বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৪

সরস্বতী বলল, “উঠতে দিলে তো উঠবেন। না বড়দা, আজ আর আপনাদের ছাড়ছি না।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “বলিস কী, যাঁর বাড়িতে উঠেছি, তিনি তো ভীষণ চিন্তা করবেন।”

“একটুও চিন্তা করবেন না। আপনি এসে পৌঁছবার খানিক বাদেই তাঁকে ফোন করে আমি জানিয়ে দিয়েছি যে, রাত্তিরটা আপনি এখানেই থাকছেন।”

বললুম, “কিন্তু আমার কী হবে?”

“আপনি তো হোটেলে উঠেছেন। ঘরের চাবিও রিসেপশানে জমা দিয়ে এসেছেন নিশ্চয়। তা হলে ফোন না-করলেও ক্ষতি নেই। ওরা ঠিকই বুঝবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিন্তু তোদের অসুবিধে হবে না তো?”

“কিচ্ছু না।” সরস্বতী হেসে বলল, “আপনাদের নাতজামাইয়ের এই ফ্ল্যাটটা কি খুব ছোট নাকি? তিন-তিনটে বেডরুম। তার একটা তো খালিই পড়ে থাকে।”

খাওয়ার পাট চুকে গিয়েছিল। আমরা আবার ড্রয়িংরুমে এসে যে-যার জায়গায় বসে পড়েছি। সুমঙ্গল বলল, “আমার কাছে ভাল জেসমিন-টি আছে, কেউ খাবেন তো বলুন।”

দিদি বললেন, “আমি খাব না।”

লছমি বলল, “আমিও না। তবে তোমরা খাও। আমি আর মা অবশ্য এখুনি উঠব না, বসে-বসে তোমাদের গল্প শুনব। চাচাজি, তুমি আরও ক’টা দিন এখন দিল্লিতে আছ তো?”

বললুম, “না রে, লছমি, কালই ইভনিং ফ্লাইটে আমাকে ফিরতে হবে।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আমিও কালই ফিরছি। তবে সরাসরি ব্যাঙ্গালোরে যাচ্ছি না। কলকাতায় আবার একটা কাজ পড়ে গেছে।” বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। “কিরণবাবু, আমারও কাল ইনিং ফ্লাইট।”

বললুম, “বাঃ, তা হলে তো এক সঙ্গেই ফিরছি।”

“মাঝে-মাঝে তো দিল্লি আসতে হয়। তা তোদের বাড়িটা তো দেখেই গেলুম। যখনই আসি, দেখা হবে।”

চা এসে গিয়েছিল। হাল্কা চা, তাতে জুঁইয়ের গন্ধ ভুরভুর করছে। ভাদুড়িমশাই চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “তারপর সরস্বতী, তোর চাকরির খবর কী?”

সরস্বতী বলল, “চাকরির আবার নতুন খবর কী হবে? যেমন পড়াচ্ছিলুম, তেমন পড়িয়ে যাচ্ছি। আপনি সেই রিপোর্টের কথা ভাবছেন তো? মানে ওই যে রিপোর্টে আমার সম্পর্কে কয়েকটা খারাপ কথা বলা হয়েছিল, তাতেই বোধহয় আপনি ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন, আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে। তাই না?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ভয় তো পাবারই কথা। তা ওতে তোর কোনও ক্ষতি হয়নি তো?”

সুমঙ্গল বলল, “কিচ্ছু না, কিচ্ছু না। আসলে গোটা ব্যাপারটাই এখন ধামাচাপা পড়ে গেছে। দেশে একটা মস্ত পালাবদল হয়ে গেল তো, দিল্লিতে এখন কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট, ও-সব ব্যাপার নিয়ে কেউ আর এখন মাথা ঘামাচ্ছে না।”

সরস্বতী বলল, “কিন্তু অন্য দিকে ছোট্ট একটা ঝামেলা বেধেছে বড়দা। সেই যে ভুপিন্দর সিং বলে একটা ছেলের কথা বলেছিলুম না, মনে আছে আপনাদের?”

নামটা চেনা-চেনা লাগছিল, কিন্তু কোন্ প্রসঙ্গে কার কাছে এই নামটা শুনেছিলুম মনে করতে পারলুম না।

ভাদুড়িমশাই দেখলুম ঠিকই মনে রেখেছেন। বললেন, “মানে সেই ছেলেটার কথা বলছিস, যাকে নিয়ে তুই বিষাণগড়ের জঙ্গলে সোনার খোঁজে গিয়েছিলি?”

সরস্বতী বলল, “হ্যাঁ, বড়দা। পাহাড়ে গিয়ে মাত্র দিনকয়েক ঘোরাঘুরি করার পরেই তার খুব জ্বর হয়। তখন জনাকয় ট্রাইবালকে সঙ্গে দিয়ে তাকে শহরে পাঠিয়ে দিতে হয়েছিল। তা ভুপিন্দার এই দিল্লি ইউনিভার্সিটিতেই পড়ত। আমার ছাত্র।”

“তাকে নিয়ে আবার কী ঝামেলা হল?”

“আর বলবেন না বড়দা। শত হলেও ছাত্র তো, তাই কিছু বলতে বড় সংকোচ হয়। কিন্তু না-বলেও পারছি না। ছেলেটা বড্ড গণ্ডগোল করছে।”

“কী রকম গণ্ডগোল?”

“তা হলে শুনুন। জ্বর সেরে যাবার পরে ছেলেটা আর জঙ্গলে যায়নি, সরাসরি দিল্লিতে ফিরে আসে। তারপর এম. এসসি. পাশ করে এখানে একটা আন্ডারগ্রাজুয়েট কলেজে লেকচারারের চাকরিও পেয়ে গেছে। তো দিল্লিতে সেই যে জিওলজিস্টদের কনফারেন্স হয়, তাতে সে একদিনও যায়নি বটে, তবে সেখানে আমি যা বলেছিলুম, কাগজগুলোর কল্যাণে তার তা জানতে কিছু বাকি নেই।”

ভাদুড়িমশাই সরস্বতীকে বাধা দিয়ে বললেন, “তা তো এখন দেশসুদ্ধু সবাই জানে, তা হলে তোর এই ছাত্রটিই বা তা জানবে না কেন? কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা।”

সুমঙ্গল বলল, “কী ভাবছেন আপনি?”

“সরস্বতী যে-কটা লোকেশানের কথা সরাসরি কর্তাদের বলেছিল, সেখানে খোঁজ চালিয়ে যে সোনার হদিশ মেলেনি, সেটাও সে জানে তো?”

সরস্বতী বল, “তাও জানে, বড়দা। এমনকি, রিপোর্টে যে আমাকে নিন্দেমন্দ করা হয়েছে, তাও জানে।”

“তবে তো মিটেই গেল। তা হলে আর গণ্ডগোল কীসের?”

“কীসের গণ্ডগোল, সবটা না শুনলে তা আপনি বুঝতে পারবেন না।” এক মুহূর্ত চুপ করে রইল সরস্বতী, পট থেকে নিজের পেয়ালায় ফের চা ঢেলে নিল, তারপর একটা চুমুক দিয়ে পেয়ালাটা নামিয়ে রেখে বলল, “দিন পনেরো আগে ভুপিন্দার আমার কাছে এসেছিল। এসে কী বলল জানেন? বলল যে, সরকারকে আমি যদি ভুলভাল লোকেশানের কথা না বলতুম, তা হলে নিশ্চয় সোনার হদিশ মিলত, আর রিপোর্টেও তা হলে আমার সম্পর্কে কোনও খারাপ কথা থাকত না।”

“তাতে তুই কী বললি?”

“আমি তে। হতভম্ব। প্রথমে তো বুঝতেই পারলুম না যে, এমন কথা বলবার মতো সাহস এর হয় কী করে! অনেক কষ্টে রাগ সামলে নিয়ে বললুম, তুমি তো বলতে গেলে আমার সঙ্গে ছিলেই না, জ্বরে পড়েছিলে বলে প্রথম দু’চারদিনের পরেই তোমাকে শহরে পাঠিয়ে দিয়েছিলুম, তারপরে আমি কোথায়-কোথায় কাজ করেছি, তা তো তোমার জানবার কথা নয়, তা হলে তোমার এমন সন্দেহ হল কেন যে, আমি ভুলভাল কয়েকটা লোকেশানের কথা ওদের বলেছি? না ভুপিন্দার, যেখানে সোনা পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয়েছিল, সেই জায়গার কথাই আমি বলেছিলম। সোনা যে পাওয়া যায়নি, তাতে বুঝতে হবে যে, যা আমার মনে হয়েছিল, তা নির্ভুল নয়। সেটা নিশ্চয় জিওলজিস্ট হিসেবে আমার পক্ষে খুবই লজ্জার কথা। কিন্তু তাই বলে তুমি এমন ভাবছ কেন যে, সরকারি টিমটাকে আমি ইচ্ছে করে ভুল জায়গায় পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলুম?”

ভাদুড়িমশাইও পট থেকে আবার নতুন করে তাঁর পেয়ালায় চা ঢাললেন। তারপর মুখ না তুলেই বললেন, “কথাটা তোর ছাত্র বিশ্বাস করল?”

“মোটেই না। বিশ্বাস তো করলই না, বরং একটা মারাত্মক কথা বলে বসল। বলল যে, ম্যাডাম, আপনি তো আমাকে নিয়ে বিষাণগড় শহর থেকে মাইল কুড়ি দক্ষিণের এক জঙ্গলে এলাকায় গিয়ে ঢুকেছিলেন, কিন্তু সরকারি কর্তাদের যে লোকেশানের কথা বলেছেন, তার একটাও বিষাণগড়ের দক্ষিণে নয়, আর সেইজন্যেই আমার মনে হচ্ছে যে, ওদের আপনি সত্যি কথা বলেননি।”

“ভুপিন্দার আর-কিছু বলল?”

“বলল বই কী। জনাকয় ট্রাইবালকে সঙ্গে দিয়ে তো আমি ওকে শহরে ফেরত পাঠিয়েছিলুম, তা তাদেরই একজন নাকি ওর হাতের সোনার আংটিটা দেখিয়ে বলেছিল যে, জঙ্গলে এইরকম রঙের পাথর পাওয়া যায়। তো ভূপিন্দার বলল, আমিও নাকি প্রথম দু-একদিন ওখানে কাজ করেই ওকে বলেছিলাম যে, সম্ভবত আমরা জায়গা বাছতে ভুল করিনি।”

“তা সে এখন কী চায়?”

“ওখানে যেতে চায়। কিন্তু একা যাবে না। ধরে পড়েছে যে, আমাকে ওর সঙ্গে যেতে হবে।”

“তোর কী ইচ্ছে? যাবি?”

সরস্বতী হাসল। “যেতুম বড়দা, কিন্তু কার কী মতলব, কথাবার্তার ধরন দেখে সেটা অন্তত খানিক পরিমাণে আঁচ করা যায় তো, তা তুপিন্দারের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে যে, ছেলেটার মতলব বিশেষ ভাল নয়। ও আমাকে লোভ দেখাচ্ছে।”

“তার মানে?”

“মানে আর কী, বলছে যে, ওকে সঙ্গে নিয়ে সামনের মাসে আমি যদি সেই লোকেশানটায় যাই, আর লোক্যালি দশ-বারোজন মজুর জোগাড় করে ফের কাজ শুরু করি তো তার তাবৎ খরচা ও দিয়ে দেবে।”

“সে তো অনেক টাকার ব্যাপার।”

“তা নিয়ে ওর ভাবনা নেই।” সরস্বতী বলল, “ভুপিন্দারের বাপ বড়লোক, তাই টাকাটা ও দিয়ে দিতে পারবে। কিন্তু আমার মন এতে সায় দিচ্ছে না। কী জানি কেন মনে হচ্ছে যে, কোনও আবিষ্কারের নেশায় নয়, ও যেতে চাইছে সোনার লোভে। অথচ এই সহজ কথাটাই ওর জানা নেই যে, মাটির নীচে যা-কিছুই থাকে, তা সে এক-ঘড়া মোহরই হোক কি সোনার একটা আস্ত খনিই হোক, তার মালিকানা হচ্ছে রাষ্ট্রের। এই নিয়ে যে একটা আইন রয়েছে, আর সেই আইন ভাঙার শাস্তি যে মোটেই লঘু নয়, তা পর্যন্ত জানে না।”

ভাদুড়িমশাই এতক্ষণ গম্ভীর মুখে সব শুনছিলেন, এবারে হেসে উঠলেন। বললেন, “জানবে না কেন, সবই হয়তো জানে। কিন্তু সোনার লোভ যাদের পেয়ে বসে, আইনের কথাটা জানলেই বা তারা মানবে কেন?”

টেলিফোন বেজে উঠল। ফানটা শোবার ঘরে। সরস্বতী উঠে গিয়ে ফোন ধরল। ফিরে এল মিনিট তিন-চার বাদে। দেখলুম তার মুখচোখ থমথম করছে। লছমি বলল, “এত রাতে কে ফোন করেছিল রে?”

সরস্বতী বলল, “ভুপিন্দার।”

বললুম, “কী বলল?”

সরস্বতী তখন-তখনই আমার কথার কোনও জবাব দিল না। একেবারে শূন্য চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। যেন আমার কথাটা সে শুনতেই পায়নি। তারপর একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, “বড়দা, ছেলেটা শুধু লোভী নয়, পাজি। আমাকে … আমাকে ও এখন ভয় দেখাচ্ছে। কী বলছে জানেন? বলছে যে, ওর কথায় রাজি হয়ে আমি যদি সামনের মাসেই ওকে নিয়ে বিষাণগড়ে না যাই, তো সহজে ও আমাকে ছাড়বে না। বলছে, আমার যে একটা বাচ্চা-ছেলে রয়েছে, অন্তত তার কথাটা যেন আমি ভেবে দেখি। কায়দা করে বলল, থিংক অভ্ ইয়োর বেবি, ম্যাডাম, থিংক অভ হিজ হেল্থ।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ইঙ্গিতটা তো খুবই স্পষ্ট। তা তুই কী করবি? যাবি?”

“যদি-বা যেতুম, এর পরে আর যাওয়ার কোনও প্রশ্নই উঠছে না।”

লছমি যাও বা একটা-দুটো কথা বলছিল, দিদি এতক্ষণ একটাও কথা বলেননি। এবারে তিনি বললেন, “কিন্তু ভাদুড়িদাদা, জানুয়ারি মাসের শেষদিকে তো আমাদের সবাইকে একবার বিষাণগড়ে যেতেই হচ্ছে। তখন আপনাদেরও আসতে হবে। না-এলে ছাড়ছি না।”

বললুম, “কী ব্যাপার?”

দিদি বললেন, “চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর ধরে একটা কাজ ফেলে রেখেছি, কিন্তু এবারে সেটা না করলেই নয়। কবে মরে যাব, তার ঠিক কী! কাজটা না-করেই যদি মরি, তো পরলোকে গিয়ে শ্বশুরমশাইয়ের কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।”

লছমি বলল, “কী হয়েছে বলি। বাবুজি তো মাঝে-মাঝেই জঙ্গলে চলে যেতেন। শেষবার যখন জঙ্গল’ থেকে ফিরে আসেন, তখন কষ্টিপাথরের একটা শিবলিঙ্গ সেখান থেকে নিয়ে এসেছিলেন। তার দিন দুই-তিন পরেই তিনি মারা যান। দাদু ঠিক করেছিলেন, বিষাণগড়ে যখন আমাদের নিজেদের বাড়ি হবে, তখন সেই বাড়ির চত্বরে ছোটমতন একটা মন্দির বানিয়ে তাতে ওই শিবলিঙ্গ প্রতিষ্ঠা করবেন। তো তার সময় তিনি আর পেলেন কোথায়? বাড়ির কাজ শেষ হতে-না-হতেই তিনিও মারা গেলেন। তার কিছুদিন বাদে মারা গেলেন আমার দাদিও। আমরাও তারপর দিল্লিতে চলে এলুম। ফলে শিবলিঙ্গ আর প্রতিষ্ঠা করাই হল না, দাদুর ইচ্ছেটা অপূর্ণ থেকে গেল। তো মা এখন তাঁর শ্বশুরমশাইয়ের সেই ইচ্ছেটা পূর্ণ করতে চাইছেন।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “সেই শিবলিঙ্গ এখন কোথায়?”

সরস্বতী বলল, “এখানে আমাদের কাছেই রয়েছে, শোবার ঘরের একটা কুলুঙ্গিতে রেখে দিয়েছি, তবে প্রতিষ্ঠা না-করে নাকি পুজো করতে নেই, তাই পুজো করা হয় না।”

“এখানে প্রতিষ্ঠা করিসনি কেন?”

“এটা তো ভাড়া-করা ফ্ল্যাট। কবে এখান থেকে উঠে যাব, তার ঠিক কী। নিজেদের বাড়ি হলে প্রতিষ্ঠা করা যেত, কিন্তু দিল্লিতে এখন জমির যা দাম, নিজেরা কখনও বাড়ি করতে পারব এমন ভরসা আর করি না।”

“চল্ শিবলিঙ্গটা একবার দেখে আসি।”

সরস্বতীর সঙ্গে তাদের শোবার ঘরে গিয়ে ঢুকলুম আমরা। কুচকুচে কালো পাথরের ছোট্ট একটি শিবালঙ্গ। হাইট সম্ভবত ইঞ্চি সাত-আটের বেশি হবে না। ভাদুড়িমশাই বললেন, “একবার হাতে তুলে দেখতে পারি?”

দিদি বললেন, “দেখুন না। এখনও তো প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, যত খুশি ছুঁয়ে দেখুন।”

ভাদুড়িমশাই কুলুঙ্গি থেকে শিবলিঙ্গটিকে তুলে নিয়ে ভাল করে সেটিকে দেখলেন। তারপরে যথাস্থানে আবার সেটিকে বসিয়ে রেখে বললেন, “একটুও খুঁত নেই। এমন নিখুঁত শিবলিঙ্গ বড় একটা দেখাই যায় না।…কিন্তু আর না সরস্বতী, অনেক রাত হল, এবারে আমরা শুয়ে পড়ব।”

গেস্টরুমে পাশাপাশি দুটো সিঙ্গল খাট। শুনে পড়তেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে এসেছিল, হঠাৎ ভাদুড়িমশাইয়ের কথায় আমার চট্‌কা ভেঙে গেল ‘ও কিরণবাবু, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?”

এই অবস্থায় সবাই যা বলে আমিও তা-ই বললুম। “না না, ঘুমিয়ে পড়ব কেন, এই একটু চিন্তা করছিলুম আর কি।”

“দেখুন মশাই, আপনার নামে যে ওয়ারেন্ট অভ অ্যারেস্ট বেরিয়েছিল সেটা মিথ্যে কথা নয়। কিন্তু সেইজন্যেই যে ছেচল্লিশের জুলাই মাসে আপনি বিষাণগড় থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, সেটা মিথ্যে।”

“ও হ্যাঁ, গ্রেফতারি পরোয়ানা তো প্রত্যাহার করা হরেছিল, ফলে মাঝখানে কলকাতায় এসেছিলুম বটে, কিন্তু পরে আবার ফিরেও যাই। বিষাণগড় থেকে পাকাপাকিভাবে আমি চলে আসি তার পরের বছর, সাতচল্লিশ সালে। তাই আপনার কথা শুনে একটু অবাক হয়ে গিয়েছিলুম। তা আপনি তো সবই জানেন, তা হলে আপনি জেনেশুনে ও-কথা বলতে গেলেন কেন?”

“অর্থাৎ, গ্রেফতারি পরোয়ানাটাকে আপনার চলে আসার কারণ হিসেবে দেখালুম কেন, এই তো?”

“সত্যিই তো, কেন দেখালেন?”

“এইজন্যে দেখালুম যে, আপনার বিষাণগড় ছাড়বার আসল কারণটা যে কী, তা আমি এখনও ওদের জানাতে চাইছি না। দেখছেন তো, সেখানে যেমন আপনাকে বাগে আনবার জন্যে একটা বাচ্চা-মেয়েকে খুন করা হবে বলে ভয় দেখানো হয়েছিল, এখানেও তেমনি সরস্বতীকে বাগে আনবার জন্যে ওদের বাচ্চা-ছেলেকে ভুপিন্দার তার টার্গেট করে নিয়েছে। না কিরণবাবু, আপনারও এখন কিছু বলবার দরকার নেই, এমনকি বিষাণগড়ে যে তিন ট্রাইবাল খুন হয়েছিল, তাদের একজনের ঝুলির মধ্যে আমি কার ফোটোগ্রাফ পেয়েছিলুম, তাও এখন এদের বলবেন না। নাহক উত্তেজনা সৃষ্টি করে লাভ কী। বরং ভাবুন, একটা কথা একটু গভীরভাবে ভাবুন।”

“কী ভাবব?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। “বিষাণগড় আর দিল্লির মধ্যে কোথাও কোনও লিংক আছে কি না, সেইটে ভাবুন। যদি কোনও লিংক আছে বলে মনে হয় তো আমাকে জানাবেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *