৩
স্বপ্নটা কিন্তু অলীক নয়।
কিন্তু কথাটা বলবার আগেই বোধহয় বলা দরকার যে, কলকাতা ছেড়ে হঠাৎ কেন আমি বিষাণগড়ে গিয়েছিলুম। তা হলে কিন্তু সেই সময় আর সেই পরিবেশের কথাটাও বলতে হয়।
১৯৪২ সনে আই. এ. পাশ করে আমি খবরের কাগজে ঢুকি। বিনা মাইনের চাকরি; তার উপরে আবার বিকেলের শিফটের চার্জে যিনি থাকতেন, রোজ তাঁকে একটা করে ভেজিটেবল চপ আর এক কাপ চা না-খাওয়ালে তিনি অনুবাদ করবার মতো কপিই আমাকে দিতে চাইতেন না। চা আর চপ খাওয়ালে কিন্তু অ্যাসোশিয়েটেড প্রেস অফ ইন্ডিয়া আর রয়টারের কপি তো দিতেনই, সেইসঙ্গে এই আশ্বাসটাও দিতেন যে, মালিককে বলে খুব শিগগিরই তিনি আমাকে মাসিক অন্তত তিরিশটা টাকা দেওয়াবার ব্যবস্থা করে দেবেন।
পি.টি. আই. আর ইউ. এন. আই. তখনও জন্ম নেয়নি। ও-সব অনেক পরের কথা। রয়টার অবশ্য এখনও আছে, তখনও ছিল। এখনকার মতো তখনও তারা শুধুই বিদেশি খবর সরবরাহ করত। দিশি খবরের জন্যে ছিল অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস অভ ইন্ডিয়া আর ইউনাইটেড প্রেস অভ ইন্ডিয়া। সংক্ষেপে এ. পি. আই. আর ইউ. পি. আই.। বলা বাহুল্য, তারা বিনা পয়সায় খবর দিত না। কিন্তু ছোট্ট কাগজ, নিয়মিত পয়সা দেবার ক্ষমতা নেই, নিউজ এজেন্সির বিল মাসের পর মাস বাকি পড়ে থাকে, শেষ পর্যন্ত তারা খবর পাঠানো বন্ধ করে দিল। ঝাঁপ বন্ধ করা ছাড়া মালিকেরও তখন আর গত্যন্তর রইল না।
তারই মধ্যে বি. এ. পাশ করে গিয়েছিলুম আমি। সেই ছোট্ট কাগজ ছেড়ে ঢুকেও পড়েছিলুম আর একটু সচ্ছল একটা কাগজে কিন্তু যুদ্ধও শেষ হল, আর বিজ্ঞাপনেও ধরল টান। দেশে তখন এত-এত শিল্প তো গড়ে ওঠেনি, কে বিজ্ঞাপন দেবে। যুদ্ধের বাজারে ব্যাঙের ছাতার মতো গুচ্ছের কাগজ গজিয়ে উঠেছিল, সেগুলোর তখন নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। এ. আর. পি. আর সিভিক গার্ডের দফতরগুলিকে গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে; বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন আরও অসংখ্য আপিস, শুধুই যুদ্ধকালীন দরকার মেটাবার জন্যে যা খোলা হয়েছিল। ফলে চাকরির বাজারেও আবার দেখা দিয়েছে সেই আগের মতোই দুঃসময়। আমি ইতিমধ্যে আরও দু-তিনটে কাগজ পালটে সদ্য যে নতুন কাগজে যোগ দিয়েছি, তারও মধু ক্রমেই শুকিয়ে আসছিল। মাইনে পাই একশো পঁচিশ। তাও এক কিস্তিতে পাওয়া যায় না। মাইনে চাইতে গেলে ক্যাশিয়ারবাবু দশ কি পনেরো টাকা দিয়ে বলেন, “আপাতত এই দিয়েই চালিয়ে নিন, মনে হচ্ছে সামনের হপ্তায় আরও কিছু দিতে পারব।”
এ হল ১৯৪৬ সালের কথা। বিয়াল্লিশের আন্দোলনের আগুন তার অনেক আগেই নিবেছে। তেতাল্লিশের মন্বন্তরে মানুষ মরেছে পোকামাকড়ের মতো। যুদ্ধ শেষ হয়েছে। নেতারা জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন। ছেচল্লিশের দাঙ্গা তখনও বাধেনি। মনে হচ্ছে, স্বাধীনতা হয়তো আর খুব দূরে নয়। পাকিস্তানের জিগির তখন অহোরাত্র উঠছিল ঠিকই, কিন্তু দেশ যে সত্যি দু’ভাগ হবে, তখনও তা আমি ভাবতে পারছিলুম না।
সেই সময়ে হঠাৎ একদিন স্টেট্সম্যানে একটা বিজ্ঞাপন আমার চোখে পড়ে। বিষাণগড় প্যালেসের জন্যে একজন কেয়ারটেকার চাই। রাজবাড়ির আউটহাউসে থাকতে হবে। থাকা-খাওয়া ফ্রি। মাইনে তিনশো টাকা। প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, গ্র্যাজুয়েট হলে ভাল হয়, স্পোকেন ইংলিশে তুখোড় হওয়া আবশ্যক, আর যেটা চাই-ই চাই, সেটা হল ইন্ডিয়ান আর্কিটেকচার বা ভারতীয় স্থাপত্যশিল্প সংক্রান্ত কিছু জ্ঞানগম্যি।
কর্মখালির বিজ্ঞাপন দেখলেই তখন আমি দরখাস্ত ছাড়ি। তবে কোনও দরখাস্তেরই কোনও উত্তর আসে না। জানতুম, এটারও কোনও উত্তর আসবে না। তবু মনে হল, দেখাই যাক না, দরখাস্ত যখন সব চাকরির জন্যেই করছি, তখন এটার জন্যে করতেই বা ক্ষতি কী। বি. এ. পড়তেই পড়তেই স্পোকেন ইংলিশের একটা কোর্স শেষ করি, তার জন্যে একটা সার্টিফিকেট পাওয়া গিয়েছিল। সেইসঙ্গে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনসেন্ট ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি বিভাগের এক নামজাদা অধ্যাপকের কাছ থেকে এই মর্মে একটা প্রশংসাপত্র জোগাড় করাও খুব কঠিন হল না যে, বয়স কম হলেও স্থাপত্যশিল্পে আমার পড়াশুনো নেহাত কম নয়, বস্তুত এ-ব্যাপারে আমাকে একজন ‘নলেজেল ইয়াং ম্যান’ হিসেবেই গণ্য করা যেতে পারে।
আমিও ইতিহাসেরই ছাত্র, তবে কিনা মডার্ন হিস্ট্রির, ভারতীয় স্থাপত্য শিল্পের ‘হ ক্ষ’ তো দূরের কথা, ‘অ আ ক খ’ও আমার জানা নেই। অধ্যাপক সেটা বিলক্ষণ জানতেন, তাই প্রশংসাপত্রর সঙ্গে খানকয়েক বইয়ের একটা লিস্টি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “দেখো হে, আমাকে ডুবিয়ো না, এই বইগুলো একটু নাড়াচাড়া করে নিয়ো।”
বাস্, দরখাস্তের সঙ্গে সার্টিফিকেট, টেস্টিমোনিয়াল ইত্যাদি গেঁথে সেইদিনই ‘দুগ্গা দুগ্গা’ বলে পোস্ট করে দিই, তবে কিনা ফলের প্রত্যাশা কিছুমাত্র করিনি। ধরেই নিয়েছিলুম যে, বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়বে না।
কিন্তু ছিঁড়ল। সাতদিনের মাথায় আমার দরখাস্তখানার প্রাপ্তিস্বীকার করে একখানা চিঠি এল, আর পনেরো দিনের মাথায় এল সাক্ষাৎকারের নির্দেশ।
না, ইন্টারভিউয়ের জন্যে আমার বিষাণগড় যাবার দরকার নেই, ওটা কলকাতাতেই হবে। অমুক দিন অমুক সময়ে আমি যেন গ্র্যান্ড হোটেলের অত নম্বর কামরায় গিয়ে দেখা করি।
সাংবাদিকদের গতি নাকি সর্বত্র। কিন্তু আমি নেহাতই একজন জুনিয়ার রিপোর্টার। বড় মাপের দু-চারজন নেতার সঙ্গে কথা বলেছি বটে, কিন্তু সেজো-মাপেরও কোনও হোটেলে তার আগে ঢোকা হয়নি। আমার দৌড় তখনও ময়দানের মিটিং পর্যন্ত; সেক্ষেত্রে ময়দানের উল্টোদিকের ওই পেল্লায় হোটেলে ঢুকবার সময়ে আমার হাঁটু যদি কিঞ্চিৎ কেঁপে থাকে, তো তার জন্যে নিশ্চয় আমাকে খুব দোষ দেওয়া যাবে না।
কথাটা শুনে যাঁরা হাসছেন, তাঁদের মনে রাখতে বলি যে, দেশ তখনও পরাধীন। ইংরেজ তখনও ভারত ছাড়েনি। যেমন গ্রেট ইস্টার্ন, তেমন গ্র্যান্ডও তখন পরিচিত ছিল ষোলো-আনা সাহেবি হোটেল’ হিসেবে। তার উপরে আবার আমি তো সেখানে ‘গেস্ট’ হিসেবে যাইনি, স্রেফ ‘চাকরিপ্রার্থী’ হিসেবে গিয়েছিলুম। ভিতরে ঢুকে এটাও লক্ষ করেছিলুম যে, চতুর্দিকে শুধুই স্যুটেড-বুটেড লালমুখো আর দিশি সাহেবের ছড়াছড়ি। শাড়ি-পরা দু’চারজন মহিলাকেও দেখলুম বটে, কিন্তু আমার মতো ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কোনও ভারতীয় ভদ্রলোক আমার চোখে পড়ল না।
যে কামরায় গিয়ে আমাকে দেখা করতে বলা হয়েছিল, রিসেপশন কাউন্টারে জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, সেটা দোতলায়। যথাস্থানে গিয়ে দরজায় টোকা দিতে এক মেমসাহেব এসে দরজা খুলে দিলেন। তারপর আমার আসবার উদ্দেশ্য জেনে নিয়ে বললেন, “আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন, আমি রানি-মা’কে খবর দিচ্ছি।”
মেমসাহেব বেরিয়ে গেলেন। আমি একটা সোফায় বসে কামরাটার উপরে চোখ বুলোতে লাগলুম। কামরাটা ছোট, দেখলেই বোঝা যায় যে, আপাতত এটা একটা অফিস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঘরের একদিকে একটা সেন্টার-টেবিলের চারপাশে খানকয় সোফা, অন্যদিকে একটা ছোট টেবিলের উপরে একটা টাইপরাইটার। তার বাঁ দিকে একটা টেলিফোন। টেবিলের সামনে একটা খাড়া-পিঠ চেয়ার। টাইপরাইটারে কাগজ পরানো রয়েছে। মেমসাহেবটি যে ওই চেয়ারে বসে কিছু টাইপ করছিলেন, সেটা বোঝা গেল। টেবিলের পাশে একটা র্যাক। তাতে এক কপি কনসাইজ অক্সফোর্ড ডিকশনারি ও অন্য কিছু বইপত্তর রয়েছে। তা ছাড়া আর কিছু এ-ঘরে নেই। এমনকি, দেওয়ালে একটা ছবি পর্যন্ত না।
খানিক বাদেই ফিরে এলেন মেমসাহেব। মৃদু হেসে, সামান্য শ্রাগ করে বললেন, “ওয়েল … শি ইজ্ন্ট রেডি ইয়েট টু রিসিভ হার ভিজিটরস। নাউ উড য়ু মাইন্ড ওয়েটিং ফর সাম টাইম… সে অ্যাবাউট হাফ অ্যান আওয়ার?”
বসলুম, “ডু আই হ্যাভ এ চয়েস? চাকরিটা আমার দরকার। তাই আধ ঘণ্টা কেন, দরকার হলে সারাদিনই আমি অপেক্ষা করব।”
“ডু য়ু কেয়ার ফর আ কাপ অভ টি? চান তো রুম সার্ভিসকে বলে আনিয়ে দিতে পারি।”
“ধন্যবাদ। কিন্তু দরকার হবে না, একটু আগেই খেয়েছি।”
মেমসাহেব তাঁর কাজে বসে গেলেন।
আধ ঘণ্টাও অবশ্য অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট কুড়ি বাদেই ফোন বেজে উঠল। মেমসাহেব ফোন ধরলেন। কেউ কিছু বলছিল। সেটা শুনলেন। তারপর ফোন নামিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “শি ইজ রেডি নাউ, অ্যান্ড শি ওয়ান্টস্ মি টু সেন্ড য়ু আপ।”
“কোথায় যেতে হবে?”
“করিডরে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরুন, তারপর দুটো দরজা ছেড়ে দিয়ে তৃতীয়টায় নক করুন। ওটাই রানি-মা’র স্যুইট।”
নক করতে যিনি দরজা খুলে দিলেন, তাঁকে দেখবামাত্র যা আমার মনে হল, তা এই যে, ঠিক-দরজায় নক করিনি। মহিলা নন, ইনি একজন দশাসই পুরুষ। দৈর্ঘ্যে অন্তত ছ’ফুট, প্রস্থেও নেহাত কম হবেন না। ওই যাকে শালপ্রাংশু মহাভুজ বলে, ঠিক তা-ই। বয়স সম্ভবত বছর চল্লিশ। পরনে থ্রি-পিস স্যুট। গায়ের রং লালচে-সাদা। চোখে মনোল। তার থেকে একটা কালো কার ঝুলছে। চুল ব্যাকব্রাশ করা। নাকের নীচে চমৎকার এক জোড়া গোঁফ। বস্তুত মোমে-মাজা সেই গোঁফজোড়াটি এতই সুদৃশ্য যে, হঠাৎ দেখলে কৃত্রিম বলে মনে হয়। সত্যিই যে কৃত্রিম, সেটা অনেক বছর বাদে জেনেছিলুম।
যা-ই হোক, ভদ্রলোককে দেখে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলুম আমি। ইন্টারভিউয়ের চিঠিখানা তাঁর দিকে এগিয়ে ধরে বললুম, “আমি কি ভুল-দরজায় নক করেছি?”
চিঠির উপরে চোখ বুলিয়ে দশাসই পুরুষটি হাসলেন। তারপর দরজার পাল্লা পুরোপুরি খুলে দিয়ে বললেন, “ভুল কেন হবে, ভিতরে আসুন।”
ভিতরে ঢুকলুম। ওয়াল টু ওয়াল কার্পেট ছিল অগের ঘরটাতেও, তবে এখানে সেটা অনেক বেশি পুরু। গালচে তো নয়, যেন পালকের গদি, পা একেবারে ডুবে যাচ্ছিল। ঘরটাও মস্ত বড়।
ঢুকেই বুঝেছিলুম, এটা ড্রইং রুম। সোফা, সেটি, সেন্টার টেবিল দিয়ে সুন্দরভাবে সাজানো। একদিকে, দেওয়ালের ধারে একটা ডিভান। দু’দিকের দেওয়াল ফাঁকা। অন্য দুই দেওয়ালের একটিতে ঝুলছে কাঞ্চনজঙ্ঘার মস্ত একটা ফোটোগ্রাফ। ফোটো সেকালে শুধু সাদা-কালোই হত, রঙিন হত না। তবে রং-তুলির ব্যাপারটা যাঁরা বোঝেন, তাঁদের দিয়ে সাদা-কালো ফোটোগ্রাফকেই অনেকে রঙিন করিয়ে নিতেন। এটাকেও সেইভাবে রঙিন করা হয়েছে। সূর্যোদয়ের মুহূর্ত। আকাশে একটু লালচে আভা। তার ছোঁয়া লাগায় পাহাড়চূড়ায় বরফের বাহার খুব খুলেছে। অন্য দেওয়ালে গিল্টি-করা ফ্রেমের মধ্যে ইংরেজ রাজা-রানির ছবি।
ড্রইং-রুমের লাগোয়া শোবার ঘর। দুই কামরার মধ্যবর্তী দরজায় জামদানি-কাজ করা পুরু পর্দা। আমাকে বসতে বলে ভদ্রলোক সেই পর্দার কাছে গিয়ে অনুচ্চ গলায় বললেন, “যশ, আওয়ার ইয়াং ম্যান ইজ্ হিয়ার।”
ভিতরের ঘর থেকে পরক্ষণেই যিনি বেরিয়ে এলেন, তাঁর মতো রূপবতী রমণী হয়তো অনেকেই দেখে থাকবেন, কিন্তু আমি অন্তত তার আগে আর দেখিনি। বয়স, মনে হল, পঁয়তিরিশের বেশি হবে না। বেশভূষায় আতিশয্য নেই। পরনে হাল্কা পেঁয়াজ-রঙের পাড়-ছাড়া শিল্কের শাড়ি, গলায় খুবই সরু একটা সোনার চেন, দু’হাতে দু’গাছি সোনার চুড়ি, পায়ে মখমলের স্লিপার। চুলে পাক ধরেনি, সিঁথিতে সিঁদুর নেই।
ভদ্রলোক বললেন, “শি ইজ দ্য কুইন মাদার অভ্ বিষাণগড়, রানি যশোমতী দেবী। … অ্যান্ড যশ, হিয়ার ইজ মিঃ কিরণ চ্যাটার্জি, দ্য ইয়াং ম্যান হু অ্যাপ্লায়েড ফর দ্যাট পোস্ট আন্ড হুম য়ু হ্যাভ কল্ড।”
রানি-মা এ-ঘরে ঢুকবার সঙ্গে সঙ্গেই সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিলুম। তিনি আমাকে বসতে বললেন, নিজেও বসলেন, তারপর ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দীপ, তুমি একবার পামেলার ঘরে যাও। গিয়ে দ্যাখো, ওকে যে চিঠিগুলো টাইপ করতে বলেছিলুম, সেগুলো রেডি হল কি না। ওগুলো আজই ছাড়তে হবে।”
ভদ্রলোক বেরিয়ে গেলেন।
রূপ নানা রকমের হয়। কিছু রূপ আমাদের প্রীতি উৎপাদন করে, কিছু দেখে আমরা মুগ্ধ হই, আবার কিছুর উপরে চোখ পড়তেই আমাদের নিশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসে, বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটবার শব্দ শোনা যায়।
বাসন্তী আমার কোনই কথাই বিশ্বাস করে না। এটাও সম্ভবত করবে না। তবে সেটাই এক্ষেত্রে আমার পক্ষে নিরাপদ। তাই নিঃসংকোচে বলি, রানি যশোমতী এসে ঘরে ঢুকবার মুহূর্ত থেকেই আমার বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটবার শব্দ শুনতে পাচ্ছিলুম, নিশ্বাসও যেন বন্ধ হয়ে আসছিল।
রানি-মা কয়েক মুহূর্ত দেখলেন আমাকে। তারপর বললেন, “যার জন্যে আপনি দরখাস্ত করেছেন, সেটা খুব উঁচু দরের চাকরি নয়, কেয়ারটেকারের কাজ, মাস-মাইনে মাত্র তিনশো টাকা। নর্মালি এ-সব চাকরির ইন্টারভিউ আমার নেবার কথা নয়। তা হলে নিচ্ছি কেন? কী মনে হয় আপনার?”
বললুম, “আন্দাজ একটা করতে পারি। তবে সেটা ভুলও হতে পারে।”
“বলুন।”
“চাকরির বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, কেয়ারটেকারকে রাজবাড়ির আউটহাউসে। থাকতে হবে। কিন্তু আউটহাউস হলেও সেটা তো রাজবাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যেই। তাই না?”
“হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কী হল?”
“আমার ধারণা, নিজে কথা বলে যতক্ষণ না কারও সততা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হতে পারছেন, ততক্ষণ আপনি বাইরের কাউকে প্যালেস-কম্পাউন্ডের ভিতরকার কোনও চাকরিতে ঢোকাতে চান না।”
“এ ভেরি ইনটেলিজেন্ট গেস্।” রানি-মা মৃদু হাসলেন। “এবারে দু-একটা কাজের কথা বলি। দরখাস্তের সঙ্গে যে-সব টেস্টিমোনিয়াল পাঠিয়েছেন, তার একটা পড়ে মনে হল, আর্কিটেকচার সম্পর্কে সাধারণভাবে কিছু পড়াশুনো করেছেন, সেক্ষেত্রে আপনার জ্ঞান মোটামুটি নির্ভরযোগ্য। কিন্তু আপনার কাজ তো রাজবাড়িতে। তার জন্য স্পেশ্যালাইজড নলেজ চাই। প্যালেস-আর্কিটেকচার সম্পর্কে কিছু পড়েছেন?”
বললুম, “ভারতবর্ষের বিখ্যাত সব প্রাসাদ নিয়ে বছর দশেক আগে লন্ডন থেকে একটা বই বেরিয়েছিল। তাতে প্রাসাদগুলির ছবি তো ছিলই, সেইসঙ্গে ছিল তাদের স্থাপত্যশৈলীর আলোচনা। বইখানা পড়েছি।”
“বইখানার নাম যদ্দুর মনে করতে পারছি ‘দ্য আর্কিটেকচারাল ইউনিকনেস অভ দ্য প্যালেসেস অভ ইন্ডিয়া।’ তাই না?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“ওতে কাজ হবে না।” রানি-মা’র ঠোঁট বিদ্রুপে বেঁকে গেল। “এ-সব বিলিতি পাবলিশারদের আমি চিনি তো, অল দে ওয়ন্ট টু ডু ইজ টু কিপ বিকানির মাইসোর বরোদা ভোপাল অ্যান্ড জয়পুর ইন গুড হিউমার। আপনি যদি বিকানির মাইসোর বরোদা ভোপাল কি জয়পুরের চাকরি নিতেন তো ও-বই আপনার কাজে লাগত। কিন্তু আপনি তো বিষাণগড়ে কাজ করতে চাইছেন।
বললুম, “বিষাণগড়ের প্যালেস নিয়েও ও-বইয়ে বেশ ক’পাতার একটা রাইট-আপ আছে কিন্তু।”
“তা আছে ঠিকই, কিন্তু যে ওটা লিখেছে, হি নোজ নেক্সট টু নাথিং অ্যাবাউট আওয়ার প্যালেস। বিষাণগড় রাজবাড়ি নিয়ে সত্যি যদি আপনি কিছু জানতে চান, তো আপনাকে ডঃ সিদ্দিকির বই পড়তে হবে।”
অকপটে স্বীকার করলুম যে, ডঃ সিদ্দিকির নাম পর্যন্ত আমি শুনিনি।
রানি-মা তাতে বিন্দুমাত্র অবাক হলেন না। বললেন, “সেট অস্বাভাবিক নয়। ভদ্রলোক তো আর চতুর্দিকে নিজের ঢাক পিটিয়ে ঘুরে বেড়ান না, তাই শোনেননি। বাট হি ইজ আ প্রোফাউন্ড স্কলার। ইতিহাসের অধ্যাপক, বম্বে ইউনিভার্সিটিতে পড়াতেন, রিটায়ার করে এখন বিষাণগড়েই আছেন। আমাদের ওখানে ওঁরা সাতপুরুষের বাসিন্দা। ওঁর বাপ-ঠাকুর্দা, এমনকি ঠাকুর্দার বাবাও আমাদের রাজ-এস্টেটে কাজ করতেন।”
ভদ্রমহিলার আরও কিছু প্রশ্ন ছিল। অধিকাংশই মধ্যপ্রদেশ সম্পর্কে। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা, বিষাণগড় তো সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ার একটা দেশীয় রাজ্য। প্রশ্নগুলির বেশির ভাগেরই যে নির্ভুল উত্তর দেওয়া গেল, তার কারণ ইন্টারভিউয়ের চিঠিখানা হাতে আসবার পর থেকে মধ্যপ্রদেশের ভূগোল আর ইতিহাসই ছিল আমার প্রধান পাঠ্য বিষয়।
রানি-মা’র শেষ প্রশ্নটার সঙ্গে অবশ্য মধ্যপ্রদেশ কেন, ভারতবর্ষেরই কোনও যোগ-সম্পর্ক ছিল না।
“ধরুন আমাদের প্যালেসের একটা উইং নিয়ে আপনার সঙ্গে আমি আলোচনা করছি। ধরুন, প্যালেসের সেই অংশটা কীভাবে সাজানো হবে, তাই নিয়ে কথা হচ্ছে। তা সেই সময়ে যদি আমি ‘কুইন অ্যান্’ কি ‘লুই দ্য ফোরটিনথ্’-এর উল্লেখ করি, তো আপনি কী বুঝবেন?”
কপালগুণে উত্তরটা আমার জানা ছিল। বললুম, “ফার্নিচারের কথা বুঝব। সেই আমলের ফার্নিচারের কথা।”
রানি-মা হাসলেন। বললেন, “ভেরি গুড। তবে কিনা চাকরিটা যে আপনার হবেই, তা কিন্তু এখুনি আমি বলছি না। চারজনকে আমরা ডেকেছি। আপনাকে নিয়ে তিনজনের সঙ্গে কথা হল। আর-একজন বাকি। তিনি বিকেলের দিকে আসবেন।”
ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই সেই গুল্ফবান ভদ্রলোকের সঙ্গে দেখা। দরজার বাইরে করিডরেই তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি বেরিয়ে আসতেই তিনি ভিতরে ঢুকে গেলেন।
রানি-মাকে ইনি ‘যশ’ বলেন, আর রানি-মা এঁকে ‘দীপ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। ভদ্রলোকের পুরো নামটা জানা হল না। বিষাণগড়ের রাজবাড়ির সঙ্গে এঁর সম্পর্ক কী, তাও না।
গ্র্যান্ড হোটেল থেকে চুপচাপ বেরিয়ে এসে চৌরঙ্গি রোডের জনস্রোতের মধ্যে আমি মিশে গেলুম।
