বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১২

গ্র্যাড হোটেলে ইন্টারভিউয়ের ডাক পাবার পর মধ্যপ্রদেশ সম্পর্কে যা-কিছু জানা দরকার, মোটামুটি তা জেনে নিয়েছিলুম। কিন্তু যে-সব বই তখন পড়ি, তাতে ব্রিটিশ-শাসিত এলাকা সম্পর্কে যত তথ্য ছিল, মধ্য-ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে তার অর্ধেক কেন সিকিভাগ তথ্যও ছিল না। তো-এসব হল ভারত স্বাধীন হওয়ার আগের কথা, সেই ছেচল্লিশ সালের ব্যাপার। তারপরে তো ওলট-পালট কম হল না, দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখনই বা আজকের ভারতে যা কিনা আয়তনে সবচেয়ে বৃহৎ রাজ্য, সেই মধ্যপ্রদেশ ছিল কোথায়। স্বাধীনতার ন’মাস বাদে, ১৯৪৮ সালের ২৮ মে তারিখে, এই এলাকার তাবৎ দেশীয় রাজ্যকে একই শাসনব্যবস্থার সুতোয় গেঁথে যখন মধ্যভারত ইউনিয়ন গড়া হল, আর গোয়ালিয়রের মহারাজা জিয়াজি রাও সিন্ধিয়াকে করা হল তার রাজপ্রমুখ, আজকের এই মধ্যপ্রদেশ তখনও জন্ম নেয়নি। এর জন্ম তো আরও আট বছর বাদে, ১৯৫৬ সালে। মধ্যভারত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘটিয়ে আর সেইসঙ্গে আগেকার সেই ব্রিটিশ শাসিত সেন্ট্রাল প্রভিন্সের চোদ্দোটি জেলাকে মিলিয়ে দিয়ে তৈরি করা হল ভারতের এই বৃহত্তম রাজ্যটিকে, যার আয়তন এখন প্রায় সাড়ে চার লক্ষ বর্গ কিলোমিটার। ইউরোপের মানচিত্রের উপরে একবার চোখ বুলিয়ে নিন, তা হলেই বুঝতে পারবেন যে, ওখানকার বহু ছোটখাটো দেশকে আমাদের এই মধ্যপ্রদেশ এখন অক্লেশে গিলে খেতে পারে, আর তা খাবার পরেও তার পেটের ভিতরকার সবখানি জায়গা ভরাট হবে না।

তো সে-কথা থাক। আমি তো আর এই আমলের কাহিনি শোনাচ্ছি না, বলছি সেই আমলের কথা, দেশের এই বিরাট এলাকার অনেক খবরই যখন আমাদের কানে এসে পৌঁছত না। বিশেষ করে এখানকার দেশীয় রাজ্যগুলি সম্পর্কে আমাদের ধারণা ছিল নেহাতই অস্পষ্ট। আমরা মোটামুটি এইটুকু জানতুম যে, এ-সব রাজ্যের কোনওটা খুবই বড়, আবার কোনওটা খুবই ছোট মাপের, কারও বার্ষিক আয় বিরাট অঙ্কের, আবার কারও আয় এতই কম যে, ছোটখাটো অনেক জমিদারির আয়ও তার চাইতে অনেক বেশি। ভাসাভাসাভাবে এটাও আমাদের জানা ছিল যে, এই রাজ্যগুলির কোনও-কোনওটার শাসনব্যবস্থা খুবই আধুনিক, সেখানে সবই চলে আইনমাফিক, প্রজারা তাই মোটামুটি সুবিচারও পায়, তবে কিনা বেশির ভাগ রাজ্যেই জমে আছে মধ্যযুগের অন্ধকার, সেখানে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই, রাজারাই সেখানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তাঁরা তাঁদের খেয়ালখুশিমতো রাজ্য চালান, আর তাঁদের বিলাসব্যসনের কড়ি জোগাতেই প্রজাদের প্রাণ বেরিয়ে যায়।

তা এই অত্যাচারের কথা শুধু রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতা শুনেই জানা যেত, বইপত্তরে এ-সবের উল্লেখ থাকত না। সেটাই স্বাভাবিক। কেননা, বইগুলো তো ইংরেজদের লেখা, দেশীয় রাজারা তাদের বন্ধু, তাঁদের অত্যাচারের কাহিনী কেন সাহেব-লেখকরা ফাঁস করতে যাবে। তার উপরে যাবার আমি যে-সব বই তখন জোগাড় করতে পেরেছিলুম, তাতে এই এলাকার দেশীয় রাজ্যগুলির শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে ভাল-মন্দ কোনও কথাই ছিল না। তবে এই গোটা ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক সম্পদের আলোচনা ছিল বিস্তারিত। তাতে এই একটা সুবিধে আমার হয়েছিল যে, এখানকার ভূপ্রকৃতি, অরণ্য আর খনিজ সম্পদ সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা আমি করে নিতে পেরেছিলুম। এখানে জানিয়ে রাখি, বিষাণগড়ে থাকতে এই ধারণাটা আমার খুব কাজে লেগেছিল।

বিষাণগড় রাজ্যটা যে বড়, তা নয়। তবে এই এলাকায় অতিশয় ক্ষুদ্র রাজ্যও তো বিস্তর আছে, তাদের সঙ্গে তুলনা করলে কিন্তু বিষাণগড়কেও নেহাত ছোটখাটো রাজ্য বলা যাবে না। এর আয়তন বিশ হাজার বর্গ-কিলোমিটারের চেয়েও কিছু বেশি, অর্থাৎ আমাদের হুগলি জেলার যে আরামবাগ মহকুমা, তার আয়তনের মোটামুটি বিশগুণ; এদিকে আবার এখনকার আরামবাগের লোকসংখ্যা তো প্রায় দশ লক্ষ, সেক্ষেত্রে বিষাণগড় রাজ্যের লোকসংখ্যা পাঁচ-ছ লাখের বেশি তো নয়ই, কিছু কমও হতে পারে। তারও মোটামুটি বারো আনাই যে ট্রাইবাল পপুােশন, এই তথ্যটা ডঃ সিদ্দিকির কাছে জেনেছিলুম।

বিষাণগড়ের রাজধানীর নামও বিষাণগড়। এটাই এ-রাজ্যের একমাত্র শহর। লোকসংখ্যা হাজার পনরো। গোটা কয়েক স-মিল অর্থাৎ করাত-কল আছে, দুটো রাইস মিল আছে, দুটো ইটখোলা আছে, আর আছে ছোটবড় কিছু দোকান। এ-সব ব্যাবসার সবই চালায় মারোয়াড়ি আর গুজরাটিরা। কিছু লোক সেখানে কাজ করে আর কিছু লোক রাজ-এস্টেটের নানান দফতরে। শহরে জল সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। যাঁরা মোটামুটি সচ্ছল লোক, নিজেদের জলের ব্যবস্থা তাঁরা নিজেরাই করে নিয়েছেন। তা ছাড়া, সব রাস্তায় না হোক, বড়-বড় তিনটি রাস্তার প্রত্যেকটিতেই আছে চার-পাঁচটি করে সরকারি টিউবওয়েল। গরিব মানুষদের সবাই যে যেখান থেকে খাবার জল নিয়ে যায়, তা অবশ্য নয়, তাদের ভরসা সর্সোতিয়া নদী আর গুটিকয় দিঘি। কিছু বাড়িতে ইঁদারা আছে, তার জল শুনেছি খুবই স্বাস্থ্যকর।

বিষাণগড়ে একটা আদালত আছে। কলেজ নেই। একটি উচ্চ-ইংরেজি বিদ্যালয় আছে, আর আছে দুটি মাইনর ইস্কুল। সেখানে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ানো হয়।

রাজ্যের মোট জনসংখ্যার শতকরা যারা পঁচাত্তর ভাগ, সেই ট্রাইবালরা শহরে থাকে না। এ-বাজ্যে জঙ্গল আছে প্রচুর, পাহাড়িয়া এলাকাও কম নয়। সমতল ভূমি বলতে গেলে চোখেই পড়ে না। পাহাড়ে আর জঙ্গলেও অবশ্য কিছু-কিছু ফাঁকা জায়গা রয়েছে, সেখানে চাষও অল্পবিস্তর হয়। ট্রাইবালদের মধ্যে সবাই যে একই গোষ্ঠীর লোক, তা নয়, তাদেরও অনেক গোষ্ঠী। কিছু-কিছু গোষ্ঠীর লোক চাষবাস করে, তাঁত বোনে, এখানে একরকমের শণ জন্মায়, তা দিয়ে মাদুর বানায়। কিছু-কিছু লোক সে-সবের ধার ধারে না।

বিষাণগড়ের খনিজ সম্পদ নিতান্ত কম নয়। লোহা আছে, ম্যাঙ্গানিজ আছে, আর আছে কয়লা। তবে রাজ্যের যা আয়, তার বেশির ভাগই আসে জঙ্গল থেকে। জঙ্গলে যেমন শাল, তেমন সেগুনও প্রচুর। রাজ-এস্টেট থেকে জঙ্গল ইজারা দেওয়া হয়। মূল্য বাবদে যা মেলে, তার সবটাই রাজ-এস্টেটের। জঙ্গলের যারা বাসিন্দা, তারা একপয়সাও পায় না। গাছপালা কাটবার অধিকার তাদের নেই; তবে হ্যাঁ, শুকনো মরা ডালপালা তারা কুড়িয়ে নিতে পারে।

এ রাজ্যের সব নদীই পাহাড়িয়া নদী। শীতকালে তিরতির করে বয়, গ্রীষ্মে প্রায় শুকিয়ে যায়, আবার বর্ষাকালে মাঝেমধ্যে এমন ঢল নামে যে, সেইসময়ে স্রোতের মধ্যে পড়লে বোধহয় হাতিও ভেসে যাবে। নদীগুলির মধ্যে সর্সোতিয়াই বড়। মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়ায় এই বিষাণগড় শহরের বাহারও খুলেছে খুব। বিশেষ করে তার পুব দিকে এই প্যালেস রোডের তো তুলনাই নেই’ বেড়াবার পক্ষে যাকে বলে একেবারে আদর্শ জায়গা। বিষাণগড়ে ইতিমধ্যে আমার পুরো একমাস কেটে গেছে। এখন মার্চ মাসের মাঝামাঝি। কলকাতায় এইসময়ে রীতিমত গরম পড়ে যায়, দুপুরের দিকে রাস্তাঘাট বেশ তেতে ওঠে। এখানে কিন্তু এখনও তত গরম পড়তে দেখছি না। ভোরে আর সন্ধের পর থেকে তো এখনও একটু শীত-শীত করে। হাল্কা একটা চাদর গায়ে থাকলে তখন আরাম বোধ করি।

সাধারণত আমি আজকাল ভোরেই ঘুম থেকে উঠি, তবে সকালের দিকে আর বেড়াতে যাওয়া হয় না। দফতরের কাজ চুকে যাবার পরে লছমি আমার সারাক্ষণের সঙ্গী। তখন সে আর আমাকে ছাড়তে চায় না। তার তাগাদায় বিকেলের দিকে প্রায় রোজই এখন সর্সোতিয়ার ধারে বেড়াতে যাই। তখন ডঃ সিদ্দিকি আর ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দেখাও হয়ে যায়। নদীর ধারে মাঝে-মাঝেই লোহার বেঞ্চি পাতা। খানিক হাঁটবার পরে তারই কোনও একটায় বসে পড়ি আমরা। নানান ব্যাপারে গল্প হয়। লছমি আমার গা ঘেঁষে তখন চুপটি করে বসে থাকে।

সেদিনও গল্প হচ্ছিল। কথায়-কথায় সসোতিয়ার প্রসঙ্গ উঠল। বললুম, “নামটার মানে কী? এটা কি কোনও ট্রাইবাল শব্দ?”

শুনে ডঃ সিদ্দিকি হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর হাসি থামিয়ে বললেন, “আরে না মশাই। আসলে নামটা হচ্ছে সরস্বতী, লোকের মুখে-মুখে সেটাই সর্সোতিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

“কিন্তু সরস্বতী নদী এখানে কী করে এল?”

“এখানে বলে কথা নেই, আরও নানা জায়গায় আছে। আপনাদের বেঙগলেও একটা সরস্বতী ছিল, কিন্তু সেই নদী এখন হেজেমজে গেছে। আসলে ব্যাপার কী জানেন, একই নামের নদী রয়েছে ইন্ডিয়ার হরেক এলাকায়। এই যেমন যমুনা। তো দিল্লিতে যেমন যমুনা রয়েছে, তেমনি ইস্টবেঙ্গলেও ওই নামের একটা নদী আপনি দেখবেন। এ-সব আলাদা-আলাদা নদী, কিন্তু একই নাম।”

প্যালেসের কথাটাও সেদিন তুলেছিলাম। তাতে নাক কুঁচকে ডঃ সিদ্দিকি < বলেন, “আরে দূর দূর, এখানকার এই রাজবাড়িটা তো একটা হচপচ ব্যাপার। গথিক, রেনেসাঁস, বারোক, ভিকটোরিয়ান, সব মিলিয়ে একটা জগাখিচুড়ি। অথচ, মজা কী জানেন, প্যালেস কমপ্লেক্সের যেটা মূল বাড়ি, সেটা ছিল রাজস্থানি-ধঁচের। আমার ঠাকুর্দার কাছে অন্তত সেইরকমই শুনেছি। তাঁর ছেলেবেলায় সেই বাড়ি তিনি দেখেওছেন। চমৎকার বাড়ি। তো এইট্রিন থার্টিতে সেই বাড়িটাকে ঘিরে নতুন-নতুন উইং গড়বার কাজ শুরু হয়ে যায়। বিলেত থেকে আর্কিটেক্‌ট নিয়ে আসা হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে ছিল হরেক স্টাইলের নকশা। তা তো থাকতেই পারে। সম্ভবত তিনি আশা করেছিলেন যে, তার থেকে একটা কোনও স্টাইল বেছে নেওয়া হবে। কিন্তু তা তো আর হল না, মহারাজা হলেই যে শিল্প সম্পর্কেও তাঁর কিছু জ্ঞানগম্যি থাকবে, এমন তো কোনও কথা নেই। তা তখন যিনি মহারাজা, তাঁর রুচির বালাইও বিশেষ ছিল না। ফলে তিনি ঢালাও হুকুম দিয়ে বসলেন, সব রকমের স্টাইল মিলিয়ে-মিশিয়ে প্যালেস তৈরি হোক। তো তা-ই হল। তার ফল যে কী হয়েছে, সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। অথচ এই পাঁচমিশেলি ব্যাপারটার মধ্যে যেটা ঢাকা পড়ে গেছে, তার কাজ দেখবেন। চোখের পলক পড়বে না।”

“রানি-মা কিন্তু এই নতুন আর্কিটেকচারাল প্যাটার্নেরই মস্ত ভক্ত। দেশীয় রাজাদের প্রাসাদ নিয়ে বিলেত থেকে একখানা বই বেরিয়েছে, তাঁকে সেই বইখানার কথা বলেছিলুম। তা সেখানা তিনিও দেখেছেন। তাতে বিষাণগড়ের রাজবাড়ির বিশেষ প্রশংসা নেই বলে দেখলুম রানি-মা’র খুব অভিমান।”

ডঃ সিদ্দিকি হেসে বললেন, “অভিমান তো হতেই পারে। রুচির বালাই তো তাঁরও বিশেষ নেই।”

“তিনি কিন্তু প্যালেস-আর্কিটেকচারের ব্যাপারে আপনাকে একজন অথরিটি বলে গণ্য করেন।”

“বটে?” ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “থাক্ থাক্, তা হলে আর আমার ওপিনিয়নটা তাঁকে জানাবেন না।”

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ চুপ করে সব শুনছিলেন। এবারে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “তা তো হল, এবারে আপনার নিজের কথা বলুন। খাওয়া-দাওয়ার কোনও অসুবিধে হচ্ছে না তো?”-

বললুম, “না না, খাওয়ার ব্যাপারে আমার কোনও খুঁতখুঁতি নেই, যা পাই তা-ই চেটেপুটে খাই। তার উপরে আবার এখানে যা খাচ্ছি, তা রাজবাড়ির কিচেন থেকে আসছে তো, সবই অতি উচ্চাঙ্গের খাদ্য।”

“ভাল, ভাল। তা কেয়ারটেকারের কাজটাও আশা করি খারাপ লাগছে না?”

“ওঃ হো, আপনাকে তো বলা-ই হয়নি। আমি আর এখন কেয়ারটেকার নই।”

“তা হলে কী?”

“প্যালেস-সুপারিন্টেন্ডেন্ট। কাজ অবশ্য পালটায়নি। তবে মাইনে বেড়েছে দেড়শো টাকা।”

ভাদুড়িমশাই চোখ গোল করে বললেন, “বটে? কবে থেকে?”

“এই মাসের গোড়া থেকে।”

“তাজ্জব ব্যাপার। মাত্র পনেরো দিনের মাথায় প্রোমোশান? আপনি মশাই ভাগ্যবান মানুষ! “

“তা-ই তো দেখছি। নইলে আর অমার নামে রানি-মা’র কাছে নালিশ করা সত্ত্বেও তিনি পানিশমেন্টের বদলে প্রোমোশানের ব্যবস্থা করবেন দেন? শুধু কি তা-ই, যে-লোকটি নালিশ ঠুকেছিল, তাকে একেবারে ঢিট্ করে দিয়েছেন, বলেছেন যে, ফের যদি সে আমার কথার অবাধ্য হয় তো প্যালেসের কাজ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকে জঙ্গলের কাজ দেখতে পাঠিয়ে দেবেন।”

“বাস্ রে!” ভাদুড়িমশাই একটা চোখ একটু ছোট করে বললেন, “আপনি দেখছি ছোটরানির নেকনজরে পড়ে গিয়েছেন। তো মশাই, এর মধ্যে কোনও কিন্তু-টিন্তু নেই তো?”

ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলুম। তাই লজ্জিত গলায় বললুম, “দূর দূর, কী যে বলেন!”

ডঃ সিদ্দিকি উঠে পড়েছিলেন। বললেন, “আমার একটু হাঁপানির টান আছে, তাই রাত্তিরের খাওয়া সাড়ে সাতটার মধ্যেই চুকিয়ে দিতে হয়। আজ তা হলে চলি।”

লছমি কিছুক্ষণ ধরে উশখুশ করছিল। তাই আমাকেও উঠতে হল। বললুম, “আমিও চলি। এখন বাড়িতে ফিরে এই ভদ্রমহিলাটিকে খাইয়ে দিতে হবে, গল্প শোনাতে হবে, তাইলে ইনি ছাড়বেন না।”

ফেরার পথে লছমি বলল, “চাচাজি, মানুষ মরে গিয়ে কী হয়?”

এই প্রশ্নটা লছমি রোজই করে। বললুম, “সে তো তোকে কতবার বলেছি। মনে নেই?”

“আছে। তবু বলো।”

“মানুষ তো মরে না, সে আকাশে উঠে আকাশের তারা হয়ে যায়।”

“আমার বাবুজিও আকাশের তারা হয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ, লছমি। আমিও তারা হয়ে গিয়েছিলুম। তোর বাবুজি তো আমার বড়-ভাইয়া, আকাশে উঠে সে আমাকে বলল, আমরা দুজনেই যদি আকাশের তারা হয়ে থাকি তো লছমিকে খাইয়ে দেবে কে, তাকে নিয়ে বেড়াতে যাবে কে, তাকে কহানিয়াঁই বা কে শোনাবে? না না, তুই ফিরে যা, নইলে লছমির খুব কষ্ট হবে। বাস্, আমিও তাই শুনে আকাশ থেকে নেমে পড়লুম। তো তুই তো বড় হবি। তখন আমি বরং আকাশে উঠে গিয়ে বড়-ভাইয়াকে এখানে পাঠিয়ে দেব।”

এই কথাগুলি যে আজই প্রথম বললুম, তা নয়। সেই প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি। কিন্তু এ-সব “কথায় লছমি রোজ যা করে না, আজ তা-ই করল। রাস্তার মধ্যে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে সে বলল, “চাচাজি, তুম্ জেরা মুঝে গোদ পর্ উঠা লো।”

কোলে তুলে নিতেই সে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল আমার গলা। তারপর আমার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট গলায় বলল, “নেহি চাচাজি, উ নেহি হো সকতা, পিতাজিকো যো-কুছ বোল্‌না হ্যায়, য়হাঁসেই বোলো, ম্যয় তুমকো জানে নেহি দুঙ্গি।”

বাড়ি না পৌঁছনো পর্যন্ত লছমি আর আমার কোল থেকে নামল না। মিশ্রজির কোয়ার্টার্সে ঢুকবার পরে নামল বটে, কিন্তু তার মা যখন বললেন যে, মুখহাত ধুয়ে, জামা পালটে এবারে তাকে খেতে বসতে হবে, তখন সে এক নতুন বায়না তুলে বসল। বলল, “চাচাজি আমার মুখহাত ধুইয়ে দেবে।”

লছমির মা যমুনা দেবীকে প্রথম প্রথম আমি ‘ভাবি’ বলতুম। পরে তাঁরই ইচ্ছেমতো ‘দিদি” বলতে শুরু করি। মেয়েকে শাসন করবার জন্যে তিনি হাত তুলেছিলেন, আমি তাঁকে বাধা দিয়ে বললুম, “ঠিক আছে দিদি, ওর যখন ইচ্ছে হয়েছে, তখন আজ নাহয় আমিই ওর মুখহাত ধুইয়ে জামা পালটে দিচ্ছি।”

গঙ্গাধর মিশ্রের স্ত্রী ইতিমধ্যে তাঁর ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ব্যাপার দেখে তিনি বললেন, “মেয়েটা তোমাকে পরেসান্ করে ছাড়ল বেটা।”

হেসে বললুম, “কিছু না, তাইজি, কিছু না। পরেসান কেন হব, আমার তো ভালই লাগছে।” যমুনা দেবী বললেন, “তো ঠিক আছে, ভাইয়া তোর মুখহাত ধুইয়ে দিক, জামা পালটে দিক, কিন্তু তারপর ওকে তুই ছেড়ে দিবি, কেমন?”

মাথা ঝাঁকিয়ে লছমি বলল, “নেহি নেহি। ছোডুঙ্গি নেহি। তারপর আমাকে খাইয়ে দেবে, তারপর আমাকে একটা গল্প ওনাবে…”

“তারপর?”

“তারপর আমি আজ উপরে গিয়ে চাচাজির কাছে ঘুমাব।”

লছমি অবশ্য শেষ পর্যন্ত আর উপরে আসেনি। ‘স্নো হোয়াইট’-এর গল্প শুনতে শুনতেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমারও যে একটু ক্লান্ত লাগছিল না, তা নয়। ভাবছিলুম, উপরে উঠে ভাল করে স্নান করে নেব।

উপরে উঠতে-উঠত দশটা। কিচেন থেকে রাত ন’টা নাগাদ আমার রাত্তিরের খাবারটা দিয়ে যায়। বুধন বলে একটি অল্পবয়সী ছেলে আমার ঘরদোর পরিষ্কার করে, গেঞ্জি-রুমাল কেচে দেয়, দরকারি টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে আনে। রাত আটটা নাগাদ আমি যখন বাইরে থেকে বেড়িয়ে ফিরি, তখন তার ছুটি। আজ আমি একতলায় আটকে গিয়েছিলম, তাই ফিরতে দেরি হয়েছে। বুধনকে অবশ্য বলাই ছিল এক-আধদিন হয়তো ফিরতে দেরি হয়ে যেতে পারে, সেক্ষেত্রে সে যেন বাড়ি চলে যায়। কিন্তু উপরে উঠে দেখলুম, বুধন তখনও বাড়ি যায়নি।

বললুম, “কী ব্যাপার? তুই এখনও বাড়ি যাসনি কেন?”

বুধন বলল, “আপনাকে একটা খবর দেবার আছে বাবুজি।”

“কী খবর?”

“কুলদীপ সিংজি বলে পাঠিয়েছেন যে, ফিরে এসে আপনি যেন একবার তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। খুব জরুরি।’

বিষাণগড়ে যাঁরা খুব ক্ষমতাশালী ব্যক্তি, কুলদীপ সিং যে তাঁদেরই একজন, সেটা জানতুম, কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়া তো দূরের কথা, মানুষটিকে আমি চোখে পর্যন্ত দেখিনি। শুনেছিলুম যে, রানি-মা’র সঙ্গে তিনিও পঞ্জাবে গিয়েছিলেন, কিন্তু দিল্লিতে কিছু কাজ ছিল বলে একসঙ্গে ফেরেননি। কাজ সেরে মাত্র গতকালই তিনি বিষাণগড়ে ফিরে এসেছেন। কী এমন জরুরি কাজে আমাকে তাঁর দরকার হল, বুঝতে পারলুম না। রাতের খাবারটা ঢাকা ছিল, ঢাকা-ই পড়ে রইল, তাড়াতাড়ি স্নান সেরে, পোশাক পালটে রওনা হলুম প্যালেসের দিকে।

প্যালেসের পশ্চিম দিককার কোন্ ঘরে তিনি বসেন, সেটা জানা ছিল। সেখানে যেতেই একজন বেয়ারা বলল, “সাব্ এখন দেওয়ানজির ঘরে আছেন, সেইখানেই যেতে বলেছেন আপনাকে।”

দেওয়ান সার্ ত্রিবিক্রম কপুরের ঘরে ঢুকে দেখলুম, একজন সাহেবের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন। ঘরে যে তৃতীয় ব্যক্তিটি বসে আছেন, তাঁকে আগেও দেখেছি। চোখে মনোক্‌ল, নাকের নীচে মোমে-মাজা ছুঁচলো-ডগার গোঁফ, এই মানুষটিকে আমি গ্র্যান্ড হোটেলে দেখেছিলুম। রানি-মা যে এঁকে ‘দীপ’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, তাও মনে পড়ল। ও হরি, ইনিই তা হলে কুলদীপ সিং।

দেওয়ানজি বললেন, “প্লিজ টেক ইয়োর সিট। …নাউ দীপ, তুমি ওঁকে কী বলবে বলো।”

কুলদীপ বললেন, “লুক হিয়ার মিঃ চ্যাটার্জি, ইট্‌স নো ইউজ বিটিং অ্যাবাউট দ্য বুশ… রূপ যখন একটা কুকুরকে তাড়া করে মন্দিরের দিকে ছুটে গিয়েছিল, তখন আপনি তাকে বাধা দিয়েছিলেন?”

প্রায় এক মাস আগের সেই ঘটনার প্রসঙ্গ যে আজ আবার কেন উঠল, কিচ্ছু বুঝতে পারলুম না। বললুম, “হ্যাঁ, বাধা দিয়েছিলুম। কিন্তু তিনি যে আমাদের ছোটকুমার, তা আমি জানতুম না।”

কুলদীপ কিছু বলবার আগেই সাহেবটি বললেন, “অ্যান্ড হোয়াট উড ইউ হ্যাভ ডান্, হ্যাড ইউ নোন্ দ্যাট হি ওয়াজ ইনডিড্ দ্য ছোটা কুমার অভ্ বিষাণগড়?”

আমি ত্রিবিক্রম কপুরের দিকে তাকালুম। তিনি বললেন, “উনি মিঃ রিচার্ড উইলসন, এখানকার পোলিটিক্যাল অফিসার। ওঁর প্রশ্নটার আপনি জবাব দিন।”

বললুম, “জানলেও হয়তো বাধা দিতুম। তার কারণ, কুকুরটাকে তিনি মেরে ফেলতে চেয়েছিলেন।”

“কী করে বুঝলেন?”

“ছোটকুমার নিজেই বলেছিলেন যে, তিনটে ড্যাশুকে তিনি পিটিয়ে মেরে ফেলেছেন, এখন এটাকেও পিটিয়ে মারতে চান।”

“ওহ্ নো,” কুলদীপ সিং দাঁতে দাঁত ঘষে বললেন, “ইট’স এ লাই, এ ডেপিকেব্ল লাই!”

তাকিয়ে দেখলুম, রাগে তাঁর মুখ টকটক করছে। শান্ত গলায় বললুম, “আমি যদি আপনার রাগ করবার মতো কোনও কথা বলে থাকি, তো তার জন্যে আমি খুবই দুঃখিত। কিন্তু কথাটা মিথ্যে নয়, রানি-মা নিজেও তা আমাকে বলেছেন।”

সার ত্রিবিক্রম বললেন, “উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই দীপ, এখন ওঁকে যা বলবার সেটা বলে দাও।” কুলদীপ ইতিমধ্যে নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়েছিলেন। বললেন, “এই কুকুর মারবার কথাটা কি আপনি প্যালেসের বাইরে কাউকে বলেছেন?”

“না, কাউকেই বলিনি। যাতে না বলি, তার জন্যে রানি-মা নিজেই আমাকে অনুরোধ করেছেন।” কুলদীপ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, উইলসন তাঁকে বাধা দিয়ে বললেন, “রানিসাহেবা অনুরোধ করেছেন, এখন আমি আপনাকে আদেশ দিচ্ছি যে, এ-ব্যাপারে বাইরের কেউ যেন ঘুণাক্ষরেও কিছু না জানতে পারে। কিপ মাম্ অ্যাবাউট অল দ্যাট ইউ মে হ্যাভ সিন অর হার্ড। এ নিয়ে যদি বাইরে আপনি মুখ খোলেন, তো তার পরিণাম আপনার পক্ষে খারাপ হবে। কিপ্ ইয়োর মাউথ অ্যাবসলি শার্ট। ওয়েল, দ্যাটস হোয়াই ইউ হ্যাভ বিন গিড়ন এ বিগ (প্রামোশান।

প্যালেস থেকে ফিরতে-ফিরতে পৌনে এগারোটা। নীচের তলার বারান্দায় দেখলুম গঙ্গাধর মিশ্র একটা মোড়ার উপরে বসে আছেন। আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, “কী ব্যাপার বেটা? এত রাতে প্যালেসে গিয়েছিলে কেন?”

সব কথা তাঁকে জানালুম। তারপর হেসে বললুম, “ছোট কুমার যে কুকুর মারতে গিয়েছিল, তা তো আমি একা দেখিনি, আপনিও দেখেছিলেন। বোধহয় আমরা দুজনেই খুব অন্যায় করে ফেলেছি। না-দেখলেই ভাল ছিল।”

শুনে মিশ্রজিও হাসলেন। তারপর অন্যদিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “আমাকে নিয়ে কোনও ভয় নেই বেটা, আমাকে ঘাঁটাবার মতো সাহস এদের হবে না। কিন্তু তোমাকে নিয়ে আমার ভয় এবারে বেড়ে গেল।”

রাজবাড়ি থেকে ঘোর অস্বস্তি নিয়ে ফিরেছিলুম। কিছুতেই সেটা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলুম না। মনের মধ্যে একটা কাঁটা সারাক্ষণ খচখচ করছিল। তার উপরে মুখটাও কেমন যেন তেতো হয়ে আছে। সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে-উঠতে ভাবলুম, আজ আর কিছু খাব না, স্রেফ জামাকাপড় পালটে এবারে শুয়ে পড়ব। কিন্তু আরও একটা চমক তখনও অপেক্ষা করছিল আমার জন্যে। বারান্দা থেকে বসবার ঘরে ঢুকে লাইট জ্বাললুম। তারপর ঘুরে দাঁড়াতেই যা আমার চোখে পড়ল, তার জন্যে আমি একেবারেই তৈরি ছিলুম না।

দেখলুম একটা সোফার উপরে পামেলা উইলসন বসে আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *