বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
২
আজও এসেছেন। চোখমুখ ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে বসবার ঘরে ঢুকে দেখলুম, সেন্টার-টেবিলে দুটো প্লেটের উপরে টোস্ট আর অমলেট সাজিয়ে রেখে ভদ্রলোক কাগজ পড়ছেন। ঝাঁটপাট দেওয়া আর থালাবাসন মাজবার জন্যে যে কাজের মেয়েটি এইসময়ে আসে, তাকে দিয়ে আমাদের ভাঁড়ার ঘর থেকে একজোড়া পেয়ালা-পিরিচও আনিয়ে নিয়েছেন ইতিমধ্যে।
ফ্লাস্ক থেকে পেয়ালায় চা ঢালতে ঢালতে রোজই সদানন্দাবাবুকে যে প্রশ্ন করি, আজও সেটা করলুম। “আপনি এক কাপ খাবেন না?”
উত্তরে রোজই তিনি যা বলেন, আজও ঠিক তা-ই বললেন। “না মশাই, দিনে আমার বরাদ্দ হচ্ছে তিন কাপ। এক কাপ খাই মর্নিং ওয়াকে বেরোবার আগে, এক কাপ খাই মর্নিং ওয়াক থেকে ফিরে, আর এক কাপ খাই বিকেলবেলায়। বাস্, ওর আর নড়চড় হবার উপায় নেই। তা সকালবেলার দু’কাপ আমার হয়ে গেছে তো, এখন তাই আর খাব না।” বলে আবার খবরের কাগজে চোখ বুলোতে লাগলেন।
কিন্তু বেশিক্ষণের জন্যে নয়। চায়ে চুমুক দিয়ে সবে এক টুকরো অমলেট কেটে নিয়ে সেই টুকরোটাকে টোস্টের উপরে রেখে সেটা মুখে তুলেছি, কাগজখানা সরিয়ে রেখে সদানন্দবাবু বললেন, “আর তো এখানে থাকা যাবে না মশাই।”
বললুম, “কেন? শ্যামনিবাসে আবার কী গণ্ডগোল হল?”
“আরে ধুর মশাই, বাড়ির কথা হচ্ছে না, বাড়ি ইজ পার্ফেক্টলি অলরাইট। মাঝখানে অবশ্য কলির একটু সর্দি-জ্বর হয়েছিল, তা সেও এখন ভালই আছে। … না না, বাড়ির কথা আমি ভাবছি না।’
“তা হলে কীসের কথা ভাবছেন?”
“ভাবছি এই শহরটার কথা, এই কলকাতার কথা। উঃ, কী শহর কী হয়ে গেল! আগে এখানে রাস্তার উপরে একটা জিলিপি পড়ে থাকলেও সেটা তুলে নিয়ে খেয়ে ফেলা যেত। আর সেই শহরেই এখন কিনা নাকে রুমাল না-চেপে সাহেবপাড়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটা যায় না। এখন আবার তার উগরে এই কাণ্ড!”
“কী কাণ্ড?”
“আবার একজন খুন হয়েছে! সেই একইভাবে!” বলে হাত-থেকে-নামিয়ে-রাখা কাগজখানাকে আমার দিকে ঠেলে দিয়ে সদানন্দবাবু বললন, “এই নিন, দেখুন।”
পেশায় আমি সাংবাদিক, তাই মাত্র একটা কাগজ রাখলে আমার চলে না, এই সেদিনও পাঁচখানা কাগজ রাখতুম, কিন্তু খবরের কাগজের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে আর পেরে ওঠা গেল না, এখন তিনখানাতেই আমাকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। সদানন্দবাবু ‘দৈনিক সমাচার’-এর ভক্ত, সেইখানাই তিনি আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছিলেন। তার লিড-স্টোরির হেডলাইনের উপরে চোখ বুলিয়েই আমাকে চমকে উঠতে হল। ‘আবার খুন, আবার স্টোনম্যান’।
হেডলাইন যদিও পিলে চমকানো, আর ঘটনা যদিও পাথর দিয়ে থেঁতলে মারার, তরু রিপোর্টার দেখলুম এমন ভয়ংকর ব্যাপারের প্রতিবেদন লিখতে বসেও কবিত্ব করার লোভ সামলাতে পারেননি। কে মরল, কোথায় মরল, কখন মরল, কীভাবে মরল, সে-সব প্রাথমিক খবর দেবার আগেই তিনি ভাষার তুবড়ি ছুটিয়ে দিয়েছেন। “নাগরিকদের তৃষ্ণার জল সরবরাহে যেখানকার পুরসভা একান্ত অপারগ, সেই কলকাতা শহরেই ফুটপাথের রক্ততৃষ্ণা নিবারণে কিন্তু বিকৃতমস্তিষ্ক ঘাতকের উদ্যোগ এখনও অব্যাহত। সূচনা গত জুন মাসে। তখন থেকে নিয়মিতভাবে সে এই তৃষ্ণা মিটিয়ে যাচ্ছে। ঘাতক এবারেও সেই স্টোনম্যান, তার শিকার এবারেও এক অসহায় নিদ্রিত মানুষ, আর তার বধ্যভূমি এবারেও এই শহরের এক ফুটপাথ। সমগ্র নগর যখন নিদ্রমগ্ন, সেই নিশাকালে এ্যারেও সে একটি প্রস্তরখণ্ডের নির্দয় আঘাতে এক ঘুমন্ত ব্যক্তির মস্তক চূর্ণ করেছে। শমন যে কখন তার শিয়রে এসে দাঁড়িয়েছে, হতভাগ্য তা জানতেও পারেনি।…’
আমরা যখন কাগজের চাকরিতে ঢুকি, রিপোর্টারদের নাম ছাপবার রেওয়াজ তখন ছিল না। বছর কয়েক হল এটা চালু হয়েছে। স্টোনম্যানের এই খবরটাতেও রিপোর্টারের নাম ছাপা হয়েছে দেখলুম। ভদ্রলোককে চিনি। এককালে সাহিত্য করতেন, তাতে বিশেষ সুবিধে হয়নি বলেই হয়তো খবরের কাগজের রিপোর্টের মধ্যেই আজকাল তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভাকে তিনি একেবারে যৎপরোনাস্তি উজাড় করে দেন।
খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে দেখলুম, সদানন্দবাবু আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। বললেন, “পড়লেন?’
“পড়লুম বই কী।”
“বুঝলেন কিচ্ছু?”
“কী বুঝব?”
সদানন্দবাবু একেবারে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন খানিকক্ষণ। যেন এমন অদ্ভুত কথা তিনি কস্মিনকালেও শোনেননি। তারপর বললেন, “এ তো বড় তাজ্জব কথা! কিচ্ছু বোঝবার নেই?”
আবার বললুম, “কী বুঝব?”
“বা রে, এই যে একটা লোক গত জুন মাস থেকে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে, ফুটপাথের উপরে একটার-পর একটা খুন করে যাচ্ছে, এর মধ্যে কিচ্ছু বোঝবার নেই? মানে এইভাবে সে খুন করছে কেন, তার মতলব কী, সেটা বুঝতে হবে না?”
ব্যাপারট, যে বিচিত্র, তাতে আর সন্দেহ কী। নিষ্ঠুরতার দিক থেকেও এই হত্যাকাণ্ডের তুলনা খুঁজে পাওয়া শক্ত হবে। ভাদুড়িমশাই এখন কলকাতায় নেই, কবে আসবেন তাও জানি না, তবে তাঁকে দেব বলেই এই হত্যাকাণ্ডগুলোর একটা খতিয়ান আমি রেখে যাচ্ছি। প্রথম খুনটা হয় জুন মাসে। যে-লোকটি খুন হয়, সে কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট আর হেয়ার স্ট্রিটের মোড়ের কাছে ফুটপাথের উপরে ঘুমিয়ে ছিল।
জুলাই মাসে একটা নয়, তিন তিনটে লোক খুন হয়ে যায়। প্রথমজন শেয়ালদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে, দ্বিতীয়জন শেয়ালদা ফ্লাইওভারের নীচে, আর তৃতীয়জন জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার সামনে।
অগস্টে আবার শেয়ালদা ফ্লাইওভারের নীচে একজন মারা পড়ে। সেপ্টেম্বরে মরে দু’জন। একজন হাওড়া ব্রিজ অ্যাপ্রোচের কাছে আর একজন ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটে, অর্থাৎ একেবারে হাইকোর্ট পাড়ায়।
তারপরে এই আট-নম্বর হত্যাকাণ্ড। সন ১৩৯৬ বঙ্গাব্দের লক্ষ্মীপুজোর ভাসান সবে শেষ হয়েছে, দিন কয়েক বাদে কালীপুজো, পাড়ায়-পাড়ায় তার জন্যে আবার নতুন করে এখন সর্বজনীনের প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে। তারই মধ্যে কলকাতার ফুটপাথে ফের স্টোনম্যানের এই হামলা। লোকটা তত্ত্বে-তক্কে ছিল নিশ্চয়ই, সুযো। মিলবামাত্র আর-একটি মানুষের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে।
সদানন্দবাবু বললেন, “মিলগুলো দেখেছেন?”
‘দৈনিক সমাচার’-এর হেডলাইনগুলোর উপরে চোখ বুলোনো শেষ হয়ে গিয়েছিল, সেখানা ফের সদানন্দবাবুর দিকে এগিয়ে দিয়ে সেদিনকার ‘দি ইস্টার্ন কুরিয়ার’খানা টেনে নিয়ে বললুম, “সে তো যে-কোনও বাচ্চা ছেলেও দেখতে পাবে। এক নম্বর মিল, আজ পর্যন্ত যে-ক’জনকে খুন করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই ফুটপাতের বাসিন্দা। দু’নম্বর মিল, তারা প্রত্যেকেই ছিল ঘুমন্ত। কেউ যে চিৎকার করে ওঠেনি কিংবা চেষ্টা করেনি হত্যাকারীকে বাধা দিতে, তাতে অন্তত সেই কথাই মনে হয়।”
“চিৎকার করেনি, সেটা কী করে বুঝলেন?”
“আরে মশাই, থাকেন নাহয় বাড়ির মধ্যে, কিন্তু নাকে রুমাল না চেপে যে আজকাল রাস্তাঘাটে হাঁটাই যায় না, সেটা নাহয় মেনে নিলুম, কিন্তু চোখ দুটো তো খোলা না রেখে উপায় নেই। নাকি আপনার চোখ দুটোও তখন বন্ধ থাকে?”
হতভম্ব হয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “কই, না তো। চোখ বন্ধ করে কি কলকাতার রাস্তায় হাঁটা যায় নাকি? তা হলে তো লরি কিংবা মিনিবাসের তলায় চাপা পড়তে হবে। না না, চোখ আমার খোলাই থাকে তখন।”
“তবু দেখতে পান না যে, পেভমেন্ট-ডোয়েলারদের সংখ্যা এই শহরে কীরকম বেড়ে গেছে? আশ্চর্য! আরে মশাই, হাজার-হাজার লোক এখানে ফুটপাথের বাসিন্দা। হয় ঝুপড়ি বানিয়ে, নয় পলিথিনের পাতলা চাঁদোয়া টাঙিয়ে, আর নয়তো গাড়ি-বারান্দার নীচে তারা জীবন কাটায়। সেইখানেই তাদের সংসার। ফুটপাথেই তারা উনুন ধরায়, ভাত রাঁধে, হাইড্রান্টের জলে চান করে, কাপড় কাচে, কলাই-করা বাসনকোসন ধোয়, তারপর ঘুমিয়েও পড়ে সেই ফুটপাথের উপরে। এক-আধজন নয়, নাইট-ডিউটি দিয়ে রাত আড়াইটে-তিনটের সময় যখন বাসায় ফিরতুম, নিত্য তখন দেখতে পেতুম যে, এক-একটা ফুটপাথে কাতারে কাতারে লোক পাশাপাশি শুয়ে ঘুমুচ্ছে।”
“তাতে কী হল?”
“এই হল যে, খুনিকে দেখে কেউ যদি চিৎকার করে উঠত, তা হলে আরও অনেকে সেটা শুনতে পেত। অথচ, কেউই নাকি কিছু শুনতে পায় না। এই যে পরপর এতগুলো ঘটনা ঘটল, একটা ক্ষেত্রেও কেউই কিচ্ছু শোনেনি। কেন শোনেনি? না, খুনির সঙ্গে ধস্তাধস্তি তো দূরের কথা, চিৎকার করে উঠবারও সুযোগ পায়নি কেউ। স্রেফ ঘুমের মধ্যেই মাথায় একটা প্রচণ্ড আঘাত লেগে তারা মারা পড়েছে।”
চুপচাপ ব্যাপারটা একটু বুঝবার চেষ্টা করলেন সদানন্দবাবু। তারপর বললেন, “আর কোনও মিল চোখে পড়ল?”
“পড়ল বই কী। তিন-নম্বর মিল, খুনির হাত কিংবা পায়ের ছাপ কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। লোকটা যেন হাওয়ায় ভেসে আসে, তারপরে কাউকে খুন করে ফের হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।”
“কিন্তু যে পাথর দিয়ে খুন করে, সেটা তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। তার উপরেই বা তার হাতের ছাপ পাওয়া যায় না কেন?”
বললুম, “সেটাই তো সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার। পরপর এতগুলো ঘটনা ঘটল, অথচ একটা ক্ষেত্রেও সে কোনও ব্লু রেখে যায়নি। অন্তত পুলিশ তো তেমন কিছু বলছে না। অন্য সময়ে কত লম্বাচওড়া কথা বলে তারা, কিন্তু এ-ব্যাপারে একেবারে স্পিকটি নট।”
“পুলিশ খুব ধাঁধায় পড়ে গেছে, কী বলেন?”
“পড়াই তো স্বাভাবিক। একটা কোনও সূত্র পেলে তবে তা সেইটে ধরে তারা এগোবে। তা কোনও সূত্রই যদি না মেলে, তো তারা এগোয় কী করে?”
সদানন্দবাবু বললেন, “তা তো বটেই।” তারপর একটু চুপ করে থেকে বললেন, “আচ্ছা মশাই, লোকে যে খুন করে, তার একটা মতলব থাকবে তো? হতে পারে যে, এ-লোকটারও কিছু একটা মতলব আছে, আর সেই মতলব হাসিল করবার জন্যেই সে একটার-পর-একটা লোককে এইভাবে খুন করে যাচ্ছে। …কী, চুপ করে রইলেন কেন? কিছু-একটা মতলব কি এর থাকতে পারে না?”
কাজের মেয়েটি চা আর জলখাবারের বাসনপত্র আগেই নিয়ে গিয়েছিল। চায়ের ফ্লাস্ক, টিফিন-ক্যারিয়ার আর জলখাবারের প্লেট ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে নিয়ে এসে বলল, “এগুলো আমি ও-বাড়ির মাসিমাকে পৌঁছে দিয়ে যাচ্ছি। আপনার জন্যে সিগারেট আনতে হবে?”
হবে না শুনে বলল, ‘তা হলে আমি যাই। মা আর দিদিমণি তো কাল সকালে আসছেন?” বললুম, “হ্যাঁ।”
“তা হলে আমি কাল খুব ভোরেই চলে আসব।”
দরজা টেনে দিয়ে মেয়েটি বেরিয়ে গেল।
সদানন্দবাবু বললেন, “কই, কিছু বলছেন না যে?”
“কী বলব?”
“লোকটার কি কোনও মতলব থাকতে পারে না?”
“কোন্ লোকটা?”
অবাক হয়ে সদানন্দবাবু বললেন, “যাচ্চলে! সাতকাণ্ড রামায়ণ পড়ে এখন সীতা কার বাবা! নিশ্চয়ই অন্য-কিছু ভাবছিলে।?”
সত্যিই তা-ই। ভাবছিলুম স্বপ্নটার কথা। এই স্বপ্ন যে কালই প্রথম দেখলুম, তাও নয়।
প্রথম দেখি ছেচল্লিশ সালের জুলাইয়ে। আমি তখন বিষাণগড়ে থাকতুম। সাতচল্লিশে সেখান থেকে কলকাতায় ফিরে আসি। তারপরেও মাসকয়েক এই স্বপ্ন আমার ঘুমের মধ্যে হানা দিত। কিন্তু সে তো অনেক দিন আগের কথা, প্রায় গত জন্মের ব্যাপার। গত চল্লিশ বছর ধরে স্বপ্নটা আমি দেখিনি, একদিনও না।
কিন্তু ইদানীং আবার দেখতে শুরু করেছি। স্টোনম্যান তার পাঁচ-নম্বর খুন সমাধা করে অগস্ট মাসের শেষ হপ্তায়। খুনটা হয়েছিল শেয়ালদা ফ্লাইওভারের নীচে। কাগজে তার খবর যেদিন বেরোয়, সেদিন রাত্তিরেই বিষাণগড়ের সেই পুরনো স্বপ্নটা আবার আমার ঘুমের মধ্যে এসে হানা দেয়। তারপর থেকে দু-একদিন অন্তর-অন্তর সেই একই স্বপ্ন আমি দেখে যাচ্ছি।
“কী হল, চুপ করে রইলেন যে?”
লজ্জিত হয়ে বললুম, “ঠিকই ধরেছেন, অন্য-একটা কথাই ভাবছিলুম বটে। তা আপনি কী যেন বলছিলেন?”
সদানন্দবাবু বললেন, “এই যে একটা লোক খুন করছে তো করেই যাচ্ছে, এর একটা মতলব থাকতে পারে না?”
“কী আর মতলব থাকবে,” বিষণ্ণ গলায় বললুম, “যাদের খুন করছে, তারা ফুটপাথের বাসিন্দা। কেউই কোটিপতি নয়। সুতরাং টাকাটা একটা মোটিভ হতে পারে না।”
“কে বলল পারে না?” সদানন্দবাবু চওড়া হেসে বললেন, “ফুটপাথে শুলেই যে সে ভিখিরি হবে, তার কোনও মানে নেই। আবার ভিখিরি হলেই যে সে কপর্দকশূন্য হবে, তারও কোনও মানে নেই।”
অবাক হয়ে বললুম, “অর্থাৎ?”
“অর্থাৎ আর কী, গিন্নির কথায় সেদিন একটা ভিসিপি ভাড়া করে এনেছিলুম। মানে আমার মোটেই ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আমার মিসেসকে তো আপনি ভালই চেনেন, তাঁর কথার উপরে কে কথা বলবে? অগত্যা কড়কড়ে পঞ্চাশ টাকা খসিয়ে একদিনের জন্যে ওই যম্ভরটা আমাকে আনতেই হল, আর তার সঙ্গে আনতে হল বারো টাকা খসিয়ে দু’খানা ক্যাসেট। একটা বাংলা, আর একটা হিন্দি। তা সত্যি বলব মশাই, বাংলার চেয়ে হিন্দি বইটা অনেক ভাল। অবশ্যি বইটা ঠিক হিন্দিও নয়, মানে কারুর মুখে কোনও কথাই নেই, একেবারে সাইলেন্ট পিকচার। ওই মানে চার্লি চ্যাপলিনের বইয়ের মতো। অঙ্গভঙ্গি করে সব বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছিল তো, তাই কে কী বলছে আর কোথায় কী ঘটছে, সে-সব ধরতে কোনও অসুবিধে হচ্ছিল না।”
“তা তার সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী?”
“আছে মশাই,” সদানন্দবাবু আবার আকর্ণবিশ্রান্ত হাস্য করে বললেন, “সম্পর্ক একটা আছে। বইটা কমল হাসনের। ওই যে মশাই, সাউথ ইন্ডিয়ার সেই বিখ্যাত অ্যাক্টর, হিন্দি বইয়েও আজকাল যে খুব নাম করেছে। তো যা বলছিলুম। বইয়ের মধ্যে একটা ভিখিরির ক্যারেক্টার আছে। একেবারে ফুটপাথের ভিখিরি। তা সে মরতে কী দেখা গেল জানেন?”
“কী দেখা গেল?”
চোখ বড়-বড় করে সদানন্দবাবু বললেন, “দেখা গেল যে, তার বালিশের মধ্যে লুকোনো ছিল কাড়ি-কাঁড়ি টাকা।”
“তাতে হল কী?”
এবারে সদানন্দবাবুর অবাক হবার পালা। অবাক হয়ে খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি। তারপর মস্ত একটা নিশ্বাস ফেলে বললেন, “আপনি একটা শিক্ষিত লোক মশাই। বাড়িতে আপনার আলমারি-ভর্তি মস্ত-মস্ত বই। তার উপরে আবার কাগজে কাজ করেন। নিজেও বই লেখেন শুনেছি। অথচ এই সহজ ব্যাপারটাই আপনি বুঝতে পারলেন না? আরে মশাই, এই লোকটাও হয়তো টাকার ধান্ধায় ঘুরছে। বড়লোকদের তো ছোঁবার উপায় নেই, তাই ফুটপাথের ভিখিরিদের খুন করছে। কেন খুন করছে? যদি তাদের বালিশের খোলে কিছু পাওয়া যায়।”
“কই, পুলিশ তো তেমন কিছু বলছে না।”
“পুলিশের কথা বাদ দিন, আপনি কী ভাবছেন বলুন। মানে, লোকটার মতলব কী হতে পারে বলে আপনার মনে হয়?”
“মতলব যে আছেই, তা-ই বা কী করে বলব?”
“তার মানে?”
বললুম, “মানে তো নরেশ দস্তিদারই বলে দিয়েছেন।”
“সে আবার কে?”
“দৈনিক সমাচারের রিপোর্টার। তিনি তো স্পষ্টই লিখেছেন যে, এখানকার ‘ফুটপাথের রক্ততৃষ্ণা নিবারণে বিকৃতমস্তিষ্ক ঘাতকের উদ্যোগ এখনও অব্যাহত।”
“ওরেব্বাবা! তো ওই ‘বিকৃতমস্তিষ্ক ঘাতকের’ না কী যেন বললেন, কথাটার অর্থ কী?”
“মানে পাগল। এখন ভেবে দেখুন, পাগলদের কোনও কাজের পিছনে কি মতলব থাকে? থাকা সম্ভব? কিন্তু না, আর না মশাই, এবারে আমি স্নান করতে যাব।”
সদানন্দবাবু উঠে পড়লেন। তারপর দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনারা এত খটোমটো বাংলা লেখেন কেন মশাই? পাগল লিখলেই তো হত। …আর হ্যাঁ, যাবার আগে একটা কথা বলে যাই। ভাদুড়িমশাই বড় ভালমানুষ, তাঁর বেঁচে থাকা দরকার। দয়া করে আর তাঁকে নিয়ে ও-সব অলুক্ষুনে স্বপ্ন দেখবেন না।”
উত্তরে কিছু বলতে যাচ্ছিলুম। সদানন্দবাবু আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “আপনি কী বলবেন, আমি জানি। বলবেন, স্বপ্ন ইজ স্বপ্ন, অর্থাৎ নেহাতই অলীক ব্যাপার। কিন্তু না, হতে পারে অলীক, কিন্তু অমন মানুষকে নিয়ে তাও আপনার দেখবার দরকার নেই। তাঁর সম্পর্কে ভাল-ভাল কথা ভাবুন, তা হলেই আর যত রাজ্যের বিচ্ছিরি সব স্বপ্ন আপনাকে দেখতে হবে না।”
সদানন্দবাবু চলে গেলেন। সদরদরজা বন্ধ করে আমি কলঘরে গিয়ে ঢুকলুম।
