২২
সার ত্রিবিক্রমের জ্ঞান পুরোপুরি ফিরে এল আর আধঘণ্টা বাদে। রাত তখন প্রায় দুটো। তৎক্ষণাৎ তিনি উঠে দাঁড়াতে যাচ্ছিলেন। ভাদুড়িমশাই বললেন, “উঠবার চেষ্টা করবেন না। আমার হাতে এই যে রিভলভারটা দেখছেন, এতে সাইলেন্সার লাগানো আছে।”
ধপ করে আবার বসে পড়লেন সার ত্রিবিক্রম। শুকনো গলায় বললেন, “আপনারা কারা?”
“এও কি একটা প্রশ্ন হল?” ভাদুড়িমশাই ধারালো হেসে বলেন, “আমাকে আপনি খুব ভালই চেনেন। আমি চারুচন্দ্র ভাদুড়ি, কাম্বারল্যান্ড ইনসিওরেন্স কোম্পানির বিষাণগড় ব্রাঞ্চের ম্যানেজার। আর, এঁকেও আপনার না-চিনবার কথা নয়, ইনি আপনাদের প্যালেসেই কাজ করেন। মিঃ কিরণকুমার চ্যাটার্জি। তবে হ্যাঁ, এই যে মাঝবয়সী ভদ্রলোকটি, এঁকে আপনি চেনেন না। তা চিনবার কোনও দরকারও আপাতত আপনার নেই।”
মাঠের উপরে যেমন মেঘ আর রোদ্দুর একইসঙ্গে খেলা করে বেড়ায়, মানুষের মুখের উপরেও যে তেমন ভয় আর ক্রোধ একই সঙ্গে খেলে বেড়াতে পারে, আগে তা আমার জানা ছিল না। সার ত্রিবিক্রমের মুখে কিন্তু আজ একই সঙ্গে এই দুটোই দেখতে পেলুম। মনে হল, একদিকে যেমন তিনি ভীষণ ভয় পেয়েছেন, অন্যদিকে তেমনি আবার রেগেও গিয়েছেন প্রচণ্ড। চাপা গলায় বললেন, “আমাকে আপনারা এখানে আটকে রেখেছেন কেন?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “না-আটকে উপায় ছিল না যে!…না না, ভয়ের কিচ্ছু নেই, সকাল হবার আগেই আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব, স্বচ্ছন্দে আপনি প্যালেসে ফিরে যেতে পারবেন, কেউ কিছু জানতে পারবে না। তা এবারে বরং আমিই একটা প্রশ্ন করি। রাত একটায় আপনি আজ সর্সোতিয়ার ধারে গিয়েছিলেন কেন? তাও বিচ্ছিরি ওই আলখাল্লায় নিজেকে ঢেকে নিয়ে? তাও আবার হাতে একটা ছোরা নিয়ে? …কোনও কাজ ছিল?”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর, সার ত্রিবিক্রম কোনও জবাব দিচ্ছেন না দেখে বললেন, “বুঝতে পারছি, আপনি মুখ খুলবেন না। ঠিক আছে, উত্তরটা তা হলে আমিই দিই, কেমন? পুলিশের বড় কর্তা অর্জুন প্রসাদ যে আপনার মস্ত শাকরেদ, মিঃ চ্যাটার্জি তা না জানতে পারেন, কিন্তু আমি জানি। সত্যি বলতে কী, সেইজন্যেই মিঃ প্রসাদকে সেদিন আমি একটা খবর খাইয়ে দিয়েছিলুম। কী খবর, না আঠাশে জুন ভোরবেলায় সর্সোতিয়ার ধারে যাদের আমি পড়ে থাকতে দেখেছিলুম, সেই তিনজন ট্রাইবাল মানুষের একজন তখনও বেঁচে ছিল; আর মরবার আগে কয়েকটা কথা সে বলেও গিয়েছিল আমাকে। কী কথা, না ‘হলদে পাথর… দশদিন বাদে আবার আসবে…এইখানে… মাঝরাত্তিরে…মরবে…বারণ করো’। তো এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিঃ প্রসাদকে এই খবরটা আমি খাইয়েছিলুম কেন?”
সার ত্রিবিক্রমের চোখ দুটো হঠাৎ রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। কিন্তু তাঁর গলার পর্দা একটুও উপরে উঠল না। সেই একই রকমের চাপা গলায় তিনি বললেন, “কেন? আমাকে ফাঁদে ফেলবার জন্যে?”
“বা রে, দোষটা কি শুধু আমার? আপনি আমার এই বন্ধুটিকে ফাঁদে ফেলবার চেষ্টা করেননি? অথচ ওঁর অপরাধটা কী? না আপনার আর এস্টেট-ম্যানেজারের পেটোয়া সাপ্লায়ারদের উনি ব্ল্যাকলিস্ট করেছিলেন। আরে বাবা, বাজার দরের চেয়ে যে তারা বেশি দাম নেয় স্রেফ আপনাদের দুজনের পেট ভরাবার জন্যে, তা তো আর মিঃ চ্যাটার্জি জানতেন না। মিঃ চ্যাটার্জির আর-একটা দোষ, তিনি বড় গোলমেলে সব প্রশ্ন তোলেন। এই যেমন, তিনজন ট্রাইবালের হঠাৎ জঙ্গল থেকে শহরে আসবার কী দরকার পড়ল, পুলিশ কেন তা নিয়ে কোনও খোঁজখবর করছে না। বুঝুন ব্যাপার, মিঃ চ্যাটার্জি এমন সরল লোক যে, তা নিয়ে খোঁজখবর করতে গেলে যে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরুবে, তাও উনি বুঝতে পারেননি। কিন্তু আপনি ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ-লোককে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবে না। একে তো ইনি পুরনো সাপ্লায়ারদের ভাগিয়ে দিয়ে আপনাদের একটা রেগুলার ইনকামের পথ বন্ধ করতে চলেছেন, তার উপরে আবার এমন গোলমেলে সব কথা বলছেন, যাতে কিনা আপনারা বিপদে পড়ে যেতে পারেন। বাস্, আপনারও খেল অমনি শুরু হল। সুরজপ্রসাদ আগরওয়ালের মার্ডারটা যে একটা চমৎকার ট্র্যাপ, তাতে আর সন্দেহ কী। মুরারিকে দিয়ে আপনি ফাঁদটা পাতলেন, আর আমার বন্ধুটিও গিয়ে ঢুকে পড়লেন তার মধ্যে।”
এতক্ষণ আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই সরছিল না। এবারে মৃদু গলায় বললুম, “আমারই বোকামি। আগরওয়ালজির সঙ্গে যে মুরারির দেখাই হয়নি, একটা ফোন করলেই সেটা জানা যেত।”
কথাটা শুনে হেসে ফেললেন ভাদুড়িমশাই। তারপর সার ত্রিবিক্রমের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা হলেই বুঝুন কীরকম মানুষ উনি! আগরওয়ালজির বাড়ি, স-মিল, আর গয়নার দোকানের ফোনের লাইন যে সেদিন সকালবেলাতেই আপনি কাটিয়ে রাখবার ব্যবস্থা করেছিলেন, তা পর্যন্ত মিঃ চ্যাটার্জি জানেন না। তো সে-কথা থাক। অর্জুন প্রসাদকে ওই খবরটা কেন খাইয়েছিলুম, সেটা এখনও বলা হয়নি। আসলে আমি জানতুম যে, খবরটা যদিও মিথ্যে, তবু ওটাকেই সত্যি ভেবে নিয়ে থানায় পৌঁছেই খবরটা সে আপনার কানে পৌঁছে দেবে। বাস্, আপনিও ধরে নিলেন যে, সত্যিই বুঝি মরবার আগে একজন ট্রাইবাল ওই কথাগুলো আমাকে বলে গিয়েছিল। কী বলেছিল সে? না ‘হলদে পাথর … দশ দিন বাদে আবার আসবে… এইখানে … মাঝরাত্তিরে।. মরবে… বারণ করো’। আপনি ওই কথাগুলোর কী অর্থ করলেন? না যে-অর্থ আপনি করবেন বলে আমি আশা করেছিলুম। আপনি ধরে নিলেন, দশদিন বাদে আবার কেউ হলদে পাথর নিয়ে মাঝরাত্তিরে সর্সোতিয়ার ধারে আসবে। কিন্তু যে আসবে, সেও মারা পড়বে, যেমন কিনা ওরা তিনজন মারা পড়েছে। সুতরাং তাকে যেন আসতে বারণ করা হয়।”
একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “আঠাশে জুন থেকে দশদিন বাদে। তার মানে আটুই জুলাই। আজ সেই তারিখ। আমি তো আশাই করছিলুম যে, আজ মাঝরাত্তিরে কেউ হলদে পাথর নিয়ে জঙ্গল থেকে এখানে আসবে বলে আপনি ধরে নেবেন, আর তার কাছ থেকে সেই পাথর কেড়ে নেবার জন্যে ঠিক সেই সময়েই এই সর্সোতিয়ার ধারে আপনার আবির্ভাব হবে। হলদে পাথর! কথাটা খুব ভেবেচিন্তেই ব্যবহার করেছিলুম, সার ত্রিবিক্রম। এই অঞ্চলের আদিবাসীরা যে সোনাকে হলদে পাথর বলে, তা যেমন আপনি জানেন, তেমন আমিও জানি। সেইসঙ্গে আমি এটাও জানি যে, হলদে পাথরের লোভে আপনি না-করতে পারেন, এমন কাজ নেই। মানুষও খুন করতে পারেন, তাই না? এই যেমন আঠাশে জুন তারিখে ওই মানুষ তিনটিকে আপনি খুন করেছেন।”
“বাজে কথা!” সার ত্রিবিক্রম বললেন, “কাউকেই আমি খুন করিনি।”
ভাদুড়িমশাই নিরুত্তাপ গলায় বললেন, “আমার ধারণা, করেছেন। তবে হ্যাঁ, একবার চিৎকার করে উঠবারও সুযোগ না-দিয়ে একা তো আর তিন-তিনজন লোককে খুন করা সম্ভব নয়, আর-কেউ আপনার সঙ্গে ছিল নিশ্চয়। সে কে? মুরারি, না অর্জুন প্রসাদ? … ছিল, সার ত্রিবিক্রম, কেউ একজন ছিল। পুরন্দর মিশ্রকে মারবার জন্যে অবশ্য আর কারও সাহায্যের দরকার আপনার হয়নি।”
“বাজে কথা! সব বাজে কথা!” চাপা গলায় সার ত্রিবিক্রম আবার গর্জে উঠলেন, “ইউ হ্যাভ বিন অ্যালেজিং থিংস দ্যাট হ্যাভ অ্যাবসলুটলি নো এগজিসটেন্স এক্সেপ্ট ইন ইয়োর ইমাজিনেশান।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? আমি তো আর এ-সব প্রমাণ করতে পারব না। কিন্তু আমি জানি যে, সব ক’টা খুনের পিছনেই আপনি ছিলেন। কাউকে নিজে খুন করেছেন, কাউকে খুন করিয়েছেন লোক লাগিয়ে। হরদেওকে অবশ্য সোনার লোভে খুন করা হয়নি। তার মনিব শিউশরণ ত্রিপাঠী তো পুরনো আমলের লোক, আপনার উপরে তিনি বিশেষ প্রসন্ন ছিলেন না। সম্ভবত আপনার কিছু-কিছু কীর্তিকলাপের খবরও তিনি রাখতেন। মিঃ চ্যাটার্জিকে সে-সব হয়তো জানাতেনও তিনি। কিন্তু মুরারি হঠাৎ এসে পড়ায় আর জানাতে পারেননি। তবে কিনা তিনিও বড় মারাত্মক একটা ভুল করলেন; মুরারির সামনেই মিঃ চ্যাটার্জিকে বলে বসলেন যে, যা-কিছু তিনি জানেন, তা একটা কাগজে লিখে হরদেওয়ের হাত দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। মুরারি কি আর সেই দিনই খবরটা আপনার কানে পৌঁছে দেয়নি? বাস, তক্ষুনি লেখা হয়ে গেল হরদেওয়ের ডেথ-ওয়ারেন্ট! হরদেও খুন হয়ে গেল, বিষাণগড় ছেড়ে চলে যাবার আগে শিউশরণজি যে-কাগজখানা তার হাত দিয়ে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলেন, তা আর মিঃ চ্যাটার্জির কাছে এসে পৌঁছল না।”
আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িমশাই। তারপর বললেন, “হরদেওকে আপনি হয়তো নিজের হাতে খুন করেননি, তবে আমার বিশ্বাস, পুরন্দরকে নিজেই মেরেছিলেন। সত্যি, সোনার লোভে আপনি না-করতে পারেন এমন কোনও কাজই নেই।”
ডঃ সিদ্দিকি এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন। এবারে চমকে উঠে বললেন, “সে কী, পুরন্দরের সঙ্গে সোনার কী সম্পর্ক?”
ভাদুড়িমশাই ফিরে তাকালেন না। কপুরসাহেবের উপর থেকে চোখ না সরিয়েই ডঃ সিদ্দিকিকে বললেন, “আপনি শুধু এইটুকুই শুনেছেন যে, পুরন্দর ছিলেন বাউন্ডুলে প্রকৃতির মানুষ, ঘরবাড়ি আর বউবাচ্চা ছেড়ে মাঝে-মাঝেই তিনি জঙ্গলে চলে যেতেন। কিন্তু জঙ্গলে যাবার কারণ হিসেবে ঠাট্টা করে তিনি কী বলতেন, তা আপনি জানেন না। কিন্তু আমি তা জানি, আর মিঃ চ্যাটার্জিও এতদিনে হয়তো জেনেছেন। পুরন্দর বলতেন, জঙ্গলে তিনি যান তাঁর প্রেমিকার টানে। যে প্রেমিকাকে কিনা বন্দি করে রাখা হয়েছে, আর যার গায়ের রং একেবারে কাঁচা হলুদের মতো। তা প্রথমদিন যখন পুরন্দর মিশ্রকে এটা আমি বলতে শুনি, তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল যে, এটা ঠাট্টা নয়, আসলে, তিনি কোনও স্ত্রীলোকের কথা বলছেন না। তা হলে কীসের কথা বলছেন? একটুখানি চিন্তা করতেই ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। বুঝতে পারি যে, আসলে তিনি সোনার কথা বলছেন। সেই সোনা, যা মাটির তলায় কি পাহাড়ের স্তরে কি কোয়ার্জের খাঁজে বন্দি হয়ে থাকে। তবে সত্যি কথাই বলি, তাঁর প্রেমিকার গায়ের রং যে কাঁচা হলুদের মতো, এই কথাটাও যদি না তিনি জানাতেন, তা হলে হয়তো আসল রহস্যটা এত সহজে আমি ধরতে পারতুম না।”
কপুরসাহেব ফুঁসে উঠে বললেন, “তা এ-সব কথার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?”
“সম্পর্ক আর কিছুই নয়, সোনা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কপুরসাব, ইউ আর এ ভেরি ক্লেভার ম্যান, তাই পুরন্দর মিশ্র যা ঠাট্টা করে বলতেন, তার অর্থটা আপনিও ধরে ফেলেছিলেন। সোনার হদিসটা জানিয়ে দেবার জন্যে চাপও দিয়েছিলেন পুরন্দরের উপরে। কিন্তু তিনি হদিসটা কিছুতেই দিলেন না। ফলে একদিন রাত্তিরবেলায় প্যালেস কম্পাউন্ডের ঠিক বাইরে নদীর ঘাটে তাঁকে ডাকিয়ে আনলেন আপনি, আর তারপরেই লোকটার মাথা ফাটিয়ে নদীর জলে তাঁকে ভাসিয়ে দিলেন। ডেডবডিটা যে ঘাটের কাছে একটা পাথরে আটকে যায়, তাতে সুবিধেই হল আপনার। প্যালেসের ডাক্তারবাবুকে দিয়ে আপনি বলিয়ে নিতে পারলেন যে, ওই পাথরটাতে ধাক্কা খেয়েই বন্দর মিশ্রের মাথা ফেটেছে।”
“বাজে কথা! ডাহা মিথ্যে কথা! অল বেসলেস অ্যালিগেশান্স! যা বলছেন তার প্রশাণ কী?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “সে-কথা পরে হবে। আপাতত অন্য-একটা প্রশ্ন করি। বড় কুমার শঙ্করনারায়ণকে বঞ্চিত করে ছোটকুমার রূপনারায়ণকে আপনি সিংহাসনে বসাতে চাইছেন কেন?”
“আমি একা চাইব কেন? সব্বাই চায়। সব্বাই জানে যে, ববি ইজ মেন্টালি আনস্টেবল্ অ্যাড শুড ইমিডিয়েটলি বি সেন্ট টু অ্যান অ্যাসাইলাম। হি ইজ ম্যাড, কমপ্লিটলি অফ হিজ রকার . “
“হুইচ ইজ এ ডেপিকেব্ল লাই!” ভাদুড়িমশাই শান্ত গলায় বললেন, “আমরা জানি, ববি পাগল নয়, হি ইজ অ্যাজ নর্মাল অ্যাজ এনি আদার ইয়াং ম্যান। স্রেফ আপনাদের ধোঁকা দেবার জন্যেই তাকে পাগলামির ভান করতে হত। হালে অবশ্য সেটাও আপনি টের পেয়ে যান, আর সেইজন্যেই স্রেফ প্রাণের ভয়ে প্যালেস ছেড়ে পালাতে হয়েছে তাকে।”
“কোথায় গেছে ববি?”
“তার তো আঠারো বছর পূর্ণ হতে আর বাকি নেই। আর তাই সেইখানেই সে গেছে, যেখান থেকে ছ’মাস বাদেই বিষাণগড়ের সিংহাসন ফ্রেম করে সে ভাইসরয়ের কাছে চিঠি পাঠাতে পারবে। ফর ইয়োর ইনফরমেশান, আমিই তাকে রায়পুরে নিয়ে গিয়ে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসেছি। …কিন্তু সে-কথা থাক, যেটা আমি জানতে চাইছিলুম, সেইটে বরং বলুন। হতে পারেন আপনি দেওয়ান, কিন্তু সেও তো চাকরি ছাড়া আর কিছুই নয়। আপনি একজন চাকর মাত্র। মেবি এ ফ্যাট-স্যালারিড ওয়ান, বাট এ সার্ড্যান্ট অল দি সেম। তা হলে আর কে আপনার মনিব হবে, ববি না রূপ, তা নিয়ে আপনার এত চিন্তা কীসের? ববিকে মেন্টাল হোমে পাঠিয়ে রূপকে সিংহাসনে বসাবার জন্যে আপনি এত ব্যস্ত কেন?”
কপুরসাহেবের চোখেমুখে রাগ যেন ফেটে পড়ছিল। কিন্তু তিনি একটা কথাও বললেন না। চুপ করে বসে রইলেন।
ভাদুড়িমশাই বললেন, “বুঝতে পারছি, আপনি কিছু বলবেন না। কেন বলবেন না, তাও আমি জানি। কপুরসাহেব, ভুলে যাবেন না যে, এখানে পাঠাবার আগে বেশ কয়েক মাসের জন্যে আমাকে যেমন মাধোপুর, তেমনি ধুল্সর স্টেট থেকে ঘুরিয়ে আনা হয়েছিল। তা বিষাণগড় প্যালেসে আমাদের লোক রয়েছে, আর ধুল্সর প্যালেসে থাকবে না, তাও কি হয় নাকি? আছে কপুরসাহেব, সেখানেও আছে, আর তাই রূপেন্দ্রনারায়ণকে রাজা করবার জন্যে আপনার এই ব্যস্ততার কারণটাও আমি সহজেই বুঝতে পারি। … না না, আপনার ভয় পাবার কিছু নেই, ধুল্সর প্যালেসের সেই স্ক্যান্ডালটার কথা আমি জানি ঠিকই, কিন্তু আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, আর-কাউকে তা আমি জানাব না। কেন জানাব না জানেন? যেহেতু একজন ভদ্রমহিলারও মানসম্মান এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।”
আবার একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন ভাদুড়িয়শাই। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে মৃদুগলায় বললেন, “ভদ্রমহিলার জন্য আমার দুঃখ হয় অল্পবয়সে একটা ভুল করে ফেলেছিলেন, তার জন্যে তাঁর অনুশোচনার অন্ত নেই, অথচ সেই ভুলের মাসুল তাঁকে এখনও দিয়ে যেতে হচ্ছে। না, তাঁর যে এ-ব্যাপারে কোনও দোষ আছে, তা আমার মনে হয় না। যাকে পেটে ধরেছেন, তাকে কি আর তিনি ভালবাসেন না? বাসেন। সেটাই তো স্বাভাবিক। তাই বলে যে তিনি আর-কারও ক্ষতি করতে চান, তা কিন্তু নয়। তাঁর সঙ্গে তো কতবারই কথা বলেছি আমি। কিন্তু প্রতিবারই এই ধারণা নিয়ে ফিরেছি যে, শি ইজ এ্যাড-ফিয়ারিং সেল্ফ রেসপেক্টিং উয়োম্যান। আপনার সে-ক্ষেত্রে না আছে ধর্মভয়, না আত্মসম্মানবোধ। থাকবেই কী করে? আপনার যে বড্ড বেশি লোভ। ছিলেন তো ধুল্সর প্যালেসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, যেই সেখানকার ছোট রাজকুমারীর সঙ্গে ধূর্জটিনারায়ণের বিয়ে হল, অমনি সেই স্ক্যান্ডাল ফাঁস করবার ভয় দেখাতে শুরু করলেন আপনি। ভয় দেখাতে লাগলেন যে, কেলেঙ্কারির কথাটা এখানে সবাইকে বলে দেবেন। তাতে কাজও হল। ধূর্জটিনারায়ণ মারা যেতেই এখানে এসে আপনি শুরু করলেন আপনার খেল, পুরনো আমলের দেওয়ান আচারিয়াসাহেবকে হটিয়ে দিয়ে তাঁর চেয়ারটা দখল করতে আপনার বিশেষ দেরিও হল না। এদিকে আবার ডিকি উইলসন আপনার তাবৎ কুকর্মের সঙ্গী, ফলে তার সুপারিশে ‘সার’-খেতাবটাও দিব্যি আপনি বাগিয়ে নিয়েছেন।”
রহস্যটা আমার কাছে একেবারে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। শুধু বুঝতে পারছিলুম না যে, কুলদীপ সিংয়ের কথাটা এখনও উঠছে না কেন।
ভাদুড়িমশাই আর-একটা সিগারেট ধরালেন। লম্বা একটা টান মেরে, বেশ খানিকটা ধোঁয়া টেনে নিলেন তাঁর ফুসফুসের মধ্যে। তারপর গলগল করে সেটা বার করে দিয়ে বললেন, “কিন্তু কপুরসাব, তাতেও আপনার শান্তি নেই। প্যালেসের সোনাদানা কতটা কী আপনি হাতিয়েছেন জানি না, তবে জঙ্গলের সোনার দিকেও যে হাত বাড়িয়েছেন, সে তো দেখতেই পাচ্ছি। আরও আরও সোনা চাই আপনার, আর সেই সঙ্গে চাই আরও আরও ক্ষমতা। তা সেই সোনার জন্যে একটার পর একটা মানুষকে আপনি খুন করে চলেছেন, আর অন্যদিকে যে কিনা সত্যিই মেন্টালি আনস্টেবল, সেই ছোট কুমারের বকলমে ডিফ্যাক্টো রাজা হবার জন্য তাকেই বসাতে চাইছেন বিষাণগড়ের সিংহাসনে। নইলে যে আপনার ক্ষমতার খিদে মেটে না। কী, আমি কি ভুল বলছি?”
সার ত্রিবিক্রমের মুখের উপরে এতক্ষণ ভয় আর ক্রোধ খেলা করে বেড়াচ্ছিল। তার বদলে এবারে যা ফুটে উঠল, একেবারে নির্ভেজাল ধূর্ততা ছাড়া তা আর কিছুই নয়। ব্যঙ্গের গলায় তিনি বললেন, “বাট ইউ কান্ট প্রুভ এনিথিং। কোনও প্রমাণই তো নেই।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকলেই বা কী হত! এটা নেটিভ স্টেট, এখানে পুলিশও আপনার, আদালতও আপনার। তাই ও-সব জায়গায় যাবার কথা আমি ভাবছিই না। আমি অন্য কথা ভাবছি। কিন্তু তার আগে বরং এই ছবিগুলো আপনি দেখুন।”
পকেট থেকে বার করে একটা প্যাকেট তিনি সার ত্রিবিক্রমের দিকে ছুড়ে দিলেন।
এটা কি পামেলার দেওয়া সেই প্যাকেট? জানি না। সেই প্যাকেটে যে কিছু ছবি ছিল, তা অবশ্য জানি, কিন্তু সেগুলি কীসের ছবি, তা আমার জানা নেই। ইচ্ছে করলে জানা যেত, কিন্তু পামেলার নিষেধ ছিল, তাই জানতে চাইনি। সেই ছবিগুলিই ভাদুড়িমশাই কপুরসাহেবকে দেখতে দিলেন কি না, কে জানে। আমি শুধু এটুকুই দেখলুম যে, প্যাকেট খুলে তার ভিতরের জিনিসগুলির উপরে চোখ বুলিয়েই সার ত্রিবিক্রমের মুখ একেবারে ছাইয়ের মতন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। পরক্ষণেই তিনি ভাদুড়িমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “এগুলি কোথায় পেলেন আপনি?”
“তা বলব না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপাতত শুধু এইটুকু বলতে পারি যে, এগুলি প্রিন্টের প্রিন্ট। মূল প্রিন্টগুলি একটা সিল্ড কভারে আমাদের দিল্লি-অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি। দিল্লি-অফিস আমাকে জানিয়েও দিয়েছে যে, কভারটা সেখানে আমাদের লকারে তুলে রাখা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, কভারে কী আছে, তা তারা জানে না।”
“এগুলি দিয়ে কী করবেন আপনি?”
“বললুম তো, আমি অন্য ব্যবস্থার কথা ভাবছি। পুলিশের কাছে ধর্না দিয়ে লাভ নেই, তাদের আপনি কিনে রেখেছেন। তাই ভাবছিলুম যে, আইনটা এবারে নিজের হাতেই তুলে নেব। খুবই মূল্যবান ছবি তো, তাই দশটা প্রিন্ট করিয়ে রেখেছি। তার থেকে একটা সেট যদি রানি-মা’র কাছে পাঠিয়ে দিই, তো কেমন হয়?”
কপুর সাহেবের মুখ থেকে সেই ধূর্ত হাসিটা অনেক আগেই মিলিয়ে গিয়েছে। রাগের আর চিহ্নমাত্র নেই, তার বদলে যে ফুটে উঠেছে, তা ভয়, শুধুই ভয়। ঘর্মাক্ত মুখ, কপালে অসংখ্য বলিরেখা, একজন জাঁদরেল মানুষের এমন বিধ্বস্ত চেহারা এর আগে আর কখনও দেখিনি। হাতের ছবিগুলিকে প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতে-রাখতে তিনি বললেন, “মিঃ ভাদুড়ি, আপনি কি আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে চান?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “যে ব্ল্যাকমেল করে, তাকে পালটা ব্ল্যাকমেল করায় কোনও দোষ নেই, কপুরসাহেব। ইউ আর জাস্ট বিয়িং পেইড ইন ইয়োর ওউন কয়েন।”
“কত টাকা চান আপনি?”
“এক পয়সাও চাই না।” ভাদুড়িম। ই বললেন, “আসলে কয়েকজন মানুষকে আমি বাঁচাতে চাই। …না না, আমি ববির কথা ভাবছি না, নাউ দ্যাট হি ইজ ইন মাধোপুর, হি ক্যান ভেরি ওয়েল লুক আফটার হিমসেলফ। আমি ভাবছি অন্য কয়েকজনের কথা, অ্যান্ড মাই ফ্রেন্ড মিঃ চ্যাটার্জি ইজ অফ কোর্স ওয়ান অত দেন। স্রেফ এঁদের কথা ভেবে দুটো স্টেটমেন্ট আমি তৈরি করে রেখেছি। তাতে সই করে দিন, তা হলেই এই দশ সেট ছবি আমি বিনামূল্যে আপনাকে দিয়ে দেব। তবে কিনা না-আঁচালে তো বিশ্বাস নেই, ওরিজিন্যাল প্রিন্টগুলো তাই ছ’মাসের আগে ফেরত পাবেন না।”
“কী আছে ওই স্টেটমেন্ট দুটোতে?”
“একটায় লেখা আছে যে, বিষাণগড়ের দেওয়ানের চাকরিতে আপনি ইস্তফা দিচ্ছেন, উইথ ইমিডিয়েট এফেক্ট। আর অন্যটায় আপনি বিষাণগড় পুলিশের বড়কর্তা অর্জুন প্রসাদকে নির্দেশ দিচ্ছেন, মিঃ কিরণকুমার চ্যাটার্জির বিরুদ্ধে যে ওয়ারেন্ট অভ অ্যারেস্ট ইস্যু করা হয়েছে, দ্যাট শুড বি উইথড্রন অ্যাট ওয়ান্স।”
“যদি সই না করি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “দেখুন কপুরসাহেব, মিথ্যে বলে লাভ নেই, সই যদি আপনি নাও করেন তো সেক্ষেত্রে ওই কুচ্ছিত ছবিগুলো আমি যশোমতী দেবীর কাছে পাঠাতে পারব না, আমার রুচিতে বাধবে। তা হলে আমি কী করব? না যার কাছ থেকে পেয়েছি, তাকেই ওগুলো ফেরত দিয়ে দেব। সে ওগুলো নিয়ে কী করবে, আমি জানি না। সে যদি আপনাকে ব্ল্যাকমেল করে তো করুক, দ্যাটস্ নান্ অভ মাই বিজনেস। আই শ্যাল জাস্ট ওয়াশ মাই হ্যান্ডস্ অভ ইট। আমার পথ আমি ঠিক করে রেখেছি। যা করব, তা অবশ্য আপনার পছন্দ হবে না, কিন্তু সেটা না-করেও আমার উপায় নেই।”
রিভলভারটাকে এতক্ষণ বাঁ হাতে ধরে রেখেছিলেন ভাদুড়িমশাই, এবারে সেটা ডান হাতে নিয়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কপুর সাহেবের চোয়াল দেখলুম ঝুলে পড়েছে। ভাঙা ফ্যাসফেসে গলায় তিনি বললেন, “কী করবেন আপনি?”
একেবারে নিরুত্তেজভাবে ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনাকে মেরে ফেলব। কিন্তু এমনভাবে মারব, যাতে কেউ না বুঝতে পারে যে, এটা মার্ডার। কীভাবে সেটা করব, তাও জানিয়ে দিচ্ছি। প্রথমেই আপনার ঘাড়ের একটা জায়গায় আমি ছোট্ট একটা আঘাত করব। তাতে আপনার শরীরে ফোনও দাগ পড়বে না, কিন্তু তৎক্ষণাৎ আপনি জ্ঞান হারাবেন। সেই অবস্থায় একটা গাড়িতে তুলে এখান থেকে মাইল পনরো দূরে একটা জঙ্গুলে জায়গায় আপনাকে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানে আপনার হাতের একটা শিরা আমরা কেটে দেব, সো দ্যাট ইউ ব্লিড টু ডেথ হোয়াইল ইউ আর স্টিল মানকনশাস। এইবার দেখুন, আপনার শরীরের পাশে আমরা কী রেখে দেব।”
স্যুটকেসটা সোফার কাছেই দাঁড় করানো ছিল। সেটা খুলে রুমালে জড়ানা ছোরাটা বার করে আনলেন ভাদুড়িমশাই। বললেন, “এইটে আপনার শরীরের পাশে পড়ে থাকবে। আপনারই ছোরা। আপনারই আঙুলের ছাপ রয়েছে এতে। আর তাই পুলিশ ধরে নেবে যে, এটা আত্মহত্যার ঘটনা।”
এত স্থির, এত শান্ত অথচ একই সঙ্গে এত কঠিন গলায় ভাদুড়িমশাই এই কথাগুলি বলে গেলেন যে, আমি পর্যন্ত ভিতরে-ভিতরে শিউরে উঠলুম। কপুর সাহেবও বুঝতে পেরেছিলেন যে, এ-সব নিতান্ত কথার কথা নয়। দেখলুম, তাঁর কপাল থেকে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে।
কয়েক পা এগিয়ে সার ত্রিবিক্রমের পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ভাদুড়িমশাই। বাঁ হাতের তালুটাকে আড়াআড়িভাবে তাঁর ঘাড়ের উপরে রেখে বললেন, “হ্যাঁ, এই জায়গায়। কিন্তু তার আগে আমি তিন পর্যন্ত গুনব। এক … দুই …”
‘তিন’ বলতে হল না। তার আগেই কপুরসাহেব বললেন, “স্টেটমেন্ট দুটো দিন, আমি সই করে দিচ্ছি।”
স্টেটমেন্ট আর কলম ডঃ সিদ্দিকির কাছে ছিল। তিনি সেগুলি ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। কাগজে সই হয়ে গেল। ভাদুড়িমশাই তাঁর স্যুটকেস খুলে বেশ বড় একটা প্যাকেট বার করে কপুরসাহেবের হাতে সেটা তুলে দিয়ে বললেন, “বাকি ন’টা সেট এর মধ্যে রইল। যে-সেটটা আপনাকে দিয়েছি, সেটাও এর মধ্যে ঢুকিয়ে রাখুন। তবে হ্যাঁ, ওরিজিন্যাল প্রিন্টগুলি তো দিল্লিতে। সেটা এখন পাবেন না। বাই দ্য ওয়ে, দিল্লি অফিসকে ইনস্ট্রাকশন দিয়ে রেখেছি, এই জুলাই মাসের মধ্যে যদি আমার কিংবা মিঃ চ্যাটার্জির কিংবা বিষাণগড় প্যালেসে কারও অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে, তা হলে আবার সেই ওরিজিন্যাল ফোটো থেকে তিন সেট প্রিন্ট করিয়ে তারা যেন তিন জায়গায় পাঠিয়ে দেয়। একটা সেট আসবে ছোট রানি-মা’র কাছে, একটা সেট যাবে মাধোপুর স্টেটের মহারাজার কাছে, অ্যান্ড দি থার্ড সেট উইল গো টু মিঃ আচারিয়া। …ওহো, একটা কথা তো আপনাকে বলা-ই হয়নি। আপনার প্রিডিসেসর মিঃ আচারিয়া এখন ভাইসরয়ের খুবই কাছের মানুষ, অ্যান্ড হি উইল বি এক্সট্রিমলি হ্যাপি টু রিসিভ এ সেট অভ্ দিজ বিউটিফুল ফোটোগ্রাফ্স।”
কপুরসাহেব ডিভান থেকে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “তার দরকার হবে না। সাতটা দিন সময় দিন আমাকে, তার মধ্যেই আমি বিষাণগড় থেকে চলে যাব। এবার কি আমি প্যালেসে ফিরতে পারি?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমরাই আপনাকে ফিরিয়ে দিয়ে আসব। তবে তার আগে চোখ বেঁধে দেব আপনার, যাতে কিনা আপনি বুঝতে না পারেন যে, কোথায় এনে আপনাকে তোলা হয়েছিল।”
সেই ব্যবস্থাই হল। কিন্তু শুধু চোখ বেঁধে দিয়েই নিশ্চিন্ত হলেন না ভাদুড়িমশাই, ওই অবস্থাতেও বিস্তর রাস্তা ঘুরিয়ে তারপর কপুরসাহেবকে প্যালেসের কাছাকাছি একটা ফাঁকা জায়গায় নিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিলেন। রাত তখন প্রায় চারটে।
বললুম, “আমি এখন কী করব?”
ভাদুড়িমশাই তাঁর পকেট থেকে একটা খাম বার করে আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এতে কিছু টাকা রইল। রেখে দিন। পরে শোধ করে দেবেন। এখন আমরা রায়পুর যাব। সেখান থেকে আপনি কলকাতার ট্রেন ধরবেন। আমি চিঠি লিখব আপনাকে। সে-চিঠি না পাওয়া পর্যন্ত আপনি বিষাণগড়ে ফিরবেন না।”
