটার্জি বলছিস? সম্পর্কে তো উনিও তোর দাদামশাই। যেমন আমাকে বড়দা বলিস, তেমনি ওঁকেও এখন থেকে দাদা বলবি। কিরণবাবু, বয়েসে আপনি আমার চেয়ে বছর চারেকের ছোট, তাই মেজদা বললে আপনার নিশ্চয় আপত্তি হবে না?”

হেসে বললুম, “লছমির মা আমাকে ‘ভাইয়া’ বলতেন। অনেকদিন ওই ডাকটা শুনিনি। সরস্বতীও সেটাই বলুক। তাতেই আমি খুশি হব।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাস, মিটে গেল। সরস্বতী, তুই আর অত কাঁচুমাচু হয়ে থাকিসনে তো। কিরণবাবু বেরসিক নন, উনি খুব ভালই বুঝতে পারছেন যে, ইট’স এ হোয়াইট লাই, এতে দোষের কিছু নেই, মজা করবার জন্যে এমন মিথ্যেকথা সবাই বলে থাকে। তার উপরে নাতনি বলে কথা, দাদুকে নিয়ে মজা করবার জন্যে একটা মিথ্যে যদি বলেই থাকিস তো বেশ করেছিস। …আর হ্যাঁ, আপনাকেও বলি কিরণবাবু, সরস্বতী কিন্তু অনেক আগেই আপনার খোঁজ করেছিল।”

“কবে?”

উত্তরটা সরস্বতীই দিল। বলল, “গ্রীষ্মের ছুটিতে গত জুন মাসে আমরা কলকাতায় এসেছিলুম। আমরা মানে আমি আর সুমঙ্গল। এসেই আপনাকে ফোন করি। কিন্তু আপনি তখন কলকাতায় ছিলেন না। শুনলুম কী একটা কাজ নিয়ে নাকি বিদেশে গিয়েছেন।”

বললুম, “হ্যাঁ, মাস কয়েকের জন্যে তখন বাইরে যেতে হয়েছিল বটে। তা তুমি আমার ফোন-নাম্বার পেলে কোথায়? ডিরেক্টরিতে?”

“ডিরেক্টরি দেখবার দরকার হয়নি, ভাইয়া। বড়দা তো মাঝেমধ্যেই দিল্লি যান, আমাদের সঙ্গে দেখাও হয়। ওঁর কাছ থেকেই আপনার ফোন নাম্বারটা আমি নিয়ে রেখেছিলম।”

ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “আর এই কথাটা অ্যাদ্দিন আপনি আমাকে জানাননি? “ চা নিয়ে মালতী ইতিমধ্যে ড্রয়িংরুমে এসে ঢুকেছিল। সেন্টার টেবিলের উপরে ট্রেটা নামিয়ে রেখে বলল, “কোশিক, তুই গিয়ে জলখাবারের প্লেটগুলো নিয়ে আয়।” তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “কাজের মেয়েটা আজ আসেনি কিরণদা। কাল জ্বর গায়ে বাড়ি গেল, এখন যে কতদিন আসবে না, কে জানে!”

বললুম, “তা হলে আর জলখাবারের হাঙ্গামা করতে গেলে কেন? শুধু চা দিলেই তো হত।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি কী বলছিলেন কিরণবাবু?”

“বলছিলুম যে, অনেকদিন ধরেই তো সরস্বতীদের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ রয়েছে, তা হলে আমাকে সেটা জানাননি কেন?”

“ভেবেছিলুম আপনাকে একটা সারপ্রাইজ দেব। তাই চেপে গিয়েছিলুম।”

“যোগাযোগটা হল কীভাবে?”

চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলছি, সব বলছি। কিন্তু তার আগে আরও দু-একটা কথা বলে নেওয়া দরকার। বছর দুয়েক আগে দিল্লিতে একটা সম্মেলন হয়েছিল। ভূতাত্ত্বিক সম্মেলন। এ-দেশের সব বিখ্যাত জিওলজিস্টরা তো তাতে যোগ দিয়েছিলেনই, স্পেশাল ইনভাইটি হিসেবে বিদেশের তা প্রায় জনা পাঁচ-ছয় নামজাদা ভূ-বিজ্ঞানীও সেখান হাজির ছিলেন। তা, বয়েস অল্প হলে কী হয়, আওয়ার সরস্বতী হ্যাজ অলরেডি মেড হার মার্ক ইন দিস ডিসিপ্লিন, তাই ওকেও সেখানে একটা পেপার পড়তে ডাকা হয়েছিল। ওর বিষয় ছিল “দি গোল্ড ডিপজিটস অত ইন্ডিয়া।” তা সেই পেপারটা নিয়ে খুব ইচই পড়ে যায়। ব্যাপারটা আপনার মনে আছে কিরণবাবু?”

বললুম, “স্পষ্ট মনে আছে। সেইজন্যেই তো সরস্বতী ভট্‌ট্চাজ নামটা আমার চেনা-চেনা লাগছিল। দুপুরে সরস্বতী যখন আমার অফিসে ফোন করে, তখনই তো কথাটা ওকে আমি জানিয়েছি।”

“ভাল, ভাল।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা হলে তো ওর যা বক্তব্য ছিল, তাও মনে আছে আপনার?”

“আছে বই কী। সেই পেপারে ও বলেছিল যে, মধ্যপ্রদেশের নদীর বালি আর কয়েকটা জায়গার পাথর পরীক্ষা করে ওর মনে হয়েছে যে, যেমন মাইসোরে তেমন সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার মাটির তলাতেও সোনার ডিপজিট থাকাই সম্ভব।”

ভাদুড়িমসাই বললেন, “আরে মশাই, মাইসোরের কোলার তো নস্যি, সেখানকার ডিপজিট এমন কিছু মস্ত মাপের নয়। গোল্ড-মাইনের কথা বলতে গিয়ে ও তার নাম করেছিল মাত্র। শুধু এইটুকু বললে কি আর অত হত?”

সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে কৌশিক বলল, “ঠিক কী বলেছিলেন আপনি?”

সরস্বতী হেসে বলল, “সে তোমার মামাবাবুর কাছেই শোনো।

ভাদুড়িমশাই বললেন, “মাটির তলায় কোথায় কতটা সোনা রয়েছে, কোনও দেশেরই সে সম্পর্কে কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে কিনা যে-সব গোল্ড-ডিপজিটের হদিশ ইতিমধ্যে মিলেছে, তার ভিত্তিতে মোটামুটি একটা হিসেব সকলেরই আছে যে, কোন্ দেশের মাটিতে কতটা সোনা থাকা সম্ভব। তো সেই হিসেব অনুযায়ী এ-ব্যাপারে সবচেয়ে ধনী চারটি দেশ হল দক্ষিণ আফ্রিকা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, কানাডা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এখন সরস্বতীর ধারণা যদি সত্যি হয়, তো এতদিনকার সেই হিসেবটাই হয়তো উলটে যাবে।”

কৌশিক বলল, “তার মানে?”

“মানে অতি সহজ। সরস্বতী বলেছিল যে, ঠিকমতো যদি প্রসপেক্টিং করা হয়, তা হলে হয়তো দেখা যাবে যে, ভারতবর্ষে একমাত্র মধ্যপ্রদেশের মাটির তলাতেই যা মজুত রয়েছে, সেই সোনার পরিমাণ ওই চারটি দেশের যে-কোনওটির ডিপজিটের চাইতেই শুধু যে বেশি, তা নয়, অনেক অনেক বেশি। বাস্‌, দিল্লি কলকাতা বোম্বাই মাদ্রাজ, চার-চারটে মেট্রোপলিসের তাবৎ বড় কাগজে সরস্বতীর সেই পেপারের কথা ফলাও করে ছাপা হল। সেইসঙ্গে সম্পাদকীয় লিখে … আপনাদের ওই কী যে বলে … হ্যাঁ, জ্বালাময়ী ভাষায় গভর্নমেন্টের আদ্যশ্রাদ্ধ করে তারা বলতে লাগল যে, সরকার তো সর্ব ব্যাপারেই ঠুটো জগন্নাথ, সব কাজেই তাঁদের আঠারো মাসে বছর, কিন্তু এখন আর কালক্ষেপ করা চলবে না, অন্তত এই একটা ক্ষেত্রে এবারে অবিলম্বে তাঁদের সর্বাত্মক অনুসন্ধানের—কী, বাংলাটা ঠিক হচ্ছে তো?—ব্যবস্থা করতে হবে। এমন কী, যে ইস্টার্ন কুরিয়ার প্রায় কোনও ব্যাপারেই ঝেড়ে কাসে না, সম্পাদকীয় নিবন্ধের প্রতিটি প্যারাগ্রাফে তিন-চারটে করে ইফ, বাট আর অলদো’ লেখে, তারাও এক্ষেত্রে লিখে বসল, ‘দ্য গভর্নমেন্ট ক্যানট—অ্যান্ড উই রিপিট, ক্যানট—এক্সপেক্ট টু রিসিভ দ্য নেশনস ইনডালজেন্স ইফ ইন দেয়ার সার্চ ফর দিস প্রেশাস মেটাল দে লিভ ইন আ সিঙ্গল স্টোন অভ্ মধ্যপ্রদেশ আনটার্নড।’ বুঝুন ব্যাপার!”

বললুম, “ওরেব্বাবা, এ তো সেই বাচস্পতির ভাষা! দ্য হাব্বারফ্লুয়াস ইনফ্যাচুফুয়েশান অভ্ আকবর দ্য গ্রেট ডান্ডিক্যালি ল্যাসেরটাইজ্ড দ্য গবান্ডি অভ হুমায়ুন!”

সরস্বতী হেসে বলল, “খবরের কাগজগুলোর কথা আর বলবেন না। একটা কিছু পেলেই হল, অমনি তারা এমন রে-রে করে ঝাঁপিয়ে পড়ে যে, সে আর কহতব্য নয়।”

বললুম, “খবরের কাগজকে দোষ দিচ্ছ কেন? সরকারের কী করণীয়, সেটা তো তাদের বলাই উচিত।”

সরস্বতী বলল, “বা রে, হুট বললেই কি এ-সব কাজে নেমে পড়া যায় নাকি? তা কক্ষনো যায় না। সবদিক থেকে তৈরি হয়ে, মানে পেপার-ওয়ার্ক শেষ করে, আর্থ টেস্টিং, সার্ভে, র‍্যান্ডম-স্যাম্পলিং ইত্যাদি তাবৎ ব্যাপারের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করে, জিওলজিস্ট আর ফিল্ড ওয়ার্কারদের একটা নির্ভরযোগ্য টিম তৈরি করে, যে-যে জায়গায় কাজ চলবে, সেখানকার লোক্যাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনকে ইনভল্‌ভ করিয়ে তবে এ কাজে নামতে হয়। স্পটে যাতে কোনও হাঙ্গামা না হয়; তার জন্যে আগে থাকতেই নিতে হয় নানা প্রিকশনারি মেজার্স। সবচেয়ে বড় কথা, বেশ শক্তপোক্ত একটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করে তোলা চাই, তবে তো অনুসন্ধানের কাজটা ঠিকমতো এগোবে।”

অরুণ সান্যাল এতক্ষণ কিছু বলেননি, এবারে বললেন, “এ তো অতি ন্যায্য কথা। প্রস্তুতি নেই, অথচ কোমর বেঁধে কাজে নামলুম, তাও কি হয় নাকি?”

সরস্বতী বলল, “কিন্তু সেই প্রস্তুতির সময়টা সরকার পেল কোথায়? দে হ্যাড টু ড্র আপ আ প্ল্যান উইদিন দ্য শর্টেস্ট পসিবল টাইম অ্যান্ড স্টার্ট ওয়ার্ক অ্যাট ওয়ান্‌স।”

কৌশিক বলল, “কেন?”

“তাও বুঝতে পারছ না? একে তো পঞ্জাবের ব্যাপারে সরকারের ক্রেডিবিলিটি তখন হুহু করে কমে যাচ্ছে। তার উপরে ‘দুর্নীতি দুর্নীতি’ বলে বিরোধী দলগুলি এমন চেঁচাচ্ছে যে, ও-সব ব্যাপার নিয়ে এমনিতে যারা মাথা ঘামায় না, তাদেরও অনেকে তখন ভাবতে শুরু করেছে, ডালমে কুছ কালা হ্যায়। ওদিকে আবার শ্রীলঙ্কায় আর্মি পাঠিয়েও খুব-একটা সুবিধে হল না, অনেকেই বলতে লাগল যে, ওটা মোটেই সুবুদ্ধির কাজ হয়নি। তো এই অবস্থায় গোল্ড ডিপোজিটের ব্যাপারটা নিয়েও কাগজগুলো যখন তারস্বরে চেঁচাতে আরম্ভ করল, তখন ইট প্রুভ্ড টু বি দ্য প্রোভার্বিয়াল লাস্ট স্ট্র অন দ্য ক্যামেল’স ব্যাক। সরকার ঘাবড়ে গেল। দে উইল্টেড আন্ডার প্রেশার। তড়িঘড়ি তারা এই ডিসিশান নিল যে, ঢের হয়েছে, আর নয়, অন্তত এই একটা ব্যাপারে এক্ষুনি কাজ আরম্ভ করতে হবে, যেমন করেই হোক, প্রমাণ করতে হবে যে, ইটস আ গভর্নমেন্ট দ্যাট ওয়ার্কস।”

কৌশিক বলল, “এই ব্যাপার?”

“তা নয় তো কী!” সরস্বতী তিক্ত হেসে বলল, “সরকারকে আমি দোষ দেব না; পুয়োর পিপ্‌ল, দে ওয়্যার অলরেডি ইন আ টাইট স্পট, অ্যান্ড দে হ্যাড টু কাম আপ উইথ সামথিং ইন এ জিফি! আর তাই তড়িঘড়ি একটা টিম খাড়া করা হল, রাতারাতি তাঁরা একটা প্রোজেক্টের খসড়া বানিয়ে ফেললেন, সরকারের পেটোয়া এক বিজ্ঞানী সেই খসড়াটা সম্ভবত না-পড়েই অ্যাপ্রুভ করে দিলেন, আর তার মাস দেড়েকের মধ্যেই গোটাকয়েক লোকেশান ঠিক করে নিয়ে শুরু হয়ে গেল সানার ডিপজিট খুঁজে বার করবার কাজ। …তুমি হাসছ কৌশিক, কিন্তু আমি আবার বলছি, কাগজগুলো এমন ফিঙের মতন তখন সরকারের পিছনে লেগেছিল যে, এ ছাড়া তাদের কোনও গত্যন্তরও ছিল না। দে ওয়্যার লেফ্‌ট উইথ নো আদার অলটারনেটিভ।”

আমি বললুম, “কিন্তু পেপারটা তো তোমার। লোকেশান বাছাইয়ের ব্যাপারে তোমাকে একবার কনসাল্ট করেছিল নিশ্চয়?”

সরস্বতী বলল, “তা করেছিল বই কী। কিন্তু আমি বুঝেই গিয়েছিলুম যে, সরকার যে টাইম-শিডিউল করে দিচ্ছে, তাতে শুধু দৌড়ঝাঁপই সার হবে, কাজের কাজ কিছু হবে না। ফলে আমি এড়িয়ে গেলুম। চেনা এক ডাক্তারকে দিয়ে এই মর্মে একটা সার্টিফিকেট লিখিয়ে নিলুম যে, আমার স্বাস্থ্য ভাল যাচ্ছে না, হাইপার টেনশানে ভুগছি, আমার পক্ষে এখন দিল্লি ছেড়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। সরকারি কর্তারা তখন বললেন যে, বেশ তো, যেতে যদি না পারো তো যেয়ো না, কিন্তু কোন্ কোন্ জায়গায় খোঁজ চালানো দরকার, সেটা অন্তত বলে দাও।”

বললুম, “দিয়েছিলে?”

“না, তাও দিইনি।”

“কেন?”

“প্রোজেক্ট সম্পর্কে কিছু-কিছু খবর আমার কানে এসেছিল। তাতে বুঝে গিয়েছিলুম যে, এতে কোনও কাজ হবে না। ভাইয়া, এটা ছেলেখেলা নয়। এ-সব কাজের একটা সুষ্ঠু পদ্ধতি থাকাই চাই। অথচ সরকারি কর্তাদের সঙ্গে কথা বলেই টের পেলুম যে, যে-দ্ধতিতে এঁরা কাজ করতে চলেছেন, তাকে কোনও সুষ্ঠু পদ্ধতি বলা চলে না। তার উপরে আবার এটাও জেনে গেলুম যে, এঁরা না নিয়েছেন কোনও প্রিকশনারি মেজার, না এ-কাজে লোকাল অ্যাডমিনিস্ট্রেশানকে ইনভল্ভ করাবার কথা ভেবেছেন। তা হলে? নির্দিষ্ট কয়েকটা লোকেশানের নাম কি আমি দিতে পারতুম না? পারতুম। তবু দিইনি। তার কারণ, এঁরা যে-লাইনের কথা ভাবছিলেন, আমি জানতুম যে, সেই লাইনে কাজ করতে গেলে টিমের লোকেরা বিপদে পড়বে।”

“কীসের বিপদ?”

অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকাল সরস্বতী। ঝাঁঝালো গলায় বলল, “ভাইয়া, ইউ ডোন্‌ আন্ডারস্ট্যান্ড। এই সহজ কথাটা ভুলে যাবেন না যে, এ-সব কাজ শহুরে এলাকায় হয় না, হয় জঙ্গলে-পাহাড়ে। কিন্তু জঙ্গল-পাহাড় বলেই আবার ভাববেন না যে, তার সবই একেবারে নির্জন জায়গা। সেখানেও মানুষ থাকে। লক্ষ রাখতে হয়, তারা যেন আমাদের ভুল না বোঝে, যেন রেগে না যায়, যেন না হস্টাইল হয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে ভাব করতে হয়। তাদের বোঝাতে হয় যে, আমরা তাদের কোনও অনিষ্ট করতে আসিনি। তা নইলে কাজ এগোবে না, পদে-পদে বাধা আসবে।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইল সরস্বতী। তারপর বলল, “আমার কথাই ধরুন। র‍্যান্ডম-স্যাম্পলিংয়ের জন্যে মধ্যপ্রদেশের যে এলাকাটা আমি বেছে নিয়েছিলুম, সেটা ছিল পুরোপুরি ট্রাইবাল এরিয়া। সেখানে আমার কাজটা আমি আদৌ করতে পারতুম না, যদি না দিনের পর দিন চেষ্টা করে সেখানকার গরিব, নিরন্ন মানুষগুলোকে আমি বোঝাতে পারতুম যে, আমি তাদের শত্রু নই, বন্ধু। আমরা যারা শহর থেকে ও-সব জায়গায় যাই, তাদের ওরা বিশ্বাস করে না। কেনই বা করবে। একলব্যের গল্পটা আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়? সেই মহাভারতের যুগ থেকে তো ওদের আমরা শুধু ঠকিয়েই আসছি। সভ্য-মানুষ দ্রোণাচার্য তাঁর ট্রাইবাল শিষ্যটির বুড়ো আঙুল কেড়ে নিয়েছিলেন, আর আমরাও সভ্য-মানুষরা কেড়ে নিচ্ছি ওদের জঙ্গল। শুধু ক্ষতি ছাড়া কোনও উপকার তো ওদের আমরা করি না। আর তাই আমাদের যে ওরা বিশ্বাস করে না, সেটাই তো স্বাভাবিক।”

অরুণ সান্যাল বললেন, “কিন্তু তাই বলে ওই বিশাল ঐশ্বর্য মাটির তলার অন্ধকারেই রয়ে যাবে, এটাও তো ঠিক নয়। একটা কিছু উপায়ের কথা তো ভাবতে হবে।”

সরস্বতী বলল, “উপায় যে নেই, তা তো নয়, দু’দুটো উপায় আছে। প্রথমত, যেখানে কাজ চলবে, স্থানীয় লোকেদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। দ্বিতীয়ত, সব কথা তাদের বুঝিয়ে বলা যায়। মানুষগুলোকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে, একটা জরুরি কাজের জন্যে এই জায়গাটা সরকারের দরকার হয়েছে, কিন্তু তাই বলেই যে সরকার তাদের উচ্ছেদ করতে চাইছে, তা কিন্তু নয়। তারা যদি স্বেচ্ছায় সরে যায়, তবেই সরকার জায়গাটা নেবে, নইলে নেবে না। কিন্তু শুধু ওইটুকু বললেই চলবে না, পুরুষানুক্রমে যেখানে তারা রয়েছে, সেখান থেকে খুব বেশি দূরে যে তারা সরে যেতে চাইবে না, এই সহজ কথাটা সরকারকে মনে রাখতে হবে। জঙ্গলের মধ্যেই, এই ধরুন দশ-পনেরো মাইলের ভিতরেই, তাদের রিহ্যাবিলিটেশানের জন্যে এমন একটা জায়গা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যেটা তাদের পছন্দসই। তার কাছাকাছি নদী কিংবা ঝর্না থাকা চাই। যারা চাষবাসের কাজ জানে, তাদের জন্য জমির ব্যবস্থা করা চাই। তারা তো তাদের পুরনো ঘরবাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে, তাই নতুন জায়গায় তাদের মাথা গুঁজবার আশ্রয়টাও বানিয়ে দেওয়া চাই। সবচেয়ে বড় কথা, সরল ওই লোকগুলোর মনে এই বিশ্বাসটুকু জাগানো চাই যে, আমরা ওদের ঠকাতে চাই না, ওদের ক্ষতি করবার কোনও ইচ্ছেই আমাদের নেই, উই আর নট গোয়িং দেয়ার টু ডিসটার্ব দেয়ার লাইফ-প্যাটার্ন অর ‘ট্রু ডেসট্রয় দ্য সোশ্যাল সিস্টেম দ্যাট দে হ্যাভ ডেভেলাপ্‌ড ওভার দ্য সেঞ্চুরিজ ফর দেমসেল্ভস।”

বললুম, “তো সেটা করা হল না কেন?”

একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে সরস্বতী বলল, “সম্ভবত এইজন্যে হল না যে, তাতে অনেক কালক্ষয় হত। আর তা ছাড়া অন্য পথটাই তো সহজ, কর্তারা তাই সেই পথটাই ধরলেন। লোকেশান দখল করে, গাছপালা কেটে জায়গাগুলোকে একেবারে সাফসুতরো করে তুলবার ভার দেওয়া হয়েছিল ভোপালের এক কন্ট্রাকটরকে। এক দঙ্গল লাঠিয়াল নিয়ে সে একেবারে তৈরি হয়েই গিয়েছিল। বোমা-বন্দুকও ছিল নিশ্চয়। বেধড়ক পিটিয়ে সে ট্রাইবালদের সেখান থেকে হটিয়ে দেয়।”

এক মুহূর্ত চুপ করে রইল সরস্বতী, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে ক্লিষ্ট হেসে বলল, “তো এইরকমই যে হবে, তা আমি জানতুম।”

“আর এইজন্যেই সম্ভবত যে-সব জায়গায় কাজ করলে গোল্ড ডিপজিটের হদিশ পাবার সম্ভাবনা রয়েছে, তার নাম তুমি জানাওনি, তাই না?”

“ঠিক তা-ই।” এতক্ষণে স্বাভাবিক হাসি ফুটল সরস্বতীর মুখে। বলল, “যদি জানাতুম, তা হলে কী হত জানেন?”

কৌশিক বলল, “কী হত?”

“কন্ট্রাকটরের গুণ্ডাবাহিনী গিয়ে সেখানকার ট্রাইবাল পপুলেশানকেও ঠিক ওই একইভাবে উচ্ছেদ করে ছাড়ত। এখন বলো কৌশিক, নিতান্ত নিঃসঙ্গ একটা শহুরে মেয়েকে যারা সব রকমে সাহায্য করেছে, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, মাসের পর মাস তাকে সব রকমের বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেছে, জেনেশুনে তাদের এই সর্বনাশটা আমি করতে পারি?”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *