বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

২৩

তেতাল্লিশটা বছর। তার মধ্যে একটা জায়গা যে কতখানি পালটে যেতে পারে, এবারে বিষাণগড়ে এসে সেটা বোঝা গেল। সেই যে ১৯৪৬ সালের আটুই জুলাই তারিখের শেষ-রাত্তিরে বিষাণগড় ছেড়ে কলকাতায় চলে আসি, তার দিন সাতেক বাদে ভাদুড়িমশাইয়ের টেলিগ্রাম পেয়ে সেখানে আবার ফিরে গিয়েছিলুম ঠিকই, কিন্তু তার পরে আর খুব বেশিদিন সেখানে থাকা হল না। চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরে এলুম ১৯৪৭ সালে। বাস, সেই যে ফিরে এলুম, তারপরে আর কখনও বিষাণগড়ে যাইনি।

বিষাণগড় তখন ছিল নেহাতই শান্ত একটা শহর। সর্সোতিয়া নদীর দুই দিকে ছড়ানো সেই শহরে লোকজন খুব বেশি ছিল না। ব্যাবসা-বাণিজ্য ছিল নামমাত্র। নদীর পুব দিকটা তবু যা হোক কিছুটা জমজমাট, পশ্চিম দিকটা বলতে গেলে ফাঁকা। মার্কেট রোড আর প্যালেস রোডই তখন ছিল বিষাণগড়ের সবচেয়ে চওড়া সড়ক। অন্য সব রাস্তায় পাকা বাড়ির তুলনায় খাপড়ার চালের ঘরবাড়ি ছিল অনেক বেশি। দোকানপাট রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকত বটে, তবে সন্ধের পর থেকে আর কোনও রাস্তাতেই লোকজন বিশেষ চোখে পড়ত না। সন্ধে-রাতেই শহরটা যেন ঘুমিয়ে পড়ত।

এবারে দেখলুম, সেই শহরের ভোল একেবারে পালটে গেছে। লাইট-রেলওয়ের খেলনা গাড়িতে উঠবার জন্যে আর আজকাল ভিরিন্ডি যাওয়ার দরকার হয় না, লোকসানের ধাক্কায় সেই রেলপথ কবেই তুলে দেওয়া হয়েছে, তার জায়গায় হয়েছে পিচ-ঢালা চওড়া রাস্তা, রায়পুর থেকে বাসে করেই তাই এখন সরাসরি বিষাণগড়ে চলে যাওয়া যায়। তাতে সময়ও লাগে অনেক কম। বিকেল চারটের মধ্যে বিষাণগড়ে পৌঁছে গেলুম।

ভাদুড়িমশাই আমাকে রিসিভ করার জন্যে যদি না সেন্ট্রাল বাস টার্মিনালে হাজির থাকতেন, বাস থেকে নেমেই তা হলে বোধহয় আমার মাথাটা চন্ করে ঘুরে যেত। ছেলেবেলায় রিপ ভ্যান উইংকূলের গল্প শুনেছিলুম। কুড়ি বছর বাদে ঘুম থেকে উঠে তার যে অবস্থা হয়েছিল, আমার অবস্থাও তখন সেইরকম। যে-দিকেই তাকাই না কেন, সব কিছুই একেবারে অচেনা লাগে। বিষাণগড় স্টেট যে এখন মধ্যপ্রদেশের একটা জেলা, আর বিষাণগড় শহর তার সদর, তা অবশ্য জানতুম, কিন্তু তাই বলে যে ইতিমধ্যে তার এই চেহারা হয়েছে, তা আমার কল্পনায় ছিল না।

রাস্তায় ভিড়; ধুলো উড়িয়ে, কানে-তালা-লাগানো হর্ন বাজিয়ে যাত্রিবোঝাই বাস আর মিনিবাস ছুটছে; লাউডস্পিকারে হিন্দি ফিল্মের গান বাজছে; সাইকেল, অটো রিকশা, মোটরসাইকেল আর স্কুটারে এখন পথঘাট একেবারে জমজমাট। বললুম, “ও মশাই, এ তো চেনাই যায় না।”

ভাদুড়িমশাই বাঙ্গালোর থেকে ফোন করে জানিয়ে রেখেছিলেন যে, আমার একদিন আগেই তিনি বিষাণগড়ে পৌঁছবেন। ইতিমধ্যেই একটা দিন তাঁর কেটেছ এখানে, আর সেই কারণেই সম্ভবত এখানকার ভিড়ভাট্টায় তিনি একটু ধাতস্থ হয়েও উঠেছেন। বললেন, “সব জায়গারই এক হাল ব্যাঙ্গালোর আগে কত সুন্দর শহর ছিল, কিন্তু সেখানেও এখন রাস্তাঘাটে ভিড় সারাক্ষণ লেগেই আছে। তবে মিশ্রজি তো এখানে প্যালেস রোডেই বাড়ি করিয়েছিলেন, সেখানে দেখবেন নদীর ধারটা এখনও তত খারাপ হয়নি। …কিন্তু তা তো হল, যা আনতে বলেছিলুম, এনেছেন তো?”

“তা এনেছি, যে-রকম আনতে বলেছিলেন, ঠিক সেইরকমই এনেছি। কিন্তু ব্যাপার কী বলুন তো, দুটো শিবলিঙ্গ দিয়ে কী হবে?”

“দুটো নয়, তিনটে। একটা তো পুরন্দর মিশ্র জঙ্গল থেকে নিয়ে এসেছিলেন, একটা আপনি কলকাতা থেকে নিয়ে এলেন, আর একটা আমি ব্যাঙ্গালোর থেকে নিয়ে এসেছি।”

“ওরে বাবা, তিনটে শিবলিঙ্গের দরকার হল কেন?”

“দরকার হল, তার কারণ নাল্পে সুখমস্তি।”

পথে আর কোনও কথা হল না। সেন্ট্রাল বাস স্টেশন থেকে একটা অটো-রিকশা নিয়েছিলুম, মিনিট পাঁচ-সাতের মধ্যেই সেটা প্যালেস রোডে মিশ্রজির বাড়ির সামনে আমাদের নামিয়ে দিল।

বাড়ির সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জমি, যেমন এ-রাস্তায় প্রতিটি বাড়ির সামনেই থাকে। গাড়িতে বসেই লক্ষ করেছিলুম যে, ভিড় করে সবাই সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সুমঙ্গল, সরস্বতী, লছমি আর যমুনাদিদি ছাড়া আরও কয়েকজন ছিলেন, তবে তাঁদের আমি চিনতে পারলুম না।

শীতের বিকেল। যমুনাদিদি বললেন, “ভিতরে চলো। একটু বাদেই সূর্য ডুবে যাবে। তখন যা ঠান্ডা পড়বে, সে তুমি ভাবতেও পারবে না।”

দোতলা বাড়ি। তবে বড় নয়। ওপরে আর নীচে দুখানা করে ঘর। বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট মন্দির। কাল সকালে সেখানে বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা হবে। সেই উপলক্ষে লোকজন নেহাত কম আসবে না শুনলুম।

জিজ্ঞেস করলুম, “লোকজনদের বসানো হবে কোথায়?”

সুমঙ্গল বলল, “কেন, বাড়ির সামনে আর পিছনে জায়গা তো কিছু কম নেই। ডেকরেটরের লোকজনেরা এই একটু আগে চলে গেল। তারা বাঁশ খাটিয়ে রেখে গেছে, কাল ভোরবেলায় এসে চাঁদোয়া টাঙিয়ে দেবে। শ দুয়েক চেয়ারের অর্ডার দিয়েছি। তাও কাল সকাল সাতটার মধ্যেই এসে যাবে। দশটার আগে তো আর প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করা হচ্ছে না। তবে আর সমস্যা কী?”

একতলার বৈঠকখানায় বসে কথা হচ্ছিল। এ-বাড়িতে আসবাবপত্র কম; যা আছে, তাও পুরনো আমলের। তবে স্বাচ্ছন্দ্যের কোনও ঘাটতি নেই। তক্তপোশের উপরে জাজিম পাতা। তার উপরে গোল হয়ে বসে গল্প করছি আমরা। ইতিমধ্যে এক রাউন্ড চা আর পকোড়াও শেষ হয়েছে। ভাবছিলুম যে, সরস্বতীকে ভিতরে পাঠিয়ে আর-এক প্রস্ত চায়ের ব্যবস্থা করা যায় কি না, এমন সময় লছমি এসে ঘরে ঢুকল।

সুমঙ্গল বলল, “আর-এক কাপ করে চা হয় না?”

লছমি বলল, “হয়, কিন্তু হবে না। যে-লোকটা ট্রেন জার্নি করে এসেছে, অন্তত তাকে এখন একটু ছেড়ে দাও তো। …চাচাজি, তুমি উঠে পড়ো। গরম জল রেডি, তুমি আর বসে থেকো না, চটপট স্নান করে নাও।”

অগত্যা উঠতেই হল। লছমির সঙ্গে ভিতরে যেতে-যেতে বললুম, “তোর দেখছি সেই অর্ডার করার অভ্যাসটা এখনও যায়নি।”

স্নান করে বেশ আরাম লাগছিল। তক্ষুনি আর নীচে নামলুম না। যমুনাদিদি তাঁর ঘর থেকে আমাকে ডেকে পাঠালেন। গিয়ে দেখি, ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন। আমাকে দেখে বললেন, “এসো ভাইয়া। তোমার কথাই হচ্ছিল। সুমঙ্গল নেহাতই ছেলেমানুষ, ওর উপরে তো সব ব্যাপারে ভরসা করা যায় না। তা ভাদুড়িদাদা কালই এসে গিয়েছেন, আজ তুমিও এলে। কালকের কাজটা ঠিকমতো সামলে দাও।”

বললুম, “ও নিয়ে এত ভাবনার কী আছে? সবই ঠিকমতো হয়ে যাবে, কিছুই আটকে থাকবে না।

যমুনাদিদি বললেন, “কাল যাঁরা আসছেন, তাঁদের অনেকেই তো পুরনো আমলের লোক, যেমন আমার শ্বশুরমশাইকে তেমন তোমার দাদাকেও তাঁরা চিনতেন। দেখো ভাইয়া, তাঁদের আদর- আপ্যায়নে যেন কোনও ত্রুটি না হয়। ভাদুড়িদাদা নানান কাজে ব্যস্ত থাকবেন, এদিকে সুমঙ্গল আবার তাদের চেনেই না, ওদিকটা তাই তোমাকেই দেখতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “একটা কথা আপনাকে বলা হয়নি। কুলদীপ আর রানি-মা’ও কাল আসবেন কিন্তু। দিন কয়েক আগেই তাঁরা বিষাণগড়ে পৌঁছে গেছেন।”

তাঁরা যে আসবেন, সে তো দিল্লি থেকে কলকাতায় আসবার পথেই ভাদুড়িমশাইয়ের কাছে শুনেছিলুম। তাই আর অবাক হলুম না। জিজ্ঞেস করলুম, “এখানে তারা উঠেছেন কোথায়? প্যালেসে?”

যমুনাদিদি বললেন, “কামাল হ্যায়! প্যালেসকো তো হসপিটাল বানা দিয়া।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওঁরা গেস্ট হাউসে আছেন। যশোমতী দেবী তাঁর নাতিটিকেও নিয়ে এসেছেন শুনলুম।”

“নাতি? কার ছেলে? ববির, না রূপের?”

যমুনাদিদি বললেন, “লো, শুনো বাহ্! তুমি দেখছি কোনও খবরই রাখো না, ভাইয়া। বড় কুমার তো বিয়েই করেননি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনি এখানে থাকতে-থাকতেই ববি অবশ্য সিংহাসন পেয়ে গিয়েছিল। তবে কিনা বুদ্ধিমান ছেলে তো, তাই খুব ভালই জানত যে, রাজাদের দিন ফুরিয়ে এসেছে। তা নিয়ে এতটুকু দুঃখও তার ছিল না। আপনি তো বিষাণগড় ছাড়লেন, আমিও তার কিছুদিন বাদে দিল্লি-অফিসে চলে যাই। তবে মাঝে-মাঝে এখানে আসতে হত। যখন আসতুম, তখন দেখাও হত ববির সঙ্গে। কিন্তু ওই যে বললুম, কক্ষনো তাকে আক্ষেপ করতে শুনিনি। এদিককার নেটিভ স্টেটগুলোকে এক করে দিয়ে যখন মধ্যভারত ইউনিয়ন করা হল, তখনও না, আবার সেই ইউনিয়নকে যখন মধ্যপ্রদেশের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হল, তখনও না। কী বলত জানেন?”

“কী বলত?”

“বলত যে, মিশরের ফারুক যা বলেছে, সেটাই ঠিক। শেষ পর্যন্ত ওই তাসের চার রাজা আর ইংল্যান্ডের রাজা-ই থেকে যাবে, আর কোথাও কোনও রাজা থাকবে না। থাকার কোনও দরকারও নেই।”

জিজ্ঞেস করলুম, “প্যালেসটা হসপিটাল হল কবে থেকে?”

“আপনি ভাবছেন, মধ্যভারত ইউনিয়ন লোপ পাবার পরে ওটা হয়েছে? মোটেই না। রাজা থাকতে-থাকতেই ববি ওখান থেকে এই প্যালেস-রোডের একটা বাংলো বাড়িতে উঠে এসেছিল। বিষাণগড় থেকে চলে যাবার আগে প্যালেসে ওই হাসপাতালের কাজও সে-ই শুরু করে দিয়ে যায়।”

“ববি এখন কোথায়?

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা তো জানি না। দিল্লিতে একটা বাড়ি আছে বটে, তবে শুনেছি যে, সেখানেও বিশেষ থাকে না, নেটিভ স্টেটগুলির উপরে নাকি কী একটা বই লিখছে, তারই কাজে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়ায়।”

“আর রূপেন্দ্রনারায়ণ? তার কী খবর?”

যমুনাদিদি বললেন, “রাজা হবার পরেই বড়কুমার তাঁর ভাইকে মায়ের সঙ্গে বিলেতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেখানকার চিকিৎসায় সে অনেকটা সুস্থ হয়েও উঠেছিল। তারপর সে ফিরে এল, বছর কয়েক বাদে বিয়েও হল তার। একটা ছেলেও হয়েছিল। কিন্তু তারপরেই সে ফের পাগল হয়ে যায়। একেবারে বদ্ধ উন্মাদ। শুনেছি, কখনও সে তার বউকে খুন করতে যেত, কখনও ছেলেকে। তারপরে তো নিজেকেই একদিন খুন করে বসল।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস লাগিয়ে ঝুলে পড়েছিল।”

রূপকে যেদিন প্রথম দেখি, সেইদিনই বুঝেছিলুম যে, ছেলেটা সুস্থ নয়। কী জানি কেন, সেই মুহূর্তে যতই রেগে গিয়ে থাকি, পরে একটু বেদনাও সেদিন বোধ করেছিলুম তার জন্য। সম্ভবত সেইজন্যই একটা দীর্ঘনিশ্বাস পড়ল। খানিক বাদে বললুম, “রানি-মা এখন কোথায় থাকেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “থাকতে প্রথম থেকে তিনি ববির সঙ্গেই চেয়েছিলেন। কিন্তু ববি তো তার দিল্লির বাড়িতে থাকে না, সে তো শুধুই ঘুরে বেড়ায়। রানি-মা তাই ছোট ছেলেকে নিয়ে দিল্লিতে একটা আলাদা বাড়িতে থাকতেন। সেখানেই আছেন। ছেলে নেই, কিন্তু ছেলের বউ তো আছে, নাতিও আছে। তাঁদের নিয়েই থাকেন। এখানে এসেছেন বটে, বিষাণগড়ের টানেই হয়তো এসেছেন, কিন্তু আমি যতদূর জানি, যশোমতী দেবী আর আজকাল বাইরে বিশেষ বেরোন না।”

লছমি এসে বলল, “আর কত গল্প করবে তোমরা? এবারে ওঠো, তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও, তারপর শুয়ে পড়ো। কাল যে রাত্তির থাকতে-থাকতে উঠে পড়তে হবে, সেটা ভুলে যাচ্ছ কেন?”

দোতলার দুটো ঘরের একটায় আমাদের শোবার ব্যবস্থা হয়েছে। ঘরের লাগোয়া একটা বারান্দাও রয়েছে দেখলুম। রাতের খাওয়ার পাট চুকে যাবার পরে সেখানে গিয়ে বসেওছিলুম একবার, কিন্তু এমন হাড় কাঁপানো শীত যে, বেশিক্ষণ সেখানে থাকা গেল না, ফের ঘরে এসে ঢুকলুম। ভাদুড়িমশাই একটা ইজিচেয়ারে বসে চুপচাপ একখানা বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছিলেন। আমাকে দেখে বইখানা সরিয়ে রেখে বললেন, “অনেক কথাই তো হল, কিন্তু কই, মুরারির কথা তো আপনি একবারও জিজ্ঞেস করলেন না?”

বললুম, “ঠিক বলেছেন, ওর কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলুম। তা মুরারি এখন কোথায়?”

“আপনি এখানে থাকতে-থাকতেই তো ঘুষ নেবার দায়ে প্যালেসের চাকরি থেকে তাকে ঝিংড়ার জঙ্গল-মহলে ট্রান্সফার করা হয়। কিন্তু জঙ্গলে তার মন টিকবে কেন, চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে কিছুদিন বাদেই সে বিষাণগড়ে তার বাবার কাছে ফিরে আসে। নারায়ণ ভার্মা তখন তাকে ব্যাবসায় লাগিয়ে দেন। তাতেও লালবাতি জ্বেলে সে রায়পুরে চলে যায়। শুনেছি সেখানে একটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে খাতা লিখবার চাকরি পেয়েছিল। বছর খানেক সেই চাকরি করার পরে সেখান থেকেও বরখাস্ত। তারপর করছিল দালালির কাজ। সেটাই চালিয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। জমি বিক্রির আগাম হিসেবে কোন্ এক পার্টির কাছ থেকে নাকি হাজার কয়েক টাকা নিয়েছিল। পরে ধরা পড়ে যে, যাঁর জমি, মুরারির সঙ্গে তাঁদের কোনও কথাই হয়নি। ফলে মামলা হয়। আর তার ফলে যা হবার, তা-ই হয়েছে, মুরারি এখন জেল খাটছে।”

“নারায়ণ ভার্মা টাকাটা দিয়ে দিলেন না?”

“ওইটেই তো মজা।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “প্রথম দিকে ছেলেকে যিনি ক্রমাগত প্রশ্রয় দিয়েছেন, শেষদিকে তিনি হঠাৎ শক্ত হয়ে গেলেন। বাড়ি আর টাকা তিনি ছেলের বউয়ের নামে লিখে দিয়েছিলেন। তো মুরারি যখন বউয়ের কাছে এসে টাকার জন্যে কেঁদে পড়ল, তখন বউ যা বলল, সে একেবারে বাঁধিয়ে রাখার মতো।”

“কী বলল মুরারির বউ?”

“বলল, শ্বশুরের ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে আমি নিজের ছেলেকে পথে বসাতে পারব না।’ কালই এই গল্পটা আমি সুরজপ্রসাদ আগরওয়ালের ছেলের কাছে শুনলুম।”

“সুরজপ্রসাদজির ছেলে? কেমন আছে তারা?”

“চমৎকার আছে।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “তারাই তো এখন এখানে সবচেয়ে বড় ব্যাবসাদার। আগে শুধু স-মিল আর জুয়েলারি শপ ছিল। এখন কী নেই? বাস, ট্রাক, মিনিবাস, তেলকল, কাপড়ের দোকান—কত আর বলব, এখানকার ব্যাবসা-বাণিজ্যের চোদ্দো আনা এখন তাদেরই হাতে।”

“আর পামেলা?”

“সেও ভাল আছে। আপনি বোধহয় জানেন না, ববি শুধুই হাসপাতাল করেনি, এখানে একটা কলেজও করে দিয়েছিল, আর একই সঙ্গে করে দিয়েছিল মেয়েদের একটা ইস্কুল। পামেলাই সেটা গড়ে তোলে। এখন সেখানে ছাত্রীর সংখ্যা কত জানেন? তা অন্তত হাজার খানেক তো বটেই।”

“সেখানে গেলে পামেলার সঙ্গে দেখা হবে?”

“আরে দুর মশাই,” ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সেখানে যাবেন কেন? সে তো কবেই রিটায়ার করেছে। তবে হ্যাঁ, বিষাণগড় ছেড়ে চলে যায়নি, এখানেই বাড়ি করে নিয়েছে একটা। দেখা যদি করতে চান, তো বাড়িতেও অবশ্য যেতে হবে না। আমার বিশ্বাস, সেও কাল এখানে আসবে। … কিন্তু না, আর কথা নয়, কলকাতা থেকে যা আনতে বলেছিলুম, সেটা এবারে আমাকে দিয়ে দিন। তারপর শুয়ে পড়ুন।”

স্যুটকেস খুলে শিবলিঙ্গ বার করে ভাদুড়িমশাইয়ের হাতে দিলুম। তিনি সেটিকে আলোর সামনে ধরে বললেন, “চমৎকার। ঠিক এইরকমই আনতে বলেছিলুম।” তারপর নিজের স্যুটকেস খুলে তার মধ্যে সেটিকে রেখে আবার তালা বন্ধ করলেন।

মাত্র এক মুহূর্ত। কিন্তু স্যুটকেসের মধ্যে যে আরও একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে, তারই মধ্যে সেটা আমি দেখতে পেয়েছিলুম। বললুম, “ওটিই আপনি ব্যাঙ্গালোর থেকে নিয়ে এসেছেন, তাই না?”

ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। আমার দিকে তাকিয়েও রইলেন অনেকক্ষণ। কিন্তু কিছু বললেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *