আসল খুনির সন্ধানে (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
চার
একেনবাবুকে ডাঃ গুপ্ত বার বার বলেছিলেন কলকাতায় গিয়েই বিকাশ সেনের স্ত্রী মনীষা সেনের সঙ্গে দেখা করতে। সমবেদনা জানানো ছাড়াও ডাঃ গুপ্ত যে সব রকম সাহায্য করতে প্রস্তুত সে কথা জানাতে। কলকাতার নার্সিং হোম-এ মিসেস সেনের জন্যে একটা কাজের ব্যবস্থা যে থাকবে– সেটাও ডাঃ গুপ্ত একাধিক বার জানাতে বলেছেন। সমবেদনা জানানোর ব্যাপারে কোনো সমস্যা নেই। তবে চাকরির কথা একেনবাবু কখনোই বিকাশবাবুর স্ত্রীকে বলতে পারেন না। তিনি তো আর চাকরিদাতা নন। ডাঃ গুপ্ত আবেগের বশে যা বলেছেন, তা কয়েক মাস বাদে মনে রাখবেন কিনা স্থিরতা নেই। খামোখা একেনবাবু সেটা বলতে যাবেন কেন? তবে বিকাশ সেনের স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাটা খুবই প্রয়োজনীয়। একবার কেন, একাধিক বার দরকার হতে পারে।
একেনবাবু ফোন করলেন। মনীষা সেন নিজেই ফোন ধরেছিলেন। একেনবাবুর কথা তিনি ডাঃ গুপ্তের কাছে শুনেছেন। একেনবাবু দেখা করতে চান জেনে বললেন বাড়িতেই থাকবেন, তবে বিকেল পাঁচটা বা পাঁচটার একটু পরে এলে সুবিধা হয়।
একেনবাবু সেই মতন পাঁচটা নাগাদই গেলেন।
চারতলা বাড়ি। সিঁড়িতে ঢোকার মুখে দারোয়ান গোছের একটা লোক টুলে বসে পত্রিকা পড়ছিল। বিকাশ সেনের নাম বলাতে কোনো কথা না বলে উপরের দিকে আঙুল তুলে আবার পাঠে মনঃসংযোগ করল। চমৎকার সিকিউরিটি!
দোতলা, তিনতলা, চারতলা তিনটেই তো উপরের দিকে। লিফটের বোতাম টিপে চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লোকটাকে। “কোন তলায়?”
উত্তর পাবার আগেই লেটার-বক্সগুলোর দিকে একেনবাবুর চোখ পড়ল। বিকাশ সেন, ১-এ। তারমানে দোতলা। লিফট নেমে আসার অপেক্ষা না করে সিঁড়ি ভেঙেই উঠলেন। দোতলায় তিনটে দরজা। তার একটাতে ১-এ দেখে বেল বাজালেন। কমবয়সি একটি কাজের মেয়ে এসে দরজা খুলল। তার পিছনে বয়স্কা এক মহিলা। একেনবাবু নিজের নাম বলতেই বললেন, “আসুন, বেবিকে ডেকে দিচ্ছি।”
বাইরের ঘরটা বেশ বড়ো। একদিকের দেয়াল ঘেঁষে লম্বা সোফা। সামনে জাম্বো সাইজের কফি টেবিল। তার একপাশে লাভ-সিট, অন্যদিকে ম্যাচিং চেয়ার। তিন দেয়ালে তিনটে ছবি টাঙানো। একটা মনে হল অয়েল পেন্টিং, অন্য দুটো অ্যাক্রিলিক বা অন্য কিছু দিয়ে আঁকা। কফি টেবিলে কাপ-ডিশের ছড়াছড়ি। নিশ্চয় বহুলোকের আনাগোনা চলছে। শোকের মধ্যেও আপ্যায়নের জন্যে চা-বিস্কুট দিতে হয়।
রাস্তার দিকের জানলার পাশে দুটো বেতের চেয়ার। তার একটাতে কাঁচাপাকা চুলের এক বয়স্ক ভদ্রলোক বসে বই পড়ছিলেন। ভদ্রলোকের চেহারাতে বেশ একটা আভিজাত্য আছে। উঠে এসে একেনবাবুকে বসতে বললেন। মনীষার বাবা। ওঁর সঙ্গে একেনবাবুর দু একটা কথাও হল। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন মেয়ে আর নাতি-নাতনিদের সামলাতে। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল ডাঃ গুপ্তকে মনীষার বাবা ভালো করেই চেনেন। উনি যখন মেডিক্যাল কলেজে পড়াতেন, তখন ডাঃ গুপ্ত ছাত্র ছিলেন। এখন আর পড়ান না, রিটায়ার করেছেন। কয়েক বছর আগে পড়ানো, রোগী দেখা ইত্যাদি থেকে ছুটি নিয়ে শেষ জীবনটা শান্তিনিকেতনে নিরিবিলিতে কাটাতে গিয়েছিলেন। বিকাশ সেনের মৃত্যুতে সেটায় ছেদ পড়েছে। মনীষা ওঁদের একমাত্র সন্তান। জীবনটা এক খাতে বইছিল, এখন কিছুটা পরিবর্তন হতে বাধ্য।
এইসব কথাবার্তার মাঝে মনীষা এলেন। বয়স তিরিশের কোঠায়, চমৎকার ফিগার। ক’দিনের অযত্নে চুলগুলো রুক্ষ। অগোছালো শাড়ি, চোখের লাল ঢাকার জন্যে ঘরের মধ্যেই কালো চশমা পরে আছেন। মুখটা ম্লান, কিন্তু নিঃসন্দেহে সুন্দরী। এমন সুন্দরী স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বিকাশবাবুর পরনারী আসক্তিটা একেনবাবুর কেমন জানি লাগল। কাম সত্যি আদিম রিপু। যুক্তি-বুদ্ধি-সংস্কার কিছুই মানে না।
একেনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “নমস্কার ম্যাডাম, এ ভাবে এসে আপনাকে বিরক্ত করতে খুব খারাপ লাগছে।”
“বিরক্তির কি আছে, আপনি বসুন।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম।” একেনবাবু বসতে বসতে বললেন, “ডাঃ গুপ্ত বিশেষ করে আমাকে বলেছেন আপনার সঙ্গে দেখা করে ওঁর সমবেদনা জানাতে।”
মনীষা মৃদুস্বরে বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
একেনবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, “যিনি গেছেন ম্যাডাম, তাঁকে ফিরিয়ে আনা যাবে না। যেটা বলতে চাই, আমাকে একটা দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, অপরাধীদের খুঁজে বার করার ব্যাপারে সাহায্য করতে।”
“আমি জানি।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। এই নিয়ে কি দু-একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“কী প্রশ্ন, বলুন?”
“আপনার কি ম্যাডাম কাউকে সন্দেহ হয়? মানে কাউকে কি আপনি জানেন যিনি আপনার স্বামীর শত্রু ছিলেন?”
“না, তেমন কেউ ছিল বলে তো আমি জানি না। পরিচিত যাদের আমি চিনি সবাই ওর বন্ধু।” তারপর একটু থেমে বললেন, “পত্র-পত্রিকায় তো ওকে নিয়ে শুধু নোংরামি চলছে, কিন্তু সেটা আসল বিকাশ নয়..” বলতে বলতে মনীষা সেনের গলা প্রায় বুজে এল।
“ম্যাডাম, ওগুলো থাক। ওসব বেশির ভাগই বানানো।”
একেনবাবুর কথা মনীষা সেনের কানে ঢুকল না। উনি বলে চললেন, “বিকাশ ওয়াজ ভেরি হ্যান্ডসাম এন্ড চার্মিং, আই ক্যান ইম্যাজিন অনেকেই হয়তো ওর কাছে আসার চেষ্টা করেছে, বাট হি ওনলি কেয়ারড ফর মি এন্ড হিজ চিলড্রেন।”
“আই অ্যাম শিওর ম্যাডাম। আপনি শুধু বলুন, রিসেন্টলি ওঁকে কি আপনি কোনো ব্যাপারে চিন্তিত দেখেছিলেন? অচেনা কোনো লোক কি ওঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন বা ফোন করেছিলেন কিছুদিনের মধ্যে?”
“না, সে-রকম তো কিছু মনে পড়ছে না।”
“যে-দিন উনি মারা যান, সেদিন ওঁর রুটিন কি নর্মাল ছিল?”
“হ্যাঁ। যে-রকম সকালে বেরোয় সে-রকমই বেরিয়েছিল। ফিরতে ফিরতে অনেক সময় রাত হয়, অফিশিয়াল কোনো ডিনার থাকলে সেটা সেরে বাড়ি ফেরে। সেদিনও ওর একটা ডিনার ছিল।”
“কোথায় ডিনার করার কথা ছিল জানতেন?”
“না, পুলিশ খোঁজ নিয়ে জেনেছে পার্ক স্ট্রিটের পিটার ক্যাট-এ।”
“রাতে আর কোনো ফোন পাননি?”
“না, এসবই আমি পুলিশকে বলেছি।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম। আমি ওদের কাছেই জেনে নেব, আপনাকে আর বিরক্ত করব না। তবে আমার নম্বরটা আপনি রেখে দিন।” বলে একেনবাবু ওঁর কার্ড বার করে তার পিছনে কলকাতার ফোন নম্বরটা লিখে দিলেন।
মনীষা কার্ডটা হাতে নিয়ে চোখ বুলিয়ে বললেন, “আপনি নিউ ইয়র্কেই থাকেন?”
“হ্যাঁ, ম্যাডাম। শুধু এই কাজের জন্যেই আমি কলকাতায় এসেছি। পুলিশ তাদের রুটিন কাজ করছে। ডাঃ গুপ্ত চান আমি প্রাইভেটলি ব্যাপারটার তদন্ত করি।”
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
“চলি ম্যাডাম, যদি হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যায় আমাকে জানাবেন। ও হ্যাঁ,” যেতে গিয়েও একেনবাবু থামলেন, “এপ্রিল মাসের এক তারিখে এমন কি কোনো ঘটনা ঘটেছিল যেটা বলার মতন?”
মনীষা অবাক হয়ে তাকালেন। “না, সে-রকম কিছু তো মনে পড়ছে না! কেন বলুনতো?”
“এমনি ম্যাডাম।” মনীষা সেনকে কিছুটা হতভম্ব অবস্থায় রেখে একেনবাবু বিদায় নিলেন।
ঠিক নতুন কোনো তথ্য পাবার আশা একেনবাবু করেননি। তবে একটা চিন্তা মাথায় নিয়ে ফিরলেন। বিকাশবাবুর মৃত্যুতে ইন্সিওরেন্সের কাছ থেকে মনীষা বেশ মোটা অঙ্কের টাকা পাবেন এই তথ্যটা জানা ছিল। যেটা জানা ছিল না, সেটা হল মনীষা এত সুন্দরী! এই রকম অসামান্য সুন্দরীর প্রেমে কি কেউ পড়েনি? মনীষা কি তাতে সাড়া দিয়েছেন? ওঁর কি কোনো প্রেমিক আছে? টাকা ছাড়াও খুনের সঙ্গে অবৈধ প্রেমেরও যোগ থাকতে পারে। রাখাল নিশ্চয় এটা নিয়েও খোঁজখবর করছে।
বাড়ি ফিরে একেনবউদিকে নিয়ে থিয়েটার দেখতে গেলেন একেনবাবু। বউয়ের ইচ্ছেতেই যেতে হল। একেনবউদির থিয়েটার দেখার নেশা। একেনবাবুর আবার থিয়েটার দেখতে বসলেই ঘুম পেতে শুরু করে। তার ওপর জেটল্যাগ। এসে অবধি সাতটা বাজতে না বাজতে ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। ঘুম ভেঙে যাচ্ছে ভোর চারটেরও আগে। পুরো থিয়েটারটা প্রায় চোখ বুজেই কাটালেন। ফিরে এসে ঘুম ঘুম চোখে খাচ্ছেন, একটা ফোন।
একেনবউদি বললেন, “তোমার সঙ্গে ব্ৰজেন রায় বলে কেউ কথা বলতে চান।”
ব্ৰজেন রায়! ভদ্রলোকটি কে? একেনবাবু মনে করতে পারলেন না। হ্যালো’ বলার পর যখন শুনলেন, ‘বেবির কাছ থেকে আপনার নম্বরটা পেয়েছি বুঝলেন, নিশ্চয় মনীষার বাবা।
একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি স্যার মনীষা ম্যাডামের বাবা?”
“হ্যাঁ।”
“বলুন স্যার।”
“আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।”
“আমার সঙ্গে? নিশ্চয় স্যার, কবে আপনাদের বাড়িতে আসব বলুন?”
“না, বাড়িতে নয়, আমি সকালে রবীন্দ্র সরোবরে একটু বেড়াই। ওখানে কাল সকাল সাতটা নাগাদ আসতে পারবেন? ইন্ডিয়ান লাইফ সেভিংস সোসাইটির সামনে?”
“আসব, স্যার।”
.
সাতটায় লেকে পৌঁছোনো একেনবাবুর পক্ষে কোনো সমস্যা নয়। উনি শুধু ভাবছিলেন কীএমন কথা যেটা মনীষার বাবা বাড়িতে বলতে চান না!
“কার ফোন?” একেনবউদির প্রশ্ন।
“মনীষা ম্যাডামের বাবার।”
বিকাশ সেনের সুন্দরী স্ত্রী মনীষার কথা একেনবউদি শুনেছেন। বিকাশ সেন প্রসঙ্গে পত্রিকাতেও নামটা দেখেছেন। “তোমার সঙ্গে ওঁর কী দরকার?”
“নো ক্লু ম্যাডাম, নো ক্লু।”
“ফাজলামি রাখো, তোমার ওই মনীষা সেনকেই ম্যাডাম বোলো, আমাকে বলতে হবে না।”
“রাইট,” বলে একেনবাবু দাঁত মাজতে গেলেন। বেসুরো গলায় একটা গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে হঠাৎ থেমে বললেন, “বুঝলে মিনু (মিনতি একেনবউদির ভালো নাম– আগে হয়তো এটা কোথাও লিখিনি), ভাগ্যিস তুমি খুব সুন্দরী নও।”
একেনবউদি একটা পান মুখে পুরতে যাচ্ছিলেন। স্বামীর এসব বকবকানিতে একেনবউদি তেমন কান দেন না। আজ অবশ্য বললেন, “এতদিন বাদে কি সেই নিয়ে আফশোস হচ্ছে?”
“আহা, কী মুশকিল, সেইজন্যেই তো ‘ভাগ্যিস’ বললাম!”
“কী যে তোমার মাথায় ঘোরে কে জানে! না হয় আমি সুন্দরী নই, যদি সুন্দরী হতাম, তাহলে কি তোমায় বিয়ে করতাম!”
“তা ঠিক, তা ঠিক।” মাথা নাড়লেন একেনবাবু! “তেমন সুন্দরী হলে, তোমার অনেক প্রেমিক জুটে যেত, আমিও হয়তো খুন হয়ে যেতাম।”
“যত সব বাজে কথা! বাপিবাবু, প্রমথবাবু ঠিকই বলেন, মাথাটা তোমার গেছে!” একেনবউদি মুখে পান দিলেন।
“পসিবিলিটি, বুঝলে মিনু পসিবিলিটি। টু মেনি পসিবিলিটিজ, ভেরি কনফিউসিং।”
“বুঝলাম, এবার শুয়ে পড়ো। আমিও নিশ্চিন্তে বসে একটু টিভি দেখি।”
“কেন ম্যাডাম, আমি জেগে থাকলে কি টিভি দেখা যায় না?”
“না, যায় না, বকবক করে কান ঝালাপালা করো!”
“গুড নাইট,” বলে একেনবাবু শুতে গেলেন। বিছানায় শোয়ার আগে ড্রাইভারকে ফোন করে সাড়ে ছ’টা নাগাদ আসতে বললেন। ছেলেটা ভালো, যখনই আসতে বলেন এসে হাজির হয়।
