সাত
মাথাফাটা রতন কথার খেলাপ করে না। পরের দিন একেনবাবু যেতেই এক চেলাকে বলল, মল্লিকার বাড়ি নিয়ে যেতে।
“যান, ও বাড়িতেই আছে, দেখা করবে। তবে আমাকে বলেছে খুনের ব্যাপারে ও কিছু জানে না। যাওয়াটা আপনার বেকার হবে।”
.
নাকতলার এই অঞ্চলে একেনবাবু আগে আসেননি। বড়ো রাস্তা থেকে বেরিয়ে ডাইনে বাঁয়ে বেশ কয়েকবার গিয়ে তারপর মল্লিকার বাড়ি। ছোটো গলির মতন রাস্তা, সেখানেও সারি সারি বহুতল বাড়ি। তারই একটার দোতলায় সামনের দিকে ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্ট। রাস্তায় গাড়ি দাঁড় করানোর জায়গা নেই।
“এখানে গাড়ি রাখা যাবে না, লোকে এসে ঝামেলা করবে। আমি ওই মোড়ে দাঁড় করাচ্ছি,” বলে ড্রাইভার একেনবাবুদের নামিয়ে দিয়ে চলে গেল। এই ড্রাইভারটি নতুন, আজকেই প্রথম এসেছে। তবে হাবভাব দেখে মনে হয় এ চত্বরের হালচাল সব জানে।
দরজায় বেল বাজাতেই পারফিউমের সুগন্ধ ছড়িয়ে যিনি দরজা খুললেন তিনিই মল্লিকা। বয়স হয়তো বছর পঁচিশেক হবে। পরনে নেভি-ব্লু জিনস। শরীরটা একটু ভারীর দিকে। সুস্তনী, হালকা নীল আর কচি সবুজ রঙের টাই ডাই করা সিল্কের টপ। খেয়াল করলে বোঝা যায় মল্লিকা সন্তানসম্ভবা। গলায় ম্যাচ করা নীল-সবুজ পুঁথির নেকলেস। ঘাড় পর্যন্ত চুল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, ঢলঢলে মুখে চোখ দুটো ছোটো একটু যেন বেমানান। সুন্দরী বলা যাবে না, কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে বেশ একটা অ্যাট্রাকটিভনেস আছে।
একেনবাবুর জন্যেই মল্লিকা অপেক্ষা করছিলেন। রতনের চেলা “এই সেই বাবু,” বলে বিদায় নিল।
“ভেতরে আসুন,” মল্লিকা বললেন।
একেনবাবু নিজের পরিচয় দিয়ে নমস্কার জানিয়ে ঘরে ঢুকলেন। বিকাশ সেনের মৃত্যুর ব্যাপারে উনি তদন্ত করছেন সেটাও জানালেন।
“হঠাৎ করে চলে এসে বোধহয় ম্যাডামের অসুবিধা করলাম।”
“না না, ঠিক আছে। আসলে আজ শরীরটা ভালো নেই বলে কাজে যাইনি, নইলে এই সময় কাজে থাকি।”
একেনবাবু বসলেন না। তাহলে কি ম্যাডাম, আরেক দিন আসব?”
“না, না, বসুন। চা খাবেন তো?”
“না ম্যাডাম, থ্যাঙ্ক ইউ।”
বাইরের ঘরটা বড়ো নয়, তবে লম্বা। ঢোকার মুখে বেশ চওড়া, কারণ বাঁদিকে খাবার জায়গা, গোটা তিনেক চেয়ার আর টেবিল সেখানে রয়েছে। তারপর ঘরটা সরু হয়ে গেছে, একদিকে রান্নাঘর থাকার জন্য। রান্নাঘরে ঢোকার দরজাটা হল খাবার জায়গা থেকে। বাইরের ঘরটা শেষ হয়েছে একটা জানলার সামনে। জানলা ঘেঁষে নিচু বুকশেলফে কয়েকটা বই আর কিউরিও। বেতের তৈরি গদি-বালিশ দেওয়া সোফাসেট আর সেন্টার টেবিল। খাবার জায়গা শুরু হবার মুখে ডানদিকে একটা প্যাসেজ ভেতরের দিকে চলে গেছে। বাথরুম, বেডরুম ইত্যাদি নিশ্চয় সেই প্যাসেজ দিয়েই যাওয়া যায়।চেয়ারে বসতে বসতে একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কাজে যাননি বললেন ম্যাডাম, কোথায় কাজ করেন আপনি?”
ভুরুটা কুঁচকে উঠল মল্লিকার, “কেন বলুন তো?”
“কাজে যাননি শুনে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, সরি ম্যাডাম।”
প্রশ্নের উত্তর কিন্তু দিলেন মল্লিকা। “গড়িয়াহাটে।” তারপর এক মুহূর্ত থেমে বললেন, “সেলস-এর চাকরি।”
কী ভাবে আলোচনাটা আরম্ভ করবেন ভাবছিলেন একেনবাবু। মল্লিকা রাতে কী কাজ করেন, সেটা ওঁর আচরণ বা ব্যবহার থেকে অনুমান করা অসম্ভব। দেখে মনে হয় পাশের বাড়ির ওই বয়সি আর দশ জনের মত। মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির শিক্ষিতা মেয়ে, সাজতে গুজতে ভালোবাসে, চাকরিবাকরি করে…
একটু ইতস্তত করে বললেন, “আমি ম্যাডাম এসেছি…।”
মল্লিকা ওঁকে থামিয়ে দিলেন, “আপনার কথা আমি শুনেছি রতনের কাছে। আমি এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। আপনি শুধু শুধু এসেছেন।”
রতন’ কথাটা খট করে কানে লাগল একেনবাবুর। সুদেববাবু বা সুদেবদা, অন্তত রতনদা আশা করেছিলেন। মল্লিকার থেকে মাথাফাটা রতন অন্তত বছর দশকের বড়ো হবে। আমেরিকায় এ-রকম নাম ধরে বলা চলে, আজকাল কলকাতাতেও মাঝেমধ্যে শোনেন। তাও কানে লাগে!
“সে তো বটেই ম্যাডাম, জানলে তো আপনি পুলিশকেই সেটা জানিয়ে দিতেন।”
“ঠিক। কিন্তু আমাকে ‘ম্যাডাম’ বলবেন না প্লিজ, শুনলে নিজেকে বুড়ি বুড়ি লাগে, মল্লিকা বললেন।
“ওটা আমার মুদ্রাদোষ ম্যাডাম, মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবে। তাও চেষ্টা করব কথা দিচ্ছি। আমার শুধু কয়েকটাই প্রশ্ন আছে।”
একেনবাবুর বলার ভঙ্গি দেখে মল্লিকার মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
“বলুন।”
“আপনি তো বিকাশবাবুকে চিনতেন ম্যাডাম, তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“কতদিনের পরিচয়?”
“মাস ছয়েক আগে একটা পার্টিতে ওই এসে আলাপ করে।”
“আই সি,” একেনবাবু মাথা চুলকে বললেন, “কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, কী ধরনের আলাপ? আপনি কি ওঁকে খুব ভালো করে চিনতেন?”
মল্লিকা কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বলল, “এতে ঢাকা চাপার কিছু নেই। আমাদের ইন্টিমেট রিলেশন হয়েছিল। ইনফ্যাক্ট ওর জন্যেই আমি প্রেগন্যান্ট হই। তারপরকী হল জানতে চান?”
মল্লিকার মুখ ভাবলেশহীন। এমনিতেই মহিলাদের সঙ্গে এ ধরনের কথাবার্তায় একেনবাবুর অসুবিধা হয়। এই কথায় তো একেবারে থতোমতো!
“মানে…।”
“মানে, সেটা জেনেই ও অদৃশ্য হয়। ফোন করলে ফোন ধরত না। দেখা করতে চাইলে দেখা করত না। ভাবটা আমাকে চেনেই না। তখন বুঝলাম, হি জাস্ট ওয়ান্টেড টু ইউজ মি… এন্ড অফ স্টোরি।”
“সরি ম্যাডাম।” একেনবাবু আর কী বলবেন ভেবে পেলেন না।
মল্লিকা বোধহয় একেনবাবুর এই চুপ হয়ে যাওয়াটা উপভোগ করলেন। তারপর নিজের থেকেই বললেন, “আমার সম্বন্ধে আপনি কী শুনেছেন জানি না, আমি সত্যিই বিকাশকে ভালোবাসতাম। ভেবেছিলাম ও-ও আমাকে ভালোবাসে।”
ইতিমধ্যে নিজেকে একটু সামলে নিয়েছেন একেনবাবু। “উনি আপনাকে এভাবে..” ‘ডাম্প’ শব্দটা প্রায় মুখে এসে যাচ্ছিল, সেটা আটকে বললেন, “ছেড়ে চলে গেলেন, আর আপনি চুপচাপ সহ্য করলেন ম্যাডাম?”
“তাছাড়া উপায়?”
একেনবাবু মাথা চুলকে বললেন, “আমি একটু কনফিউসড ম্যাডাম, আমি তো শুনেছিলাম আপনি বিকাশবাবুকে খুন করবেন বলে ভয় দেখাচ্ছিলেন।”
“আমি! কার কাছে শুনেছিলেন?”
“মানে শুনেছিলাম মলয়বাবু..” কোত্থেকে শুনেছেন সেটা একেনবাবু বিশদ করলেন না।
“মলয় আমার বন্ধু, সে আমার কষ্ট দেখে বিকাশকে বলেছিল আমার টেক কেয়ার করতে। বিকাশ সেই কথায় আমল না দেওয়াতে হয়তো ভয় দেখিয়েছিল। জাস্ট ভয় দেখানো।”
“আই সি। কিন্তু যেটা ফ্যাক্ট, সেটা হল বিকাশবাবু খুন হয়েছেন।”
এবার মল্লিকা চুপ।
“বিকাশ সেনের কোনো শত্রু ছিল কিনা আপনি জানেন?”
“না।”
“মলয়বাবু যে খুন করেননি আপনি কী করে জানলেন?”
“কারণ খুন করার ছেলে সে নয়।”
“মলয়বাবু কোথায় থাকেন?”
“জানি না।”
“আমি আবার কনফিউসড ম্যাডাম, আপনার বন্ধু কোথায় থাকেন আপনি জানেন না?”
“জানতাম, এখন সেখানে থাকে কিনা জানি না।”
“শেষ কবে ওঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে?”
“রতনের দল ওকে খুব মারধোর করায় যখন হাসপাতালে কয়েকদিন থাকতে হয়েছিল, তখন।”
“সেটা কতদিন আগে?”
“প্রায় দিন কুড়ি।”
“তারপর ওঁকে দেখতে যাননি?”
“না, রতন আমাকে ওর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে বারণ করেছে।”
“রতনবাবুকে আপনি কতদিন চেনেন?”
“বেশি দিন নয়।”
“মলয়বাবু ওঁর দলবলের হাতে মার খাবার আগে চিনতেন?”
“না, তবে নাম শুনেছিলাম। এ তল্লাটে সবাই ওর নাম জানে।”
“আই সি, কবে আপনার সঙ্গে রতনবাবুর পরিচয় হয়?”
“মলয় হাসপাতালে যাবার দু-দিন বাদে হঠাৎ রাত্রিবেলায় রতন আমার অ্যাপার্টমেন্টে আসে। নিজের পরিচয় দিয়ে জোর খাঁটিয়ে আমার সঙ্গে শোয়।”
মল্লিকা এত স্বচ্ছন্দে চোখে চোখ রেখে কথাটা বললেন, যেন গড়িয়াহাট বাজারে কারোর সঙ্গে দেখা হয়েছে সেটাই জানাচ্ছেন। এটা কি শুধু অকপট ভাষণ, না একেনবাবুকে শক দিয়ে অপদস্ত করার চেষ্টা। চক্ষুলজ্জা থাকলে ভদ্রলোক বেশি প্রশ্ন না করে যাতে সরে পড়েন তার ব্যবস্থা।
একেনবাবু নড়েচড়ে চেয়ারে একটু ভালো করে বসলেন। মুখটা একটু নিচু করে গম্ভীর মুখে শুধু বললেন, “বুঝলাম ম্যাডাম।”
“আর কিছু জানতে চান? তাও কেন রতনের সঙ্গে আমি সম্পর্ক রেখেছি?”
একেনবাবুর উত্তরের অপেক্ষা না করে মল্লিকা বললেন, “রতন আপনাকে কী বলেছে জানি না, আমি কিন্তু রতন বা কারোর রক্ষিতা নই। প্রেগন্যান্ট হয়ে যাবার পর লাইনের কাজ আমি করি না। রতন মাঝেমধ্যে আসে। জলে থাকলে কুমিরের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করতে হয়, এই পর্যন্ত।”
“ম্যাডাম, রতনবাবু আমায় কিছুই বলেননি।” মুখটা তুলে মল্লিকার দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বেশ দৃঢ় ভাবে একেনবাবু বললেন। “আমি এসেছি অন্য দু-একটা প্রশ্ন করতে।”
“আপনি তো এর মধ্যেই অনেকগুলো প্রশ্ন করে ফেললেন, আর কী প্রশ্ন?” মনে হল মল্লিকা একটু বিরক্ত।
“মলয়বাবুকে রতনবাবুর লোকেরা কেন মেরেছিলেন?”
“জানি না।”
“মলয়বাবু আপনার বন্ধু ম্যাডাম, তিনি রতনবাবুর দলের হাতে মার খেলেন, অথচ আপনি রতনবাবুকে জিজ্ঞেস করলেন না কথাটা?”
“না, সাহস হয়নি। ধরে নিয়েছিলাম আমার জন্যে।”
“কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, আপনাকে কিন্তু খুব ভিতু বলে মনে হয় না।”
“তাহলে কী মনে হয়?” চোখে চোখ রেখে প্রশ্নটা করলেন মল্লিকা।
মল্লিকার প্রশ্নের ফাঁদে পা দিলেন না একেনবাবু। উত্তর না দিয়ে আরেকটা প্রশ্ন করলেন, “বিকাশবাবুর সঙ্গে রতনবাবুর কোনো গণ্ডগোলের কথা আপনি শুনেছেন?”
“না। বরং বিকাশ মারা যাওয়ায় ওর ক্ষতি হয়েছে, কথায় কথায় ক’দিন আগে রতন বলেছিল। এবার আমি আপনাকে একটা সিরিয়াস প্রশ্ন করি?”
“করুন, ম্যাডাম।”
“আমি বিকাশের স্ত্রী না হতে পারি, কিন্তু বিকাশের সম্পত্তিতে তো অধিকার ওর অবৈধ সন্তানেরও আছে। সেই অধিকার থেকে আমার বাচ্চা কেন বঞ্চিত হবে? আপনি তো আমেরিকায় থাকেন– বড়ো বড়ো লোকদের চেনেন, এ ব্যাপারে একটা কিছু করতে পারেন না?”
“আমি বড়ো বড়ো লোকদের চিনি ম্যাডাম!” একেনবাবু একটু অবাক হয়েই বললেন।
“বিকাশের বস তো আপনার বন্ধু।”
মল্লিকা ইতিমধ্যে রতনের কাছ থেকে একেনবাবু সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক কিছু শুনেছেন। কী শুনেছেন সেটা জানার আর চেষ্টা করলেন না একেনবাবু। বললেন, “এটা তো সিভিল কেস। আপনার সন্তান জন্মাবার পর সিভিল কোর্টে গিয়ে এর ফয়সলা করতে হবে।”
“আমি নিজে টাকা চাই না, কিন্তু আমার বাচ্চার যা প্রাপ্য সেটা সে পাবে না কেন?” একই প্রশ্ন আবার করল মল্লিকা।
‘ইউ হ্যাভ এ পয়েন্ট ম্যাডাম। রতনবাবুর সঙ্গে এই নিয়ে আপনার কোনো কথা হয়েছে?”
“না।”
“আপনার বাবা-মা বা আত্মীয়স্বজন কেউ জানেন বিকাশবাবুর সঙ্গে আপনার এই রিলেশনের ব্যাপারটা?”
“আমার সঙ্গে আমার আত্মীয়স্বজনের কোনো যোগ নেই।”
মল্লিকার কাছ থেকে আর বিশেষ কিছু জানা গেল না। বেশ ঘোড়েল শক্ত মেয়ে, এটুকুই বুঝলেন একেনবাবু। মলয়ের একটা ঠিকানা মল্লিকার কাছ থেকে পেলেন। তবে সেখানে মলয়কে পাওয়ার সম্ভাবনা কমই।
