১১
“আমি তো এখান থেকে চলে যাচ্ছি। বয়েস অনেক হয়েছে, আর বেশিদিন আমি বাঁচবও না। কিন্তু চ্যাটার্জিবাবু, দয়া করে আমার এই একটা অনুরোধ আপনি রাখবেন। বড়কুমারের উপরে আপনাকে একটু নজর রাখতে হবে। অনেক বছর ধরে আমি এই রাজবংশের নিমক খেয়েছি, আমি চাই এরে ভাল হোক্, তো সেইজন্যেই এখন যাবার সময়ে এই কথাটা আপনাকে বলে গেলাম। … না না, শঙ্করনারায়ণের কথাবার্তা আর চালচলন দেখে আপনি ওকে পাগ্লা আদমি ভাববেন না। আপনি বুঝদার লোক, একদিন আপনি সব বুঝবেন, সব জানবেন। সির্ফ থোড়া হুঁশিয়ার থাকুন, আঁখ ঔর কান খুলা রাখুন, বাস্।”
কথাগুলি শিউশরণ ত্রিপাঠীর। আমার আগে এই বিষাণগড় প্যালেসের তিনিই ছিলেন কেয়ারটেকার। চাকরি থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু তৎক্ষণাৎ তিনি বিষাণগড় থেকে বিদায় নেননি, কেয়ারটেকারের কাজটা আমাকে বুঝিয়ে দেবার দরকার ছিল, তাই আমি এখানে না-আসা পর্যন্ত তিনি থেকে যান। যেদিন আমি বিষাণগড়ে পৌঁছই, তার পরদিন সকাল দশটা নাগাদ তিনি এসে চার্জ হ্যান্ডওভার করলেন। যাবতীয় খাতাপত্তর বুঝিয়ে দিলেন। সেইসঙ্গে বিশদভাবে জানালেন যে, আমার কাজটা ঠিক কীরকম হবে। ত্রিপাঠীজির কাছে এটাও জানা গেল যে, আমি একজন সহকারী পাব।
“তবে কিনা তার উপর খুব ডিপেন্ড না-করাই ভাল।”
“কেন?”
ত্রিপাঠীজি হাসলেন। বললেন, “আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট মুরারিপ্রসাদেরই উচিত ছিল সব্সে আগে এসে আপনার সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু সে কি এসেছে?”
“কই, না তো।”
“কেন আসবে? রাজবাড়ির মুনিমজি নারায়ণ ভার্মার সে ছেলে, তাই জানে যে, আপনাকে পরোয়া না-করলেও তার চাকরি যাবার ভয় নেই। এমনিতেও সে বারোটা-একটার আগে কাজে আসে না, তাও বোধহয় দয়া করে আসে। তো ওই ছেলে আপনার কাজে হেল্প করবে, এমন আশা করবেন না চ্যাটার্জিবাবু। নিজে যেটুকু পারবেন, করবেন, বাস্।”
শিউশরণ ত্রিপাঠীর কাছে সেদিন এমন আরও কিছু-কিছু খবর শুনি, যা আমার অস্বস্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। সম্পত্তি থাকলে অশান্তিও থাকবে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। তার উপরে এ তো রাজবাড়ি, যেমন সম্পত্তি তেমন ক্ষমতা নিয়েও এখানে অল্পবিস্তর অশান্তি যে থাকবে, তা আমি ধরেই রেখেছিলুম। কিন্তু ত্রিপাঠীজি সেদিন বিদায় নেবার আগে যে-সব খবর আমাকে শুনিয়ে গেলেন, তা আমার কল্পনাতেও ছিল না।
বললুম, “এ-সব কথা আমাকে বলছেন কেন?”
“দুটো কারণে বলছি। এক, মহারাজ ধূর্জটিনারায়ণ যতদিন বেঁচে ছিলেন, তাঁর এই দ্বিতীয় পক্ষের বউয়ের বাপের বাড়ির লোকরা ততদিন এই বিষাণগড়ে কোনও পাত্তাই পেত না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর এরাই জাঁকিয়ে বসেছে। এরাই এখানে কলকাঠি নাড়ে, এরাই কাউকে ওঠায় কাউকে নামায়, কোন্ ব্যাপারে কী হবে না-হবে তা এরাই ঠিক করে। কিন্তু তাতে যে এ-রাজ্যের মঙ্গল হচ্ছে, তা নয়। …মুশকিল কী হয়েছে জানেন? যেমন অন্য সব নেটিভ স্টেটে, তেমনি এখানেও ইংরেজরা একজন পোলিটিক্যাল অফিসার বসিয়ে রেখেছে তো, সেই রিচার্ড উইলসন লোকটাও হচ্ছে পাজির পা-ঝাড়া, তাকে এরা হাত করেছে, তা নইলে নিশ্চয় পঞ্জাব থেকে এসে এরা এখানকার হর্তা-কর্ম:-বিধাতা হয়ে এইভাবে ছড়ি ঘোরাতে পারত না।”
“মহারাজের শ্বশুরবাড়ি কি পঞ্জাবে?”
“দ্বিতীয় পক্ষের শ্বশুরবাড়ি। ছোটরানি-মা তো এখন সেইখানেই আছেন। …ও হ্যাঁ, একটা কথা আপনাকে জানিয়ে রাখি, আপনি যেন ভুল করে কক্ষনো ওঁকে ছোটরানি-মা বলবেন না। ওটা ওঁর পসন্দ নয়।”
“কেন?”
ত্রিপাঠীজি হেসে বললেন, “তাও বুঝলেন না? উনি রাজার মেয়ে ঠিকই, কিন্তু বংশমর্যাদায় অনেক ছোট, ও-সব ছোটঘরের মেয়েরা কি আর এ-সব রাজবাড়িতে পাটরানি হয়ে ঢুকতে পারে? উনিও এখানে পাটরানি হয়ে আসেননি। তো ছোটরানি-মা বললে সেই কথাটা মনে পড়িয়ে দেওয়া হয় তো, সেটা পসন্দ করেন না। আপনি ওকে রানি-মা’ই বলবেন, নইলে ঝামেলা হবে।”
বললুম, “ঠিক আছে, ঝামেলায় যাব না। কিন্তু ছোটরানি-মা’র ব্যাপারটা না হয় বুঝলুম, বড়রানি-মা কোথায়?”
ঘরের সিলিংয়ের দিকে আঙুল তুলে ত্রিপাঠীজি বললেন, “স্বর্গে। বড়কুমার শঙ্করনারায়ণের বয়েস যখন মাত্র এক বছর, রানি জয়েশ্বরী দেবী তখন মারা যান। ছোটরানি যশোমতীর তখনও ছেলেপুলে হয়নি, কী করেই বা হবে, তার মাত্র দু’মাস আগে তিনি বউ হয়ে এই রাজবাড়িতে এসেছেন, বড়রানির বাচ্চা-ছেলেটাকে তিনি কোলে তুলে নিলেন, আর আমরাও ভাবলুম যে, এক রানি থাকতে যে মহারাজ ধূর্জটিনারায়ণ আবার বিয়ে করেছিলেন, সেটা ভালই করেছিলেন, নইলে এই বাচ্চা তো সির্ফ, ঝি-চাকরের কাছে মানুষ হত, মায়ের আদর তার জুটত না।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ত্রিপাঠীজি। তারপর স্নান হেসে বললেন, “কিন্তু চ্যাটার্জিবাবু, আমরা যা ভাবি, সবসময়েই কি তা হয়? বিয়ের আট মাস বাদে ছোটরানির ভি একঠো লেড়কা হল, আর….
ত্রিপাঠীজির মুখের কথা কেড়ে নিয়ে আমি বললুম, “বড়কুমারের তিনি সৎমা হয়ে গেলেন, এই তো?”
“না না, তা যদি বলি তো ঝুট্ হবে, বাবুজি।” ত্রিপাঠীজি বললেন, “সাথ-সাথ্ তিনি শঙ্করনারায়ণের সৌতেলা-মা হননি। মহারাজ তো তার পরেও কয়েক বছর বেঁচে ছিলেন, অন্তত তার মধ্যে যে হননি, সেটা ঠিক। তো মহারাজ আজ থেকে ছে’ বরস আগে, চল্লিশ সালে মারা গেলেন। শঙ্করনারায়ণের উমর তখন আর কত হবে, করিব দশ কি এগারো। আর ছোটকুমারের উমর তাঁর চেয়ে দেড় কি দো সাল কম। তো তখুন হল মুশকিল। পঞ্জাব থেকে লোক এল। ছোটরানি-মা’র পিতাজি এলেন, দো ভাই এলেন, সেখানকার রাজ-এস্টেটের ম্যানেজার কপুর-সাব এলেন, আর এল কুলদীপ সিং।”
“কপুর-সাব মানে ত্রিবিক্রম কপুর? বিষাণগড়ের দিওয়ান?”
“হ্যাঁ, বাবুজি। খুব ঘটা করে ধূর্জটিনারায়ণের শ্রাশান্তি হল। অনেক দানধ্যান হল, সাতদিন ধরে দরিদ্রনারায়ণের সেবা হল। তারপর সব কাজকাম মিটবার পরে ছোটরানি-মা’র পিতাজি আর ভাইরা একদিন পঞ্জাবে চলেও গেলেন। কিন্তু কপুর-সাব আর ইখান থেকে নড়লেন না, কুলদীপ সিংও না। …বাবুজি, মহারাজের বাবার আমল থেকে বিষাণগড়ের দেওয়ান ছিলেন কৃষ্ণস্বামী আচারিয়া। তিনি ছিলেন সাউথ ইন্ডিয়ার লোক। কাজকর্মে যেমন ওস্তাদ, তেমনি বিবেচক আর বুদ্ধিমান। তা ছাড়া খুব জবরদস্ত মানুষ ছিলেন, কোনও পোলিটিক্যাল অফিসারকেই কখনও পাত্তা দেননি, এমনকি এই রিচার্ড উইলসনকেও না; রাজ্যের তরফে যা কিছু জানাবার, তা একেবারে সরাসরি বড়লাটকে জানাতেন। জানি না, উইলসন-সাহেব সেইজন্যেই তাঁর উপরে খাপ্পা হয়ে ছিলেন কি না। আমরা শুধু দেখলুম যে, মহারাজ মারা যাবার দেড় মাসের মাথায় আচারিয়া-সাহেবের নোকরি গেল, আর সেখানে গ্যাঁট হয়ে বসলেন এই ত্রিবিক্রম কপুর। আর ওই যে কুলদীপ সিংয়ের নাম করলুম, কপুরের সে মস্ত শাকরেদ। অতি নচ্ছার লোক। দু’দিন থাকুন, সবই টের পেয়ে যাবেন।”
আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই আবার সেই একই কথা জিজ্ঞেস করলুম, “আপনি আমাকে এ-সব কথা বলছেন কেন?”
ত্রিপাঠীজি বললেন, “সে তো আপনাকে জানিয়েছি। দুটো কারণে আমার পক্ষে আর চুপ করে থাকা সম্ভব নয়। প্রথম কারণ, আপনাকে সব জানানো আমার কর্তব্য, যাতে আপনি হুঁশিয়ার থাকতে পারেন। দ্বিতীয় কারণ, আপনাকে এটাও আমার জানিয়ে রাখা দরকার যে, এখানে আপনি যা দেখবেন আর যা শুনবেন, তার সবই যে সত্যি, ভুল করেও যেন কক্ষনো তা ভাববেন না। বাবুজি, এই রাজবাড়ির মধ্যে পাপ ঘুষেছে, সেই পাপের চক্করে আপনি ফেঁসে যাবেন না। আপনি দূরে থাকবেন বাবুজি, একবার যদি ফেঁসে যান তো আপনি মারা পড়বেন।”
বললুম, “এ-সব কথা বলতে আপনার ভয় হচ্ছে না?”
শুনে এমনভাবে হেসে উঠলেন ত্রিপাঠীজি যেন আমার কথাটায় তিনি খুব মজা পেয়েছেন। হাসিটা থামবার পরেও তিনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর, আমার মুখের উপর থেকে তাঁর চোখ না-সরিয়ে বললেন, “কামাল্ হ্যায়! চাটার্জিবাবু, অনেকদিন তো ভয়ে-ভয়ে কাটালুম, আর কত ভয় করব? নোকরি থেকে ছুট্টি মিলে গেছ, চক্ষু মুদে চার-বেহারার কান্ধে উঠে গঙ্গাতীরে যাবার ভি সময় এসে গেল। না চাটার্জিবাবু, এক ভগবান ছাড়া দুăা কিসিকো আর আমি এখন ভয় করছি না।”
“মুনিমজির কাছে কাল শুনেছি যে, আপনি ইউ.পি.র লোক, আমাকে কাজ বুঝিয়ে দিয়েই সেখানে চলে যাবেন। সত্যি?”
“হ্যাঁ, বাবুজি, কালই আমি ইলাহাবাদে রওনা হচ্ছি। ইখান থেকে ভোর পাঁচটায় ট্রেন ছাড়ে, সেই ট্রেন ধরে ভিরিন্ডি চলে যাব।”
“যাবার আগে অন্তত এই কথাটা আমাকে বলে যান যে, এখানে কাকে-কাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি।”
“কাউকে না বাবুজি, কাউকে না।” ত্রিপাঠীজি আবার হেসে উঠলেন। তারপর হঠাৎ একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, “এক ওই গঙ্গাধর মিশির বাদ। মিশিরজি খুব ধার্মিক মানুষ বাবুজি, অওর বহোত বহোত ইমানদার। লেকিন দুঃখী মানুষ। একটাই লেড়কা, সেটা মারা পড়ল। যেভাবে মরল, সেটা নিয়েও ভাববার অ ছে। আমার বিশোয়াস…”
বিশ্বাসটা যে কী, তা আর জানা হল না। সিঁড়িতে যদিও জুতোর শব্দ পাইনি, ঠিক এই সময়েই দরজার পর্দা সরিয়ে বছর কুড়ি-বাইশের একটি লোক আমাদের ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, “রাম রাম চাটার্জি-সাব। পিতাজির কাছে শুনলুম যে, আপনি এসে গেছেন।
ত্রিপাঠিজি বললেন, “আরে এসো এসো, মুরারি। …চাটার্জি বাবু, এই হচ্ছে মুরারিপ্রসাদ, আমাদের মুনিমজি নারায়ণ ভার্মার ছেলে। তো মুরারিই আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট। এখন থেকে আপনারা দুজনে মিলে সব কাজকাম চালিয়ে নেবেন।”
কথাটা শেষ করেই ত্রিপাঠীজি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিলেন। দরজা পর্যন্ত এগিয়েছিলেনও, কিন্তু বারান্দায় পা বাড়াবার আগে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনার সঙ্গে আরও কিছু কথা ছিল বাবুজি, অনেক কিছু বলবার ছিল, লেকিন আমার তো এখন আর সময় নেই বাবুজি, কাল ভোরেই চলে যাব, অথচ সব এখনও গোছগাছ করে উঠতে পারিনি। তো ভাবছি একটা কাজ করব। আপনার সুবিধার জন্যে দরকারি কিছু-কিছু কথা একটা কাগজে আমি নোট করে রাখব। আমি নিজে হয়তো আর আসতে পারব না, কিন্তু তাতে কিছু মুশকিল হবে না বাবুজি, আজ রাতেই হোক আর কাল সকালেই হোক, আমার নোকর হরদেও সেই চিরকুটখানা আপনার কাছে ঠিকই পৌঁছে দিয়ে যাবে।” ত্রিপাঠীজি চলে গেলেন। বুঝতে পারলুম, যে-প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল, তৃতীয় ব্যক্তির সামনে তিনি আর তা নিয়ে কিছু বলতে চান না।
তো এ-সবই হল দিন-পনেরো আগের কথা। এর মধ্যে কয়েকটা ঘটনা ঘটে গেছে।
প্রথম ঘটনা, শিউশরণ ত্রিপাঠী তাঁর নোকরের হাত দিয়ে আমার জন্যে কোনও চিরকুট পাঠিয়েছিলেন কি না, তা আমার জানা নেই। যদি পাঠিয়েও থাকেন, সেই চিরকুট আমার কাছে পৌঁছয়নি। যেদিন আমার সঙ্গে তাঁর কথা হয়, তার পরদিন ভোরের ট্রেনেই তিনি ভিরিন্ডি রওনা হয়ে যান, কিন্তু সেই ভোরবেলাতেই সর্সোতিয়ার ধারে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে ডঃ সিদ্দিকি হঠাৎ দেখতে পান যে, প্যালেস রোডের যে-দিকটায় কোনও বাড়িঘর নেই, সেই দিকে, রাস্তা থেকে দশ-বারো গজ দূরে, ঢালু ঘাসজমির উপরে একটি মানুষ উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। কাছে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন, মানুষটি জীবন্ত নয়, তার মাথাটা একেবারে থ্যাতলানো। সে যে শিউশরণ ত্রিপাঠীর নোকর হরদেও, খানিক বাদেই তা জানতে পারা যায়। ডঃ সিদ্দিকির চিৎকারে যারা ছুটে এসেছিল, তাদেরই একজন হরদেওকে শনাক্ত করে। পুলিশের ধারণা এটা বদলা নেওয়ার ঘটনা। হরদেও জুয়া খেলত, বছর খানেক আগে জুয়ার আড্ডায় সে একজনের মাথা ফাটিয়েছিল, ফলে সে গ্রেফতার হয়, কিন্তু ত্রিপাঠীজি তাকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে আনেন। গোটা পঞ্চাশেক টাকা জরিমানা দিয়েই হরদেও যে সে-যাত্রায় রেহাই পেয়ে যায়, সেও নাকি ত্রিপাঠীজির জন্যেই। তবে যার মাথা ফাটিয়েছিল, তার তো একটা আক্রোশ ছিলই। এবারে হরদেওয়ের মাথা ফাটিয়ে সে কিংবা তারই কোনও শাকরেদ সেই পুরনো ঘটনার বদলা নিয়েছে।
দ্বিতীয় ঘটনা, দিন দশ-বারো আগে বড় বিচিত্রভাবে কুমার রূপেন্দ্রনারায়ণ সিংয়ের সঙ্গে পরিচয় হল। বিকেল পাঁচটায় আমার কাজকর্ম সেরে মহেশ্বরের মন্দিরের চাতালে গিয়ে বসেছি, হঠাৎ দেখি, একটা বাচ্চা-কুকুর প্যালেসের দিক থেকে তীরবেগে ছুটে আসছে। কাছে আসতে বুঝলুম, বাচ্চা নয়, কুকুরটা আসলে ড্যাশুন্ড। বয়েস বাড়লেও আকারে এরা বিশেষ বড় হয় না, তাই দূর থেকে দেখলে বাচ্চা বলে ভ্রম হয়। কুকুরের পিছন পিছন হাতে একটা মোটা লাঠি নিয়ে যে ছুটে এল, পনেরো-ষোলো বছর বয়সের সেই ছেলেটিকে অবশ্য চিনতে পারলুম না। বাদামি রঙের কুকুরটা ইতিমধ্যে মন্দিরের বারান্দায় উঠে পড়েছিল। ছেলেটিও বারান্দায় উঠতে যাচ্ছে দেখে তাকে বাধা দিয়ে বললুম, “কী ব্যাপার? কী চাও তুমি?”
ছেলেটি তাতে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, “বাট হু আর ইউ?”
বললুম, “আমি এই প্যালেসের কেয়ারটেকার। এখন বলো তুমি কী চাও।”
“হোয়াই, আই ওয়ান্ট টু কিল্। আই হ্যাভ অলরেডি কিলড থ্রি অভ দেম, অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু ফিনিশ অফ্ দ্য হোল ট্রাইব!”
শুনে ইচ্ছে করছি। যে, ওর হাতের লাঠিটা কেড়ে নিয়ে ওকেই আগাপাশতলা পেটাই, কিন্তু সেই মুহূর্তেই মন্দির থেকে বেরিয়ে এলেন গঙ্গাধর মিশ্র। কী ঘটতে চলেছে, সেটা তিনি আঁচ করেছিলেন নিশ্চয়, তবু গম্ভীর গলায় বললেন, “কী ব্যাপার?”
ছেলেটি বলল, “ড্যাশগুগুলোকে আদর করতে গিয়েছিলুম, কিন্তু ওরা এত পাজি যে, আমাকে আঁচড়ে দিয়েছে। আমি ওদের মেরে ফেলতে চাই। তিনটেকে পিটিয়ে মেরেছি, এখন এটাকেও মারব!”
মিশ্রজি বললেন, “আর এক পা’ও এগিয়ো না! যেখানে দাঁড়িয়ে আছ, ওখান থেকেই ফিরে যাও!”
“যদি না যাই?”
মিশ্রজির চোখ দুটো যেন দপ করে জ্বলে উঠল। কঠিন গলায় তিনি বললেন, “না গেলে কী হবে, সে তুমি ভালই জানো। আগের বারে তুমি এই মন্দিরের চৌহদ্দির মধ্যে গুতি দিয়ে একটা পায়রা মেরেছিলে। সেবার তোমার কী হয়েছিল, ভুলে গেছ?”
ছেলেটি চোখ নামিয়ে নিল। তারপর অস্ফুট গলায় বলল, “ভুলিনি। সেবারে আমার টাইফয়েড হয়েছিল।”
“আর এবারে যদি এই কুকুরটাকে মারো, তা হলে কী হবে সেটাও বলে দিই।” সেই একই রকমের কঠিন গলায় মিশ্রজি বললেন, “মহেশ্বরের অভিশাপে এবারে তা হলে তুমি পাগল হয়ে যাবে।”
শুনে কী যে হল, জানি না, যেমন এসেছিল ঠিক তেমনিভাবেই ছুটতে ছুটতে ছেলেটি আবার প্যালেসের দিয়ে চলে গেল।
মিশ্রজি কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন প্যালেসের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস পেলে বললেন, “চাটার্জিবাবু, এঁকে বোধহয় আপনি চিনলেন না। ইনি আমাদের ছোটকুমার, রূপেন্দ্রনারায়ণ সিং।”
তৃতীয় ঘটনা, মুরারিপ্রসাদ কখন কাজে আসে আর কখন চলে যায়, ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে দিন সাতেক সেদিকে নজর রেখেছিলুম। তাতে দেখা গেল, রোজই সে বারোটা-একটায় এসে হাজিরা দেয়, আর কোনওদিনই সে বিকেল চারটের পরে দফতরে থাকে না। অথচ হাজিরা খাতায় আসা-যাওয়ার সময় লেখে দশটা-পাঁচটা। এই ব্যাপারটা নিয়ে তাকে খুব কড়কে দিয়েছি। বলে দিয়েছি, এখন থেকে সে যদি দশটার সময় দফতরে আসতে না পারে, আর আমার অনুমতি না-নিয়ে পাঁচটার এক মিনিট আগেও দফতর থেকে বেরিয়ে যায়, তা হলে তাকে অ্যাটেনড্যান্স-রেজিস্টারে সই করতে দেব না। এ হল ২২ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। সেইদিনই রাত্তিরে প্যালেসে আমার ডাক পড়ে। ছোটরানি-মা ইতিমধ্যেই পঞ্জাব থেকে ফিরে এসেছিলেন, শুনলুম তিনিই ডেকে পাঠিয়েছেন। বিষাণগড়ে আসার পর যশোমতী দেবীর সঙ্গে সেই আমার প্রথম সাক্ষাৎকার।
প্যালেসের একতলায় কেউ থাকে না। তার একদিকে সুইমিং পুল। সেদিকটায় কারও যাবার হুকুম নেই। অন্যদিকে পরপর ছোটবড় কয়েকটা দফতর। কোনওটা দেওয়ানজির, কোনওটা তাঁর সেক্রেটারির, কোনওটা এস্টেট-ম্যানেজারের। একতলার দুদিক দিয়ে দুটো সিঁড়ি উপরে উঠে গেছে। আমাকে দফতরের দিককার সিঁড়ি দিয়ে উপরে নিয়ে যাওয়া হল। যশোমতী দেবী তাঁর ড্রয়িংরুমে বসে ছিলেন। আমি সেখানে যেতে হেসে বললেন, “সো ইউ আর হিয়ার। তা বিষাণগড় তোমার কেমন লাগছে?”
বললুম, “খুব ভাল লাগছে। তবে কিনা মাত্রই কয়েকদিন হল এসেছি তো, তাই শহরটা এখনও ঘুরে দেখা হয়নি।
যশোমতী দেবীর দ্বিতীয় প্রশ্ন, “কাজকর্ম সব বুঝে নিয়েছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, ত্রিপাঠীজি আমার আসার অপেক্ষায় ছিলেন, তিনি আমাকে সব বুঝিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।”
তৃতীয় প্রশ্নটা একেবারে গুলির মতো ছুটে এল। “মুরারিপ্রসাদের সঙ্গে তোমার কী হয়েছিল?” মুরারিপ্রসাদ যে লোক মোটেই সুবিধের নয়, ত্রিপাঠীজির কথা থেকেই সেটা বুঝতে পেরেছিলুম। তাকে কড়কানোর ব্যাপারটা যে সে সহজভাবে নেবে না, উপরতলায় আমার নামে নালিশ করবে, তাও জানতুম। তবে সেটা যে এত তাড়াতাড়ি রানি-মা’র কানে পৌঁছবে, এতটা আমি কল্পনা করিনি।
প্রশ্ন শুনে আমার বুকের মধ্যে ধক্ করে উঠল। কান ঝাঁ-ঝাঁ করতে লাগল। তবু যথাসম্ভব শান্ত গলায় বললুম, “লোকটি ফাঁকিবাজ। দফতরে তার সাতঘণ্টা কাজ করবার কথা, কিন্তু গত এক হপ্তায় তাকে একটা দিনও তিন-চার ঘণ্টার বেশি কাজ করতে দেখিনি। তাই তাকে একটু কড়কে দিতে হল। এটাও জানিয়ে দিতে হল যে, দশটায় দফতরে না এলে তাকে আমি হাজিরা খাতায় সই করতে দেব না।”
“কাজ করতে ওর কি কোনও অসুবিধে হচ্ছে?”
“যদি হয়, তো স্পষ্ট করে সেটা বলুক। যদি আমার সাধ্যে থাকে, তো অসুবিধেটা আমি মিটিয়ে দেবার চেষ্টা করব। কিন্তু তার জন্যে কাজে ফাঁকি দেবে কেন? রানি-মা, আমি অসুবিধের কথাটা বুঝি, দাবিদাওয়ার কথাটাও বুঝি, সে-সব যে মেটানো দরকার, তাও বুঝি, কিন্তু এই ফাঁকিবাজির ব্যাপারটা একেবারেই পছন্দ করি না।”
রানি-মা হাসলেন। বললেন, “কামাল হ্যায়! তো ঠিক আছে। আর-এক হপ্তা দ্যাখো। আমি ওর বাবাকে সব বলছি। তাতেও যদি না বিধা হয়, তো আমাকে জানিয়ো, ওর বদলে আমি তোমাকে অন্য লোক দেব।…আর হ্যাঁ, একটা কথা তোমাকে বলা হয়নি। তোমার যা কোয়ালিফিকেশন, তাতে ‘কেয়ারটেকার’ উইল নট বি দ্য রাইট কাইন্ড অভ্ ডেজিগনেশন ফর ইউ। তাই দেওয়ানজির সঙ্গে কথা বলে ঠিক করলুম যে, সামনের মাস থেকে পোস্টার নাম আমরা পালটে দেব, অ্যান্ড ইউ উইল বি নোন্ অ্যাজ দ্য প্যালেস সুপারিনটেন্ডেন্ট। সেইসঙ্গে তখাও কিছু বাড়বে। গে এখন তুমি কত পাও?”
“সাড়ে তিনশো।”
“ওটা পাঁচশো হয়ে যাবে। …ওয়েল, ইউ মে গো নাউ।”
কোনওক্রমে একটা ধন্যবাদ জানিয়ে প্রায় বিমূঢ় অবস্থায় ঘর থেকে বেরিয়ে আসছি, হঠাৎ পিছন থেকে রানি-মা আবার ডাকলেন। বললেন, “ও হ্যাঁ, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। … না না, তেমন কিছু নয়, এ ভেরি মাইনর ম্যাটার। রূপকে তুমি দেখেছ তো?”
“ছোট রাজকুমারের কথা বলছেন তো? মাত্র একদিনই তাঁকে দেখেছি, তাও মাত্র কয়েক মিনিটের জন্যে।”
রানি মা আবার খুব সুন্দর হাসলেন। বললেন, “সিলি বয়, হঠাৎ রেগে গিয়ে তিনটে ড্যাশুন্ডকে মেরে ফেলেছে। অবিশ্যি ওরা এমনিতেই মরত। অনেক বয়েস হয়েছিল তো, আর ভুগছিলও খুব। এদিকে রূপও এমনিতে বড় দয়ালু ছেলে, তাই এখন খুব আক্ষেপ করছে।”
ঠিক কী যে যশোমতী দেবী বলতে চান, তা আমি বুঝে উঠতে পারছিলুম না। তাই কুণ্ঠিতভাবে বললুম, “আমায় কিছু করতে হবে?”
“ও নো, ইউ ডোট হ্যাভ টু ডু এনিথিং।” রানি-মা স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “শুধু একটা কথা। তুমি তো মাঝে-মাঝে বাইরে যাও, তা এই রেগে গিয়ে কুকুর মারার ব্যাপার নিয়ে প্যালেসের বাইরে কাউকে কিছু বোলো না। …বাস্, এবারে তুমি যেতে পারো।”
চতুর্থ ঘটনা, কাল ২৭ ফেব্রুয়ারির বিকেলে ডঃ সিদ্দিকির কাছে গিয়েছিলুম। কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলেই রানি-মা আমাকে বলেছিলেন যে, প্যালেস আর্কিটেকচার সম্পর্কে ডঃ সিদ্দিকি একজন অথরিটি, সুতরাং এ-ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস করবার থাকলে তাঁকেই জিজ্ঞেস করা ভাল। তো বিষাণগড় প্যালেসের কয়েকটা খুঁটিনাটি বিষয়ে আমার জানবার ছিল। সেইজন্যেই তাঁর কাছে যাওয়া। অমায়িক পণ্ডিত মানুষ, আলাপ করে খুশি হওয়া গেল। তাঁরই ওখানে পরিচয় হল এক বাঙালি ভদ্রলোকের সঙ্গে। নাম শুনলুম চারু ভাদুড়ি। বিলিতি বিমা কোম্পানি কাম্বারল্যান্ড ইনসিওরেন্সের জাল তো ভারতবর্ষেও মস্ত করে ছড়ানো, ইনি তাদের একজন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। বছরখানেক হল বিষাণগড় অফিসের চার্জে আছেন। কথায় কথায় বললেন, বিষাণগড় শহরটা তো ভালই, তবে কিনা পরপর দু’মাসে দুটো লোক খুন হয়ে গেল, আগে এখানে এই ধরনের ঘটনার কথা ভাবাও যেত না।
ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “কী আশ্চর্য ব্যাপার দেখুন, মানে ওই সেকেন্ড মার্ডারটার কথা বলছি, এত লোক থাকতে শেষ পর্যন্ত লাশটা কিনা আমারই চোখে পড়ল!”
চারু ভাদুড়ি বললেন, “তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার, পুলিশ যাকে খুনি বলে এক্ষেত্রে সন্দেহ করছে, অন্তত সন্দেহ করছে বলে চতুর্দিকে বলে বেড়াচ্ছে, বরাবর সেই লোকটা কিন্তু এখানেই ছিল, অথচ পুলিশ তাকে তখন অ্যারেস্ট করেনি, আর এখন নাকি তাকে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।”
বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো?”
ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কী করে বলব। তবে কিনা আপনি এখানে নতুন এসেছেন তো, তাই গায়ে পড়ে একটা পরামর্শ দিচ্ছি। একটু সাবধানে থাকুন। আর যা-ই করুন, বেশি রাত করে … মানে পথে যখন লোকজন খুব কম, তখন … রাস্তাঘাটে পারতপক্ষে বেরুবেন না।”
