আসল খুনির সন্ধানে (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

 

দুই 

অবনী গুপ্তের অ্যাপার্টমেন্ট আটতলায়। একেনবাবুর দৌলতে আগে এখানে বেশ কয়েকবার এসেছি। সিকিউরিটি গার্ডদের সবাইকেই অল্প-বিস্তর চিনি। তবে আজকে যারা পাহারায় তারা নতুন। ডাঃ গুপ্ত নিশ্চয় ওদের বলে রেখেছিলেন আমরা আসছি। নাম বলতেই লিফট দেখিয়ে দিল।

 

পাশাপাশি দুটো প্রশস্ত লিফট, হাত-পা ছড়িয়েও এক ডজন লোক দিব্যি দাঁড়াতে পারে। ফ্যান্সি ইন্টিরিয়ার। মেঝে থেকে ফুট চারেক উঁচু মেহগনি প্যানেল লিফটের তিন দিক জুড়ে। প্যানেল যেখানে শেষ হয়েছে সেখান থেকে শুরু হয়েছে কাচের ঝকঝকে আয়না। ফলে লিফটটা যেন আরও বড় দেখাচ্ছে! দু-দিকে হাত-ধরার লম্বা হ্যাঁন্ডেল আয়নার ঠিক নীচে লাগানো। লিফটের দরজা আর তার পাশের প্যানেল, যেখানে কন্ট্রোল বাটনগুলো, সোনালি রঙের স্টেইনলেস স্টিলের। লিফটের কার্পেটে কী স্প্রে করে জানি না, ঢুকলেই এক ঝলক সুগন্ধ নাকে আসে। আমাদের অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর ঘুপচি, রং চটা, দেয়ালে চিত্র-বিচিত্র দাগওয়ালা লজুড়ে লিফটের সঙ্গে কোনো তুলনাই হয় না। ঘটঘট আওয়াজ করতে করতে কষ্টেসৃষ্টে ওপরে ওঠে না, সোঁ করে উঠে যায়। এতে চড়াও একটা আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা।

 

অবনী গুপ্ত আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বেল টিপতেই দরজা খুলে অভ্যর্থনা করলেন, “আসুন, আসুন, থ্যাঙ্ক ইউ ফর কামিং অন সাচ এ শর্ট নোটিস।”

 

মুখ দেখে মনে হল একটু উদ্বিগ্ন।

 

“কী যে বলেন স্যার,” একেনবাবু তাঁর স্বাভাবিক বিনয়ের সঙ্গে বললেন।

 

“এদিকে, এই ঘরে আসুন,” বলে আমাদের সবাইকে বাইরের ঘরে নিয়ে বসালেন। “কী দিতে বলব আপনাদের হুইস্কি, জিন, ভডকা? কফি, চা?”

 

“আরে না স্যার, এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন?”

 

আমার একটু তেষ্টাই পেয়েছিল। বললাম, “কোনো সফট ড্রিঙ্ক আছে?”

 

“নিশ্চয়। কী চান– কোলা না আনকোলা?”

 

“কোক আছে?”

 

“নিশ্চয়। বলজিৎ!” বলজিৎকে আমরা চিনি। এক মধ্যবয়সি পাঞ্জাবি মহিলা। ডাঃ গুপ্তের কুক-কাম-হাউসকিপার। বলজিৎকে একটা কোক আনতে বলে সেইসঙ্গে চা-ও অর্ডার করলেন। তারপর একটু অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই বললেন, “বনানী বাড়ি নেই, শিকাগোতে বোনের কাছে গেছে।”

 

মনে মনে ভাবলাম, সর্বনাশ, আবার নিশ্চয় কোনো নারীঘটিত ব্যাপার!

 

“সব কিছু ঠিক আছে স্যার?” একেনবাবু উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্নটা করলেন।

 

“না, ঠিক নেই, একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটেছে!”

 

“কী স্যার?”

 

“কলকাতায় আমার পাবলিসিটি ম্যানেজার বিকাশ সেন গতকাল খুন হয়েছে।”

 

নার্সিং হোম প্রসঙ্গে বিকাশ সেনের নাম কয়েকবার শুনেছি। ডাঃ গুপ্তের সঙ্গে তোলা তাঁর ছবিও দেখেছি। আমাদেরই মতো বয়স। তিনি খুন হয়েছেন! কী ভয়ানক কথা!

 

“সেকি স্যার!” একেনবাবু বললেন।

 

“যেটা হরিবল, সেটা হল ওর লাশ সোনাগাছির একটা গলিতে পাওয়া গেছে!”

 

“সোনাগাছিতে!”

 

“হ্যাঁ, আর সেই নিয়ে এখন কেলেঙ্কারি! ওর স্ত্রী-র সঙ্গে একটু আগে কথা হল। ভীষণ কান্নাকাটি করছে। একে স্বামীর মৃত্যু, তার ওপর এই কলঙ্ক। বিকাশকে আমি চিনি বহু বছর। সোনাগাছিতে যাবার ছেলে সে নয়। ভদ্র পরিবারের পড়াশুনো জানা বিবাহিত সোফিস্টিকেটেড ইয়ং ম্যান। স্ত্রীসঙ্গ করতে চাইলে কোনো হাইক্লাস কলগার্লের সঙ্গে করতে পারে, সোনাগাছি যাবে না। আমার মনে হয়, কেউ ওকে গুলি করে বডিটা ওখানে ফেলে দিয়ে গেছে।”

 

“পুলিশ কী বলছে স্যার?”

 

“পুলিশ কী বলছে কে জানে! একটু আগে অনলাইনে কয়েকটা পত্রিকা পড়লাম। হাজার রকম থিওরি, পুলিশের নাম দিয়েই চলছে অত্যন্ত ডিসগাস্টিং ব্যাপার!”

 

ব্যাপারটা যে মর্মান্তিক ও জঘন্য সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তবে তার জন্যে একেনবাবুকে কেন জরুরি তলব, সেটা ভাবার চেষ্টা করছিলাম। বেশিক্ষণ ভাবতে হল না। একটু চুপ করে থেকে ডাঃ গুপ্ত বললেন, “আই নিড ইওর হেল্প।”

 

“আমার হেল্প স্যার?” হতভম্ব হয়েই প্রশ্নটা একেনবাবু করলেন।

 

“ইয়েস। আমার মনে হয় এই খুনটার পিছনে বড়ো রকমের কোনো উদ্দেশ্য আছে। বিকাশ কলকাতায় আমাকে রিপ্রেসেন্ট করছে। এটা শুধু বিকাশকে খুন নয়, আমারএতদিনের প্ল্যানটাকেও কেউ মার্ডার করার চেষ্টা করছে।”

 

“দাঁড়ান স্যার, দাঁড়ান, আপনার এত পরিকল্পনা মার্ডার হবে কেন?”

 

“আপনি ব্যাবসাদার নন তাই বুঝছেন না। আমার কোম্পানির একজন বড়ো কনসাল্টেন্ট, যিনি পাবলিক রিলেশন্স দেখছেন তিনি সোনাগাছিতে খুন হলেন… এ নিয়ে কী পরিমাণ হইচই হচ্ছে সেটা কল্পনা করতে পারছেন? তিনি কী রকম শেডি ডিল করেন, সে ব্যাপারেও অনেক স্পেকুলেশন হচ্ছে। ইনফ্যাক্ট বিকাশ যে কিছুদিন আগে লোকাল রতন গুন্ডার সঙ্গে রেস্টুরেন্টে খেয়েছে, সেটা নিয়েও পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। অথচ এগুলো আমি করতে বলেছি আপনারই পরামর্শে।”

 

“আমার পরামর্শে স্যার!” একেনবাবু আকাশ থেকে পড়লেন।

 

“আপনিই তো বললেন, যে নার্সিং হোমের ফিজিক্যাল প্রোটেকশনের জন্য লোকাল গুন্ডাদের সঙ্গে সমঝোতা রাখতে। নার্সিং হোমে লোক তো মারা যাবেই, তারজন্য যদি সেখানে ভাঙচুর হয় তাহলে প্রফিটটা থাকে কোথায়?”

 

একেনবাবু কখনোই অবনী গুপ্তকে গুন্ডা পুষতে বলেননি, বরং উলটোটাই শুনেছি। অবনীবাবু যখন নার্সিং হোমে ভাঙচুর নিয়ে গুন্ডা কানেকশন রাখার কথা তুলেছিলেন, একেনবাবু বলেছিলেন, ‘কী যে বলেন স্যার!’ কিন্তু এ নিয়ে অবনী গুপ্ত-র সঙ্গে তর্ক করে কোনো লাভ নেই, সব ব্যাপারেই উনি যা বুঝতে চান তাই বোঝেন।

 

একেনবাবু সে চেষ্টা না করে বললেন, “আমাকে বলুন স্যার, কী ভাবে আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারি?”

 

“আমার বিশ্বাস এটা বিগ কনস্পিরেসি এগেইন্সট মি। কে বিকাশকে মেরেছে এবং কেন মেরেছে আপনি খুঁজে বার করুন।”

 

“এখান থেকে কি স্যার ওটা করা যায়!”

 

“এখান থেকে কেন! আপনি কালকের ফ্লাইটেই দেশে যান। যতদিন লাগে ওখানে থাকুন– অল অ্যাট মাই এক্সপেন্স। এছাড়া আপনার ফি-টি যা লাগে আমি দেব।”

 

“কিন্তু স্যার…”

 

“কিন্তু-টিন্তু নয়, এই সাহায্যটুকু আপনাকে করতেই হবে, প্লিজ।”

 

লাকিলি এই সময়ে হাসপাতাল থেকে ডাঃ গুপ্তের একটা এমার্জেন্সি কল আসায় একেনবাবু সাময়িক ভাবে মুক্তি পেলেন।

 

.

 

সেদিন বাড়ি ফেরার পর থেকেই অবনী গুপ্তের ঘনঘন ফোন আসছে। একেনবাবুকে কলকাতা যাবার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছেন। কোনো ওজর-আপত্তিই টিকছে না দেখে একেনবাবু আমাদের পীড়াপীড়ি শুরু করলেন, ওঁর সঙ্গে আমাদেরও কলকাতা যেতে হবে। যেহেতু আমরা একটা টিম, একসঙ্গে কাজ করি– অবনী গুপ্তের কাছ থেকে আমাদের সবার যাতায়াতের ভাড়াও নাকি উনি জোগাড় করে ফেলেছেন!

 

অন্যের পয়সায় দেশে যাওয়া লোভনীয় হলেও সম্ভব নয়। একেনবাবুর ফ্লেক্সিবিলিটি আছে, উনি ফেলো হিসেবে নামে মাত্র ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত। ভুজুংভাজুং দিয়ে যত্রতত্র যেতে পারেন। আমি বা প্রমথ সেটা পারি না, দু-জনেই পড়াই। এটা ঠিক, একেনবাবুর হাতে কেস এলে আমরা সঙ্গে থাকি। সঙ্গে থাকি’ বলাটা একটু বাড়াবাড়ি। আমার একটা গাড়ি থাকায় ওঁকে নিয়ে এদিক-ওদিক যেতে পারি। দুয়েকটা পরামর্শও দিই, যদিও পরে দেখি সেগুলোর মূল্য কানাকড়িও নয়। প্রমথ বাঁকা বাঁকা নানান কথা বললেও দরকার মতো সাহায্য করে। একেনবাবু অবশ্য সবাইকে বলে বেড়ান, আমি আর প্রমথ না থাকলে উনি অচল! এমন কি রহস্যের সমাধান করেও এমন ভাব দেখান যে আমরা দুজনে সঙ্গে ছিলাম বলেই সেটা সম্ভব হয়েছে! মজার ব্যাপার, কথাটা মিথ্যে হলেও শুনতে বেশ লাগে।তবে এবার সেটা হবার জো নেই।

 

অনিচ্ছা সত্ত্বেও একেনবাবুকে সেই একাই কলকাতা যেতে হল। যাবার দিন প্রমথ একেনবাবুর হাতে একটা ছবি দিয়ে বলল, “বউদিকে গিয়ে দেখাবেন।”

 

“কী স্যার?”

 

“আর্টিস্ট বিনয় দত্তের সঙ্গে আপনার ডায়ালগের ছবি। নিজের মুখ তো তখন আপনি দেখতে পাননি, তাই এখন দেখুন কী অবস্থা হয়েছিল।”

 

সত্যি, বেচারা একেনবাবু! বিনয় দত্তের সামনে কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে বিনয় দত্তের আঁকা ছবি, যেটা তখনও শেষ হয়নি।

 

ও, ঘটনাটাই তো বলিনি। বিনয় দত্ত বিখ্যাত আর্টিস্ট হতে পারেন, কিন্তু আমাদের মতো আর্ট-অজ্ঞ লোকের কাছে তো তিনি অচেনা! শ্যামলা চেহারার ছোটোখাটো এক ভদ্রলোক লাল রঙের তুলি হাতে ইজেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে আমরাও দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। ইজেলের ওপর ক্যানভাসে প্রিন্ট করা কলকাতার একটা অস্পষ্ট ম্যাপ। ভদ্রলোক তুলি দিয়ে ম্যাপের ওপর বাঁকা ত্রিভুজ-টাইপের কিছু আঁকছেন। আমাদের মতো আরও বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে। কোথাও কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ একেনবাবু উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, ওটা কি একটা ত্রিভুজ?”

 

ভদ্রলোক থমকে তুলি হাতে ঘুরে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে বিরক্তি।

 

“আপনার কী মনে হয়?”

 

গলার স্বরে শ্লেষ সুস্পষ্ট। আমি একেনবাবুর হাতে একটু চাপ দিলাম, যদি হিন্টটা নিয়ে মুখটা বন্ধ রাখেন। বৃথাই। মাথাটা দু-একবার হেলিয়ে আরেকবার ভালো করেতাকিয়ে একেনবাবু উত্তর দিলেন, “মনে তো হচ্ছে স্যার ত্রিভুজ।”

 

একেনবাবুর ভাবভঙ্গি দেখে আর উত্তর শুনে অনেকেই হাসতে শুরু করেছে। কর্মকর্তাদের একজন চোখ পাকিয়ে আমাদের দিকে তাকালেন। সত্যি, কী লজ্জাজনক পরিস্থিতি! একজন তো বিনয় দত্তকে বলেই ফেললেন, “প্লিজ গো অ্যাহেড এন্ড ফিনিশ ইট।”

 

বিনয় দত্ত ওঁর তুলি প্যালেটের ওপর রেখে বললেন, “আই অ্যাম ডান!”

 

সেটা রাগ করে, না সত্যিই ‘ডান’– কে জানে।

 

যাক সে কথা। আমি বললাম, “এটা তো দারুণ ছবি, কোত্থেকে পেলি?”

 

“রশিদের কাছ থেকে। ওখানে ও গিয়েছিল সেদিন। ইট ওয়াজ সাচ এ ড্রামাটিক মোমেন্ট, ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারেনি।”

 

একেনবাবু ছবিটা পরীক্ষা করে বললেন, “বোধহয় একটু নার্ভাসই হয়ে গিয়েছিলাম স্যার।”

 

“লজ্জা পেলে গিন্নিকে দেখাবেন না।” প্রমথ টিপ্পনি কাটল।

 

“কেন স্যার, এমন কী খারাপ হয়েছে?”

 

“একটুও না,” আমি বললাম, “রেখে দিন যত্ন করে, বিখ্যাত লোকের সঙ্গে তোলা ছবি– এটা তো ট্রেজার।”

 

.

 

একেনবাবুর এই কাহিনি পুরোদমে শুরু করার আগেই বলে রাখি, পরের ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষদর্শী আমি নই। একেনবাবু কলকাতায় পৌঁছোনোর পর প্রায় প্রতিদিনই ফোনে কথা হত। উনি যা-যা ঘটেছে জানাতেন, আর মাঝেমাঝে আমাদের মতামত নিতেন। প্রমথ অবশ্য বলত “কেন ফালতু আমাদের মত নিচ্ছেন, সেটা শুনে তো আপনি চলবেন না।” একেনবাবুর উত্তর, “কী যে বলেন স্যার, আপনাদের সঙ্গে কথা বলে কত যে ক্লু পাই।”

 

সে যাইহোক, ফোন শেষ হলেই দরকারি সূত্রগুলো আমি ডায়েরিতে লিখে রাখতাম। ঘটনাগুলো একেনবাবুর কাছে যেভাবে শুনেছি সেভাবেই লেখার চেষ্টা করছি। আমি নিজে ধারে-কাছে ছিলাম না, তাই একেনবাবুর উলটোপালটা কথা বলা, ক্ষণে ক্ষণে কনফিউসড হওয়া, কথা বলতে বলতে পা নাচিয়ে চিন্তা করা, বোকা বোকা প্রশ্ন করে আসল খবর বার করা ইত্যাদি, তেমন ভাবে লিখতে পারিনি। সেই বিচারে একেনবাবুর অন্যান্য কাহিনি থেকে এটা একটু আলাদা।

 

এখানে আরও একটা কথা বলি। আমার লেখার ব্যাপারে একমাত্র উৎসাহদাতা একেনবাবু। প্রমথ চিরদিনই নেগেটিভ। এবার তো আরও বেশি। ওর দৃঢ় বিশ্বাস এই লেখাটা হবে নিকৃষ্টতম, একেবারেই অপাঠ্য। এক-আধ জন যাঁরা আমার বই পড়েন তাঁরা নাকি পড়েন একেনবাবুর অরিজিন্যাল ডায়ালগ আর প্রমথর বুদ্ধিদীপ্ত বিশ্লেষণের আকর্ষণে। আমার কৃতিত্ব একেবারেই শূন্য–জিরো। আমার না আছে গল্প বলার ক্ষমতা,না আছে ভাষার ওপর দখল। আর আমার চিন্তাশক্তি তো ধর্তব্যের মধ্যেই নয়।

 

বাজে লিখি মানতে রাজি আছি। চিন্তাশক্তি নেই কথাটা মানা যায় না। প্রতিবাদ করতেই প্রমথ বলল, “এতদিন ধরে একেনবাবুর কাহিনি লিখছিস, একবারও মনে হয়নি পাঠককে জানানো দরকার স্বামীকে ছেড়ে একেনবউদি কেন এত বছর ধরে একা কলকাতায় পড়ে আছেন? ওঁদের কোনো ছেলেপুলে নেই যে তাদের পড়াশুনোর জন্যে কলকাতায় থাকা দরকার, একেনবউদি নিজে চাকরি করেন না যে তার জন্যে কলকাতায় থাকা প্রয়োজন… তাহলে কারণটা কী? এদিকে একেনবাবু তো তোর মুখ্য চরিত্র!”

 

সত্যি কথা বলতে কী, এটা আমার মাথায় আসেনি। আসলে লিখতে গিয়ে রহস্যের জটের মধ্যেই মনটা আটকে থাকে– পূর্ণাঙ্গ কাহিনি রচনার জন্য প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক তথ্যগুলো ঢোকানো হয় না।

 

“ঠিক আছে, ওটা এবার লিখে দেব।”

 

“কী লিখবি?”

 

“যা সত্যি তাই লিখব। লিখব একেনবউদি নিউ ইয়র্কে এসে থাকেন না, কারণ ওঁর মা কয়েক বছর ধরে স্ট্রোকে প্রায় শয্যাশায়ী। নার্স থাকলেও মেয়ের তত্ত্বাবধানের ওপর তিনি সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভরশীল।”

 

“আরও অনেক কিছু লিখতে হবে তোকে।” প্রমথ বলল।

 

“আর কী লিখতে হবে?”

 

“পারম্পর্য বলে একটা কথা আছে জানিস? যাকে বলে ধারাবাহিকতা।”

 

“তুই কি আমাকে বাংলা শেখাচ্ছিস?”

 

“শেখাচ্ছি না, বোঝাচ্ছি। ক’দিন আগে তুই একটা কাহিনি লিখলি, সেখানে আমরা সবাই কলকাতায় ফিরে গেছি। এমন কী আমার সঙ্গে ফ্রান্সিস্কার ছাড়াছাড়ির কথাও ফলাও করে বললি। এখন সে নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নয়। মনে হচ্ছে আমরা যেন নিউ ইয়র্কেই বরাবর আছি। ফ্র্যান্সিস্কাও আমাদের সঙ্গেই আছে।”

 

“কিন্তু আমরা তো আবার সবাই নিউ ইয়র্কেই ফিরে এসেছি, আর ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে তোর ভুল বোঝাবুঝি মিটে গেছে।”

 

“সেটা তুই জানিস। কিন্তু তোর পাঠকরা জানে? মনে মনে তো খুব ভাবিস, একেনবাবুর সিরিজ নিয়ে একদিন মাতামাতি হবে। মাতামাতি হবে না, হাসাহাসি হবে। একবার লিখছিস সবাই কলকাতায় ফিরে গেছে, পরের গল্পেই সবাই নিউ ইয়র্কে! এর পরের গল্পে সবাইকে কোথায় নিয়ে ফেলবি আফ্রিকায়?”

 

সত্যি কথা বলতে কী, আমি একবারও চিন্তা করিনি আমাদের ব্যক্তিগত জীবন একেনবাবুর কাহিনির মধ্যে জড়িয়ে যাবে। হ্যাঁ, কলকাতায় আমরা সবাই ফিরে গিয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু নানা কারণে সেখানে থাকতে পারিনি। নিউ ইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ভালো অফার পেয়ে ফিরে এসেছি। প্রমথও অধ্যাপকের চাকরি পাওয়ায় চলে এসেছে। একেনবাবুর এবার এদেশে আসার পিছনে কলকাঠি নেড়ছিলেন ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট। মার্কিনমুলুকে একেনবাবুর পার্মানেন্ট ভিসা বা গ্রিনকার্ড পাওয়া ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট না থাকলে হত না। এই ভিসার জোরেই এখন উনি নিউ ইয়র্কে স্বনামে গোয়েন্দাগিরি করতে পারছেন।

 

যাইহোক, এসব এখানে লিখলাম প্রমথর তির্যক মন্তব্যের প্রত্যুত্তর দিতে। লেখা শুরু না করতেই ‘একেনবাবুর নিকৃষ্টতম কাহিনি’ লিখছি বলে প্রমথর যে ভবিষ্যদ্বাণী, সেটা মানতে আমি মোটেই রাজি নই। আমার লেখা রুদ্ধশ্বাসে পড়ার মতো যে নয় সে বোধটুকু আমার আছে। প্রশ্ন হল, একেনবাবুর রহস্য-উঘাটনের ক্ষমতা প্রকাশ করতে পারছি কি না। সেটা পারলেই আমার শ্রম সার্থক।

 

আর দু-একটা কথা এখানে যোগ করে দিই। ডায়েরিতে যা আছে, তার থেকে এই কাহিনি কলেবরে অনেক বড়ো। কল্পনাপ্রসূত অনেক বর্ণনা এতে যোগ করেছি। বিশেষ করে একেনবাবু আর একেনবউদির কথোপকথন তো প্রায় পুরোটাই বানানো। ওটা যোগ করেছি কাহিনির গতি যাতে বজায় থাকে। প্রমথর মতে ওই ডায়ালগগুলোতে আমি ঝুলিয়েছি… ওগুলো নাকি চরিত্রানুগ হয়নি, বিশেষ করে একেবউদির ক্ষেত্রে। এমন কী একেনবাবুর যে প্রতিষ্ঠিত চরিত্র সেটাও নাকি ঠিক মতো ফোটেনি! তবে কাহিনির মূল বিষয়বস্তু নিয়ে প্রমথর সমস্যা নেই, সেটাই বাঁচোয়া। ও আরেকটা কথা, বেশ কিছু চরিত্রের নাম পালটেছি। রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাড়ির ঠিকানা ইত্যাদিতে যে অসঙ্গতি আছে– সেগুলো ইচ্ছাকৃত। নাম পালটে লিখলেও পাত্রপাত্রীরা অনেকে এখনও জীবিত। তাঁদের বাসস্থান হয়তো একই আছে। সেই কথা ভেবে এছাড়া কোনো উপায় ছিল না।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *