বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

২৪

ছ’টায় ঘুম ভাঙল। গোটা বাড়ি তার অনেক আগেই জেগে উঠেছিল। একতলা থেকে যে-সব আওয়াজ আসছিল, তাতে বুঝলুম, ডেকরেটারের লোকজনেরাও কাজে লেগে গিয়েছে।

লছমি এসে ঘরে ঢুকে বলল, “উঠে পড়ো চাচাজি, আর কত ঘুমোবে।”

লেপের তলা থেকে মুখ বার করে বললুম, “ওরে বাবা, এখনও তো রাতই কাটেনি।”

“শীতকালে কি আর তাড়াতাড়ি রাত কাটে? বাথরুমে গরম জল রেখে এসেছি, চোখমুখ ধুয়ে নাও, তারপর নীচে গিয়ে দ্যাখো, বাগানময় লাইট জ্বেলে কীভাবে কাজ চলছে।”

কুয়াশার আড়াল থেকে সূর্যদেবের উদয় হতে-হতে সাতটা বাজল। অথচ তারই মধ্যে দেখলুম, চাঁদোয়া খাটিয়ে তার তলায় মস্ত মস্ত দড়ির কার্পেট বিছিয়ে ঝপাঝপ চেয়ার পাতার কাজ চলছে। আটটার মধ্যেই ডেকরেটরের কাজ শেষ। খানিক বাদে পুরুত ঠাকুরও এসে গেলেন। ভদ্রলোকের বয়স বেশি নয়, কিন্তু চেহারায় ইতিমধ্যেই গাম্ভীর্যের ছাপ পড়েছে। শুনলুম ইনি দ্বারভাঙ্গার লোক, প্যালেস কম্পাউন্ডে যে শিবমন্দির রয়েছে, তার নিত্যপূজার ভার এখন নাকি এঁরই হাতে। এসে বললেন, “আটটার মধ্যে আসবার কথা ছিল ঠিকই, কিন্তু সকালবেলায় ওখানে যে পুজো হয়, সেটা না-সেরে তো আসতে পারি না, তাই একটু দেরি হয়ে গেল।”

যমুনাদিদি বোধহয় সারারাত্তির দু’চোখের পাতা এক করেননি, লছমিও মনে হয় জেগেই ছিল, নইলে নিশ্চয় পুজোর জোগাড়যন্তর ভোরবেলার মধ্যে শেষ করা যেত না। পুরুতঠাকুর মন্দিরে গিয়ে ঢুকলেন। প্রাথমিক যে-সব বিধিনিষেধের ব্যাপার রয়েছে, তাতে মন দেবার আগে জানিয়ে দিলেন যে, বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা হবে ঠিক দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে, শাস্ত্রমতে নাকি আজ সেটাই সবচেয়ে ভাল সময়।

যশোমতী দেবী আসবেন জানতুম, কিন্তু, নাতিকে নিয়ে সাড়ে আটটার মধ্যেই যে তিনি এসে পড়বেন, তা ভাবিনি। রানি-মাকে প্রথম যখন দেখি, তাঁর বয়স তখন বছর-পঁয়ত্রিশ। অসামান্যা রূপবতী ছিলেন। এমন রূপ, যার সামনে দাঁড়িয়ে আমার নিশ্বাস একেবারে বন্ধ হয়ে এসেছিল। আজ তাঁর বয়স প্রায় আশি, মাথা একেবারে ধবধবে সাদা, মুখে দুঃখের ছাপ বড় স্পষ্ট হয়ে ফুটেছে। শরীর অবশ্য এই বয়সেও সেই আগের মতোই ছিপছিপে আর সটান। চোখে আর ঠোঁটে যে এক টুকরো হাসি সবসময়ে লেগে থাকত, সেটাও একেবারে মিলিয়ে যায়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্বীকার করব, পাশ থেকে যদি না ভাদুড়িমশাই বলে দিতেন যে, ইনি কে, রানি-মা’কে তা হলে হয়তো দেখবামাত্র আমি চিনতে পারতুম না।

আমন্ত্রিতদের মধ্যে প্রায় কেউই তখনও এসে পৌঁছননি। প্যান্ডেল একেবারে ফাঁকা। ওঁদের দুজনকে তাই বাড়ির মধ্যে একতলার বৈঠকখানায় নিয়ে এলুম। লছমি আর সুমঙ্গল সেখানে ডেকরেটরের পাওনা টাকা নিয়ে কথা বলছিল। রানি-মা’কে ঢুকতে দেখে লছমি তক্ষুনি এগিয়ে এসে জাজিমের উপরে তাঁদের বসাল। তারপর দুটো তাকিয়া এনে দুজনের দু’পাশে রেখে বলল, “আপনি যে সত্যি দিল্লি থেকে আসবেন, তা কিন্তু আমরা ভাবতেও পারিনি। মা তো কালই আপনাদের আসবার কথা শুনেছেন। বললেন যে, এ আমাদের মস্ত সৌভাগ্য।”

যশোমতী দেবী মৃদু হেসে বললেন, “সৌভাগ্য তো আমার। তোমার দাদু ছিলেন আমাদের কুলপুরোহিত। তাঁর বাড়িতে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, তাও আমাদের উপাস্য দেবতা মহেশ্বরের বিগ্রহ, আর আমি আসব না, তাও হয় নাকি? এ তো আমারই মস্ত পুণ্য হল।”

ছোট্ট শিবলিঙ্গটি দেখলুম বৈঠকখানা-ঘরের একদিকের দেওয়ালে একটি কুলুঙ্গির মধ্যে রয়েছে। বললুম, “বিগ্রহ এখনও ঠাকুরঘরে রেখে আসোনি?”

লছমি বলল, “চাচাজি, আমি তো রেখে আসতেই চেয়েছিলুম। কিন্তু ঠাকুরমশাই বললেন, আগে তিনি জায়গাটাকে শুদ্ধ করে নেবেন। আরও নাকি কীসব কাজ রয়েছে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠা তো দশটার আগে হবেও না, সে তো তুমিও শুনলে, তার আগে ভাল সময় নেই। তো বিগ্রহ ওখানে সাড়ে ন’টা নাগাদ পৌঁছে দিলেই হবে।”

বললুম, “সরস্বতী কোথায়?”

সুমঙ্গল বলল, “আর বলবেন না। ঠান্ডা লেগে বাচ্চাটার একটু জ্বর হয়েছে। বেশি নয়, একশো পয়েন্ট চার। কিন্তু বড্ড ঘ্যানঘ্যান করছে, সরস্বতী তাই নীচে নামতে পারছে না। বলল যে, প্রতিষ্ঠার সময় তো নামতেই হবে, তখন নামবে।”

বললুম, “তা হলে এক কাজ করো। হয় লছমি কিংবা তুমি এখানে থাকো, আমি তা হলে সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। একটু বাদেই তো সবাই আসতে শুরু করবেন।”

যশোমতী দেবী বললেন, “কাউকে এখানে থাকতে হবে না। বলতে গেলে আমি তোমাদের ঘরের লোক, আমার সঙ্গে ভদ্রতা করার দরকার নেই। আমি বরং খানিকক্ষণ এখানে থাকি, তারপর লোকজন এসে গেলে সামনে গিয়ে বসব। কিরণ, তুমিও সামনে গিয়ে দাঁড়াও, লোকজন এসে পড়লে আমাকে খবর দিয়ো।”

লোকজন ন’টা নাগাদ আসতে শুরু করল। তার খানিক বাদে ভিতরে গিয়ে রানি-মা’কে খবর দিলুম। তিনি বললেন, “তা হলে আর এখানে বসে থেকে কী হবে। চলো, বাইরে গিয়ে বসি। পুরনো আমলের কিছু লোকজনের সঙ্গেও দেখা হয়ে যাবে। অনেকদিন তো ওঁদের দেখিনি।”

বাইরে এসে রানি-মা দারুণ খুশি। পুরনো আমলের বেশ কিছু লোক ইতিমধ্যে এসে পড়েছিলেন। তাঁদের অনেকে আবার রাজ-এস্টেটেই কাজ করতেন। রানি-মা’কে ঘিরে দাঁড়ালেন তাঁরা। জনার্দন আর ড্যানিয়েলও ছিল তাঁদের মধ্যে। দেখলুম, দুজনেই একেবারে থুথুড়ে বড়ো হয়ে গেছে।

এসেছিলেন কুলদীপ আর পামেলাও। ভাদুড়িমশাই তাঁদের এনে রানি-মা’র কাছে বসিয়ে দিলেন। রানি-মা বললেন, “দীপ তো দিল্লিতেই থাকে। মাঝে-মাঝে আসেও আমার কাছে। পামেলাকেই বরং অনেক বছর বাদে দেখলুম। কেমন আছ তুমি পামেলা?”

পামেলা হেসে বললেন, “যশ্, আমি তোমার চেয়ে দু’বছরের বড়। তা এই বয়সে আর কতটা ভাল থাকা যায়? বেঁচে যে আছি, এই যথেষ্ট।”

রানি-মাও হাসলেন। তারপর বললেন, “অথচ দীপকে দ্যাখো। ও তো তোমার চেয়ে তিন বছরের বড়। কিন্তু এই বয়েসেও ব্যাবসার কাজে শুনি সমানে চক্কর মেরে বেড়ায়। আজ যদি কলকাতা যাচ্ছে তো কাল বোম্বাই। ও আর বুড়ো হল না।”

শুনে কুলদীপ সিংও হেসে উঠলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।

একটা ব্যাপার লক্ষ করছিলুম। যশোমতী দেবী আর কুলদীপ সিং যে পরস্পরকে ‘দীপ’ আর ‘যশ’ বলেন, সেটা জানা ছিল। কিন্তু পামেলাকে এই প্রথম আমি রানি-মা’কে ‘যশ্’ বলতে শুনলুম। তাতে বুঝলুম, দুজনের মধ্যে যে একটা ঘনিষ্ঠতার সম্পর্ক রয়েছে, বাইরের কাউকে পামেলা সেটা জানতে দিতে চাইতেন না। একান্তে যখন দেখা হত, পরস্পরকে তখন তাঁরা নাম ধরেই ডাকতেন হয়তো, কিন্তু চাকরি করতে হলে কতকগুলি কেতা তো মানতেই হয়, পামেলা সেই কেতাকে সবসময় মান্য করে চলতেন। কিন্তু আজ আর তিনি প্যালেসের বেতনভোগী কর্মচারী নন, তাই সেই কেতা মানবারও কোনও দরকার আর যেন তিনি বোধ করছেন না।

সবাই হাসছিল। সবাই কথা বলছিল। শুধু যশোমতী দেবীর নাতিটি দেখলুম চুপচাপ বসে আছে। বছর পঁচিশ-ছাব্বিশের ছেলে, এই বুড়োর মজলিশে কাউকেই সে চেনে না, সেইজন্যেই সে হয়তো একটু অস্বস্তিবোধ করছিল। খানিক বাদে সে উঠে দাঁড়াল, রানি-মাকে বলল, “দাদিজি, তুমি বোসো, আমি বরং যাই।”

রানি-মা বললেন, “ঠিক আছে, তুই তা হলে গেস্ট হাউসে চলে যা। আমি তো এক্ষুনি উঠতে পারব না। অনেক দিন বাদে এদের সঙ্গে দেখা হল, একটু কথা বলি। তা ছাড়া বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হবে। সে-সব হোক, তারপরে যাব।”

ছেলেটি চলে গেল।

তারও খানিক বাদে সুমঙ্গল এসে বলল, “ভাইয়া, আপনি আর ভাদুড়িদাদা একটু ভিতরে আসুন।”

ভিতরে গিয়ে দেখি, বৈঠকখানা-ঘরে লছমি একেবারে পাথরের একটা মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। কাছে গিয়ে বললুম, “ব্যাপার কী, এত গম্ভীর কেন?”

লছমি একেবারে ফুঁপিয়ে উঠল। “সর্বনাশ হয়ে গেছে চাচাজি! বিগ্রহটা খুঁজে পাচ্ছি না। অথচ এই কুলুঙ্গির মধ্যেই ছিল!”

“সে তো আমিও দেখেছি। তা হলে গেল কোথায়? অন্য কোথাও সরিয়ে রাখিসনি তো?”

“কখন সরাব! আমি তো সেই তখন থেকে এ-ঘরে আর ঢুকিইনি! ঠাকুরঘরে বসে মা’কে সাহায্য করছিলুম।”

সুমঙ্গল বলল, “তখন থেকে মানে কখন থেকে?”

“সেই যখন রানি-মা তার নাতিকে নিয়ে বৈঠকখানা ঘরে এসে বসলেন তখন থেকে।”

সুমঙ্গল বলল, “তার মানে এঁরা ছাড়া তখন থেকে বেশ-কিছুক্ষণ এ-ঘরে কেউ ছিলই না?”

আমি বললুম, “তুমি বোধহয় খারাপ কিছু ভাবছ সুমঙ্গল। কিন্তু রানি-মা তো এখনও এ-বাড়ি ছেড়ে চলে যাননি, বাইরেই তিনি বসে আছেন।”

সুমঙ্গল তাড়াতাড়ি বলল, “না না, আমি খারাপ কিছু ভাবছি না। তা ছাড়া ওঁরা কেন বিগ্রহ সরাবেন, ওটা নিয়ে ওঁরা করবেনই বা কী?”

বললুম, “দিদি জানে?

লছমি বলল, “মা এখনও জানে না। সরস্বতীও জানে না। শুধু আমরা ক’জন জানি। তবে এক্ষুনি তো পুরুতঠাকুর বলবেন, বিগ্রহ নিয়ে এসো। তখন তো আর কিছু চেপে রাখা যাবে না। ভাবতেই তো আমার মাথা ঘুরছে।”

ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললুম, “আপনি চুপ করে আছেন কেন? একটা কিছু বুদ্ধি দিন। রানি-মাকে গিয়ে ডিসক্রিটলি একবার জিজ্ঞেস করব?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওঁকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। উনি কিছু জানেন বলেও মনে হয় না। যাকে জিজ্ঞেস করলে লাভ হত, সে তো একটু আগেই এখান থেকে চলে গেল।”

হঠাৎ মনে হল, তাই তো, এ নিশ্চয় রানি-মা’র ওই নাতিটির কাজ। বললুম, “সে তো গেস্ট-হাউসে গেল। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করব?”

“আমার ধারণা, সেখানেও তাকে পাবেন না। বিগ্রহ যদি সে সরিয়েই থাকে, তবে তারপরেও গেস্ট-হাউসে বসে থাকবে, এত নির্বোধ সে নিশ্চয়ই নয়।”

বললুম, “তা হলে এখন উপায়?”

লছমির মুখ একেবারে শুকিয়ে গিয়েছিল। অস্ফুট গলায় সে বলল, “কী হবে তা হলে?”

হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “বোকা মেয়ে, খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিস, তাই না? আরে, তোদের বিগ্রহ ঠিকই আছে। যশোমতী দেবী তাঁর নাতিকে নিয়ে যখন এখান থেকে বেরিয়ে সামনে গিয়ে বসলেন, তার একটু বাদেই আমি আবার ওদিক থেকে এই বৈঠকখানা ঘরে এসেছিলুম। এসে মনে হল, বিগ্রহটিকে এখানে এইভাবে রাখাটা ঠিক হচ্ছে না, তাই উপরে নিয়ে রেখে এলুম। এক্ষুনি আবার এনে দিচ্ছি। চলুন কিরণবাবু, উপর থেকে মহেশ্বরকে আবার নীচে নামানো যাক।”

লভূমির মুখে আবার হাসি ফুটেছে। বলল, “উঃ চাচাজি, কী ভয়ই যে পেয়েছিলুম।”

আমার একটা খটকা লাগছিল। উপরে উঠতে-উঠতে ভাদুড়িমশাইকে বললুম, “কই, আপনাকে তো তখন আমি একবারও এদিকে আসতে দেখিনি। গেটের দিকে সারাক্ষণ তো আপনি আমার পাশেই ছিলেন।”

বিনা বাক্যে ভাদুড়িমশাই তাঁর স্যুটকেস খুলে তার ভিতর থেকে দুটি শিবলিঙ্গের একটিকে বার করে আনলেন। বললুম, “এটি তো আমি কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছি। আর অন্যটা তো আপনি এনেছেন বাঙ্গালোর থেকে। এঁদের বিগ্রহটি তা হলে কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি দেখছি একটা হাঙ্গামা না-বাধিয়ে ছাড়বেন না। একটু চুপ করে থাকুন তো, অত কথা বলবার দরকার কী। চুপচাপ সব দেখে যান।”

স্যুটকেস বন্ধ করে আমার আনা বিগ্রহটি তিনি হাতে তুলে নিলেন। ঘর থেকে আমরা বেরিয়ে এলুম। দেখলুম, সিঁড়ির কাছে সরস্বতী দাঁড়িয়ে আছে। ভাদুড়িমশাইকে বলল, “আপনার কথামতো উপর থেকে গেটের দিকে লক্ষ্য রাখছিলুম। হ্যাঁ, সে-ই। একটু আগে বেরিয়েও গেল দেখলুম।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “ঠিক আছে। তুই আর তা হলে উপরে বসে থাকবি কেন? ছেলেকে নিয়ে এবারে নীচে নেমে আয়।”

তাঁর হাতের বিগ্রহটি দেখিয়ে সরস্বতী বলল, “এটিই তো ভাইয়া কলকাতা থেকে নিয়ে এসেছেন?”

“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “নিশ্চিন্ত থাক্, তফাতটা কেউ বুঝতে পারবে না।”

আমার কিছুই বোধগম: হচ্ছিল না। সবই যেন হেঁয়ালির মতো লাগছিল। কিন্তু ভাদুড়িমশাই তো কথা বলতে নিষেধ করেছেন, তাই একেবারে চুপ করে রইলুম।

নীচে নেমে শুনলুম, পুরুতঠাকুর বিগ্রহ পাঠিয়ে দিতে বলেছেন। যে-সময়ে প্রতিষ্ঠা করার কথা, তার আর বিশেষ দেরি নেই। আমরা নামতে লছমি আর সুমঙ্গল স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। বিগ্রহটি সুমঙ্গলের হাতে তুলে দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “যাও, সাবধানে এটিকে এবারে মন্দিরে পৌঁছে দিয়ে এসো।”

.

বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার কাজ সাড়ে দশটার মধ্যেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু তারপরেও বাকি ছিল আনুষঙ্গিক নানা অনুষ্ঠান, পূজা-পাঠ আর প্রসাদ বিতরণ। সে-সব মিটতে মিটতে একটা বেজে গেল। আমন্ত্রিতদের জন্যে চা, কফি আর শরবতের ব্যবস্থা ছিল, তবে যে-কেটারারকে তার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তার লোকজনরা খুবই দক্ষ, আমাদের আর তাই সেদিকে নজর রাখার কোনও দরকারই হয়নি। বেশিরভাগ লোকজনই অবশ্য খানিক সময় বসে আর গল্পগুজব করে তারপর চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু এই একটা ব্যাপার লক্ষ করে খুব ভাল লাগল যে, সমস্ত কাজ মিটে না নাওয়া পর্যন্ত যশোমতী দেবী তাঁর চেয়ার ছেড়ে একবারও নড়লেন না। যাবার আগে বাড়ি। প্রত্যেকের সঙ্গে দেখা করলেন, প্রত্যেকের খোঁজখবর নিলেন, আমার সঙ্গেও কথা বললেন কিছুক্ষণ। বললেন, “কিরণ, তুমি তো শুনলুম মাঝে-মাঝে দিল্লি আসো, এবার এলে দেখা কোরো।”

একটু আগেও বাড়ি যে একেবারে লোকজনে ভর্তি হয়ে ছিল, এখন আর তা বুঝবার উপায় নেই। ডেকরেটরের লোকেরাও দেখলুম, এরই মধ্যে চাঁদোয়া খুলতে শুরু করে দিয়েছে। জিজ্ঞেস করতে বলল যে, কালই আর-একটা বাড়িতে কী-একটা উৎসব রয়েছে, মালপত্র নিয়ে আজই সেখানে গিয়ে কাজ শুরু করা দরকার।

সুমঙ্গল বলল, “যাঃ, সব একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল!”

আমি বললুম, “এবারে আমাকেও যেতে হবে। এখন তো বাসের খুব সুবিধে। রায়পুরে পৌঁছে মাঝরাত্তিরের ট্রেনটা যদি ধরতে পারি তো বেশ হয়।”

লছমি বলল, “তুমি কি খেপেছ চাচাজি! এতই যদি তোমার ফিরবার তাড়া তো এলে কেন?” হেসে বললুম, “আসতে খুব ইচ্ছে হল, তাই এসেছি।”

“কিন্তু থাকতে ইচ্ছে করছে না, কেমন? দাঁড়াও, মা’কে ডেকে আনছি।”

সত্যিই গিয়ে দিদিকে ডেকে আনল। দিদি বললেন, “কে ফিরে যেতে চাইছে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমি নই। তিনদিনের আগে আমি ফিরছি না।”

গতিক সুবিধের নয় দেখে বললুম, “আমিও কিন্তু এমন কথা বলিনি যে, আজই ফিরব। শুধু বলেছিলুম যে, ফিরতে পারলে ভাল হয়।”

দিদি বললেন, “না ভাইয়া, ভাল হয় না। রাজবাড়ির এই ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে ব্যবস্থা হয়েছে যে, আপাতত দিন-সাতেক তিনি রোজকার পুজোর কাজটা চালিয়ে দেবেন, কিন্তু এর মধ্যে আর কাউকে ঠিক করে নিতে হবে আমাদের। তা তোমরা থাকতে-থাকতে সেটা ঠিক করে দাও, তারপর যেয়ো।”

বললুম, “ঠিক আছে, তা-ই হবে। তা হলে বরং এক রাউন্ড চা হয়ে যাক।”

লছমি বলল, “তোমরা বোসো, আমি তোমাদের চা পাঠিয়ে দিচ্ছি। চা খেয়ে বরং সর্সোতিয়ার ধার থেকে একবার ঘুরে এসো। শুধু একটা কথা মনে রেখো, আজ আর রান্নার পাট রাখা হয়নি। যেমন এ-বেলায় খেয়েছ, রাত্তিরে। তেমনি কিন্তু স্রেফ ফলমূল আর মিষ্টি খেয়ে থাকতে হবে।”

চা খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লুম। ভাদুড়িমশাই, আমি, সরস্বতী আর সুমঙ্গল। লছমি এল না, বাড়িতে সে মায়ের কাছে থেকে গেল। তা ছাড়া সরস্বতীর ছেলের ঘুম এখনও ভাঙেনি। জেগে উঠবার পরে দিদাকে দেখতে না পেলে সে কান্না জুড়ে দেবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *