বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

পাঠক-পাঠিকারা বোধহয় বুঝতে পেরেছেন যে, মাঝে-মাঝেই যেমন আমি এই সময়কার কথা তাঁদের বলব, তেমন আবার মাঝে-মাঝেই ফিরে যাব সেই ১৯৪৬ সালের কথায়। যেতেই হবে। কেন না, এই সময়ের সঙ্গে যেমন আমার স্বপ্নের একটা স্পষ্ট যোগসম্পর্ক রয়েছে, ঠিক তেমনই এখন যা ঘটছে আর তখন যা ঘটেছিল, তার মধ্যেও একটা যোগসূত্র হয়তো থাকতে পারে। সত্যিই আছে কি না, আমার পক্ষে তা বলা সম্ভব নয়। ভাদুড়িমশাই থাকলে হয়তো বলতে পারতেন, কিন্তু শ্যামনিবাসের হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের পরে সেই যে তিনি কলকাতা ছেড়েছেন, তারপরে যদিও বেশ কয়েক মাস কেটে গেল, ইতিমধ্যে তিনি আর কলকাতায় আসেননি। দিন কয়েক আগে কৌশিককে ফোন করেছিলুম, সে বলল, মামাবাবু এখন কী একটা কিডন্যাপিংয়ের কেস নিয়ে খুব ব্যস্ত, খুব শিগগির তাঁর আর কলকাতা আসবার আশা নেই।

এখন নভেম্বর মাস। গতমাসে বাসন্তী আর পারুল পুরী থেকে বেড়িয়ে এল। আমার যাওয়া হল না। বাসন্তী অনেক করে বলেছিল, কিন্তু কাজের তখন এমন চাপ যে, কলকাতা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে পারিনি। পরে ওদের কাছে গল্প শুনে মনে হল যে, দূর ছাই, কাজকর্ম শিকেয় তুলে রেখে আমিও ওদের সঙ্গে চলে গেলেই পারতুম। শুধু যে পুরীতেই ওরা ছিল, তা নয়। ওরই মধ্যে ভুবনেশ্বর, কোনারক আর চিল্কা থেকেও ঘুরে এসেছে। পুরীতেও ওরা আনন্দ নেহাত কম করেনি। সবচেয়ে বড় আনন্দ ঢেউয়ের মধ্যে ঝাঁপাঝাঁপি করা। তোসালি স্যান্ডস্ তো পুরীর খুব কাছেই। সেখানেও একদিন গিয়েছিল। পারুলের গল্প তো শেষই হতে চায় না। “জানো বাবা, তোমার যখন পাঁচ বছর বয়েস, আর বড়পিসির বয়েস সাত, তখন তোমরা দাদু আর দিদার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে সমুদ্দুরের ধারে যে বাড়িটায় ছিলে, সেটাও এবারে দেখে এলুম।”

“বলিস কী, বাড়িটার নাম কী বল তো?”

“সিন্ধু-বেলা। তোমার কাছে কত গল্প শুনেছি তো, নামটা ভুলে যাইনি। তা ঠিক করেছিলুম যে, এবারে পুরী গিয়েই বাড়িটা খুঁজে বার করব।”

“এখন যারা থাকে, তাদের সঙ্গে আলাপ হল?”

“না, বাবা। আসলে কেউই ছিল না যে। থাকবেই বা কী করে, বাড়িটার যা অবস্থা হয়েছে না, দেখলে দুঃখ হয়। জানলা-দরজার পাল্লা নেই, মেঝের উপরে এক-হাঁটু বালি। তোমার কাছে শুনেছি যে, বাড়ির সামনে সুন্দর একটা বাগন ছিল, তাতে অনেক ফুলগাছ ছিল। সে-সব কিছু এখন নেই, কম্পাউন্ড-ভর্তি শুধু ফণীমনসার ঝাড়। গেটের পিলার থেকে নামের ট্যাবলেটটা কিন্তু খসে পড়েনি। ওই ট্যাবলেট দেখেই তো বাড়িটা চিনলুম।”

‘সিন্ধু-বেলা’র সঙ্গে বত যে স্মৃতি জড়িয়ে আছে আমার। শুধু ওই বাড়িটা কেন, গোটা পুরী জুড়েই ছড়িয়ে আছে আমার ছেলেবেলার স্মৃতি। অথচ বাসন্তী আর পারুল সেখানে গেল, শুধু আমারই যাওয়া হল না। একটু বোধহয় অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম, পারুলের কথায় চটকা ভেঙে গেল।

“কী অত ভাবছ, বাবা?”

“কিচ্ছু না, তোর মা’কে বল্, এবারে আমি চান করতে যাব।”

“আজ এত তাড়াতাড়ি?”

বললুম, “ইলেকশন এসে পড়ল না? অফিসে তাই কাজ বেড়েছে। একটু তাড়াতাড়ি বেরুতে হবে।”

স্নান করে, খেয়ে বেরিয়ে পড়লুম।

অফিসে গিয়ে প্রথমেই যা করি, ফোনের ডায়াল ঘুরিয়ে পি. বি. এক্স.-এর মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলুম, “কেউ ফোন করেছিল?”

“দুজন ফোন করেছিলেন। একজন পার্ক সার্কাস থেকে আর একজন বালিগঞ্জ থেকে।”

“কিছু বললেন?”

“পার্ক সার্কাস থেকে যিনি ফোন করেছিলেন, আপনি নেই শুনে তিনি বললেন যে, ঘণ্টাখানেক বাদে আবার ফোন করবেন।”

“নাম জিজ্ঞেস করেছিলে?”

“করেছিলুম। বললেন না।”

বিরক্তিকর ব্যাপার। যাঁরা ফোন করেন, নাম জানাতে তাঁদের এত আপত্তি কেন, বুঝি না। বিরক্তি গোপন করে জিজ্ঞেস করলুম, “আর যিনি বালিগঞ্জ থেকে ফোন করেছিলেন?”

“তাঁর নাম আমি লিখে রেখেছি। কৌশিক সান্যাল। বললেন যে, এখন ঘণ্টা দুয়েক তিনি বাড়িতেই থাকবেন। অফিসে এসে আপনি যদি তাঁকে ফোন করেন তো খুব ভাল হয়। কী নাকি একটা মেসেজ আপনাকে দেবার আছে।”

পকেট থেকে নোটবই বার করে কৌশিকের টেলিফোন নম্বরটা দেখে নিলুম, তারপর পি.বি.এক্স.কে বললুম নম্বরটা ডেকে দিতে।

মিনিট পাঁচেক বাদেই টেলিফোন বেজে উঠল।

“হ্যালো…”

লাইনের ওদিকে কৌশিকের গলা পেয়ে বললুম, “কী ব্যাপার? ফোন করেছিলে কেন? “

“আপনাকে একটা খবর দেবার ছিল।”

“কী খবর?”

“মামাবাবুর খবর।”

“ভাল খবর তো?”

“সেটা নিজে এসেই দেখে যান।”

“তার মানে?”

“মানে আর কী,” উৎফুল্ল গলায় কৌশিক বলল, “মামাবাবু এখন কলকাতায়। বাঙ্গালোর থেকে কী একটা কাজে দিল্লি গিয়েছিলেন। কাল রাত্তিরের ফ্লাইটে সেখান থেকে কলকাতায় এসেছেন।”

“কয়েকটা দিন থাকবেন তো?”

“না। থাকার নাকি উপায় নেই। কাল বিকেলের ফ্লাইটে মাদ্রাজ যাচ্ছেন। সেখান থেকে রাত্তিরের ট্রেন ধরে পরশু ভোরবেলায় বাঙ্গালোর পৌঁছবেন। বললেন, না-ফিরলেই নয়।”

“তা হলে?”

“তা হলে আর কী, বিকেলে একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের বাড়িতে চলে আসুন।”

“ফোনটা একবার ভাদুড়িমশাইকে দাও তো।”

“মামাবাবু একটু কাজে বেরিয়েছেন।” কৌশিক বলল, “তবে তিনটের মধ্যেই ফিরবেন। আমাকে বিশেষ করে বলে গিয়েছেন আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। আপনি আসবেন কিন্তু কিরণমামা।”

বললুম, যাব। তারপর ফোন নামিয়ে রেখে লেখার প্যাডটা টেনে নিলুম। বিরোধী মোর্চা নিয়ে হাজার দেড়েক শব্দের মধ্যে একটা লেখা তৈরি করে দেবার কথা, কালকের এডিট পেজে বেরুবে। লাইব্রেরি থেকে দরকারি ক্লিপিংগুলো আনিয়ে রেখেছি। লেখাটা চারটের মধ্যেই শেষ করা দরকার। নয়তো রাস্তায় বেরিয়ে ট্রাফিক-জ্যামে আটকে যেতে পারি, তা হলে আর সন্ধের আগে কৌশিকের বাড়িতে গিয়ে পৌঁছতে পারব না।

কিন্তু নির্ঝঞ্ঝাটে লিখব, তার উপায় কী। সবে প্রথম প্যারাগ্রাফটা শেষ করেছি, টেলিফোন বেজে উঠল। পি.বি.এক্স-এর মেয়েটি বলল, “পার্ক সার্কাস থেকে সেই ভদ্রমহিলা আবার ফোন করেছেন। দেব?”

‘ভদ্রমহিলা’ শুনে একটু অবাক লাগল। পরক্ষণে বললুম, “দাও।”

গলা শুনে বয়স মোটামুটি আন্দাজ করা যায়। টেলিফোন যাঁর গলা ভেসে এল, তাঁর বয়স সম্ভবত তিরিশের বেশি হবে না।

“আমি কি মিঃ কিরণ চ্যাটার্জির সঙ্গে কথা বলছি?”

“হ্যাঁ।”

“আমি দিল্লিতে থাকি। এখানে জিয়োলজির উপরে একটা অল-ইন্ডিয়া সেমিনার হচ্ছে, জানেন নিশ্চয়?”

“জানি… মানে কাগজে যা বার হচ্ছে, সেইটুকুই জানি, তার বেশি কিছু জানি না।”

“তাতে আমার একটা পেপার পড়বার ছিল। আসলে সেই জন্যেই আমি কলকাতায় এসেছিলুম। কালই আবার দিল্লি ফিরে যাব। কিন্তু তার আগে আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই।”

“কী নাম আপনার?”

“সরস্বতী ভট্টাচার্য। আমাকে আপনি চিনবেন না…”

“দাঁড়ান, দাঁড়ান, আপনি কি দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়ান?”

“তা পড়াই, কিন্তু তাতে কী হল?”

“মাইসোরের কোলারে যেমন আছে, তেমনি মধ্যপ্রদেশেও যে সোনার খনি থাকা সম্ভব, এমনকি সেখানকার গোল্ড ডিপজিট যে কোলারের চেয়ে অনেক বেশি হওয়াও কিছু বিচিত্র নয়, আপনার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কি বছর দুয়েক আগে খুব হইচই হয়েছিল?”

সরস্বতী হাসলেন। তারপর হালকা গলায় বললেন, “ও, দ্যাট ওঅজ এ মাইনর ম্যাটার… নাথিং টু রাইট হোম অ্যাবাউট। অ্যান্ড, এনিওয়ে, আই ওঅজ প্রুড রং। কিন্তু সে-কথা থাক। আসলে যা বলতে চাইছিলুম… আপনার সঙ্গে এখনও আমার পরিচয় হয়নি, তবে আমার মা’কে হয়তো আপনি চিনবেন।”

“কী নাম তাঁর?”

“লক্ষ্মী দেবী। … মনে পড়ছে?”

“লক্ষ্মী… লক্ষ্মী….” নামটাকে কয়েকবার বিড়াবড় করে আওড়ালুম, কিন্তু কিছুই মন পড়ল না। বিভ্রান্ত হয়ে বললুম, “না তো।”

“সে কী,” সরস্বতী ভট্টাচার্য বললেন, “মা তো বললেন, নাম বললেই আপনি তাঁকে চিনতে পারবেন।”

আমতা-আমতা করে বললুম, “কোথাও কোনও ভুল হয়নি তো?”

“তা কী করে হবে? আচ্ছা, আপনি তো গল্পও লেখেন, তাই না?”

“তা লিখি।”

“তা হলে তো ভুল হবার কথা নয়। কিছুদিন আগে দিল্লির একটা হিন্দি ম্যাগাজিনে আপনার একটা গল্পের তর্জমা বেরিয়েছিল। তাতে লোক পরিচিতিতে বলা হয়েছিল যে, আপনি খবরের কাগজে কাজ করেন। মা তো তাই দেখেই বললেন, এ নিশ্চয়ই আমাদের চাচাজি। আচ্ছা, আপনি কি কখনও বিষাণগড়ে ছিলেন?”

চাচাজি… বিষাণগড়….লক্ষ্মী! নিমেষে একট’ পর্দা যেন সরে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল পাঁচ-বছরের ফুটফুটে একটা বাচ্চা-মেয়ের মুখ।

বললুম, “তুমি কি….তুমি কি লছমির মেয়ে?”

“হ্যাঁ,” ওদিক থেকে সহাস্য উত্তর তেসে এল। “গাইড দেখে আপনার বাড়িতেও ফোন করবার চেষ্টা করেছিলুম। লাইন পাইনি। ভাগ্যিস সেই হিন্দি কাগজটায় যেখানে আপনি কাজ করেন সেই কাগজের ক্রমটাও দেওয়া হয়েছিল। তাই বাড়ির লাইন না পেয়ে কাগজের লাইনটা ধরতে চেষ্টা করলুম। কিন্তু লাইন যদি বা পেলুম, আপনাকে পাওয়া গেল না।”

“তখনও আমি অফিসে এসে পৌঁছুইনি যে!”

“এখন কতক্ষণ থাকবেন?”

“চারটে পর্যন্ত।”

“ঠিক আছে, তার মধ্যেই আমি যাচ্ছি। আপনার সঙ্গে একবার দেখা হওয়াটা খুব দরকার।” ভেবে দেখলুম, এর মধ্যে যদি সরস্বতী আসে, লেখাটা তা হলে শেষ করতে পারব না। বললুম, “তোমাকে আসতে হবে না। বিকেলটা তুমি কি ফ্রি আছ?”

“তা আছি।”

“তা হলে এক কাজ করো, তোমার ঠিকানাটা আমায় দাও। সাড়ে চারটে নাগাদ সেখান থেকে তোমাকে তুলে নিয়ে আমার এক বন্ধুর বাড়িতে যাব। তারপর আবার আটটা সাড়ে আটটার মধ্যেই তোমাকে পৌঁছে দেব তোমার ঠিকানায়।”

সরস্বতীর ঠিকানাটা জেনে নিয়ে ফোন নামিয়ে রাখলুম।

কিন্তু তক্ষুনি যে আবার লেখায় মন দিতে পারলুম, তা নয়। প্রায়ই আজকাল সেই স্বপ্নটা দেখি। কালও দেখেছি। ছেচল্লিশ সালের ভয়ঙ্কর একটা রাত্রির স্মৃতি এই যে এত বছর বাদে আবার হঠাৎ আমার ঘুমের মধ্যে এসে হানা দিতে শুরু করেছে, কিছুতেই সে যেন আর বিদায় নিতে চাইছে না। দিনের বেলাতেও নিষ্কৃতি নেই। রাত্তিরে যেমন স্বপ্ন দেখি, দিনেও তেমন নানান কাজের মধ্যে মাঝে মাঝে বিষাণগড়ের কথা মনে পড়ে যায়। রানি-মা, কুলদীপ সিং, পামেলা, গঙ্গাধর মিশ্র, শিউশরণ ত্রিপাঠী, ডিকি উইলসন, ডক্টর সিদ্দিকি, নারায়ণ ভার্মা, রূপেন্দ্র সিং, ত্রিবিক্রম কাপুর, ববি—কত মানুষ, কত রকমের চরিত্র, কত স্বার্থের টানাপোড়েন! একের পর এক মুখগুলি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। মনে পড়ে এমন আরও অনেকের কথা, যাদের মুখের আদল আমার স্মৃতিতে ক্রমেই ধূসর হয়ে যাচ্ছিল।

সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে গঙ্গাধর মিশ্রের নাতনি লছমিকে।

মিশ্রজি ছিলেন বিষাণগড়ের রাজপুরোহিত। রাজবাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে বাইরের লোক নেহাত কম থাকত না। প্যালেসের কেয়ারটেকার হিসেবে যেমন আমি সেখানে আশ্রয় পেয়েছিলুম, তেমনি গার্ডেনার, বাজার-সরকার আর গভর্নেস থেকে শুরু করে একগাদা দাসদাসী ছিল সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। থাকত গোয়ানিজ কুক ড্যানিয়েল আর পৈতেধারী ব্রাহ্মণ পাচক জনার্দন বাজপেয়ী। ধোবি, সহিস, ড্রাইভার, দরোয়ান আর পাইক-পেয়াদাও কম ছিল না। ছিলেন মিশ্রজিও। রাজবাড়ির পশ্চিম-দিকে, কম্পাউন্ডের উঁচু পাঁচিলের পাশে, যে ছোট্ট বাড়িটার দোতলায় দু’খানা ঘর আমি আমার কোয়ার্টার্স হিসেবে পেয়েছিলুম, মিশ্রজি তাঁর স্ত্রী, পুত্রবধূ আর নাতনিকে নিয়ে তারই একতলায় থাকতেন।

আমাকে যখন প্রথম দেখেন, মিশ্রজি যে তখন একটু চমকে উঠেছিলেন, আজও তা আমি ভুলিনি। চমকে উঠবার কারণ ছিল। কিন্তু সেই মানুষটির স্নেহের বন্ধনও ছিঁড়তে হয়েছিল আমাকে। তখন আর আমার কিছু করবার ছিল না। যে লছমিকে প্রায় সারাদিনই আমার কোলে কিংবা পিঠে চড়ে ঘুরতে দেখা যেত, সেও বলেছিল, “যেয়ো না, চাচাজি, যেয়ো না।” কিন্তু তবু একদিন আমাকে বিষাণগড় থেকে চলে আসতে হয়েছিল।

লছমি তখন নেহাতই ছোট্ট একটা মেয়ে। কিন্তু সে তো বিয়াল্লিশ বছর আগেকার কথা। ছোট্ট সেই মেয়েটার বয়েস তা হলে এখন আটচল্লিশ। তার মেয়ে এখন দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। কী যেন নাম বলল? ও হ্যাঁ, সরস্বতী। লক্ষ্মার মেয়ে সরস্বতী! তাজ্জব ব্যাপার! ঠাকুর দেবতার নামে নাম রাখতে গিয়ে কি এরা তাদের সম্পর্কের কথা ভুলে যায় নাকি?

হাতের কাজটা যেমন করেই হোক সাড়ে তিনটের মধ্যে চুকিয়ে দেব ভেবেছিলুম। হল না। লেখা শেষ হতে-হতে সওয়া চারটে বেজে গেল। চটপট সেটা প্রেসে পাঠিয়েই বেরিয়ে এলুম অফিস থেকে। ঝাউতলা রোডের যে ঠিকানাটা সরস্বতী দিয়েছিল, সেখানে পৌঁছতে পৌঁছতে পৌনে পাঁচটা।

যে-বাড়ির ঠিকানা, গাড়ির থেকেই চোখে পড়েছিল যে, তার ঠিক সামনেই একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সরস্বতী ভট্টাচার্য বলে এই বাড়িতে কেউ থাকে কি না, জিজ্ঞেস করতে মেয়েটি বলল, “আমিই সরস্বতী। আপনি নিশ্চয় মিঃ চ্যাটার্জি, তাই না!”

“হ্যাঁ।”

“একটু নামবেন না? এটা সুমঙ্গলের… আই মিন আমার স্বামীর দাদার বাড়ি। উপরে এসে এক কাপ চা যদি খান, সবাই খুব খুশি হবেন। আমার স্বামী অবশ্য আসেননি, হি ইজ ইন দিল্লি, তবে আর সবাই তো আছেন, একটু বসবেন না?”

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললুম, “ও-সব আর একদিন হবে, এখন উঠে পড়ো তো, উই আর অলরেডি লেট।”

দরজা খুলে দিতেই সরস্বতী গাড়িতে উঠে পড়ল। বলল, “যাচ্ছেন তো আপনার বন্ধুর বাড়িতে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে গেলে আপনাদের কথা বলতে কোনও অসুবিধে হবে না তো?”

বললুম, “একটুও না। আসলে যাঁর কাছে যাচ্ছি, তোমার মা’কে আর তোমার ঠাকুর্দা-ঠাকুমাকে তিনিও খুব ভালই চিনতেন। তাঁর কাঁধেও তো লছমি কিছু কম চাপেনি। কেন, ভাদুড়িমশাইয়ের কথা শোনোনি তোমার মায়ের কাছে?”

“আমরা কি… আমরা কি মিঃ চারুচন্দ্র ভাদুড়ির কাছে যাচ্ছি?”

বললুম, “হ্যাঁ।”

সরস্বতী হাসল। বলল, “ভালই হল। ওঁর সঙ্গে এখনও পরিচয় হয়নি। তবে আপনাকে যা জানাতে চেয়েছিলুম, সেটা ওঁকেও জানানো দরকার।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *