১৮
গেস্ট হাউসে ঢুকে ফোন করবার পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যেই পুলিশের গাড়ি এসে গেল। জিপ থেকে প্রথমেই লাফিয়ে নামলেন বিষাণগড় স্টেট পুলিশের বড়কর্তা অর্জুন প্রসাদ। বাজখাঁই গলার জন্য আড়ালে অনেকেই তাঁকে গর্জন প্রসাদ বলে। তবে সব সময়েই যে তিনি হাঁকার পেড়ে কথা বলেন, তা নয়। এমনিতে যাঁর গলা শুনলে মনে হয় যেন আকাশে মেঘ ডাকছে, সেই মানুষটিকেই রাজবাড়িতে অনেক সময় হাত জোড় করে খুবই মোলায়েম গলায় কথা বলতে শুনেছি।
ভাদুড়িমশাইকে যে রাজবাড়িতে সবাই খাতির করে চলে, অর্জুন প্রসাদও সেটা জানতেন নিশ্চয়। সম্ভবত সেই কারণেই তিনি খুব-একটা গলা চড়ালেন না। তাঁর সঙ্গে আরও দুজন অফিসার এসেছিলেন। লাশ তিনটির দিকে ছড়ি উঁচিয়ে অর্জুন প্রসাদ তাঁর সহকারীদের বললেন, “আপনারা ওদিকটা দেখুন, আমি ততক্ষণ মিঃ ভাদুড়ির সঙ্গে কথা বলি।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমার যা বলবার, তা আমি নিজের থেকেই বলব, নাকি আপনি যা জানতে চান, তা আমাকে প্রশ্ন করে জেনে নেবেন?”
অর্জুন প্রসাদ বললেন, “মুখে না বলে আপনি যদি একটা রিটন স্টেটমেন্ট আমার অফিসে পাঠিয়ে দেন, তো খুব ভাল হয়। দুপুরের মধ্যে সেটা পাঠাতে পারবেন না?”
“না-পারবার তো কিছু নেই। বারোটার মধ্যেই সেটা পেয়ে যাবেন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ, মিঃ ভাদুড়ি। আপাতত কয়েকটা প্রশ্ন করছি। বাট অফ কোর্স আই ডোন্ট হ্যাভ টু টেল ইউ দ্যাট ইউ মে ভেরি ওয়েল ডিসাইড নট টু আসার এনি অভ্ দেম।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওহ্ ফর্গেট দ্য ফর্মালিটিজ! কী জানতে চান বলুন। জানলে উত্তর দেব, না জানলে বলব জানি না।”
“আপনি এই মানুষগুলিকে প্রথম কখন দেখেন?”
“পৌনে পাঁচটায়।”
“তখন তো বলতে গেলে ভোরই হয়নি, ওই সময়ে আজ আপনি এখানে এসেছিলেন কেন?”
“আজই যে প্রথম এলুম, তা নয়, রোজই আসি।”
“কিন্তু আপনি থাকেন তো হিলক রোডে, এখান থেকে তার দূরত্ব নেহাত কম হবে না।”
“তা তো হবেই না,” ভাদুড়ি হেসে বললেন, “হাঁটাপথে তা অন্তত কুড়ি মিনিট।”
“এতটা পথ হেঁটে এখানে আপনি আসেন কেন? তাও ওই শেষ-রাতে?”
“আমি তো হেঁটে আসি না, হাঁটতে আসি।”
“তার মানে?”
“মানে তো খুবই সহজ।” ভাদুড়ি বললেন, “রাত চারটেয় আমি ঘুম থেকে উঠে পড়ি। মুখহাত ধুয়ে বেরোতে বেরোতে চারটে কুড়ি-পঁচিশ। এখন জুন মাস তো, সাড়ে চারটের মধ্যে অন্ধকার মোটামুটি কেটে যায়। তবে পথ তখনও ফাঁকা। হিলক রোড তো ফ্ল্যাট নয়, উঁচুনিচু, ও-রাস্তায় হেঁটে সুবিধে হয় না, তাই বাইসাইকেল চালিয়ে প্যালেস রোডে চলে আসি। আজও এসেছিলুম। এসে দেখি, এই ব্যাপার। তার একটু বাদেই মিঃ চ্যাটার্জিও এসে পড়লেন। গেস্ট হাউস থেকে উনিই আপনাদের ফোন করেছিলেন।”
একটু-একটু করে ভিড় জমতে শুরু করেছে। থানা থেকে একটা লরি এসে পৌঁছেছে ইতিমধ্যে। অর্জুন প্রসাদ তাঁর সহকারীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনাদের কাজ এখনকার মতো হয়ে গিয়ে থাকলে লাশ তিনটে মেডিক্যাল এগজামিনেশনের জন্যে পাঠিয়ে দিন। …ও হ্যাঁ, সব দিক থেকে- ফোটো তুলে রেখেছেন তো? …রেখেছেন। ভাল। তা হলে আপনারাও আর দেরি করবেন না, থানায় ফিরে গিয়ে ডাক্তারবাবুকে চলে আসতে বলুন। আমিও একটু বাদেই ফিরছি।”
থানা থেকে পরে যারা এসেছিল, ধরাধরি করে লাশ তিনটিকে তারা লরিতে তুলে নিল। অর্জুন প্রসাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট দুজনও লরির ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসে পড়লেন। লরি চলে গেল।
অর্জুন প্রসাদ বললেন, “একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না, মিঃ ভাদুড়ি। আপনি তো বললেন হিলক্ রোড থেকে সাইকেলে করে রোজ এখানে হাঁটতে আসেন। তো সেই সাইকেলটা কোথায়?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওই তো একটা বেঞ্চির গায়ে হেলান দিয়ে রেখেছি। বাঁ দিকে তাকালেই দেখতে পাবেন।”
বাঁ দিকে তাকিয়ে সাইকেলটা দেখে নিলেন মিঃ প্রসাদ। তারপর বললেন, “মানুষগুলিকে আপনি ঠিক কী অবস্থায় দেখেছিলেন?”
“মানে কেউ তখনও বেঁচে ছিল কি না, এটাই জানতে চাইছেন তো?”
“হ্যাঁ।”
“তা হলে শুনুন, দুজনকে আমি মৃত অবস্থায় দেখেছিলুম, কিন্তু একজন তখনও বেঁচে ছিল। দু-একটা কথাও সে আমাকে বলেছে। কিন্তু সে তো ডিলিরিয়ামের মতো। জ্বরের ঘোরে কি স্বপ্নের মধ্যে মানুষ যে-রকম কথা বলে, অনেকটা সেইরকম। এত ইনকোহেরেন্ট যে, তার কোনও অর্থ আমি ধরতে পারিনি।”
“কী বলেছিল লোকটা?”
“বলেছিল, “হলদে পাথর… দশদিন বাদে আবার আসবে… এইখানে… মাঝরাত্তিরে… মরবে বারণ করো…’। বাস্ আর কিছু সে বলতে পারেনি।”
“তারপরেই সে মারা যায়?”
“তারপরেই মারা যায়।”
“কিন্তু মরবার আগে ওই কথাগুলো সে নিশ্চয় হিন্দিতে বলেনি, ট্রাইবাল ভাষায় বলেছিল। আপনি সে-ভাষা বুঝলেন কী করে?”
“ভাষাটা মোটামুটি জানি বলেই বুঝলুম। আমাদের অফিসে এখানকার একটি ট্রাইবাল ছেলে বেয়ারার কাজ করে, তার কাছেই শিখেছি। কিন্তু ছাড়া ছাড়া কয়েকটা শব্দ বুঝে আর লাভ কী হল, তার দ্বারা যে লোকটা কী বোঝাতে চাইছে, সেটাই তো ধরতে পারা গেল না।”
অর্জুন প্রসাদ চুপচাপ কী যেন চিন্তা করলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, তা হলে ওই কথাই রইল, বারোটার মধ্যে একটা রি স্টেটমেন্ট আপনি পাঠিয়ে দিন। …আর হ্যাঁ, তিনটে লোকের সঙ্গে একটা করে পুঁটলি রয়েছে দেখলুম। ওর মধ্যে কী আছে আপনি জানেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা কী করে জানব? জানতে হলে তো পুঁটলি খুলে দেখতে হয়, বাট টু ডু দ্যাট উড হ্যাভ বিন হাইলি ইমপ্রপার। না মশাই, খোলা তো দূরের কথা, কোনও কিছু আমি ছুঁয়েও দেখিনি। ও-সব আপনাদের কাজ, আপনারা করুন।”
“তা হলে আর আপনাকে আটকে রাখব না।” অর্জুন প্রসাদ বললেন, “আপনি এখন যেতে পারেন। দরকার বুঝলে পরে আবার আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করব।”
অর্জুন প্রসাদ তাঁর জিপে গিয়ে উঠলেন। ভিড় ইতিমধ্যে পাতলা হয়ে গিয়েছিল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে তাঁর সাইকেলটিকে নিয়ে এলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর বললেন, “চলুন, আপনাকে খানিকটা এগিয়ে দিই।”
হাঁটতে-হাঁটতে মৃদু গলায় বললুম, “পুলিশকে কিন্তু আপনি মিথ্যে কথা বলেছেন।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো বলেইছি। তিনটে পুঁটলিই আমি খুলেছিলুম। একটার মধ্যে এই মূল্যবান জিনিসটি পাওয়া গেল।”
পকেট থেকে আলগোছে বার করে যা তিনি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন, সেটি একটি জীর্ণ, ময়লা ফোটোগ্রাফ। যাঁর ফোটোগ্রাফ, তাঁর মাথার পাগড়িতে পাখির পালক গোঁজা, হাতে তীরধনুক। কিন্তু আদিবাসী সেজে ফোটো তোলালেও মানুষটি যে কে, তা বুঝতে আমার কিছুমাত্র অসুবিধে হবার কোনও কারণ ছিল না। গঙ্গাধর মিশ্রের বাড়িতে এঁরই আর-একটি ফোটোগ্রাফ দেখে আমি চমকে গিয়েছিলুম।
অস্ফুট গলায় বললুম, “পুরন্দর মিশ্র?”
ফোটোগ্রাফখানা আমার হাত থেকে ফিরিয়ে নিতে-নিতে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাক, তা হলে চিনতে পেরেছেন।”
“এ-ফোটো ওদের থলিতে কী করে এল?”
“আমার ধারণা, সেটা আমি বুঝতে পেরেছি।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “কিন্তু আপাতত সে-কথা থাক। তার বদলে আর-একটা কথা শুনুন। পুলিশকে আমি আরও একটা মিথ্যে কথা বলেছি।”
“আবার কী মিথ্যে বললেন?”
“পুলিশকে ওই যে আমি বললুম, একটা লোক বেঁচে ছিল, আর মরবার আগে ডিলিরিয়াম বকার মতো আমাকে খাপছাড়া কয়েকটা কথা বলে গেছে, ওটা একেবারে ডাহা মিথ্যে।”
হতভম্ব হয়ে বললুম, “সে কী, লোকটা আপনাকে কিছু বলেনি?”
“কী করে বলবে। কেউই তো বেঁচে ছিল না। অল অভ্ দেম ওয়্যার স্টোন ডেড।”
“তা হলে পুলিশকে আপনি ও-কথা বলতে গেলেন কেন?”
“কারণ আছে নিশ্চয়। .. শুধু একটা অনুরোধ, আমি যে দু’দুটো মিথ্যে বলেছি, তা যেন কেউ জানতে না পারে। আর হ্যাঁ, এই ফোটোর কথাও এখন কাউকে বলবেন না।”
কথা বলতে বলতে আমরা রাজবাড়ির দেউড়ি পর্যন্ত চলে এসেছিলুম। বললুম, “ভিতরে গিয়ে একটু বসবেন না?”
“না দশাই, এখন বাড়ি ফিরে স্টেটমেন্ট লিখে থানায় পাঠাতে হবে। তা ছাড়া, বেলাও তো কম হয়নি। অফিস রয়েছে না?”
ভাদুড়িমশাই সাইকেলে উঠে পড়লেন! আমিও রাজবাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে আমার কোয়ার্টার্সের দিকে পা বাড়া।
.
দুপুরে আজ আর দফতরে যাবার ইচ্ছে ছিল না। একে তো আজকের দিনটা শুরুই হয়েছে খুব খারাপভাবে, তার উপর আবার নদীর ধারে দেখা দৃশ্যটার কথা ভাবতে গেলেই গা’টা কেমন যেন গুলিয়ে উঠছিল। কিচেন থেকে সকালবেলার যে জলখাবার পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ঘরে ঢুকে দেখলুম সেটা ঢাকা দিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু আর মুখে তুলতে ইচ্ছে করল না। দফতরে অবশ্য না গেলেই নয়। প্যালেসের পিছন দিককার একটা পুরনো বাড়ি কিছুদিন আগে ভেঙে ফেলা হয়েছে, সেখানে নতুন বাড়ি উঠবে, তার প্ল্যান নিয়ে আজ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে বৈঠক হবার কথা, আমাদের এস্টেট-ম্যানেজার গোপীচাঁদ শেঠিও তাতে উপস্থিত থাকবেন, ফলে না গিয়ে উপায় নেই। কিন্তু গিয়ে শুনলুম, ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক রায়পুর থেকে ফোন করে জানিয়েছেন যে, হঠাৎ একটা কাজে আটকে যাওয়ায় আজ তিনি আসতে পারছেন না, কাল আসবেন।
মুরারি আজকাল সময়মতো আসছে, তাকে নিয়ে আর নতুন কোনও সমস্যা দেখা দেয়নি। যে-লোকটা আগে প্রায় প্রতিটি কাজ নিয়েই কিছু-না-কিছু ওজর-আপত্তি তুলত, ইদানীং যে সমস্ত কাজই সে হাসিমুখে করে দেয়, তাতে বুঝতে পারি, রানি-মা তাকে ধমকে দিয়েছেন নিশ্চয়, নইলে তার এই রূপান্তর ঘটত না। ভেবেছিলুম, পাওনাদারদের যে-সব বিল কিছুদিন ধরে জমে আছে, ‘পাস্ড ফর পেমেন্ট’ ছাপ মারবার আগে আজ তাকে সেগুলি একবার ভাল করে চেক করবার কাজে লাগিয়ে দেব, কিন্তু দশটার সময়ে দফতরে পৌঁছে শুনলুম, মুরারি আসেনি।
এল সাড়ে দশটায়। বললুম, “কী ব্যাপার, আজ হঠাৎ দেরি যে? শরীর ঠিক আছে তো?” মুরারি সে-কথার জবাব না দিয়ে বলল, “শুনেছেন?”
“কী শুনব? সর্সোতিয়ার ধারে আজ আবার তিনটে মানুষ মরে পড়েছিল, এই খবর?”
“ও তো পুরনো খবর!” মুরারি বলল, “আপনিই যে ইনফর্মেশানটা পুলিশকে দিয়েছিলেন, তাও জানি। তো পুলিশ শুনলুম পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট পাবার পরেই জোর তদন্ত শুরু করবে। শহরে কার-কার কাছে রিভলভার আছে, তার একটা লিস্টি নাকি তৈরি করে ফেলেছে।”
“তা তো করেছে, কিন্তু শহরে যারা পারতপক্ষে আসে না, ট্রাইবাল এরিয়া থেকে এমন তিনজন মানুষ কাল রাত্তিরে হঠাৎ শহরে এসে ঢুকেছিল কেন, সেটা তো আগে বোঝা চাই। আমার তো মনে হয়, সেটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। তা এখানকার পুলিশের বড়কর্তাটি যে আদৌ এ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করছেন, আজ সকালে তাঁর কথাবার্তা শুনে তা কিন্তু মনে হল না। মিঃ ভাদুড়িকে আগড়ম-বাগড়ম গোটাকয় প্রশ্ন করলেন, বাস্।”
মুরারি বলল, “যাচ্চলে, লেংটি পরা তিনটে জংলি মানুষ মরেছে তো কী হয়েছে, আপনি তা নিয়ে অত ভাবছেন কেন, ভাবতে হয় তো এদিককার কথা ভাবুন।”
“কেন, এদিকে আবার কী হল?”
“যা হয়েছে, তা তো ভয়ংকর ব্যাপার!” মুরারি হঠাৎ একেবারে সবচেয়ে নিচু পর্দায় নামিয়ে ফেলল তার গলা, তারপর তার মুখখানাকে আমার কানের কাছে নিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল, “বড়কুমার তো নিরুদ্দেশ!”
বরটা শুনবামাত্র পামেলার কথা মনে পড়ে গেল আমার। মার্চ মাসে যেদিন সে রাত্তিরবেলায় আমার কোয়ার্টার্সে এসে দেখা করেছিল, সে-দিন সে কি এইরকম একটা সম্ভাবনার কথাই আমাকে বলেনি? যদ্দুর মনে পড়ে, সে বলেছিল যে, এই প্যালেস আর এখন বড়কুমারের পক্ষে বিশেষ নিরাপদ জায়গা নয়, তাই হয়তো সে এখান থেকে পালিয়ে রাজস্থানের মাধোপুর স্টেটে চলে যেতে পারে।
আমি যে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছি, মুরারি সেটা লক্ষ করেছিল। বলল, “কী ভাবছেন বলুন তো?”
বললুম, “কিছু না। কিন্তু এ তো বড় অদ্ভুত কথা! হঠাৎ তিনি নিরুদ্দেশ হতে যাবেন কেন? ঠিক জানো তো?”
“বেঠিক জানলে কি আর আপনাকে বলতুম? খবরটা শুনেছি একেবারে স্ট্রেট ফ্রম দ্য হর্সেস মাউথ।”
“কখন থেকে নিরুদ্দেশ?”
“কাল রাত্তির থেকেই তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। … দিন, কী করতে হবে বলে দিন, কাজে বসে যাই।”
বিলগুলি আগের দিনই গুছিয়ে রেখেছিলুম, ড্রয়ার থেকে বার করে মুরারির হাতে তুলে দিয়ে বললুম, “বেশ ভাল করে চেক করে দাও তো, অনেকদিন হল পড়ে আছে, আজই এগুলি পেমেন্টের জন্যে পাঠিয়ে দেব।”
মুরারি তার টেবিলে গিয়ে বসল। তারপর বিল চেক করতে-করতে হঠাৎ একসময় মুখ তুলে বলল, “আপনি অবশ্য স্বীকার করলেন না, কিন্তু বড়কুমারের খবর শুনে সত্যি আপনি একটু অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলেন। মনে হল যেন আপনি আর-কিছু ভাবছেন।”
বললুম, “আরে না, কিছুই ভাবছিলুম না।”
বললুম বটে, কিন্তু একইসঙ্গে লক্ষ করলুম, একটা অদ্ভুত হাসি তার মুখের উপরে খেলা করে বেড়াচ্ছে। মনে হল আমার কথাটা সে বিশ্বাস করেনি।
.
একটা থেকে দুটো। দুপুরে এই এক ঘণ্টা আমরা ছুটি পাই। খাওয়ার ছুটি। মুরারি আগে এই সময়ে বাড়ি চলে যেত, তারপরে আর বড়-একটা ফিরত না। আজকাল সে টিফিন ক্যারিয়ারে খাবার নিয়ে আসে, অফিসে বসেই দুপুরের খাওয়াটা খেয়ে নেয়। আমি আমার কোয়ার্টার্সে চলে যাই। যাবার সময় কিচেনে বলে যাই খাবার পাঠিয়ে দিতে। আজ সকালে সেই যে গা কেমন গুলিয়ে উঠেছিল, তার জোর এখনও মেটেনি, মুখটা একেবারে বিস্বাদ হয়ে আছে। কিচেনের দিকে পা বাড়াতেও অস্বস্তি হচ্ছিল।
প্যালেসের উত্তরে খানিকটা ফাঁকা জায়গা। তারপর কিচেন। সেও এক যজ্ঞিবাড়ির মতো এলাহি ব্যাপার। কিচেন এখানে একটা নয়, পাশাপাশি দুটো। একটায় দিশি-মতে ডাল-ভাত-রুটি-তরকারি লুচি-পরোটা মাছ-মাংস হয়, অন্যটায় সাহেবি খানা। এদিকের দায়িত্বে আছে জনার্দন ঠাকুর, আর ও-দিকটা সামলায় গোয়ানিজ কুক ড্যানিয়েল। এরা নিজেরা রান্না করে না, রান্না ঠিকমতো হচ্ছে কি না, তার তদারক করে। আার জন্যে সাহেবি কিচেন থেকে ব্রেকফাস্ট যায়, আর যেমন দুপুর তেমনি রাত্তিরের খাবার যায় দিশি কিচেন থেকে। সেই দিকে যেতে-যেতে দেখলুম, সামনের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে জনার্দন আর ড্যানিয়েল কথা বলছে। কী কথা বলছে, বোঝা গেল না, তবে এইটে লক্ষ করলুম যে, দুজনের মুখই গম্ভীর।
জনার্দনকে বললুম, শরীরটা ভাল নেই, তাই দুপুরে আর আমার জন্যে খাবার পাঠাতে হবে না। বলে আমার কোয়ার্টার্সের দিকে পা বাড়ালুম। ঠিক করেছিলুম যে, খানিকক্ষণ বিশ্রাম করে তারপর দুটো নাগাদ আবার দফতরে ফিরে যাব।
বাথরুমে ঢুকে চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে শোবার ঘরের এককোণে রাখা ইজিচেয়ারে এসে গা এলিয়ে দিয়েছি, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। এই দুপুরে আবার কার কী দরকার পড়ল, বুঝতে পারলুম না। চটিতে পা গলিয়ে বাইরের ঘরে এসে দরজা খুলে দেখি, ড্যানিয়েল দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞেন করলুম, “কী খবর ড্যানিয়েল?”
“আপনার জ্বর হয়েছে চাটার্জিসাব?”
বললুম, “জ্বর নয়, ওই একটু অরুচির মতো হয়েছে, তাই আর এ-বেলা কিছু খাব না ভাবছি।” ড্যানিয়েল বলল, “একেবারে কিছু না-খেয়ে থাকাটা ঠিক হবে না, সাব্। আমি বরং একটা স্যুপ করে আপনার জন্যে পাঠিয়ে দিচ্ছি। খেয়ে দেখুন, ভাল লাগবে। …না না, থিক স্যুপ নয়, ক্লিয়ার স্যুপ। খুব হাল্কা।”
হেসে বললুম, “ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও।”
“আভি ভেজ দুঙ্গা সাব্।” সেলাম ঠুকে ড্যানিয়েল চলে গেল।
তার দু-তিন মিনিট বাদেই বেজে উঠল আমার শোবার ঘরের ফোন।
“হ্যালো।”
ইংরেজিতে প্রশ্ন ভেসে এল, “মিঃ চ্যাটার্জি দেয়ার?”
“স্পিকিং।”
“প্লিজ ডোন্ট আস্ক এনি কোয়েশ্চনস্, জাস্ট লিস্ন টু হোয়াট আই সে। ডোন্ট টেক এনি ফুড অফার্ড বাই এনিওয়ান। নট ইন এ গ্ল্যাস অভ ওয়াটার।”
যিনি ফোন করছিলেন, কথা শেষ করেই তিনি ফোন নামিয়ে রাখলেন। গলাটা চিনতে পারলুম না।
