বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
১৭
ভেবেছিলুম, ঘুম থেকে একটু তাড়াতাড়ি উঠে সরস্বতীদের বাড়ি থেকে হোটেলে ফিরে আসব। দিল্লিতে কয়েকটা জরুরি কাজ এখনও বাকি, এ-যাত্রায় সেগুলি না সারলেই নয়। কিন্তু একে তো ঘুমিয়েছি দেরিতে, তার উপরে শীতকাল, লেপের মায়া কাটাতে কাটাতে তাই সাড়ে আটটা বেজে গেল। তার উপরে যেমন লছমি, তেমনি সরস্বতীও বেঁকে বসল যে, ব্রেকফাস্টটা না-খেয়ে বেরোনো চলবে না। দিদি অবশ্য কিছু বলছিলেন না, কিন্তু তাঁর মুখ দেখেই বুঝতে পারছিলুম যে, কিছু যদি না-খাই, তো তিনি কষ্ট পাবেন।
দাড়ি কামিয়ে, স্নান করে, ব্রেকফাস্ট সেবে রওনা হতে হতেই তাই সাড়ে দশটা বাজল। হোটেলে পৌঁছলুম সওয়া এগারোটায়। ভাদুড়িমশাই-২ নামিয়ে দিলেন। বলে গেলেন, এয়ারপোর্টে ইন্ডিয়ান এারলাইনসের কাউন্টারের কাছেই তিনি অপেক্ষা করবেন। আমি তাঁর টিকিটখানা চেয়ে রাখলুম, ভবনের বোর্ডিং কার্ডে যাতে পাশাপাশি সিট-নম্বর লিখিয়ে নিতে পারি। মালপত্র বলতে নেহাতই দুজনের দুটো হ্যান্ডব্যাগ, কেবিনে ও দুটো আমাদের সঙ্গেই থাকবে, সুতরাং তা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।
হোটেলে আমার ঘরে ঢুকে হ্যান্ডব্যাগটা চটপট গুছিয়ে নিলুম। তারপর সেটা কাঁধে ঝুলিয়ে ফের নেমে এলুম একতলার রিসেপশান কাউন্টারে। চাবি জমা দিয়ে, হোটেলের পাওনা মিটিয়ে চেক-আউট করতে করতে আরও মিনিট পনেরো। হোটেলে যে আর ফিরব না, সেটা আগেই ঠিক করে রেখেছিলুম। দুপুরের খাওয়াটা কোনও ব্যাপারই নয়। কনট সার্কাসে তো দু-তিনটে অফিসে যেতেই হচ্ছে, সেখানে কাজ সেরে পালিকা বাজারে ঢুকে যে-কোনও ফাস্ট-ফুডের দোকান থেকে হালকা কিছু খেয়ে নেব।
দুপুরে কাজকর্ম যত তাড়াতাড়ি চুকিয়ে দিতে পারব ভেবেছিলুম, তত তাড়াতাড়ি “অবশ্য হল না। কাজ ছিল বাবা খড়গ সিং মার্গেও। কনট সার্কাসের ঝামেলা মিটিয়ে তাই সেখানেও একবার ঢুঁ মারতে হল। তারপরে আবার আটকে গেলুম একটা মিছিলে। প্রায় ঘণ্টাখানেক একেবারে নট-নড়ন-চড়ন-নট-কিচ্ছু অবস্থা। ফলে, যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছলুম, টেক-অফ টাইমের তখন আর মাত্র আধঘণ্টা বাকি। সিকিউরিটি-চেকের ডাক তার অনেক আগেই পড়ে গিয়েছে।
দূর থেকেই ভাদুড়িমশাই!ক দেখতে পেয়েছিলুম। কাউন্টারের কাছাকাছি যে চেয়ারের সারি, তারই একটায় বসে তিনি পাশের এক বৃদ্ধ ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশ বছর পরে দেখা। তবু যে দেখবামাত্র মানুষটিকে আমি চিনতে পারলুম, তার কারণ আর কিছুই নয়, মনোক্ল আর গোঁফ। বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। কুলদীপ সিংয়ের বয়েস তো এখন বিরাশি-তিরাশির কম হবে না। এখানে তিনি কী করছেন?
আমাকে দেখেই ভাদুড়িমশাই উঠে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন, “কী ব্যাপার, এত দেরি?”
বললুম, “একটা মিছিলে আটকে গিয়েছিলুম, তাই দেরি হয়ে গেল।”
কুলদীপ সিং বললেন, “গুড ইভ্নিং মিঃ চ্যাটার্জি, অনেক দিন বাদে আবার দেখা হল।”
বললুম, “গুড ইভ্নিং। আপনারা একটু বসুন, আমি ততক্ষণে বোর্ডিং কার্ডের ব্যবস্থা করি।”
ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে কুলদীপ বললেন, “ঠিক আছে, আপনারা আসুন, আমি ততক্ষণে সিকিউরিটির দিকে এগোই। বুড়ো হয়েছি, আমি তো তাড়াতাড়ি হাঁটতে পারব না।”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “কলকাতায় কোথায় উঠছেন?”
“বরাবর তো গ্র্যান্ডে উঠি, এবারেও তা-ই উঠব। কেন, আপনি আসবেন? কোনও কথা ছিল?”
“না, না,” ভাদুড়িমশাই বললেন, “এ-যাত্রায় আর দেখা হবে বলে মনে হয় না। কালই আমি ব্যাঙ্গালোরে ফিরছি। তবে সামনের মাসে তো দেখা হচ্ছেই। যদি অবশ্য আপনি বিষাণগড়ে আসেন।”
কাউন্টারের ভিড় ইতিমধ্যে একেবারে হালকা হয়ে গিয়েছিল। চটপট বোডিং কার্ড করিয়ে নিয়ে আমরাও সিকিউরিটির দিকে রওনা হলুম। যেতে-যেতেই পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেমে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের ঘোষণা শোনা গেল : প্যাসেঞ্জারস ফর ক্যালকাটা, দিস ইজ আওয়ার লাস্ট কল্ ফর ইয়োর সিকিউরিটি চেক।
এয়ারবাস ফ্লাইট। প্লেনে উঠে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়েই বোঝা গেল যে, প্যাসেঞ্জার আজ কম। বিস্তর আসন ফাঁকা পড়ে আছে। যে সারিতে আমাদের সিট, সেটা খুঁজে নিয়ে পাশাপাশি দুজনে বসে পড়লুম। তারপর সিট বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে মৃদু গলায় বললুম, “আমাদের বিষাণগড়ের বন্ধুটিকে দেখছি না যে?”
ভাদুড়িমশাই বললেন, “উনি কি আর আপনার-আমার মতো ফেলু পার্টি? নিশ্চয় ‘জে’ ক্লাসের টিকিট, সামনের দিকে বসেছেন।”
“আপনার কথা শুনে মনে হল, সামনের মাসে উনিও বিষাণগড়ে যাবেন। সত্যি?”
“মিথ্যে বলব কেন?”
“উপলক্ষটা কী?”
“তাও বলতে হবে? বিষাণগড়ের গঙ্গাধর মিশ্র মশাই যে বাড়ি তৈরি করিয়েছিলেন, জানুয়ারি মাসে সেখানে শিবলিঙ্গের প্রতিষ্ঠা হবে না? তো সেই সময় আমরা যেমন বিষাণগড়ে যাব, তেমনি কুলদীপও যাবেন।”
“কুলদীপ সে-কথা জানলেন কী করে? আপনি ওঁকে বলেছেন বুঝি?”
“তা বলেছি বই কী।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “এত ধুমধাম করে একটা কাজ হতে যাচ্ছে, আর ওঁকে সেখানে গিয়ে দুদিন থাকতে বলব না?… কেন, কুলদীপ যাচ্ছেন শুনে আপনি ঘাবড়ে গেলেন নাকি?”
তক্ষুনি-তক্ষুনি ভাদুড়িমশাইয়ের প্রশ্নের কোনও উত্তর দেওয়া গেল না। তার কারণ, প্লেন ইতিমধ্যে হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে চলতে-চলতে রানওয়ের একটা প্রান্তে এসে এক মুহূর্ত থেমে থেকেই ভীষণভাবে গর্জে উঠেছে, আর পরক্ষণেই শুরু করে দিয়েছে তার প্রচণ্ড দৌড়। কানে প্রায় তালা লেগে যাবার জোগাড়।
সেকেন্ড কয়েক বাদেই আমরা আকাশে উঠে পড়লুম। গর্জন ক্রমে শান্ত হয়ে এল। ঘোষণা শোনা গেল : আপনারা এবারে ধুমপান করতে পারেন, সিট-বেল্টও খুলে ফেলতে পারেন, তবে কিনা ওটা বেঁধে রাখাই উচিত হ্যায়।
বললুম, “ঘাবড়ে যাবার কথা কী বলছিলেন?”
“বলছিলুম যে, কুলদীপ সম্পর্কে আপনার ভয় কি আজও কাটেনি?”
“ভয় নয়, একটা অস্বস্তি ছিল। সেটা এখনও কাটেনি। লোকটাকে যখন প্রথম দেখি, তখনই মনে হয়েছিল, ওর মাথায় হরেক মতলব খেলছে। পরে দেখলুম, সেটা মিথ্যে নয়। আজও ওকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলুম।”
“আরে দূর,” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “সে-সব তো প্রায় গতজন্মের ব্যাপার। নাইনটিন ফর্টিসিক্সের পরে যে তেতাল্লিশ বছর কেটে গেছে, সেটা ভুলে যাবেন না। তখন ওর অর্থলোভ ছিল, ক্ষমতার লোভ ছিল, কিন্তু বয়েসও ছিল চল্লিশ বছরের মতো। আর আজ ও বিরাশি তিরাশি বছরের বুড়ো। এই বয়েসে ও টাকা দিয়েই বা কী করবে, ক্ষমতাই বা ওর কোন্ কাজে লাগবে?”
“বাট ইউ শুড হ্যাভ থট্ অভ পামেলা। তার জীবনটা তো ও নষ্ট করে ছেড়েছে।”
“পামেলার কথা যে আমি ভাবিনি, তা আপনাকে কে বলল? ভেবেছি মশাই, ভেবেছি। যেমন পামেলার কথা ভেবেছি, তেমনি ভেবেছি যশোমতী দেবীর কথা। …ও হ্যাঁ, একটা খবর তো আপনাকে বলাই হয়নি, কিরণবাবু। আপনাদের ছোটরানি-মাও জানুয়ারি মাসে বিষাণগড়ে আসছেন।
“এই একই উপলক্ষে?”
“হ্যাঁ। বিষাণগড়ের রাজবংশ হচ্ছে মহেশ্বরের উপাসক, আর শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠার মতো একটা পবিত্র অনুষ্ঠানে তিনি আসবেন না? তাই কখনও হয়? নাকি হওয়া উচিত?”
আমার বিস্ময় ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল। বললুম, “তিনিও যে আসবেন, তা আপনি জানলেন কী করে?”
“কুলদীপকে আসতে বললুম তো, তা তিনি বললেন যে, যশোমতী দেবীকেও তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসবেন।”
“শিবলিঙ্গটি যে পুরন্দর মিশ্র জঙ্গল থেকে নিয়ে এসেছিলেন, তাও বলেছেন নিশ্চয়?”
“বা রে, তা কেন বলব না?” ভাদুড়িমশাই একটা সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “অর্ডারি শিবলিঙ্গ হলে কি আর তার প্রতিষ্ঠায় ওঁদের এত উৎসাহ হত? ও-সব তো রোজই কোথাও-না-কোথাও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। আর এ হচ্ছে প্রকৃতির নিজের হাতে তৈরি করা ব্যাপার। তাও কোথায় সেটা পাওয়া গেছে? না, জঙ্গলে। দেখুন না, খবরটা একবার রটে যাক, তখন নাগপুর থেকেও রিপোর্টার আর ফোটোগ্রাফাররা দল বেঁধে ছুটে আসবে।”
“ওরেব্বাস! এটা তো ভেবে দেখিনি! আপনি তো দেখছি এই উপলক্ষে একটা মেলা বসিয়ে দেবার তালে আছেন। যা বললেন, তাতে তো মনে হচ্ছে বিস্তর লোক আসবে।”
ভাদুড়িমশাই রহস্যময় হাসলেন। তারপর তাঁর আধ-খাওয়া সিগারেটটাকে সিটের হাতলে লাগানো অ্যাসট্রের মধ্যে পিষে দিয়ে বললেন, “আসুক, আসুক। যত লোক আসে, ততই ভাল। দ্য মোর দ্য মেরিয়ার।”
খাবারের ট্রলি এসে গিয়েছিল। তাই আর তখন কোনও কথা হল না। বাকি পথটাও বলতে গেলে চুপচাপই কাটল।
দমদমে নেমে ভাদুড়িমশাই একটা ট্যাক্সি নিলেন। তারপর আমাকে শেয়ালদায় আমার বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে চলে গেলেন বালিগঞ্জের দিকে। যাবার আগে বললেন, কলকাতার কাজ সেরে পরদিনই তিনি বাঙ্গালোরের ফ্লাইট ধরবেন। সুতরাং ইতিমধ্যে আর তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।
একটা কথা এখানে বোধহয় বলে রাখা ভাল। যদিও একই প্লেনে আমরা কলকাতায় এলুম, দমদমে নেমে কুলদীপকে আর দেখতি পাইনি।
.
জন্মেছিলুম বোধহয় পায়ের তলায় সর্ষে নিয়ে, যত্রতত্র ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়িয়েছি, দু’দণ্ড কোথাও থিতু হয়ে বসা হত না, একটানা কোনও জায়গায় কয়েকদিন কাটাবার পরেই মনে হত, ঢের হয়েছে, এবারে দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়া যাক। খবরের কাগজে রিপোর্টারের চাকরি নিয়েছিলুম, সেও বসে-বসে কাজ করবার চাকরি নয়, চর্কির মতো ঘুরে বেড়াতে হত। সেই তুলনায় এখন একেবারে ঝিমিয়ে পড়েছি। বাইরে যে যাই না, তা নয়, তবে কিনা খুবই কম যাই। ঘুরে বেড়াতে আগের মতো আর ভালও লাগে না। বুঝতে পারি যে, বুড়ো হচ্ছি, শরীর এখন বিশ্রাম চায়।
বাসন্তীও সেটা বুঝতে পারে। তাই দিল্লি থেকে ফিরে তাকে যখন জানালুম যে, জানুয়ারিতে আবার আমাকে বিষাণগড়ে যেতে হবে, বাসন্তী তখন অবাক হয়ে বলল, “সে কী, আবার দৌড়ঝাঁপ শুরু হল?”
সব কথা তাকে খুলে বললুম। এটাও বললুম যে, সে তো কখনও বিষাণগড়ে যায়নি, এবারে যদি আমার সঙ্গে যায় তো নতুন একটা জায়গা তার দেখা হয়ে যাবে।
বাসন্তী বলল, “যেতে তো ইচ্ছে করে। এত যে লছমি আর যমুনাদির গল্প শুনেছি, তোমার কাছে, গেলে ওদের সঙ্গে দেখাও হয়ে যেত। কিন্তু যাই কী করে? ছেলে একমাসের ছুটি নিয়ে কলকাতায় আসছে, কালই চিঠি পেয়েছি, তো সে এল আর আমি বেরিয়ে পড়লুম, তা তো হয় না। তোমাকে তাই একাই যেতে হবে। ভাদুড়িদা যাচ্ছেন তো?”
“তিনি তো যাচ্ছেনই। সম্ভবত কৌশিকও যাবে।”
“তা হলে আর তাবনা কী, ভাদুড়িদা যখন সঙ্গে আছেন, তখন আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারব। আর তা ছাড়া, আমি আর পারুল তো এই সেদিনই পুরী থেকে ঘুরে এলুম। তোমারই বরং কোথাও যাওয়া হয় না। না না, তুমি যাও, এখন যখন যেতে চাইছে, তখন দিন কয়েকের জন্যে ঘুরেই এসো।”
যেমন লছমি আর যমুনাদির কথা, তেমনি কুলদীপের কথাও বাসন্তীকে অনেক বলেছি। কুলদীপ সিংও যে বিষাণগড়ে যাচ্ছে, সেটা আবশ্য বাসন্তীকে আজ জানালুম না। জানালে আমার বিষাণগড়ে যাওয়ার ব্যাপারে বাসন্তী এত সহজে সম্মতি দিত কি না, সেটা সন্দেহের ব্যাপার।
.
সকালের জলখাবার খেয়ে সদ্য চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিয়েছি, সদানন্দবাবু এসে হাজিরা দিলেন। একগাল হেসে বললেন, “কী মশাই, দিল্লি কেমন হল?”
“ছিলুম তো মাত্র একটা দিন আর দুটো রাত। তার মধ্য আর কী হবে?”
“না মানে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দেখা হবে বলেছিলেন না? দেখা হল?”
“তা হয়েছে।”
“আমার কথা কিছু জিজ্ঞেস করলেন তিনি?”
করেননি। কিন্তু সেটা বললে পাছে সদানন্দবাবু দুঃখ পান, তাই মিথ্যে করে বলতে হল, তা করেছেন বই কী। বিশেষ করে জিজ্ঞেস করলেন আপনার স্বাস্থ্যের কথা।”
“তা আপনি তাঁকে কী বললেন?”
“বললুম যে, মর্নিং ওয়াক করে আপনি চমৎকার আছেন। অ্যাজ ফিট অ্যাজ এ ফিল।” সদানন্দবাবুর মুখে হঠাৎ ছায়া পড়ল। বললেন, “কিন্তু মশাই, আমি একা ভাল থাকলেই তো হবে না, কলকাতারও তো ভাল থাকা চাই।”
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কেন, কলকাতার আবার কী হল?”
“না মানে নতুন করে কিছু হয়নি। কিন্তু যা হয়েছে, তার তো একটা কিনারা হওয়া দরকার।”
“কীসের কিনারা।”
“তাও বুঝলেন না? স্টোনম্যানের মশাই, স্টোনম্যানের।”
“তা-ই বলুন। তা পরশুর আগের দিন কলকাতা ছেড়ে কাল রাত্তিরে তো ফিরে এসেছি, এর মধ্যে আবার কী ঘটল?”
“না না, নতুন কিছু ঘটেনি। গত মাসে সেই যে আমাদের ফ্লাই-ওভারের তলায় একজনের মাথা ফাটিয়েছিল, তারপরে তো দিন-পঁচিশেক কাটল, ইতিমধ্যে আর ফুটপাথে কেউ ওভাবে মারা পড়েনি।”
“তা হলে?”
শুনে সদানন্দবাবু ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “ইতিমধ্যে আর-কেউ মরেনি ঠিকই, কিন্তু মরতে কতক্ষণ! জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে এমন একটা মাসও কি গেছে, যে মাসে কেউ মরেনি? এক জুলাই মাসেই তিনটে লোক মরেছে, আর সেপ্টেম্বরে দুটো। এখন এই ডিসেম্বর মাসটা ভালয় ভালয় কাটলে হয়। কাটবে কি না কে জানে, আজ তো একুশে ডিসেম্বর, মাস কাবার হতে এখনও দশ দিন বাকি, দেখুন এখন এর মধ্যে আবার কেউ কাবার হয়ে যায় কি না!”
“হলেই বা আমরা কী করতে পারছি?”
“আমরা আর কী করব, আমাদের ক্ষমতাই বা কতটুকু, চুপচাপ সব দেখে যাওয়া আর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকা ছাড়া তো কিছু করবারও নেই আমাদের। তবে কিনা ভাদুড়িমশাই হয়তো কিছু করতে পারেন। তা দিল্লিতে তো তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল আপনার, এটার একটা ফয়সলা করার জন্যে তাঁকে একবার রিকোয়েস্ট করলেও তো পারতেন।”
“তিনিই বা কী করবেন? ভাদুড়িমশাই বাঙ্গালোরে থাকেন, আর ৬ হল কলকাতার ব্যাপার। অতদূর থেকে এ-সব ব্যাপারের ফয়সলা করা যায়?”
“তা কেন যাবে না? আমার কথাটাই ভেবে দেখুন না। আমি থাকি শেয়ালদায়, আর তিনি থাকেন বালিগঞ্জে। তাও যে থাকেন, তা নয়, দিন কয়েকের জন্যে সেখানে তাঁর বোনের বাড়িতে এসে উঠেছিলেন মাত্র। তা সেখান থেকে তাঁর একবার এ পাড়ায় আসার দরকার? ল না, বালিগঞ্জে বসেই তিনি আমার কেসটার কেমন ফয়সলা করে দিলেন। তা হলে বা লোর বসেই ব। তিনি এই ব্যাপারটার ফয়সলা করে দিতে পারবেন না কেন?”
আমাদের পীতাম্বর চৌধুরি লেনের মার্ডার কেসটার ফয়সলা ভাদুড়িমশাই যেভাবে করেছিলেন, সত্যি সেটা চমকপ্রদ। কিন্তু তাই বলে কি আর এ-দুটো ব্যাপারের মধ্যে কোনও তুলনা চলে? তা ছাড়া, শেয়ালদা থেকে বালি।ঞ্জ যত দূর, কলকাতা থেকে বাঙ্গালোর যে তার চেয়ে কিছু বেশি দূর, সদানন্দবাবু তা জানেন না, তাও নয়। কিন্তু মুশকিল হয়েছে এই যে, সদানন্দবাবুকে ফাঁসির দড়ির থেকে ছাড়িয়ে আনার পর থেকেই তিনি ভা’ডিমশাইকে সাক্ষাৎ ভগবান বলে ভাবতে শুরু করেছেন। তাঁর ধারণা, ভাদুড়ি শাইয়ের পক্ষে সবই সম্ভব।
ধারণাটাকে ভেঙে দেবার কোনও অর্থ হয় না। তাই বললুম, “হয়তো পারেন। তবে কিনা এখন তিনি অন্য একটা কেস নিয়ে বড় ব্যস্ত হয়েছেন। বড্ড জটিল কেস, তাই দৌড়ঝাঁপও করতে হচ্ছে খুব। তো সেটা না-মেটা পর্যন্ত তো এই স্টোনম্যনের ব্যাপারটায় তিনি হ’তই দিতে পারবে না।”
সদানন্দবাবু বেজার গলায় বললেন, “তবে তো মুশকিল হল। শেয়ালদা পাড়ায় থাকি, চতুর্দিক জমজমাট, রাস্তায় পা ফেলবার জায়গা মেলে না, সারাক্ষণ ভিড়ভাট্টা লেগে আছে, অথচ এই তল্লাটেই কিনা এমন ব্যাপার। নাঃ, বাড়িঘর বিক্রি করে এখান থেকে সরেই যাব ভাবছি।”
হেসে বললুম, “কোথায় যাবেন? রাজভবনের কাছাকাছি কোথাও? সেখানেও কিন্তু সেপ্টেম্বরেই একজন খুন হয়েছে!”
“ওরে বাবা!” সদানন্দবাবু বললেন, “ঠিকই তো, আমার তো মনেই ছিল না। ওল্ড কোর্ট হাউস স্ট্রিটেও যে স্টোনম্যান একজনের মাথা ফাটিয়েছে, তা তো ভুলেই গিয়েছিলুম। তা হলে আর কোথায় যাব।”
বাড়ি ফেরার জন্যে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়েছিলেন, ধপ্ করে আবার বসে পড়লেন।
বললুম, “কোথাও যাবার দরকার নেই। এইখানেই থাকুন। আমরাও তো রয়েছি, এত ভয় পাচ্ছেন কেন? তা ছাড়া আপনি তো আর ফুটপাথের বাসিন্দা নন। তবে?”
সদানন্দবাবু বললেন, “আরে মশাই, ফুটপাথের বাসিন্দা না-হলেই যে রেহাই মিলবে, তা-ই বা ভাবতে পারছি কই। ওই যে সেদিন কার নাম করছিলেন … ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, নরেশ দস্তিদার তা সেই ভদ্রলোক আজ তাঁর কাগজে কী লিখেছেন জানেন?”
“কী লিখেছেন?”
“সেই কথা বলব বলেই তো এসেছিলুম।” হাতের কাগজখানা তুলে ধরে সদানন্দবাবু বললেন, “শুনুন তবে। ভদ্রলোক লিখেছেন, ‘আপাতত সেই অদৃশ্য শিকারি ফুটপাথকেই তার মুণ্ডশিকারের মঞ্চ হিসেবে নির্বাচন করে নিয়েছে বটে, কিন্তু শুধু ফুটপাথেই যে তার এই ঘৃণ্য জিঘাংসাবৃত্তি সীমাবদ্ধ থাকবে, তার নিশ্চয়তা কোথায়? বস্তুত সেই নরঘাতী উন্মাদের হস্ত ক্রমে যদি নাগরিকদের গৃহাভ্যন্তরেও প্রবিষ্টু হয়, তাতে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না।’ তা হলেই বুঝুন। আমার তো মশাই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।”
হেসে বললুম, “তা তো দিতেই পারে। যা ভাষা, আপনি যে ভির্মি খাননি, এই যথেষ্ট।”
“ঠাট্টা করছেন তো? তা করুন।”
সদানন্দবাবু আর একটিও কথা বললেন না। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
একটু বাদেই ফোন বেজে উঠল। যিনি ফোন করছিলেন, আমি যে কিরণ চ্যাটার্জি, এইটে জেনে নিয়ে তিনি বললেন, “প্লিজ হোল্ড দ্য লাইন।”
পরক্ষণেই ভেসে এল গম্ভীর কণ্ঠস্বর। “মিঃ চ্যাটার্জি?”
“স্পিকিং।”
“আমি কুলদীপ সিং কথা বলছি। অনেকদিন বাদে কাল আপনার সঙ্গে দিল্লি এয়ারপোর্টে দেখা হল, লেকিন বাতচিত হল না। তা আপনি আছেন কেমন?”
“এই আছি একরকম। আপনি?”
“আমি আর কী ভাল থাকব? বুডটা হয়ে গেছি না? তা জানুয়ারি মাসে আপনিও বিষাণগড়ে যাচ্ছেন তো?”
“ভাবছি তো যাব। এখন দেখি কী হয়।”
“আরে চলুন চলুন। পুরানো ঝগড়া ভুলে যান মশাই। উই আর অল ওল্ড পিল নাউ, ছেলেছোকরাদের মতন ঝগড়া করা আমাদের সাজে না। কী, আমি ভুল বলছি?”
“না, না, ভুল কেন, ঠিকই তো বলছেন।”
“তা হলে আপনি যাচ্ছেন তো?”
ঢোক গিলে বললুম, “ঠিক আছে, আপনি যখন এত করে বলছেন, তখন নিশ্চয়ই যাব।”
“বাঃ, তা হলে ওই কথাই রইল। আই লুক ফরোয়ার্ড টু মিটিং ইউ দেয়ার।”
কুলদীপ ফোন ছেড়ে দিলেন।
পালামে যখন কুলদীপকে দেখি, একটা অস্বস্তির কাঁটা তখন থেকেই আমার মনের মধ্যে খচখচ করছিল। ফোনে অবশ্য খুবই মিষ্টি-মিষ্টি কথা বলল। হাসলও খুব। কিন্তু কী জানি কেন, আমার অস্বস্তি তাতে বাড়ল বই কমল না।
