বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৯

স্যুপটা খানিক বাদেই এসে গিয়েছিল, সঙ্গে বেশ কড়া করে সেঁকা দুখানা টোস্ট। কিন্তু খাইনি। টোস্ট দুখানা স্যুপের বাটির মধ্যে ফেলে দিয়ে একটা চামচে দিয়ে নাড়তে নাড়তে যখন কাদামতো হয়ে গেল, গোটা জিনিসটা তখন নর্দমায় ঢেলে দিলুম। খাবার পাঠানো সত্ত্বেও যে তা আমি মুখে তুলিনি, এটা যাতে কেউ বুঝতে না পারে।

দফতরে যাবার পথে কিচেনে গিয়ে জনার্দন ঠাকুরকে বললুম যে, আমার শরীর সত্যি ভাল নেই, একটু জ্বর মতো হয়েছে, আপাতত দিন-তিনেক স্রেফ বার্লি খেয়ে থাকব ভাবছি, তাই কিচেন থেকে এই ক’টা দিন কোনও খাবার পাঠাবার দরকার হবে না।

জনার্দন ঠাকুরের মুখ দেখে মনে হল না যে, সে খুব বিস্মিত হয়েছে। বলল, “হঠাৎ বারিষ নামল তো, তাই এখুন একটু জ্বরজারি হোবে। তো ঠিক আছে, বার্লি পাঠিয়ে দিব।”

বললুম, “তোমাকে আর ও নিয়ে ভাবতে হবে না। মার্কেট রোড থেকে কালই এক কৌটো বার্লি কিনে এনেছি। স্টোভও আছে। ও আমি নিজেই করে নিতে পারব।”

জনার্দনকে আর কোনও কথা বলার সুযোগ না-দিয়ে দফতরে চলে এলুম।

বিকেলে চলে গেলুম হিলক্ রোডে। ফোনের কথাটা ভাদুড়িমশাইকে জানাতে তিনি বললেন, “গলাটা চিনতে পারলেন না?”

“না।”

“পুরুষের গলা, না মহিলার?”

“পুরুষের।”

“তাই তো, বড় চিন্তায় ফেলে দিলেন দেখছি।” ভুরু কুঁচকে ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইচ্ছে করলে অবিশ্যি বিকৃত গলায় কথা বলা যায়, চেনা লোককে তখন গলা শুনে আইডেন্টিফাই করা যায় না। যা-ই হোক, হুঁশিয়ারিটা সত্যি না মিথ্যে, তাও তো বুঝতে পারছি না।”

“মিথ্যেও হতে পারে?”

“হতেই পারে। কেউ হয়তো আপনাকে ভয় পাইয়ে দিতে চাইছে। বাট লেট আস্ টেক ইট অ্যাজ জেনুইন। সে-ক্ষেত্রে প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার এই হিতার্থী বন্ধুটি কে?…প্যালেসে আমার নিজের একজন লোক আছে ঠিকই, সে-কথা আপনাকে আমি বলেওছি, কিন্তু সে-ই যে আপনাকে সতর্ক করে দিয়েছে, তা আমার মনে হয় না।”

“কেন?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “সে যদি সতর্ক করে দিত, তো এতক্ষণে তা আমি জেনে যেতু! সে-ই জানাত। কিন্তু না, সে কিছু জানায়নি। তাই ধরে নেওয়া যায় যে, এ-কাজ তার নয়, অন্য ারও। এমন কারও, যে কিনা চায় না যে, আপনি বেঘোরে মারা পড়ুন।”

“তা হলে এটা কার কাজ? কে ফোন করল?”

“তা-ই তো ভাবছি। আচ্ছা, আপনিও একটু ভেবে দেখুন তো, রাজবাড়িতে কি এমন কেউ আছে, যাকে আপনি যোলো-আনা বিশ্বাস করতে পারেন?”

শিউশরণ ত্রিপাঠীর কথা মনে পড়ল। এ-প্রশ্ন তাঁকে আমি করেছিলুম। তাতে তিনি বলেছিলেন যে, কাউকেই ওখানে বিশ্বাস করা চলে না।

বললুম, “না মশাই, কাউকেই ওখানে আমি বিশ্বাস করি না। এক ওই গঙ্গাধর মিশ্র বাদে। তবে কিনা তিনি তো আর প্যালেসের লোক নন।”

“তা না-ই বা হলেন, কিন্তু প্যালেস কম্পাউন্ডের মধ্যেই তো আছেন, তাও আপনি যে-বাড়িতে আছেন, তিনিও আছেন সেই বাড়িরই একতলায়। ভদ্রলোক আপনাকে স্নেহও করেন।”

“কিন্তু তাঁর তো ফোন নেই। মন্দির আর বাড়ি ছাড়া অন্য কোথাও যান না তিনি। তা ছাড়া, ফোনটা যিনি করেছিলেন, তিনি ইংরেজিতে কথা বলছিলেন। কিন্তু তাউজি ইংরিজি জানেন না। না না, তাউজি নন, আর-কেউ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “তা-ই হবে। কিন্তু আমি ভাবছি, কিচেন থেকে খাওয়া তো বন্ধ করলেন, এখন আপনি খাবেন কোথায়। এক কাজ করুন, খাওয়ার ব্যাপারে অন্তত কয়েকটা দিনের জন্যে এখন মিশিরজির সঙ্গে একটা ব্যবস্থা করে নিন। সব কথা তাঁকে খুলে বলবার দরকার নেই। জাস্ট বলবেন যে, কিচেনের খাবারে বড্ড ঝালমশলা দেয়, তাতে আপনার একটু স্টম্যাক-আপসেটের মতো হয়েছে, তাই কয়েকটা দিন এখন ওঁদের সঙ্গে খাবেন।”

বললুম, “সে তো স্বচ্ছন্দেই করা যায়। ঠিক আছে, তা হলে ওই কথাই রইল।”

বলে উঠে পড়তে যাচ্ছিলুম। ভাদুড়িমশাই আমাকে বাধা দিয়ে বললেন, “উঠবেন না, আর-একটা কথা আছে। আটুই জুলাই আপনাদের গেস্ট-হাউসটা খালি পাওয়া যাবে?”

“তা তো এখুনি বলতে পারছি না। বুকিংয়ের খাতাটা দেখে বলতে হবে।”

“আজেবাজে বুকিং থাকলে ক্যানসেল করিয়ে দিতে পারবেন না? যদি পারেন তো খুব ভাল হয়। ওই একটা দিনের জন্যে গেস্ট হাউসটা আমার চাই।”

“ঠিক আছে, লছমিকে নিয়ে একটু বাদেই তো সসোতিয়ার ধারে বেড়াতে যাচ্ছি, আপনিও চলে আসুন, পাকা খবর তখনই পেয়ে যাবেন।”

হিলক্ রোড থেকে রাজবাড়িতে ফিরে এসেই মিশ্রজিকে বললুম যে, আমার শরীরটা বিশেষ ভাল যাচ্ছে না, কয়েকটা দিন আমি এখন ওঁদের বাড়িতেই খাব। শুনে মিশ্রজি তো দারুণ খুশি। পরক্ষণেই তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। একটু সংকুচিতভাবে বললেন, “কিন্তু বেটা, আমরা তো নিরামিষ খাই, মছলি না থাকলে তোর অসুবিধে হবে না তো?”

বললুম, “নিরামিষই তো খেতে চাইছি। এরা যা ঝাল-মশলা দেয় না, মাছ-মাংসে অরুচি ধরে গেছে। তা ছাড়া ঠিক সহ্যও হচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, আপনাদের বাড়িতে শুধু দুপুর আর রাতের খাবারটা খাব। সকালের চা-জলখাবার নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। আপনাদের তো চায়ের পাট নেইও।”

“আমরা না-ই বা খেলাম, তোর জন্যে বানিয়ে দেব।”

“দরকার হবে না। আমার স্টোভ আছে, এক. কৌটো চা আর কয়েক প্যাকেট বিস্কুটও আছে। দু’বেলার চা আমি নিজেই করে নিতে পারব।”

মিশ্রজি বললেন, “সে তুই যা ভাল বুঝিস। যাই, তোর তাইজিকে বলে আসি যে, আজ রাত্তিরে তুই আমাদের সঙ্গে খাচ্ছিস। দারুণ খুশি হবেন।”

বাড়ির ভিতর থেকে লছমি বেরিয়ে এল। সেজেগুজে একেবারে তৈরি হয়ে রয়েছে। বললুম, “একটু দাঁড়া লছমি। একবার দফতরে যাওয়া দরকার। একটু কাজ আছে।…না না, যাব আর আসব। পাঁচ মিনিটও লাগবে না।”

দফতরে গিয়ে স্টিলের আলমারি খুলে গেস্ট-হাউসের বুকিং রেজিস্টারটায় একবার চোখ বুলিয়ে নিলুম। তারপর আবার সেটা যথাস্থানে রেখে দিয়ে, আলমারিতে চাবি দিয়ে কোয়ার্টার্সে ফিরে এলুম আমি। লছমি চুপচাপ বাড়ির সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। বললম, “চল, এবারে বেরিয়ে পড়া যাক।”

আকাশে আজ মেঘ নেই বটে, কিন্তু বর্ষা এসে গেছে। ক’দিন ধরেই রাত্তিরে বেশ বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ধুলো যেমন মরেছে, তেমনি গরমও কমেছে অনেকটা। গাছপালা এখন ঝকঝকে সবুজ। এদিকে নদীতেও ঢল নেমেছে, সর্সোতিয়া একেবারে কানায় কানায় ভর্তি। আধডোবা পাথরে ধাক্কা খেতে-খেতে, চতুর্দিকে ফেনা ছড়িয়ে খলখল করে জল ছুটছে।

খানিক বাদেই ভাদুড়িমশাই এসে গেলেন। সকালে অমন একটা কাণ্ড ঘটে গেল, অথচ তা নিয়ে তাঁর মুখে দেখলুম উদ্বেগের কোনও চিহ্ন নেই। বললেন, “কী হল?”

বললুম যে, কারও রিজার্ভেশন ক্যানসেল করার কোনও দরকারই হচ্ছে না। “আটুই জুলাই আমাদের গেস্ট হাউস একেবারে ফাঁকাই থাকবে। অন্তত আমার খাতায় কোনও বুকিং নেই।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঠিক আছে। তা হলে ওই একটা দিনের জন্যে ওটা বুক করে রাখুন।”

“কার নামে বুক করব?”

“কাম্বারল্যান্ড ইনসিওরেন্সের নামে। টাকাকড়ি কী দিতে হবে?”

“কিচ্ছু না। থাকা বলুন, খাওয়া বলুন, গেস্ট-হাউসে সবই ফ্রি। খাবার যাবে প্যালেসের কিচেন থেকে। ওখানে যে-সব বয়-বেয়ারা আছে, স্রেফ গরম করে তারা সার্ভ করে দেয়। ও নিয়ে ভাববেন না। শুধু একটা কথা; কী খাবেন, সেটা কিন্তু আগে থাকতে জানিয়ে রাখা দরকার।”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “কিচ্ছু খাব না। শুধু একটা রাত ওখানে থাকতে চাইছি। রাত্তিরবেলায় দোতলার বারান্দায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সসোতিয়ার বাহার দেখব, বাস্।”

তো এ-সবই হল আঠাশে জুনের কথা। তারপর তিনটে দিন মোটামুটি শান্তিতেই কাটল। মিশ্রজির ওখানে খাচ্ছি, সুতরাং সেদিক দিয়েও নিশ্চিত্ত। ইতিমধ্যে আর-কোনও রহস্যজনক ফোনও আসেনি। ববির কী হয়েছে, তা অবশ্য জানি না। সেই যে সে নিরুদ্দেশ হয়েছে, তা নিয়ে আর কিছু বলতেও শুনছি না কাউকে। পামেলা বলেছিল, ববি এখান থেকে মাধোপুর স্টেটে চলে যাবে। গেছে কি না, কে জানে। ভাদুড়িমশাইকে তার নিখোঁজ হবার খবরটা যথাসময়ে দিয়েছিলুম। তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *