বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১০

অরুণ সান্যাল বললেন, “সে কী, তুমি সেখানে একলা গিয়েছিলে?”

সরস্বতী বলল, “শুধু যে গিয়েছিলুম, তা নয়, পুরো তিন-তিনটে মাস সেখানে ছিলুম। একেবারে একলাই যে গিয়েছিলুম, তা নয়, ভুপিন্দর সিং বলে আমার এক ছাত্র আমার সঙ্গে ছিল। কিন্তু বেশিদিন তার থাকা হয়নি। বালি আর পাথর ঘেঁটে ঘেঁটে সবে তখন লোকেশান খোঁজার কাজ চলছে, সেইসময়ে সে জ্বরে পড়ে। জঙ্গলের কিছু-কিছু লোকের সঙ্গে ইতিমধ্যে ভাব জমিয়ে নিয়েছিলুম, তাদের দু-একজন সবসময়ে আমার সঙ্গে থাকত। তারা বলল, হাওয়া লেগে জ্বর হয়েছে। কীসের হাওয়া, সেটা অবশ্য বোঝা গেল না, তবে জ্বর দেখলুম ছাড়ছে না। সঙ্গে কিছু ওষুধ-বিষুধ ছিল, তাতে কাজ না-হওয়ায় দিন চার-পাঁচ বাদে ওই লোকগুলোকেই সঙ্গে দিয়ে তাকে শহরে পাঠিয়ে দিই। তারপর থেকেই আমি একা।”

কৌশিক বলল, “ওরেব্বাবা, এ তো আমি ভাবতেই পারি না।”

সরস্বতী বলল, “আমিই কি পারতুম? কিন্তু তখন আমাকে কাজের নেশায় পেয়ে বসেছে। ক্রমাগত মনে হচ্ছে এইবারে নিশ্চয়ই ঠিক-জায়গাটার খোঁজ পেয়ে যাব। তো সেই সময়ে এই ট্রাইবালরা যে আমাকে কী সাহায্য করেছিল, সে আমি বুঝিয়ে বলতে পারব না। দিনের পর দিন তখন আমি ওদের সঙ্গে একই খাবার খেয়েছি, এমন কী একদিন একটা দাঁতাল শুয়োর আমার তাঁবুর উপরে এসে হামলা করার পর থেকে আমি রাতও কাটিয়েছি ওদের ঘরে। শুধু তা-ই নয়, ওদেরই একটা ছেলে একদিন একেবারে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আমাকে বাঁচিয়ে দেয়। শুকিয়ে যাওয়া একটা নদীর বালির মধ্যে সোনার গুঁড়ো চিকচিক করছে দেখে আমি ছুটে একমুঠো বালি তুলে আনতে গিয়েছিলুম। হঠাৎ দেখি, ছেলেটা আমার হাত টেনে ধরেছে। কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই সে তার হাতের লাঠিটা ছুড়ে দিল সেই বালির উপরে, আর দেখতে-দেখতে লাঠিটা সেই বালির মধ্যে তলিয়ে গেল। চোরাবালি! জংলি ওই ছেলেটা যদি না সেদিন টেনে ধরত আমাকে, তা হলে আর দেখতে হত না, চোরাবালির মধ্যেই সেদিন আমি ডুবে মরতুম!”

আমি বললুম, “ডিপজিটটা কোথায়, তার হদিশ কি শেষ পর্যন্ত পেয়েছ?”

সরস্বতী বলল, “একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত হয়ে সে-কথা বলতে পারব না, তবে আমার ধারণা, পেয়েছি। কিন্তু কোথায় পেয়েছি, আমার পেপারে তার উল্লেখ করিনি, সেখানে সাধারণভাবে মধ্যপ্রদেশের নাম করেছি মাত্র। আর সরকারি কর্তাদেরও যে সেই জায়গাটার নাম আমি জানাইনি, তা তো বললুমই। কিন্তু তার ফল কী হয়েছে জানেন?”

“কী হয়েছে?”

“আসলে লোকে ‘নটার কথা চেপে গিয়ে সরকারকে তো আমি যেমন-যেমন মনে এল তেমন-তেমন গোটা দু২ জায়গার নাম জানিয়েছিলুম, কন্ট্রাকটর সেই জায়গাগুলোকে সাফসুতরো করে দেবার পরে সেখানে কাজও শুরু হয়েছিল, কিন্তু মাত্র মাসখানেক কাজ চলবার পরেই ঘটল বিপদ। যাদের ওখান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, দল বেঁধে সেই আদিবাসীরা আবার হঠাৎ একদিন ফিরে এল সেখানে। টাঙ্গি, বর্শা, তীরধনুক নিয়ে তারা সার্ভে-ক্যাম্পের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইচ্ছে করলে সেই সার্ভে টিমের প্রত্যেকটি লোকের মাথা তারা সেদিন টাঙ্গির ঘায়ে দু’ফাঁক করে দিতে পারত। অথচ, আশ্চর্য ব্যাপার, একটা লোককেও তারা প্রাণে মারেনি। স্রেফ তাদের তাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের জায়গাজমি তারা ফের দখল করে নেয়। এর পরেও যদি শহর থেকে পুলিশ পাঠিয়ে, গুলি চালিয়ে ট্রাইবালদের সেখান থেকে আবার নতুন করে উচ্ছেদ করা হত, তো তাতেও আমি অবাক হতুম না। কিন্তু খবরটা ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল তো; তা ছাড়া ট্রাইবালদের মধ্যে যারা কাজ করে, এইরকম দু’তিনটে প্রতিষ্ঠানও এই উচ্ছেদের ব্যাপারটা নিয়ে ভোপালে আর ইন্দোরে বার করেছিল প্রতিবাদ-মিছিল। তার উপরে আবার ঝাড়খণ্ড পার্টির ক্ষমতা এ-সব এলাকায় দিনে-দিনে বাড়ছিল, তাই মধ্যপ্রদেশ সরকারও সম্ভবত ভর পেয়ে গিয়েছিল যে, ব্যাপারটা নিয়ে যদি খুব বেশি শোরগোল হয়, তো পরিণামে তাদের ঝঞ্ঝাট আরও বাড়বে বই কমবে না। ফলে তারা আর পুলিশ পাঠাল না, আর সার্ভে-টিমের কাজকর্মও তার ফলে বন্ধ হয়ে গেল।”

কৌশিককে ডেকে মালতী ইতিমধ্যে তার হাত দিয়ে আর এক রাউন্ড চা পাঠিয়ে দিয়েছিল। আমি আমার পেয়ালায় একটা চুমুক দিয়ে বললুম, “অর্থাৎ স্বর্ণসন্ধান নিয়ে আমরা খবরের কাগজের লোকেরা যে নাটক জমিয়ে দিয়েছিলুম, সেইখানেই তার উপরে যবনিকা পড়ে গেল, কেমন?”

বিষণ্ণ হেসে সরস্বতী বলল, “তা আর পড়ল কই। যে-লোকেশানের কথা জানিয়েছিলুম, সারা জীবন খোঁজ চালালেও সেখানে কোনও ডিপজিটের হদিস নিশ্চয় মিলত না। সেক্ষেত্রে কাজ চলেছিল মাত্র মাসখানেক কি বড়জোর মাস দেড়েক। কিন্তু সরকারকে তো বলতে হবে যে, তাদের তরফে চেষ্টার কোনও ত্রুটি হয়নি। ফলে, ট্রাইবালদের যে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, আর তারা খেপে যাওয়ার ফলেই যে অনুসন্ধানের কাজটা ঠিকমতো চালানো হয়নি, এ সব অস্বস্তিকর কথা চেপে গিয়ে একটা রিপোর্ট ঠিকই খাড়া করা হল। তাতে কী বলা হল জানেন?”

“কী বলা হল?”

“বলা হল যে, ডঃ সরস্বতী ভট্টাচার্য যে লোকেশানের কথা বলেছিলেন, সেখানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালিয়েও, বৃহৎ ডিপোজিট তো দূরের কথা, কোনও ছোটখাটো ডিপজিটেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি।”

বললুম, “না-পাওয়াই স্বাভাবিক। কেননা, আসল-লোকেশানের কথাটা তুমি চেপে গিয়েছিলে।” সরস্বতী বলল, “সেটা ঠিক। কিন্তু অনুসন্ধানটা ব্যাপকই বা হল কোথায়? ওটা একেবারেই মিথ্যে কথা। কাজটা তো করা হয়েছিল নেহাতই দায়সারাভাবে, তা হাঙ্গামা বেধে গিয়েছিল বলে মাঝপথেই সে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তা নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না, আসলে রিপোর্টের উপসংহারে যা বলা হল, সেটাই হচ্ছে মারাত্মক। সেখানে বলা হল যে, সরস্বতী ভট্টাচার্য তাঁর পেপারে যে অভিমত প্ৰকাশ করেছিলেন, তা ততটা তথ্যনির্ভর নয়, যতটা অনুমানভিত্তিক। বস্তুত এমন সন্দেহ অস্বাভাবিক নয় যে, ভূবিজ্ঞানী হিসেবে তিনি প্রত্যাশিত দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে পারেননি; যথেষ্ট পরিমাণ তথ্য-প্ৰমাণ না-থাকা সত্ত্বেও, স্রেফ হাততালি পাবার অস্বাস্থ্যকর আগ্রহে তিনি চাঞ্চল্যকর একটা অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।”

কৌশিক বলল, “মাই গড, ই’ট্স এ টেরিব্‌ল ইনডায়মেন্ট! এই রিপোর্টের কথা জানাজানি হলে তো আপনার ভীষণ দুর্নাম হবে। চাই কী, চাকরি নিয়েও টানাটানি পড়তে পারে।”

“দুর্নাম তো হয়েছেই।” সরস্বতী বলল, “আর অধ্যাপক মহলে সবাই যে আমার শুভার্থী, তাও তো নয়, সুতরাং চাকরি ধরে টান মারবারও একটা চেষ্টা হয়েছিল বই কী। তবে তাতে বিশেষ সুবিধে হয়নি। এই একটা সুবুদ্ধির কাজ করেছিলুম যে, আমাদের ডিপার্টমেন্টের যিনি কর্তা, সরকারি আমলারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করা মাত্র সমস্ত কথা তাঁকে আমি জানিয়ে রেখেছিলুম। এত তাঁকে বলেছিলুম যে, একে তো এঁদের প্রোজেক্টটা একেবারে রদ্দি, তার উপরে আবার ট্রাইবালদের রিহ্যাবিলিটেশানের ব্যবস্থাও এঁরা করছেন না, সুতরাং যা এঁরা করতে চলেছেন আর যেভাবে সেটা করা হবে, তাতে আমার বিন্দুমাত্র সায় নেই, আসল তথ্য এঁদের কাছে আমি চেপে যাব। সুতরাং সেদিক থেকে চিন্তার কিছু নেই।”

বললুম, “যাক, চাকরিটা তা হলে যাচ্ছে না?”

সরস্বতী হেসে বলল, “চাকরি যাওয়া অত সহজ নাকি? সব শুনে আমাদের ডিপার্টমেন্টাল হেড অবশ্য কোনও মন্তব্য করেননি, বাট আই অ্যাম প্রিটি শিওর, হি ইজ অন মাই সাইড। সো আর মাই স্টুডেন্টস। আমাকে যদি চাকরি ছাড়তে হয় তো তারা লাগাতার ধর্মঘট বাধিয়ে দেবে। না না, ও নিয়ে আপনারা ভাববেন না। তবে হ্যাঁ, একটা দাগ তো পড়েই গেল। যাঁরা আমাকে চেনেন, তাঁদের নিয়ে অবশ্য ভাবনা নেই, তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারছেন যে, কিছু-একটা রহস্য এর মধ্যে আছে, তথ্য জোগাড় না-করে কোনও সিদ্ধান্তে আসবার মতো কাঁচা কাজ আমি করি না। কিন্তু সবাই তো আর আমাকে চেনেন না, তাঁরা নিশ্চয় ভাবছেন যে, সরস্বতী ভট্টাচার্য ইজ এ সেনসেশান-মংগার।

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ সব শুনে যাচ্ছিলেন, একটা কথাও বলেননি। এবারে তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “সরস্বতী মোটামুটি সমস্ত কথাই জানিয়েছে, কিরণবাবু। যদি আরও কিছু আপনার জানবার থাকে তো ওকে জিজ্ঞেস করুন।”

বললুম, “আপাতত আর কিছু জানবার নেই।”

“এবারে তা হলে আমার কথা শুনুন। কাজের সূত্রে মাঝে মাঝেই তো আমি দিল্লি যাই, তা বছর দুয়েক আগে দিল্লিতে যখন ভূতাত্ত্বিকদের ওই সম্মেলন হয়, আমিও তখন দিল্লিতেই ছিলুম। সরস্বতীকে তখনও আমি চিনতুম না। কিন্তু সোনার ডিপজিট নিয়ে সেই সম্মেলনে ও যা বলেছিল, তাই নিয়ে খুব হইচই পড়ে গিয়েছিল তো, তা কাগজে তার বিবরণ পড়ে আমি একটু ঘাবড়ে যাই। ঘাবড়ে যাবার কারণ ছিল। প্রথমেই যা আমার মনে হয়েছিল, তা এই যে, মেয়েটা খুব বুদ্ধির কাজ করেনি। কেননা, ওর পেপারে ও যে-রকম জোরগলায় বলেছে, মধ্যপ্রদেশের মাটির তলায় সোনার একটা বিশাল ডিপজিটের সন্ধান পাওয়া যাবেই, তাতে অনেকেরই এই সন্দেহ হবে যে, ঠিক কোন্ জায়গায় সেই ডিপজিটটা রয়েছে, তাও নিশ্চয় ও জানে। যাদের এই সন্দেহ হবে, তাদের সকলেই যে ভদ্রলোক, এমনটা তো আর আশা করা যায় না, কিছু-না-কিছু গুণ্ডা-বদমাসও তাদের মধ্যে থাকতেই পারে। তা যদি থাকে, সরস্বতী তা হলে নিরাপদ নয়। বাস, এই কথাটা মনে হওয়ামাত্র আমি সরস্বতীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি ওকে সাবধান করে দিতে চেয়েছিলুম।”

জিজ্ঞেস করলুম, “তা তো হল, কিন্তু যোগাযোগটা করলেন কীভাবে?”

“ভেবেছিলুম টেলিফোন ডিরেক্টরিতে নামটা পাওয়া যাবে। কিন্তু তা পাওয়া গেল না। তাতে অবশ্য হতাশ হইনি। তার কারণ, কাগজ পড়ে জেনেছিলুম যে, ও দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। সেখানে ফোন করে ওর বাড়ির ঠিকানা জোগাড় করি। ঠিকানাটা নিউ রাজিন্দরনগরের। বিকেল নাগাদ যখন সেখানে যাই, সরস্বতী তখন বাড়িতে ছিল না। যে ভদ্রমহিলা এসে আই-হোলে আমাকে বেশ ভাল করে দেখে নিয়ে তারপর দরজা খুলে দেন, তিনিই জানান যে, আমি একটুক্ষণ বসলে ভাল হয়, টুকিটাকি দু-একটা জিনিস কিনতে সরস্বতী একটু বেরিয়েছে, কিন্তু দূরে কোথাও যায়নি, মিনিট দশ-পনেরোর মধ্যেই ফিরে আসবে। ভদ্রমহিলার বয়স মনে হল বছর পঞ্চাশেক…

সরস্বতী বাধা দিয়ে বলল, “মায়ের জন্ম ১৯৪১ সালে, তার মানে এখনও… অর্থাৎ ১৯৮৯ সালেও… তাঁর বয়স পঞ্চাশ পূর্ণ হয়নি। আর আজ থেকে দু’বছর আগেই কিনা তাঁকে আপনার পঞ্চাশ বছরের বুড়ি বলে মনে হয়েছিল? দাঁড়ান, ফিরে গিয়ে মা’কে সব বলছি।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ওরে বাবা, তোরও তো একদিন পঞ্চাশ বছর বয়েস হবে। তখন বুঝবি যে, পঞ্চাশেই মানুষ বুড়িয়ে যায় না। তা ছাড়া আমি তো পঞ্চাশ বছর বলিওনি, বলেছি বছর-পঞ্চাশেক। তার মানে বাহান্নও হতে পারে, পঁয়তাল্লিশও হতে পারে।

অরুণ সান্যাল বললেন, “অবজেক্‌শান ওভাররুলড। বড়দা, ইউ প্লিজ প্রসিড।”

ভাদুড়িমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভদ্রমহিলা যে কে, সে তো সরস্বতীর কথা থেকেই আপনি বুঝতে পেরেছেন কিরণবাবু। আমারও কেমন যেন চেনা-চেনা লাগছিল, কিন্তু ঠিক প্লেস করে উঠতে পারছিলুম না। তো সরস্বতীর জন্যে ড্রইংরুমে বসে অপেক্ষা করছি, এমন সময় ভদ্রমহিলা ফের ঘরে ঢুকে বললেন, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করছি, কিছু মনে করবেন না, আপনি কি কখনও বিষাণগড়ে ছিলেন?’ বাস্, আর কিছু বলতে হল না, ওই একটা কথাই যেন বছর পঞ্চাশ বছর বয়সের এক মহিলার মুখের উপরে সুপার ইমপোজ করে বসিয়ে দিল একটা পাঁচ-বছরের বাচ্চা-মেয়ের মুখ। আর তক্ষুনি বুঝতে পারলুম যে, কেন এঁকে এত চেনা-চেনা মনে হচ্ছিল। বললুম, ‘তুমি…তুমি কি লছমি?’ … কিরণবাবু, জীবনে কত বিচিত্র ঘটনাই যে ঘটে। সেই সাতচল্লিশে যাকে শেষ দেখেছি, সাতাশি সালে যে এমনভাবে তার সঙ্গে আবার দেখা হয়ে যাবে, এ তো স্বপ্নেও ভাবা যায় না!”

সরস্বতী বলল, “বড়দা, আপনার চেয়ে আমার মায়ের কৃতিত্ব কিন্তু বেশি। তিনিই প্রথম চিনেছিলেন।”

আমি বললুম, “ঠিক কথা। নইলে কি লছমি ওইভাবে বিষাণগড়ের উল্লেখ করত?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বিলক্ষণ। আমার তো বিশ্বাস আই-হোল দিয়ে আমাকে দেখবামাত্রই লছমি চিনতে পেরেছিল। তা নইলে সে দরজা খুলে দিত কি না, তাতে সন্দেহ আছে। দিল্লিতে আর আজকাল কেউ হুটপাট কাউকে দরজা খুলে দেয় না।”

মালতী ইতিমধ্যে ঘরে এসে ঢুকেছিল। লছমির সঙ্গে দিল্লিতে দেখা হয়ে যাওয়ার গল্পটা সে ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে আগেই শুনেছিল নিশ্চয়, এবারে সরস্বতীর দিকে তাকিয়ে বলল, “সে তুমি যা-ই বলো, চেনার ব্যাপারে কিন্তু দাদাকেই আমি বেশি মার্কস দেব।”

সরস্বতী বলল, “কেন মালতীদি?”

“এ তো খুবই সহজ কথা, তাও বুঝতে পারছ না?” মালতী বলল, “লছমি যখন বিষাণগড়ে আমার দাদাকে প্রথম দেখেছিল, দাদার বয়েস তখন অলরেডি চব্বিশ-পঁচিশ, যে-বয়েসের পরে মানুষের মুখের আদল খুব-একটা পালটায় না। কিন্তু দাদা যখন লছমিকে প্রথম দেখেছিল, সে তখন নেহাত পাঁচ-বছরের একটা পুঁচকে মেয়ে। তার মুখের আদল তারপরে বিস্তর পালটেছে, আর সেটাই স্বাভাবিক। তবু যে দিল্লিতে তাকে দেখে দাদার চেনা-চেনা মনে হয়েছিল, এ কি কম কথা?”

অরুণ সান্যাল বললেন, “সত্যিই তো, চল্লিশ বছর বাদে দেখা, পাঁচ বছরের সেই মেয়েটার মুখ ইতিমধ্যে কত পালটে গেছে, তবু কেন অমন কথা মনে হচ্ছিল আপনার?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আর কিছু নয়, ওর চোখ দেখে। কী জানো, যাদের চোখের তারা খুব নীল হয়, তাদের চুল সাধারণত ঘন কালো হয় না। লছমিকে সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বলেই ধরতে হবে। ওর চোখের তারা অতি আশ্চর্য রকমের নীল, অথচ মাথার চুল মিশমিশে কালো। তা ছাড়া ওর থুতনির নীচে একটা কাটা-দাগ ছিল। সেটাও দেখলুম মিলিয়ে যায়নি। লছমির বয়স যখন তিন বছর, তখন নাকি মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে পড়ে যায়। বিষাণগড়ে থাকতে ওর বাবার কাছে তা-ই শুনেছিলুম।”

সরস্বতী বলল, “তার মানে তো আমার দাদামশাইয়ের কাছে। তাঁকে আপনি চিনতেন?”

“চিনতুম বই কী। কিরণবাবু অবশ্য তাঁকে দেখেননি, উনি গিয়ে বিষাণগড়ের চাকরিতে জয়েন করার মাসখানেক আগেই পুরন্দর মিশ্র মারা যান। তবে আমি তো আরও কিছুদিন আগে থেকেই সেখানে ছিলুম, তাই যেমন আরও অনেকের সঙ্গে, তেমনি তোর দাদামশাইয়ের সঙ্গেও আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। বিকেলের দিকে মাঝে-মাঝে উনি সর্সোতিয়ার ধারে বেড়াতে আসতেন, সেইখানেই ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়। …ও হ্যাঁ, ওই নদীর নামেই যে তোর নাম, সেটা জানিস তো?”

প্রশ্নটা যেন শুনতেই পায়নি, এইভাবে অন্য কথায় চলে গেল সরস্বতী। জিজ্ঞেস করল, “বড়দা, আপনি তো তাঁকে দেখেছেন, কেমন মানুষ ছিলেন আমার দাদামশাই?”

গাড়িতে করে এখানে আসবার সময় আমাকেও এই প্রশ্নটা সরস্বতী করেছিল। কিন্তু আমি তো তাঁকে তুমি না। তাই স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারিনি। বিষাণগড়ে থাকতে পুরন্দর মিশ্র সম্পর্কে অন্যের কাছে যা শুনেছি, শুধু সেইটুকু ওকে বলেছিলুম।

কিন্তু ভাদুড়িমশাই তাঁকে চিনতেন। তাঁর মতামতের মূল্যও তাই অনেক বেশি।

সরস্বতীর প্রশ্নের জবাব কিন্তু তক্ষুনি তিনি দিলেন না। একটুক্ষণ চুপ করে থেকে পাল্‌টা তাকেই জিজ্ঞেস করলেন, “কথাটা তুই জানতে চাইছিস কেন?”

“তাঁর সম্পর্কে নানাজনের কাছে নানা কথা শুনেছি। কেউ বলে তিনি পায়জামা-পাঞ্জাবি-পরা সন্ন্যাসী ছিলেন, কেউ বলে তিনি বাউন্ডুলে-গোছের মানুষ ছিলেন, কেউ বলে সাংসারিক দায়-দায়িত্বের কোনও ধারই তিনি ধারতেন না!”

“এ-সব কথা কোথায় শুনলি?”

“বিষাণগড়ে। আপনি হয়তো জানেন না, বিষাণগড়ে আমাদের একটা বাড়ি আছে। মারা যাবার বছর দুয়েক আগে গঙ্গাধর মিশ্র অর্থাৎ আমার দাদামশাইয়ের বাবাই সেটা তৈরি করান। বাড়িটা তিনি তাঁর পুত্রবধূ অর্থাৎ আমার দিদিমার নামে লিখে দিয়ে গিয়েছিলেন। তো আমার দিদিমাও যে এখন আমারই কাছে আছেন, তা আপনি জানেন। বাড়িটা তিনি ভাড়া দেননি, এখনও মাঝে-মাঝে বিষাণগড়ে গিয়ে দু’চার সপ্তাহ সেখানে কাটিয়ে আসেন। আমরাও যাই। তা সেই বিষাণগড়েই দাদুর সম্পর্কে এ-সব কথা শুনেছি।”

“এত সব শুনেছিস আর বিষাণগড়ের মাইল পনরো দক্ষিণের এক জঙ্গলে তোর দাদুর যে একটি রক্ষিতা ছিল, এই রসালো গল্পটাই কেউ তোকে শোনায়নি?”

শুনে হোহো করে হেসে উঠল সরস্বতী। তারপর হাসি থামিয়ে বলল, “ওহ বড়দা, ইউ আর দ্য লিমিট! প্লিজ মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ! … রক্ষিতা নয়, প্রেমিকা। তো সেই প্রেমিকার কথা দিদিমার কাছেও শুনেছি। দাদুই তাঁকে খেপাবার জন্যে বলতেন।”

রান্নাঘর থেকে মালতী মাঝে-মাঝে ড্রইংরুমে এসে আমাদের কথা শুনছিল। এবারে সে ঘরে ঢুকে বলল, “কিরণদা, আপনি আর সরস্বতী এখানে খেয়ে যেতে পারেন। রান্না হয়ে গেছে।”

হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “ওরেব্বাবা, ন’টা বাজে। না না, বাড়িতে বলে আসিনি, আর যদি দেরি করি তো বাসন্তী হাঙ্গামা করবে। …সরস্বতী, তুমি খেয়ে নিতে পারো, তবে আমি খাচ্ছি না।

সরস্বতী বলল, “আমার পক্ষেও খাওয়া সম্ভব নয়। কাল সকালে চলে যাচ্ছি, আজ যদি বাইরে খেয়ে ফিরি তো আমার বড়-জা ভীষণ চটে যাবে। দাঁড়ান ভাইয়া, আমিও আপনার সঙ্গে উঠব। কিন্তু তার আগে বড়দা’র কথাটা শুনে যাই। …কই বড়দা, আপনি তো কিছু বলছেন না?”

ভাদুড়িমশাইও উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “আমি আর কী বলব। আপাতত শুধু এইটুকুই বলতে পারি যে, তোর দাদামশাইকে সবাই খুব খেয়ালি মানুষ মনে করত। কিন্তু সেটা যে ঠিক কথা, অর্থাৎ পুরন্দর মিশ্র যে খেয়ালি প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, আমার তা মনে হয় না।”

অরুণ সান্যাল নীচে নামতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ মানুষ, আপাতত তাঁর চেম্বারে বসাও বন্ধ, তাই তাঁকে নামতে দেওয়া হল না। অন্যেরা সবাই আমাদের বিদায় জানতে নীচে নেমে এলেন। যাবার পথে সরস্বতীকে পার্ক সার্কাসে নামিয়ে দিয়ে যাব। চাবি ঘুরিয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিতে যাচ্ছি, এমন সময় জানলার কাছে মুখ এনে ভাদুড়িমশাই সরস্বতীকে বললেন, “রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের নাম শুনেছিস?”

“না তো।”

“তা যদি শুনতি, তা হলে হয়তো খানিকটা অন্তত বুঝতে পারতি যে, তোর দাদু কেমন মানুষ ছিলেন। কিন্তু আজ আর এ নিয়ে কিছু বলছি না। সামনের মাসের গোড়ার দিকে একবার দিল্লি যাবার কথা আছে। তখন বলব।”

গাড়ি ছেড়ে দিলুম। বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে দশটা।

স্টোনম্যানের কথাটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলুম। কাল রাতে তবু আবার সেই ভয়ংকর স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেল। রাত তখন তিনটে। তারপর যে আবার কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, খেয়াল নেই। ঘুম ভাঙতে দেখি, সাড়ে সাতটা।

বাসন্তী বলল, “আজ আর বাজারে যাবার দরকার নেই। মাছ আর আনাজ যা আছে, কাল পর্যন্ত চালিয়ে নিতে পারব। কিন্তু একবার বাইরে যাও তো, সকাল থেকেই একটা গোলমাল শুনতে পাচ্ছি, কী হয়েছে দেখে এসো।”

গোলমালটা আমিও শুনতে পাচ্ছিলুম। কিন্তু সেটার কারণ বুঝবার জন্যে আর বাইরে যেতে হল না। সদানন্দবাবু এসে বললেন, “ভীষণ ব্যাপার মশাই!”

“কী হয়েছে?”

“আবার খুন! আবার সেই ফুটপাথের উপরে!”

“কিন্তু কোথায়? মানে কোন্ এলাকায়?”

সদানন্দবাবুর মুখে যেন কথাই সরছিল না। ধপ করে তিনি একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপর কপালের ঘাম মুছে অস্ফুট গলায় বললেন, “একেবারে আমাদের বাড়ির পাশে। শেয়ালদা ফ্লাইওভারের তলায়। উঃ, মাথাটা একেবারে থেতলে দিয়েছে!”

“সেই জুন মাসে শুরু হয়েছে, তার পরে একটা মাস বাদ গেল না। এক জুলাই মাসে তিন-তিনটে লোক মরেছে, আর সেপ্টেম্বরে দু’জন। তার মানে গত জুন থেকে এই নভেম্বরের মধ্যে মোট ন’জন লোক এই একই ভাবে মারা পড়ল। তার মধ্যে আবার পাঁচটা খুনই হল আমাদের শেয়ালদা-পাড়ায়। ভাবা যায়?”

সদানন্দবাবু যাও-বা বসে ছিলেন এতক্ষণ, আমার শেষ কথাটা শুনে চেয়ারের মধ্যেই এলিয়ে পড়লেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *