বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

২০

নেহাত যদি না স্মৃতিভ্রংশ হয়, তা হলে জীবনের যে-ক’টা তারিখ একেবারে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত আমার মনে থাকবে, তার মধ্যে একটা নিশ্চয় ছেচল্লিশ সালের দোসরা জুলাই। আজ বুঝতে পারি যে, আমাকে ঘিরে কী ভয়ংকর বিপদের জাল সে-দিন ছড়ানো হয়েছিল, আর কী নির্বোধের মতো সেই জালের দিকে আমি এগিয়ে গিয়েছিলুম। কাজটা যে নির্বোধের মতোই করেছিলুম, তাতে সন্দেহ কী। একটু যদি সতর্ক হতুম, আর কিছু না হোক্, যদি কাউকে সঙ্গে নিয়ে আগরওয়ালজির দোকানে যেতুম, তা হলে নিশ্চয় অত বড় বিপদে আমাকে পড়তে হত না।

সেদিনও যথারীতি দশটায় দফতরে গিয়েছি, কাজও করেছি একটা পর্যন্ত। তারপর মিশ্রজির ফ্ল্যাটে দুপুরের খাওয়া সেরে দুটোয় যখন আবার দফতরে ফিরে আসি, তখন মুরারি বলল, “কিছু বিল্ডিং মেটেরিয়াল কিনবার ছিল, তার অর্ডার কিন্তু এখনও দেওয়া হয়নি। এদিকে পরশু থেকে তো কাজ শুরু হচ্ছে, তার মধ্যে যদি মাল না পড়ে তো মিস্ত্রি-াজুরকে বসিয়ে রাখতে হবে।”

কথাটা আমার মনেই ছিল না। বললুম, “ঠিক আছে, দরকার তো আপাতত ইট, বালি আর সিমেন্ট, রামসেবকজির গদিতে যদি ফোন করি তো আজ রাত্তিরেই। উনি ডেলিভারি দেবেন। কিন্তু তাঁর আগের বারের মালের বিল তো দেখলুম; আমার ধারণা তিনি গম একটু বেশি নিচ্ছেন। সত্যিই নিচ্ছেন কি না, সেটা একবার যাচাই করে দেখা দরকার। তা তুমি একটা কাজ করো। বাজারে তো বিল্ডিং মেটেরিয়ালের আরও দু-তিনজন ডিলার রয়েছে, তাদের কাছে চলে যাও। জেনে এসো, তারা কী দামে বিক্রি করে।”

মুরারি তবু তার চেয়ার ছেড়ে উঠল না। বলল, “আমাদের এস্টেট ম্যানেজার যে রামসেবকজির বন্ধু, সেটা জানেন তো?”

বললুম, “কে কার বন্ধু, তা আমি জানি না। জানবার কোনও দরকার আছে বলেও মনে করি না। তোমাকে যা করতে বলছি, করো। বাজারে চলে যাও, এক-নম্বর ব্রিক, মাঝারি-দানার বালি আর পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট কে কী দামে বিক্রি করছে, জেনে এসো। দেরি কোরো না, সাইকেল নিয়ে যাও, চারটের মধ্যে ফিরে আসবে।”

কথাটা কি একটু কঠিন গলায় বলেছিলুম? কী জানি। মুরারি অবশ্য আর গড়িমসি করল না, দফতর থেকে তার সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

ফিরে এল সওয়া চারটের সময়। কোটেশানগুলি সে একটা চিরকুটে লিখে এনেছিল, সেটা আমার টেবিলের উপরে রেখে বলল, “এই নিন আপনার কোটেশান। …ও হ্যাঁ, মার্কেট রোডে আগরওয়ালজির সঙ্গে দেখা হল। বললেন যে, আপনার সঙ্গে কী একটা জরুরি কথা আছে, আজই যদি তাঁর দোকানে একবার যান তো বড় ভাল হয়। তিনিই আসতেন, তবে তাঁর বাতের ব্যথাটা আবার বেড়েছে, তাই আসতে পারছেন না।”

বাতের ব্যথা বাড়াটা মনে হল স্রেফ একটা ওজর ছাড়া আর কিছুই নয়। আসলে সর্সোতিয়ার ধারে তিন-তিনটে লাশ পড়ে ছিল, এই খবরটা চাউর হবার সঙ্গে-সঙ্গেই গোটা শহর জুড়ে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে যে, বিকেলের দিকে কেউ বড় আর ঘর থেকে বেরোতেই চায় না। দোকানপাট আগে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকত, কিন্তু ক’দিন ধরেই দেখছি যে, পাঁচটা বাজার সঙ্গে-সঙ্গেই দোকানে-দোকানে ঝাঁপ পড়ে যায়। সন্ধের দিকে তো রাস্তাঘাট একেবারে খাঁখাঁ করতে থাকে। আগরওয়ালজিও সম্ভবত ভয় পেয়েছেন। এলে তো দোকান বন্ধ করে তারপর তাঁকে আসতে হয়। তাও নাহয় এলেন, কিন্তু ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যেতে পারে। তার উপরে আবার সর্সোতিয়ার ধার দিয়ে ফিরতে হবে। খুব সম্ভব সেই কথা ভেবেই তিনি আসছেন না। কিন্তু তা না-ই আসুন, ফোন তো একটা করতে পারতেন। যা আমি জানতে চেয়েছিলুম, ফোনে সেটা জানিয়ে দিলেই তো মিটে যায়।

ফোন অবশ্য আমিও করতে পারি। কিন্তু করলুম না। মনে হল, যাই, ভদ্রলোকের যখন এতই মৃত্যুভয়, তখন আমিই গিয়ে দেখা করে আসি। ব্যাপারটা আসলে আর কিছুই নয়, প্যালেসের রানি-মহলের জন্যে কিছু ফার্নিচার বানাবার কাজ চলছে। তার জন্যে ভাল-জাতের সিড সেগুন চাই। ঠিকমতো সিড না-হলে কিছুদিন পরেই কাঠ অল্পবিস্তর বেঁকে যায়। ছুতোরমিস্ত্রিদের ভাষায় ‘রেগে যায়’। যে-তক্তার দৈর্ঘ্য যত বেশি, তার রেগে যাওয়ার আশঙ্কাও তত বেশি। এদিকে দুখানা পালঙ্কের ফ্রেমের জন্যে বেশ লম্বা খানকয় প্ল্যাঙ্কের দরকার হচ্ছে; জোড়া-না-দেওয়া সিঙ্গল প্ল্যাঙ্ক চাই, কিন্তু রাগী কাঠ হলে চলবে না। তা সুরজপ্রসাদ আগরওয়ালের যেমন গয়নার দোকান রয়েছে, তেমনি আবার কাঠেরও তিনি মস্ত কারবারি। দিন দুই আগে তাই কথাটা তাঁকে জানিয়েছিলুম। জিজ্ঞেস করেছিলুম, সাইজমতো এইরকম কিছু তক্তা তিনি আমাদের দিতে পারবেন কি না।

আগরওয়ালজি বুঝে গিয়েছিলেন যে, আমার সঙ্গে মন খুলে কথা বলা চলে, তাতে তাঁর কোনও ক্ষতি হবার ভয় নেই। তাই হেসে বললেন, “দেখছেন তো, রাজবাড়ির ফার্নিচার, তাতেও এখুন আর বার্মা-টিকের খোঁজ হচ্ছে না, সি.পি.র সেগুন দিয়েই কাজ চলছে। তো বারিষ নেমে যাবার পরে তো আমি গয়নার দুকানে বসছি, স-মিলে বসছে আমার লেড়কা। তার কাছে খবর করব, স্টকে যদি সিজন-করা কিছু মাল থাকে তো আপনারা পেয়ে যাবেন।”

মুরারির কথা শুনে মনে হল, আগরওয়ালজি বোধহয় তাই নিয়েই কিছু বলতে চান। হাতের কাজটা সেরে নিয়ে চারটে পঁয়ত্রিশ নাগাদ একটা সাইকেলে চেপে আমি প্যালেস থেকে বেরিয়ে পড়লুম।

মার্কেট রোডে যখন পৌঁছলুম, তখনও পাঁচটা বাজতে মিনিট দুই-তিন বাকি। অথচ তারই মধ্যে দেখলুম, দোকানপাট প্রায় সবই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আগরওয়ালজিও তাঁর দোকানের সামনের স্টিলের শাটার নামিয়ে তাতে তালা লাগাচ্ছিলেন, আমাকে দেখে শাটারটাকে আবার ঠেলে উপরে তুলে দিয়ে বললেন, “রাম রাম চাটার্জিসাব, আসুন, আসুন।”

বলতে-বলতেই শাটারের পিছনের কোলাপসিবল গেটও তিনি খুলে ফেলেছিলেন। ফলে আমাকে দোকানের মধ্যে ঢুকতেই হল। আগরওয়ালজি ফ্যান চালিয়ে দিয়ে বললেন, “তারপর চাটার্জিসাব, খবর কী?”

বললুম, “খবর তো আপনার কাছে। তা এত সকাল-সকাল দোকান বন্ধ করছিলেন যে?”

“আমি কি আর একা করছি?” আগরওয়ালজি ম্লান হেসে বললেন, “সবাই করছে। তো কাউকে দোষ দেবারও তো উপায় নেই। অবস্থা দেখছেন না? ব্যাবসা এবারে লাটে উঠবে।”

“আরে না, দু’দিন যাক্, দেখবেন আবার সব নর্মাল হয়ে এসেছে। …ও হ্যাঁ, সেই কাঠের কী হল? “

“অত ভাল মাল আমার স্টকে নেই। লেড়কাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তা সে বলল, যে মাল আছে, তাতে গেরান্টি দিতে পারব না। তবে হ্যাঁ, মুলুকচাদজির স্টকে আছে, ওখানে একবার খবর করুন।” আরও দু-একটা কথার পরে উঠে পড়লুম। বললুম, “আপনিও তো বাড়ি যাবেন। চলুন, খানিকটা পথ একসঙ্গে যাওয়া যাক।”

আগরওয়ালজি হেসে বললেন, “দুকান যখন ফের খুলেছি, তখন আরও দু-একটা কাজ সেরে তারপর যাব। আপনি এগোন চাটার্জিসাব।”

দোকান থেকে বেরিয়ে দেখলুম, রাস্তায় একটাও লোক নেই। হাতঘড়ির দিকে তাকালুম। সওয়া পাঁচটা। এই সময়ে মার্কেট রোডে ভিড় জমে যায়। আজ একেবারে খাঁ-খাঁ করছে।

একটা ব্যাপারে আমার ধাঁধা লেগে গিয়েছিল। মুরারি বলল, আজ যখন তাকে কয়েকটা জিনিসের দাম জানবার জন্যে বাজারে পাঠাই, তখন মার্কেট রোডে আগরওয়ালজির সঙ্গে তার দেখা হয়। শুধু দেখা নয়, কথাও হয়েছিল। আগরওয়ালজিকে সে-কথা বলতে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, মুরারির সঙ্গে আজ কেন, গত এক হপ্তার মধ্যে তাঁর কথা হয়নি। মুরারি তা হলে অমন কথা কেন বলল? আজ তো দফতর ছুটি হয়ে গেছে, কাল তাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

বাড়ি ফিরে ভাল করে স্নান করলুম। তারপর চা-বিস্কুট খেয়ে, চিঠি লিখলুম কয়েকটা। সর্সোতিয়ার ধারে যখন বেড়াতে বার হলুম, তখন সাড়ে ছটা। লছমির একটু জ্বরমতো হয়েছে, তাকে তাই সঙ্গে আনিনি।

ভাদুড়িমশাই এলেন সাতটা নাগাদ। সর্সোতিয়ার ধারে আজকাল আর বিশেষ ভিড় জমতে দে না। ভ্রমণবিলাসীদের অনেকেরই উৎসাহে ইতিমধ্যে ভাটা পড়েছে। গোনাগুনতি আমরা ক’জন কয়েকটা বেঞ্চি দখল করে বসে থাকি। ভাদুড়িমশাই তাঁর সাইকেলটাকে একটা ল্যাম্পপোস্টের গায়ে হেলান দিয়ে রেখে আমার পাশে এসে বসলেন। ভদ্রলোককে একটু চিন্তিত মনে হল। কিন্তু তা নিয়ে কিছু বলবার ‘আগেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি আজ আগরওয়ালজির গয়নার দোকানে গিয়েছিলেন?”

“হ্যাঁ।”

“কখন গিয়েছিলেন?”

“পাঁচটার সময়।”

“সেখান থেকে কখন বেরিয়ে আসেন?”

“সওয়া পাঁচটায়। কেন, কী হয়েছে?”

স্থির চোখে কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন ভাদুড়িমশাই, তারপর মৃদু গলায় বললেন, “সুরজপ্রসাদ আগরওয়াল হ্যাজ বিন মার্ডারড।”

কথাটা শুনবামাত্র আমার হৃৎপিণ্ড যেন একটা লাফ মেরে হঠাৎ গলার মধ্যে এসে আটকে গেল। কিছুক্ষণ কোনও কথাই বলতে পারলুম না, তারপর অনেক কষ্টে বললুম, “সে কী!”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “হ্যাঁ। স্কাল একেবারে স্ম্যান্ড। ভারী একটা পাথর দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। দোকানঘরের মধ্যেই সেটা পাওয়া গেছে। তবে কিনা রক্তমাখা পাথরটা পাওয়া গেছে বলেই যে তাতে খুনি। স্পিার-প্রিন্ট পাওয়া যাবে, তার কোনও গ্যারান্টি নেই। হাতে দস্তানা পরে যদি সে ওটা ব্যবহার করে থাকে, তো পাওয়া যাবে না।”

“খুনটা কখন হল?”

“পৌনে ছ’টায়। সেটা ফিক্স করা শক্ত হয়নি। তার কারণ, পাশের দোকান ওষুধের। এখানকার আইন তো জানেন, আর-সব দোকান বন্ধ হয়ে গেলেও ওষুধের দোকান রাত আটটা পর্যন্ত এখানে খোলা রাখতেই হয়। আগরওয়ালজির চিৎকার শুনে ওষুধের দোকানের দুর্জন কর্মচারী তক্ষুনি ছুটে এসেছিল। তখন ঠিক পৌনে ছ’টাই বাজে। গয়নার দোকানের শাটার আর কোলপসিবল গেট খোলাই ছিল। কাঠের দরজাটাও ধাক্কা মারতেই খুলে যায়। অর্থাৎ সেটাও ভেজানো ছিল মাত্র, ভিতর থেকে তাতে খিল কিংবা ছিটকিনি দেওয়া ছিল না। ভিতরে ঢুকে তারা দেখতে পায় যে, আগরওয়ালজি মেঝের উপরে পড়ে আছেন। তার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তারা পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ আসে ছ’টা নাগাদ। আমিও সেইখান থেকেই আসছি।”

বললুম, “চিৎকার শুনেই তো পাশের দোকানের লোকেরা ছুটে গিয়েছিল বলছেন, খুনি তা হলে পালাল কী করে?”

‘পুলিশের ধারণা দোকানঘরের পিছন দিককার দরজা দিয়ে পালিয়েছে।”

“পুলিশ কাউকে সন্দেহ করছে”

সরাসরি আমার প্রশ্নের জবাব না-দিয়ে ভাদুড়িমশাই বললেন, “মুশকিলটা কী হয়েছে জানেন কিরণবাবু, পাঁচটার সময় যে আপনি আগরওয়ালজির দোকানে ঢুকেছিলেন, পাশের দোকানের এই লোক দুটি তা দেখেছে, কিন্তু কখন আপনি বেরিয়ে আসেন, তা তারা দেখেনি। ফলে এখন পুলিশের ধারণা হয়েছে যে, ইউ ওয়্যার দি লাস্ট পার্সন টু সি হিম অ্যালাইভ।”

“ওরা কি আমাকেই খুনি বলে সন্দেহ করছে নাকি?”

“বিচিত্র নয়।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “দোকান থেকে বেশ কিছু গয়না নাকি লোপাট হয়েছে। সেটাকেই যদি মোটিভ হিসেবে দাঁড় করায় তো আমি অবাক হব না। কিন্তু একটা কথা ইতিমধ্যে আমার জানা দরকার। আজ পাঁচটার সময় আগরওয়ালজির কাছে আপনি গিয়েছিলেন কেন?”

“মুরারিকে আজ দুপুরে বাজারে পাঠিয়েছিলুম। সে ফিরে এসে বলল, মার্কেট রোডে আগরওয়ালজির সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল। তখন আগরওয়ালজি তাকে নাকি বলেন যে, আমার সঙ্গে তাঁর কিছু কথা আছে, আমি যেন তাঁর সঙ্গে একবার দেখা করি। কিন্তু মজা কী জানেন, পাঁচটার সময় আমি যখন তাঁর দোকানে গেলুম, তখন তিনি বললেন যে, মুরারির সঙ্গে তাঁর অমন কোনও কথা হয়নি।”

“তাই?” ভাদুড়িমশাই তীব্র চোখে আমার দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই তাঁর দৃষ্টি আবার স্বাভাবিক হয়ে এল। বললেন, “পুলিশের কথা শুনে মনে হল, দে উইল গেট ইন টাচ উইথ ইউ।”

“কী বলব তাদের?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “এটা কি একটা প্রশ্ন হল? যা সত্যি, তাই-ই বলবেন। …নিন, এবারে বাড়ি যান, আর রাত করবেন না।”

বাড়িতে ফিরে মিশ্রজিকে জানালুম কী হয়েছে। তিনি স্থির হয়ে সব শুনলেন, কিন্তু কোনও উদ্বেগ প্রকাশ করলেন না। শুধু বললেন, “দোষ যখন তোর নয়, তখন ভয় পান না বেটা, সব ঠিক হয়ে যাবে।”

পরদিন দফতরে গিয়ে মুরারির দেখা পাওয়া গেল না। এগারোটা নাগাদ নারায়ণ ভার্মা এসে জানালেন যে, মুরারি অসুস্থ, দফতর থেকেই জ্বর নিয়ে কাল বাড়ি ফিরেছিল, দিন পাঁচ-সাতের মধ্যে যে কাজে আসতে পারবে, এমন সম্ভাবনা নেই।

একটার সময় লাঞ্চ ব্রেক। খাতা-পত্তর গুছিয়ে রেখে উঠবার উপক্রম করছি, এমন সময় বেয়ারা এসে খবর দিল, দেওয়ানজি ডেকে পাঠিয়েছেন। কপুরসাহেবের ঘরে ঢুকতে তিনি বসতে বললেন। তারপরই প্রশ্ন করলেন, “কী ব্যাপার বলুন তো, পুলিশ আপনার খোঁজ করছে কেন?”

কাল দুপুর থেকে যা-যা হয়েছে, কোনও কথাই বাদ দিলুম না। কপুরসাহেব সব শুনলেন। তারপর বললেন, “অর্জুন প্রসাদকে কে তাতাচ্ছে, তা আমার জানা নেই। মুরারিও হতে পারে, আর-কেউও হতে পারে। তবে অর্জুন যা ‘লল, তাতে এটা বোঝা শক্ত নয় যে, একটা মিথ্যে-মামলায় সে আপনাকে জড়িয়ে দেবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আপনি ভয় পাবেন না। অর্জুন যদি আপনাকে অকারণে হ্যারাস করে, তো আই ওন্ট টেক ইট লায়িং ডাউন। আমার লোকের গায়ে হাত দিয়ে আজ পর্যন্ত কেউ এখানে নিস্তার পায়নি। অর্জুনও পাবে না। আই শ্যাল কাট হিম ডাউন টু হিজ প্রপার সাইজ।”

থানার লোক এল বিকেলবেলায়। বাড়িতে ফিরে স্নান করে, চা খেয়ে, সদ্য একটা থ্রিলার নিয়ে ইজিচেয়ারে গা ঢেলে দিয়েছি, দরজায় টোকা পড়ল। বাইরে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁকে চিনতে অসুবিধে হল না। সর্সোতিয়ার ধারে সেদিন অর্জুন প্রসাদের যে দুই অ্যাসিস্ট্যান্টকে দেখেছিলুম, তাঁদেরই একজন।

ঘণ্টাখানেক ধরে তিনি আমাকে জেরা করলেন। প্রথম দিকে সবই মামুলি প্রশ্ন। আগে কোথায় ছিলুম, কী কাজ করতুম, বিষাণগড়ে কবে এসেছি, সুরজপ্রসাদ আগরওয়ালের সঙ্গে কবে থেকে আলাপ, তাঁর কাছে কাল কেন গিয়েছিলুম ইত্যাদি। প্রসঙ্গত মুরারিরও কথা উঠল। তারই কথায় যে আমি আগরওয়ালজির সঙ্গে দেখা করতে যাই, তাও জানিয়ে দিলুম। দেখলুম, তাঁর প্রশ্নের উত্তরে যা-যা বলছি, সবই তিনি একটা খাতায় টুকে নিচ্ছেন। একসময়ে তিনি খাতাটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর একেবারে আচমকা যে প্রশ্নটা করলেন আমাকে, তাতে আমার মাথাটা একেবারে ঝিমঝিম করে উঠল।

“গয়নাগুলো কোথায় রেখেছেন?”

কোনওক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললুম, “কীসের গয়না?”

পুলিশ অফিসারটি চতুর হেসে বললেন, “দেখুন মিঃ চ্যাটার্জি, বোকা সেজে আপনি পার পাবেন না। আগরওয়ালজির দোকান থেকে কাল যা-যা আপনি সরিয়েছেন, তার সবই আমরা খুঁজে বার করব।”

তিন, চার, পাঁচ, ছয়, সাত। জুলাই মাসের ক’টা দিন যে কীভাবে কাটল তা আমি বলে বোঝাতে পারব না। রোজই পুলিশ আসে, রোজই চেষ্টা করে আমাকে দিয়ে খুনের কথাটা স্বীকার করিয়ে নিতে। তার উপরে আবার সাত তারিখে যে পুলিশ অফিসারটি এসেছিলেন, তাঁর কাছে শুনলুম, মুরারি নাকি থানায় গিয়ে লিখিতভাবে জানিয়ে এসেছে যে, সুরজপ্রসাদ আগরওয়াল আমাকে দেখা করতে বলেছেন, দোসরা জুলাই তারিখে এমন কথা সে আমাকে বলেনি।

আট তারিখে দফতরে বসে কাজ করছি, এমন সময় ভাদুড়িমশাইয়ের ফোন এল। “লিভ্ দ্য প্যালেস ইমিডিয়েটলি অ্যান্ড গো টু ডঃ সিদ্দিকি’জ হাউস।”

চারটে বাজে। খাতাপত্র আলমারিতে তুলে রেখে দফতর থেকে বেরিয়ে পড়লুম।

ডঃ সিদ্দিকির বাড়িতে পৌঁছে বোঝা গেল, আমার জন্যেই তিনি অপেক্ষা করছিলেন। গেস্ট-হাউসের পাশের বাড়িটাই ডঃ সিদ্দিকির। সামনে বাগান। বাগানের পিছনে ছোট্ট দোতলা বাড়ি। ডঃ সিদ্দিকি তাঁর একতলার বারান্দায় একটা বেতের চেয়ারে বসে ছিলেন। আমাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “ভিতরে আসুন।”

এ-বাড়িতে আগেও বার কয়েক এসেছি। একতলায় কেউ থাকে না। সামনে ড্রইং রুম, পিছনে লাইব্রেরি। ভদ্রলোক আমাকে তাঁর লাইব্রেরি-রুমে নিয়ে বসালেন। বললেন, “আপনি যে এখানে এসেছেন, তা কেউ জানে না তো?”

“না। কাউকে কিছু বলিনি।”

“এই বাড়িতে ঢুকবার সময় কেউ দেখেওনি আপনাকে?”

“না।”

“আর ইউ শিওর?”

“অ্যাবসলুটলি। পথ একেবারে ফাঁকা ছিল।”

মনে হল, ভদ্রলোক এতক্ষণে নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন, “আপনাকে এখন ঘণ্টা কয়েক এখানেই থাকতে হবে। ঘর ছেড়ে বাইরে যাবেন না, নিষেধ আছে। মিঃ ভাদুড়ি ন’টার আগে আসবেন না। আপনি বসে-বসে বই পড়ুন। খানকয় ম্যাগাজিন রয়েছে, তাও দেখতে পারেন। উপরে গিয়ে আমি আপনার চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।”

কেন যে ভাদুড়িমশাই এখানে আসতে বললেন আমাকে, বুঝে উঠতে পারছিলুম না। চতুর্দিকে অজস্র বই। তার মধ্যে কল্হণের রাজতরঙ্গিণীর যে তর্জমা সার্ মার্ক অরেল স্টাইন করেছিলেন, সেটাও চোখে পড়ল। বইখানা টেনে নিয়ে পড়তে বসে গেলুম।

চা এল। আটটা নাগাদ এসে গেল রাতের খাবারও। এইটুকু শুধু বুঝতে পারছিলুম যে, একটা কিছু ব্যাপার নিশ্চয়ই ঘটেছে, কিন্তু সেটা যে কী, অনেক ভেবেও তার কোনও কূলকিনারা পাচ্ছিলুম না। ডঃ সিদ্দিকি এর মধ্যে একবার লাইব্রেরি-রুমে এসেছিলেন। বললেন, “রোজই তো একবার সর্সোতিয়ার ধারে হাঁটতে যাই। আজও তাই যাওয়া দরকার। নইলে লোকের মনে সন্দেহ হবে হয়তো।”

বললুম, “ব্যাপারটা কী বলুন দেখি।”

ডঃ সিদ্দিকি আমার প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না। সামান্য হাসলেন মাত্র। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই এলেন সওয়া ন’টায়। হাতে ছোট একটা সুটকেস। বললেন, “একা একা হাঁফিয়ে উঠেছেন বুঝি?”

বললুম, “সেটা কি খুব অস্বাভাবিক? কিন্তু ব্যাপারটা কী?”

“ব্যাপার আর কিছুই নয়, আপনার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরিয়ে গেছে। অর্জুন প্রসাদের লোকেরা পাঁচটা নাগাদ প্যালেসে গিয়েছিল। কিন্তু তার আগেই তো আপনি প্যালেস থেকে বেরিয়ে এসেছেন, তাই সেখানে আপনাকে পায়নি। তারা এখন চতুর্দিকে একেবারে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে আপনাকে।”

“আপনি জানতেন যে, আজ অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট বেরুবে?”

“জানতুম বই কি।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওয়ারেন্ট যে মোটামুটি সাড়ে-চারটের সময় সই হবে, তাও জানতুম। অবাক হচ্ছেন কেন? থানাতেও আমার লোক আছে না? সে-ই জানিয়ে দিয়েছিল। আসলে মুরারি কাল থানায় গিয়ে ওই যে স্টেটমেন্ট দিয়ে এল, তখনই ঠিক করা হয় যে, আজ আপনাকে গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু সে-কথা যাক, গেস্ট-হাউসটা আজ আমাদের কোম্পানির নামে বুক্ড থাকবার কথা। সেটা ঠিক আছে তো?”

“তা আছে।”

“চমৎকার। তা হলে আরও ঘণ্টাখানেক আপনি বইপত্তর পড়ুন। মোটামুটি সাড়ে দশটায় আমরা গেস্ট-হাউসে গিয়ে ঢুকব।”

বইপত্তরে মন বসাব, এমন অবস্থা তখন আমার নয়। তা ছাড়া, পুলিশের হাত থেকে অন্তত আজকের রাত্রিটার জন্যে যে ভাদুড়িমশাই আমকে দূরে রাখতে চান, সেটা বুঝতে পারলেও একটা অস্বস্তির কাঁটা আমার মনের মধ্যে খচখচ করছিল। ভাবছিলুম যে, মিশ্রজিকে তো আমি কিছুই বলে আসিনি, তিনি কী ভাবছেন! একে তো পুলিশ আমাকে অ্যারেস্ট করবার জন্যে সেখানে গিয়েছিল, তাতেই তিনি ঘাবড়ে গিয়েছেন নিশ্চয়, তার উপরে যদি আবার রাত্তিরে না ফিরি, তো তাঁর উদ্বেগের সীমা থাকবে না। তাঁকে একটা খবর দিতে পারলে হত।

ভাদুড়িমশাইকে সে-কথা বলতে তিনি হেসে বললেন, “কে বলল খবর দেওয়া হয়নি! আপনি যে আজ রাত্তিরে আপনার কোয়ার্টার্সে ফিরবেন না, চাই কী কয়েকটা দিনই এখন না-ফিরতে পারেন, তা তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

“কে জানাল? আপনি?”

“আমি কেন জানাতে যাব? আপনাকে তো আগেই বলেছি, প্যালেসেও আমাদের লোক আছে। সে-ই জানিয়েছে।”

“লোকটা কে বলুন তো?”

“তা জেনে আপনার কী চতুর্বর্গ লাভ হবে? আপাতত শুধু এইটুকু জেনে রাখুন যে, কাম্বারল্যান্ড ইনসিওরেন্স এখানে মোটা টাকার কাজ-কারবার করে। তা সেই কাজে যাতে কেউ বাগড়া দিতে না পারে, তার জন্যে সর্ব ঘাঁটিতেই কিছু-না কিছু লোককে তাদের হাতে রাখতে হয়। তেমন লোক প্যালেসে আছে, থানায় আছে, পোস্টাল ডিপার্টমেন্টেও আছে। যা আমাদের জানা দরকার, তারাই তা জানিয়ে দেয়, আর তার জন্যে টাকাও পায় নিয়মিত। আপনাদের তো অর্থবল কম, তাই আর্মি মেনটেন করেন না। কিন্তু তা যদি করতেন, তো সেখানেও কাম্বারল্যান্ড কোম্পানির লোক থাকত। আর-কিছু জানতে চান?”

ক্লিষ্ট হেসে বললুম, “না। যা বলেছেন, তা-ই যথেষ্ট। কিন্তু একটা কথা ভাবছি। এই যে আটুই জুলাইয়ের জন্যে গেস্ট হাউসটা আপনি বুক করতে বলেছিলেন, তখনই কি আপনি জানতেন যে, ঠিক আজই আমার নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে?”

“না, তা জানতুম না।” ভাদুড়িমশাই বললেন, “ওটা একটা কোইনসিডেন্স। তবে কিনা তাতে আপনার ভালই হল, অন্তত আজ রাত্তিরের জন্য দিব্যি আপনি ওখানে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারবেন।”

বললুম, “সে না হয় আজকের জন্যে একটা ব্যবস্থা হল। কাল কী হবে?”

“কালকের কথা কাল ভাবা যাবে। উই শ্যাল ক্রস দ্যাট ব্রিজ হোয়েন উই কাম টু ইট। আপাতত ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। উপায় একটা হবেই। … একটা কথা বলুন দেখি, এই যে গত কয়েকদিন ধরে পুলিশ রোজ প্যালেসে গিয়ে আপনাকে জেরা করছে, এতে ওখানকার রিঅ্যাকশানটা কী?”

“সে আমি কী করে বলব, মুখে তো সবাই ‘আহা উহু’ করছে, কিন্তু সহানুভূতিটা সত্যি কি না কে জানে। এই ক’মাসে কম লোককে তো চটাইনি। সবচেয়ে বেশি চটিয়েছি এস্টেট ম্যানেজারকে। যে-ক’জন সাপ্লায়ারের কাছ থেকে তিনি মাল নিচ্ছিলেন, প্রতিটি আইটেমে তারা বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দাম নিত। তাদের আমি ভাগিয়ে দিয়েছি। ফলে তিনি এখন মহা খাপ্পা। তবে হ্যাঁ, এস্টেট-ম্যানেজারের পেটোয়া লোকদের ভাগিয়ে আমি যে নতুন জনাকয় সাপ্লায়ারের কাছ থেকে মাল নিতে চাই, দেওয়ানজি তা শুনে একটুও অখুশি হননি। যেভাবে আমি খৰ্চা কমাচ্ছি, তিনি বরং তার প্রশংসাই করলেন।”

“বটে?” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ তো খুবই ভাল কথা। তা আপনার পিছনে যে পুলিশ লেগেছে, তা নিয়ে তিনি বললেন কিছু?”

“তাও বললেন বই কী। বললেন, অর্জুন প্রসাদ যদি আমাকে মিথ্যে একটা খুনের মামলায় জড়িয়ে দেয় তো তিনিও হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না, তাকে তিনি শায়েস্তা করে ছাড়বেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বাঃ, এ তো আরও ভাল খবর। সার ত্রিবিক্রিম কপুর যখন আপনার পাশে রয়েছেন, তখন আর আপনার ভাবনা কী। রাইট নাউ হি হিজ দ্য মোস্ট পাওয়ারফুল ম্যান ইন বিষাণগড়। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন কিরণবাবু, স্বয়ং দেওয়ানজি যে আপনার সহায়, পুলিশ তা নিশ্চয় জানে না, জানবামাত্র তারা লেজ গুটিয়ে পালাবে।”

ঠিক এই সময়েই ডঃ সিদ্দিকি এসে ঘরে ঢুকলেন। বললেন, “সাড়ে দশটা বাজে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “গেস্ট হাউসের খবর কী?”

ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “দোতলা থেকে সেটাই তো দেখছিলুম। ন’টার মধ্যে ওখানে সমস্ত ঘরের আলো নিভে গেছে। সার্ভেন্টস কোয়ার্টার্স, দরোয়ানের ঘর, সব অন্ধকার। সবাই ঘুমোচ্ছে, মনে হয়।”

“ঘুমটা আর-একটু পাকুক। আমি এগারোটা নাগাদ গেস্ট-হাউসে ঢুকব। তখন দরোয়ান এসে গেট খুলে দিলেও অন্যদের ঘুম আশা করি ভাঙবে না। তবে আমি যদিও গেট দিয়ে ঢুকব, মিঃ চ্যাটার্জি ঢুকবেন পাঁচিল ডিঙিয়ে।”

আমার মুখে সম্ভবত একটু উদ্বেগের চিহ্ন ফুটে উঠেছিল। ডঃ সিদ্দিকি সেটা লক্ষ করে থাকবেন। বললেন, “ভয়ের কিছু নেই, উই হ্যাভ এ কমন বাউন্ডারি-ওয়াল, পিছনের দিকে সেটা তেমন উঁচু নয়, সহজেই আপনি সেটাকে টপকে ওদিকে চলে যেতে পারবেন। মোট কথা, সামনের গেট দিয়ে আপনার ঢোকা চলবে না। আপনার নামে যে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, দরোয়ানও হয়তো সেটা জানে। সে যদি আপনাকে চিনে ফেলে তো বিপদ হবে।”

আমি আর কথা বাড়ালুম না। গেস্ট-হাউস বুকিংয়ের কাগজটা সঙ্গেই ছিল, সেটা ভাদুড়িমশাইকে দিয়ে বললুম, “দরোয়ান আপনাকে চেনে, বুকিংয়ের কাগজ-টাগজ তাই হয়তো দেখতে চাইবে না, তবু ঝুঁকি নিয়ে লাভ কী, এটা সঙ্গে রাখুন।”

কাগজখানা পকেটে রেখে, স্যুটকেস হাতে নিয়ে, সামনের দরজা দিয়ে ভাদুড়িমশাই বেরিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে-যেতে ঘুরে দাঁড়িয়ে আমাকে বললেন, “কিরণবাবু, একটা কথা মনে রাখুন। ডঃ সিদ্দিকির সঙ্গে বাড়ির পিছন দিকে গিয়ে পাঁচিলের ধারে আপনি তৈরি হয়ে থাকবেন। গেস্ট হাউসের সামনে আমি আমার গাড়ির হর্ন বাজাব, তারপর গেটে যে কলিং বেল রয়েছে, সেটাই টিপব। ওদিক থেকে আপনি খেয়াল রাখবেন দরোয়ান কখন এসে গেট খুলে দেয়। যখন গেট খুলবে, আপনি তার শব্দ শুনতে পাবেন। ধরে নিতে পারেন, বাড়ির পিছন দিকে তখন তার নজর থাকবে না। ঠিক তখনই পাঁচিল টপকে গেস্ট হাউসের কম্পাউন্ডের মধ্যে লাফিয়ে পড়বেন। বৃষ্টি হওয়ায় মাটি ভিজে রয়েছে, সুতরাং আপনি লাফিয়ে পড়লেও শব্দ হবার ভয় নেই।”

“লাফিয়ে পড়ে তারপর আমি কী করব?”

“কিচ্ছু করতে হবে না। গেস্ট-হাউসের পিছন-দিককার জমিতে কম্পাউন্ড-ওয়ালের ধারে, ঝুপসি-মতো কয়েকটা গাছ রয়েছে। তারই কোনও-একটার আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকবেন। ধরে নিচ্ছি, দরোয়ানের ফের ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হবে না। ওইটুকু সময় আপনাকে অপেক্ষা করতে হবে।”

“তারপর?”

“গেস্ট-হাউসের পিছনেই রয়েছে লোহার স্পাইরাল সিঁড়ি। বাথরুম পরিষ্কার করবার জন্য জমাদাররা ওই সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় ওঠে। বাইরের যে দরজা দিয়ে তারা দোতলার বাথরুমে ঢোকে, সেটা আমি ভিতর থেকে খুলে রাখব। তা হলে আর অসুবিধে কী, আমি গিয়ে গেস্ট-হাউসে ঢুকবার মিনিট পনেরো-কুড়ি বাদে ওই স্পাইরাল সিঁড়ি দিয়ে আপনি দোতলায় উঠে আসবেন।”

ভাদুড়িমশাই বেরিয়ে গেলেন। ডঃ সিদ্দিকি তাঁর বাড়ির পিছন-দিকে নিয়ে গেলেন আমাকে। কম্পাউড-ওয়ালের পাশে গিয়ে দাঁড়াবার একটু বাদেই শুনতে পেলুম গাড়ির হর্ন। কলিং বেলও প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বেজে উঠল। তারও মিনিট খানেক পরে যে শব্দটা শোনা গেল, তাতে বুঝতে পারলুম যে, গেস্ট-হাউসের লোহার গেটটা খুলে দেওয়া হচ্ছে। পরক্ষণেই আমি পাঁচিল টপকে গেস্ট-হাউসের কম্পাউন্ডের মধ্যে লাফিয়ে পড়লুম। নরম মাটি, কোনও শব্দ হল না।

কাজগুলি হয়ে যাচ্ছিল একেবারে ঘড়ির কাঁটার মতো। গেস্ট-হাউসের একতলায় আর দোতলায় কয়েকটা আলো জ্বলে উঠেছিল, তারপরে আবার নিভেও গিয়েছিল খানিক বাদে। গোটা বাড়িটা একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবার পরেও মিনিট দশ-পনেরো চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম আমি। তারপর যখন মনে হল যে, কেউ আর কোথাও জেগে নেই, তখন গাছের আড়াল থেকে নিঃশব্দে এগিয়ে এসে স্পাইরাল সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে পড়লুম।

বাথরুমের বাইরের দিকের দরজাটা ভাদুড়িমশাই খুলে রেখেছিলেন। ভিতরে ঢুকে দেখলুম, হাতে একটা পেনসিল-টর্চ নিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে অাছেন। আমাকে দেখে মৃদু হেসে বললেন, “অলো জ্বালবেন না। দরজা বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাকুন ‘ চান তো একটু ঘুমিয়েও নিতে পারেন।”

“আপনি ঘুমোবেন না?”

“আমাকে এখুনি আবার বেরুতে হবে।”

“কোথায়?”

ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। বললেন, “সর্সোতিয়ার ধারে। বলেছিলুম না রাত জেগে আজ সর্সোতিয়ার বাহার দেখব? তা সেটা একেবারে নদীর ধারে বসে দেখতে চাইছি। বাস্, এ নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন নয়। যাবার আগে একটা কথা বলে যাই। বাইরে যা-ই ঘটুক, ঘর থেকে বেরুবেন না। এমনকি, বারান্দাতেও যাবেন না। নিন, শুয়ে পন।”

স্যুটকেস থেকে ছাইরঙের একটা ম্যাকিনটশ বার করে সেটা গায়ে চাপিয়ে নিঃশব্দে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রেডিয়াম-লাগানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, বারোটা বাজতে তখনও দশ মিনিট বাকি।

শুয়ে ছিলুম। কিন্তু ওই অবস্থায় কি কারও ঘুম আসা সম্ভব? ঘুম এল না। শুয়ে শুয়ে আকাশ-পাতাল চিন্তা করতে লাগলুম। ভাবতে লাগলুম বাবা-মা আর ভাইবোনের কথা। মিশ্রজি, লছমি আর যমুনাদিদির কথা। রানি-মা, পামেলা আর কুলদীপের কথা। সার ত্রিবিক্রম কপুরের কথা। একমাত্র তিনিই পারেন এই ষড়যন্ত্রের হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে। ষড়যন্ত্র যে একটা চলছে, তাতে তো আর সন্দেহ নেই। তা নইলে আর মুরারি ওই মিথ্যে স্টেটমেন্ট দেবে কেন? কিন্তু মুরারির স্টেটমেন্ট যে মিথ্যে, দেওয়ানজি কি তা জানেন?

ভাদুড়িমশাই-ই বা পুলিশকে মিথ্যে কথা বলতে গেলেন কেন? কেন বললেন যে, ২৮ জুন তারিখের ভোরবেলায় তিনি সর্সোতিয়ার ধারে যে-তিনজন মানুষকে পড়ে থাকতে দেখেছিলেন, তাদের মধ্যে একজন তখনও বেঁচে ছিল? মরবার আগে সে যে দু-একটা কথা বলে গিয়েছিল তাঁকে, তাও তো মিথ্যে। নাকি মিথ্যে নয়? সত্যিই সে ওইসব কথা বলেছিল নাকি? যা বলেছিল, অন্তত যা বলেছিল বলে পুলিশকে ভাদুড়িমশাই জানিয়েছেন, তা আমার স্পষ্ট মনে আছে। ‘হলদে পাথর… দশ দিন বাদে আবার আসবে … এই খানে… মাঝরাত্তিরে … মরবে … বারণ করো’।

হঠাৎ যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল আমার মাথায়। আঠাশে জুন লোকটা বলেছিল ‘দশ দিন বাদে আবার আসবে’। আজ আটুই জুলাই। তার মানে তো সে আজকের কথাই বলেছিল। কিন্তু কে আসবে? কে মরবে? কাকে বারণ করা হবে?

আর শুয়ে থাকতে পারলুম না। ভাদুড়িমশাই বাইরে যেতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তখন আর কোনও নিষেধ মান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বিছানা থেকে নেমে, দরজা খুলে, নিঃশব্দে আমি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালুম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *