আট
মল্লিকার বাড়ি থেকে ফেরার পথে একেনবাবু ভাবছিলেন অর্থ আর শক্তি কী ভাবে সমাজের বাধা-নিষেধের পাঁচিলগুলো ভেঙে দিচ্ছে! মল্লিকার কথাবার্তায় শিক্ষাদীক্ষার ছাপ। কাচের আলমারিতে কিউরিওগুলোর নীচে বেশ কয়েকটা বইয়ের মধ্যে সঞ্চয়িতা আর গীতবিতান একেনবাবুর নজর এড়ায়নি। এ-রকম একটা মেয়ে রতনের মতো অশিক্ষিত গুন্ডা ক্যারেক্টারের শয্যাসঙ্গিনী ভাবতেও ওঁর খারাপ লাগছিল। এখন তো গুন্ডাদেরই রাজত্ব। দাউদ ইব্রাহিম থেকে শুরু করে পাড়ার বিশু গুন্ডা। এইসব লোকেদের হাতেইপৃথিবী!
আসলে একেনবাবু মুখে যতই বলুন, মানুষ স্যার, মানুষ, উনি ক্লাস সিস্টেমে প্রবল বিশ্বাসী। ভদ্রলোক’ আর ‘ছোটোলোক’ –এই দুইয়ের মেলামেশায় ওঁর প্রচণ্ড সমস্যা হয়। কে ‘ভদ্রলোক আর কে ‘ছোটোলোক’ তার একটা ডেফিনেশনও ওঁর মাথায় আছে, যেটা আবার স্থান-কাল-পাত্রে একটু পালটায়। যেমন, ম্যানহাটানে প্লাম্বারের সঙ্গে কলেজ প্রফেসরের প্রেম বা বিয়ে– একটু খুঁতখুঁত করলেও সেটা চলে। তা বলে দেশে? কলের মিস্ত্রির সঙ্গে শিক্ষিত অধ্যাপিকা ঘর করছে, এটা কি মানা যায়? একেনবাবুর সঙ্গে এ নিয়ে আমার আর প্রমথর প্রায়ই লাগে। তর্কে কোণঠাসা হয়ে একেনবাবু তাঁর শেষ অস্ত্র ছাড়েন, “যাই বলুন স্যার, তেলেজলে মিশ খায় না।”
নাকতলা থেকে বেরিয়ে রাজা সুবোধ মল্লিক রোড ধরতে গিয়ে একেনবাবু দেখলেন অ্যাকসিডেন্টে রাস্তা জ্যাম।
“বাইপাস ধরা যাবে?” ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন একেনবাবু।
ড্রাইভারটি রাস্তাঘাট ভালো চেনে। অন্য একটা সহজ পথ ধরে পাটুলির রাস্তায় নিয়ে এসে বাইপাসে পড়ল। একটু ঘুরপথ হবে, তবে সময় মনে হয় কমই লাগবে।
“আজ দুপুরের মেনু কী?” একেনবউদিকে মোবাইল থেকে ফোন করলেন।
“ডাল, পাঁচমেশালি তরকারি, আলু-পটল দিয়ে মাছের ঝোল, একটা ভাজা। ভাজা কী হবে এখনও ঠিক করিনি। কখন আসছ তুমি?”
“আধঘণ্টার মধ্যেই এসে যাব। কীসের ডাল?”
“ভাজা মুগের।”
“বাড়িতে গন্ধরাজ লেবু আছে?”
“না। খেতে ইচ্ছে করলে নিয়ে এসো।”
“দেখি।”
এই গন্ধরাজ লেবুটা ম্যানহাটানে মেলে না। একেনবাবু অনেক খুঁজেছেন, পাননি। হয়তো আছে, চাইলে তো লোকে বলে বাঘের দুধও নিউ ইয়র্কে পাওয়া যায়।
“একবার গড়িয়াহাট বাজারে একটু থামবেন।” ড্রাইভারকে বললেন একেনবাবু।
“গন্ধরাজ লেবু তো মুকুন্দপুর মার্কেটেই পেয়ে যাবেন, শুধু শুধু পার্কিং-এর পয়সা দেবেন কেন?”
চোখ-কান খোলা ড্রাইভার, তার ওপর একেনবাবুর পয়সা বাঁচাচ্ছে। খুশি হলেন একেনবাবু।
“তাহলে সেখানেই চলুন।”
.
এ দিকটায় বহুবছর একেনবাবু আসেননি। তদন্তের কাজে একবার আসতে হয়েছিল। বাইপাস দিয়ে মুকুন্দপুরে ঢোকার রাস্তাটা তখনও পাকা হয়নি। টিনের চালের নীচে ঘুপচি সাইজের একটা থানা ছিল। সেখানে বসে গাদা গাদা মশার কামড় খেয়েছিলেন এখনও মনে আছে। রাস্তার ধারে যে থানাটা এখন দেখলেন, আগের তুলনায় সেটা প্রাসাদ। মুকুন্দপুরও সে মুকুন্দপুর নেই। লোকসংখ্যা প্রচুর বেড়েছে। ডেভালপমেন্ট হচ্ছে দ্রুত গতিতে। সব কিছু যে খুব প্ল্যান করে হচ্ছে তা নয়। রাস্তার দু-ধারে যেসব দোকান, বেশির ভাগই মনে হয় জবরদখল করা জমি। থানার গা-ঘেঁষেই দরমা দিয়ে ঘেরা কয়েকটা দোকান। সেখানে দাঁড়িয়ে একজন পুলিশ চা খাচ্ছে। সেগুলো পার হতেই একটা বড়ো স্পেশালিটি হাসপাতাল। লবিতে ঢোকার মুখে বিশাল কাচের দরজা। দারুণ মডার্ন আর্কিটেকচার, দেখার মতন বাড়ি! সেটা পার হলে পর পর বেশ কয়েকটা বাড়ি বা গেস্ট হাউস। তারপর আরেকটা বিশাল হাসপাতাল। সেই হাসপাতালের পাশ দিয়ে রাস্তাটা ডানদিকে ঘুরে গেছে। ঘোরার মুখে একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড, তার প্রায় পাশ দিয়েই বাজারে ঢোকার গলি। ড্রাইভার অবশ্য বাজারের মুখ পর্যন্ত গেল না। তার আগেই বাঁদিকে যে ছোটো রাস্তাটা গেছে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একেনবাবুকে বলল, “ওই গলি দিয়ে ঢুকে যান। ঢুকেই ডানদিকে গেলে বাঁ-দিকে সজির দোকান পাবেন।
আলু-পেঁয়াজের একটা দোকানের পর বেশ কয়েকটা সজির দোকান। সজির চেহারাগুলো সত্যি চমৎকার, একেবারে চকচকে ফ্রেশ। নিউ ইয়র্কে চায়না টাউনেও এত ফ্রেশ জিনিস দেখেননি একেনবাবু। গন্ধরাজ লেবুও মিলল। দুটো লেবু কিনে যখন পয়সাদিচ্ছেন, তখন পাশে দাঁড়ানো এক বয়স্ক খরিদ্দার দোকানিকে বললেন, “হ্যাঁরে ভোলা, এই বেগুন-টম্যাটোতে আর কত রঙ লাগাবি?”
“আমরা কোনো রঙ লাগাই না, কাকু।” ভোলা প্রতিবাদ করল।
“তুই লাগিয়েছিস তো বলছি না। যার কাছ থেকে কিনেছিস, সে লাগিয়েছে।”
ভোলা কোনো উচ্চবাচ্চ্য করল না।
ভদ্রলোক একেনবাবুর দিকে তাকিয়ে অযাচিত ভাবেই বললেন, “বুঝলেন, সব ভেজাল। এইসব টক্সিক রং-টং লাগানোর কী দরকার? মেট্রো-তে যান, ওখানে এসব পাবেন না। টম্যাটো দেখলে ম্যাড়ম্যাড়ে লাগবে, কিন্তু খাঁটি জিনিস। জার্মান মাল্টি ন্যাশেনাল, ওরা এইসব রিস্ক নেয় না।”
‘মেট্রো’ কী একেনবাবুর কোনো ধারণাই নেই। অন্য সময় হলে একেনবাবু জ্ঞানটা বাড়িয়ে নিতেন, আজকে দাঁড়ালেন না। বাইপাসে ঢুকে গড়িয়াহাট কানেক্টারের দিকে একটু এগোতেই ডানদিকে একটা দোকানের সামনে হলুদ শালুতে লেখা, এই মাসে সব কিছু ২৫% ছাড়–৩ টাকায় ৪ টাকার জিনিস কিনুন। পাছে ২৫% কেউ যদি না বোঝে– তাই সেটা ব্যাখ্যা করে দেওয়া হয়েছে। দোকানটা এক তলা কিন্তু বিশাল। ওপরে লেখা ‘মেট্রো’– একদিকে ইংরেজিতে, অন্যদিকে বাংলায়। মেট্রো! এটাই কি সেই জায়গা?
ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করতে বলল, “সুপার স্টোর, সবকিছু পাওয়া যায়। তবে সবাইকে ঢুকতে দেয় না।”
“কেন?”
“তা ঠিক জানি না, কীসব আইন আছে।”
ড্রাইভারটি তার বেশি কিছু জানে না। একেনবাবুর মনে হল নিশ্চয় আমেরিকার ‘বিজে-স’ বা কস্টকো’-র মতন কোনো দোকান, মেম্বারশিপ থাকলে সস্তায় জিনিস কেনাযায়।
.
কলকাতায় আসার একটা বড়ো আকর্ষণ হল খাওয়াদাওয়া। দই-মিষ্টির কথা বাদই দেওয়া যাক। এখানকার তরিতরকারি বা মাছের যা স্বাদ, তার সঙ্গে আমেরিকার শাকসজি বা মাছের তুলনা হয় না। তবে হ্যাঁ, মুরগি আর গোট মিট, মানে পাঁঠার মাংসের ব্যাপারে আমেরিকা কিন্তু টপে। খান মার্কেট থেকে কেনা গোট মিটের কোয়ালিটি এখন পর্যন্তকলকাতায় কোথাও দেখেননি। কলকাতায় যেদিন এলেন সেদিন বিকেলে মাসতুতো শালি দোলা-র বাড়িতে খেতে গিয়েছিলেন। ভায়রা একেনবাবুকে ইম্প্রেস করার জন্যে টেরিটি বাজারের কোন এক চাচাজির দোকান থেকে পাঁঠার মাংস এনেছিলেন। নো কম্পারিজন। মুরগির প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো। আমেরিকায় মুরগির রোস্ট, ফ্রাই ইত্যাদি খাবার পর কলকাতার চিকেন মুখেই তোলা যায় না। এসব অবশ্য একেনবাবুর পার্সোনাল মত। কিন্তু তাতে একেনবউদির সুবিধা। তিনি নিজে মাংস পছন্দ করেন না। বাড়িতে শুধু মাছই হচ্ছে।
দুপুরের খাওয়াটা দিব্বি হল। আজকে দুপুরে আর বিশ্রাম নয়। একেনবাবুর আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলা দরকার। প্রথমে বিকাশ সেনের প্রাইভেট সেক্রেটারি নীলাঞ্জনা মিত্রের সঙ্গে। রাখাল দত্ত নীলাঞ্জনাকে জানিয়েও রেখেছেন একেনবাবু যাবেন বলে। তারপর সময় থাকলে মনীষা সেনের সঙ্গে আরেকবার কথা বলতে হবে।
রাখাল দত্তকে ফোন করে বিকাশ সেনের অফিসের ঠিকানাটা নিয়ে নিলেন একেনবাবু। শেখর চৌধুরীকে কবে কথা বলার জন্য পাওয়া যেতে পারে, সেই খোঁজটাও নিতে বললেন। ইতিমধ্যে ড্রাইভার লাঞ্চ খেয়ে চলে এসেছে।
.
বিকাশ সেনের অফিসটা পূর্ণদাস রোডে, একটা মাল্টি-স্টোরি বিল্ডিং-এর এক তলায় কয়েকটা ঘর নিয়ে পাবলিক রিলেশন্স-এর ফার্ম। কিছুদিন আগেও এ ধরনের ফার্মের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। পাবলিক রিলেশন্স ব্যাপারটা ঠিক কী, একেনবাবুর এখনও স্পষ্ট ধারণা নেই। কোম্পানিগুলোর জনসংযোগ করার কাজ তো অ্যাড এজেন্সির। মক্কেলদের প্রডাক্টগুলোর জন্য বিজ্ঞাপন বানিয়ে তারা পত্র-পত্রিকায় ছাপায়। এক কালে তো এটা কিনুন, ওটা কিনুন বলে রাস্তার থামে থামে পোস্টারও সেঁটে দিত, এখন হোর্ডিং বানায়। পুরো ব্যাপারটাই নাকি আর্টের পর্যায় চলে গেছে, যাকে বলে ক্রিয়েটিভ আর্ট। এক-একটা অ্যাড ক্যাম্পেনের পিছনে নাকি অনেক গবেষণা থাকে! কী এত গবেষণা কে জানে!
একেনবাবুর দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নে অ্যাড এজেন্সিতে কাজ করত। দিদির সর্বদা অভিযোগ ছেলে নাকি রাত তিনটের আগে বাড়ি ফেরে না! জামাইবাবু বাইরে পোস্টেড, কলকাতায় কী হচ্ছে কিছুই খোঁজ রাখেন না। একেনবাবু তখন কলকাতা পুলিশে। কী একটা কাজে গড়িয়াহাটে গিয়েছিলেন। কাছেই ভাগ্নের অ্যাড এজেন্সির অফিস, ভাবলেনএকবার ‘হ্যালো’ বলে যাবেন। তিনটে বাজে, অফিসে প্রায় কেউই নেই। কাছেই এক কফিহাউসে ভাগ্নের সাক্ষাৎ পেলেন। কয়েকজন মিলে সিগারেট ফুঁকছে, আর কফি খাচ্ছে। একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কীরে, তুই এখানে! তোদের অফিস টাইম কখন?”
“টাইম একটা আছে, কিন্তু সেই টাইমে কাজ হয় না।”
“তার মানে?”
“আমরা ক্রিয়েটিভ কাজ করি মামা, রাত ন’ টা-দশটার আগে ক্রিয়েটিভ জুস-ই ফ্লো করে না।”
ভেরি ইন্টারেস্টিং! ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ এযুগে জন্মাননি! তখন মেন্টালিটি বোধহয় অন্য রকম ছিল, নইলে এত লিখতেন কী করে? শান্তিনিকেতনে তো তখন ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না, হ্যারিকেনের আলো। ন’টা-দশটার আগেই নিশ্চয় শুয়ে পড়তেন। এই ভাগ্নেটির ক্রিয়েটিভ কাজ অবশ্য একেনবাবু দেখেননি। তার আগেই জামাইবাবু ছোঁড়াকে নিজের কোম্পানিতে ঢুকিয়ে নিয়েছিলেন। এখন টাকা-পয়সার হিসেব কষে।
যাক সে কথা। পাবলিক রিলেশন্সের কাজটা ঠিক কী, বিকাশ সেনের অফিসে ঢুকে জানা গেল। লবিতে বড়ো বড়ো পোস্টারে পরিষ্কার করে লেখা –রেপুটেশন ম্যানেজমেন্ট, কর্পোরেট কম্যুনিকেশন, মিডিয়া রিলেশন, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, কর্পোরেট সোশ্যাল রেস্পন্সিবিলিটি ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাগুলোর ইংরেজি ব্যাখ্যাও রয়েছে, একেনবাবুর মাথায় সবগুলো ঢুকল না। যাদের বোঝার দরকার তারা নিশ্চয় বোঝে। ঝাঁ চকচকে অফিস তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
রিসেপশনিস্টকে নিজের পরিচয় দিয়ে নীলাঞ্জনা মিত্রের খোঁজ করতেই ভিতরের কোনো একটা ঘর থেকে নীলাঞ্জনা বেরিয়ে এলেন। ফ্যাশানেবল সালোয়ার কামিজ পরা লম্বা একটি মেয়ে, চোখটা কটা ঠিক বাঙালি বাঙালি চেহারা নয়। একেনবাবুকে নিয়ে রিসেপশানিস্টের ডেস্ক থেকে একটু দূরে লবির একটা কোণে দাঁড়ালেন। নীলাঞ্জনার হাবভাবে একেনবাবু বুঝলেন বিকাশবাবু সম্পর্কে কিছু বলার ইচ্ছে তাঁর নেই। ইংরেজিতে বললেন, “অফিসের কনফারেন্স রুমে ক্লায়েন্ট আছে, বিকাশ সেনের পুরোনো অফিস ঘরেও একটা মিটিং চলছে, সুতরাং প্রাইভেটলি কথা বলার কোনো জায়গা নেই।”
একেনবাবু বললেন, “ঠিক আছে ম্যাডাম, কখন মিটিং শেষ হবে বলুন, আমি তখন আসব।”
“কখন মিটিং শেষ হবে বলা শক্ত।” আবার ইংরেজিতেই বললেন নীলাঞ্জনা।
“কালকে আপনার সময় হবে?”
“দেখুন, আমি সব সময়েই ব্যস্ত। আর এ ব্যাপারে আমার কিছু বলারও নেই।”
একেনবাবু তখন অন্য পথ ধরলেন। বললেন, “ম্যাডাম, আপনি যদি কিছু না বলতে চান, বলবেন না। তবে তদন্তটা খুনের। আপনার নাম কিন্তু জড়াবে, আপনি চান বা না চান।”
এই কথায় নীলাঞ্জনার বোধহয় টনক নড়ল। এবার বাংলায় বললেন, “আমার সংসারে অনেক সমস্যা হয়েছে, সেটাকে আর বাড়াতে চাই না।”
“নিশ্চয় ম্যাডাম,” একেনবাবু নীলাঞ্জনাকে আশ্বস্ত করলেন। “সত্যি কথা বলতে কী, আপনার সঙ্গে বিকাশবাবুর ব্যক্তিগত সম্পর্ক কী ছিল, সে নিয়ে আমার চিন্তা নেই।”
“তাহলে?”
“যেটা আমি বোঝার চেষ্টা করছি ম্যাডাম, বিকাশবাবুর খুন হওয়ার সঙ্গে সেই সম্পর্কটা জড়িত কিনা।”
একেনবাবুর এই কথাগুলো নীলাঞ্জনা পছন্দ হল না। ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “আপনি কী ইমপ্লাই করছেন?”
“কিছুই না ম্যাডাম, শুধু বোঝার চেষ্টা করছি।”
এক মুহূর্ত চুপ থেকে বললেন, “এখানে আমি কোনো কথা বলতে পারব না।”
“বেশ ম্যাডাম, তাহলে কোথায় বলতে পারবেন বলুন। আপনার বাড়িতে আসতে
“না না বাড়িতে নয়।” আপত্তি জানাল নীলাঞ্জনা।
একেনবাবু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
“ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন, আমি অফিসে বলে আসছি।”
খানিক বাদে একটা চাবি হাতে ফিরে এসে নীলাঞ্জনা বললেন, “দোতালায় আমাদের স্টোর রুম আছে, সেখানে কিছুক্ষণ বসতে পারি।”
ঘুপচি স্টোর রুম। ফাইলপত্র, কাগজ আর পোস্টারে ঠাসা। তারই মাঝখানে একটা টেবিল আর গুটিকতক চেয়ার।
“বসুন,” বলে একটা চেয়ার টেনে নীলাঞ্জনাও বসলেন।
“কী জানতে চান বলুন?”
“বিকাশবাবুর সঙ্গে আপনার অন্তরঙ্গতা হয়েছিল ম্যাডাম?”
“উনি আমার বস ও বন্ধু দুই-ই ছিলেন। অন্তরঙ্গ কথাটা ব্যবহার করতে চাই না।”
“আপনি কিন্তু বললেন ম্যাডাম, আপনার সংসারে এ নিয়ে অনেক সমস্যা হয়েছে…।”
একেনবাবুকে কথাটা শেষ করতে দিলেন না নীলঞ্জনা। “হ্যাঁ, হয়েছে। তার কারণ আমার স্বামী একটু সন্দেহপ্রবণ। মাঝে মাঝে কাজের সূত্রে আমার বাড়ি যেতে দেরি হত বা ডিনার খেয়ে বাড়ি ফিরতাম, ওর তাতে অসুবিধা হত।”
“আই সি। একটা প্রশ্ন করি ম্যাডাম, কিছু মনে করবেন না, বিকাশবাবু কি আপনার বন্ধুত্বের সুযোগ নেবার চেষ্টা করেছিলেন, আই মিন…।”
আবার একেনবাবুকে থামিয়ে দিলেন নীলাঞ্জনা। “একবারই চেষ্টা করেছিল, বাট আই নিপড ইট ইন দ্য বাড। আফটার দ্যাট হি নেভার ট্রায়েড।”
“আপনার স্বামী কি সেটা জানতেন?”
“না, এটা গল্প করার কোনো ব্যাপার নয়।”
“আর কারোর কাছে কি উনি শুনে থাকতে পারেন?”
“কার কাছ থেকে শুনবে! আর শোনার মতো তো কিছু ঘটেনি! কিছু যদি ও শুনতে পেত আমায় বলত।”
“দাঁড়ান ম্যাডাম, আমার একটু গুলিয়ে যাচ্ছে। এই ‘নিপড ইন দ্য বাড’ কথাটা বললেন, এটা কতদিন আগেকার ঘটনা?”
“আমার মনে নেই।” একটু বিরক্তিভরে নীলাঞ্জনা উত্তরটা দিলেন।
“আই সি,” মাথা চুলকোলেন একেনবাবু। “কিন্তু তারপর থেকে ম্যাডাম আপনি সময় মতোই বাড়ি ফিরছেন, তাই তো?”
“না, তা ঠিক না। আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন বলুন তো?”
“আসলে ম্যাডাম, আমি বোঝার চেষ্টা করছি। আপনার স্বামীর সন্দেহটা গেল কী ভাবে! আপনি তো সেই দেরি করেই বাড়ি ফিরছেন, বাইরে ডিনারও খাচ্ছেন!”
“তার কারণ আমি ওকে বলেছি, ও যা মাইনে পায় তা দিয়ে সংসার চলবে না। আই নিড দিস জব আমাদের দুজনের জন্যেই। আর এটা একটা ডেস্ক জব নয়। এই চাকরিতে ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ডিনার খেতে হবে, কাজের চাপ বেশি পড়লে রাত্রি পর্যন্ত কাজও করতে হবে। হি উইল হ্যাভ টু ট্রাস্ট মি।”
“বুঝেছি ম্যাডাম, উনি সেটা মেনে নিয়েছেন।”
“মেনে নেওয়া মানে আমার চাকরির সমস্যাটা অন্তত বুঝেছেন।”
“বিকাশবাবুর বিরুদ্ধে তো সেক্সয়াল হ্যারাসমেন্টের চার্জও আছে?”
“তা আছে, কিন্তু সেটা আমার তরফ থেকে নয়।” তারপর একটু চুপ করে বললেন, “লোকটা মরে গেছে, অনেক কিছুই এখন অবান্তর। ও যে নিষ্পাপ শুদ্ধ চরিত্রের লোক কখনোই আমি বলব না, তবে মনে রাখবেন এক হাতে তালি বাজে না। তালে তাল না দিয়েও যে লোককে ম্যানেজ করা যায় তার প্রমাণ আমি।”
“তা তো বটেই ম্যাডাম। ভালো কথা, যেদিন বিকাশবাবু মারা যান, সেদিন কি আপনি ওঁর সঙ্গে ডিনার মিটিং-এ গিয়েছিলেন?”
“না।”
“ওঁর নাকি অফিশিয়াল ডিনার ছিল সেদিন?”
“থাকতে পারে। ওর সব অ্যাপয়েন্টমেন্টের কথা আমি জানতাম না।”
“কিন্তু ম্যাডাম, আপনি তো ওর প্রাইভেট সেক্রেটারি!”
“তা বলেই আমি সব কথা জানব সেটা কেন ভাবছেন? হয়তো ওটা একটা কনফিডেনশিয়াল মিটিং, ইচ্ছে করেই আমাকে জানায়নি।”
“আই সি।” আবার মাথা চুলকোলেন একেনবাবু।
“আর কী জানতে চান?”
“ও হ্যাঁ, বিকাশবাবুর সঙ্গে কারো কোনো গণ্ডগোল চলছিল টাকা-পয়সা বা অন্য কোনো ব্যাপারে?”
“তেমন তো কিছু শুনিনি। আর কিছু?” নীলাঞ্জনা মনে হল এবার অধৈর্য হয়ে পড়েছেন।
“এক্ষুনি আর কিছু নয়, ম্যাডাম। শুধু একটা কথা, পয়লা এপ্রিল বা জানুয়ারির চার তারিখে এমন কি কিছু ঘটেছিল যার সঙ্গে বিকাশবাবু জড়িত?”
নীলাঞ্জনা অবাক হয়ে তাকালেন। একটু ভেবে বললেন, “না, তেমন তো কিছু মনে পড়ছে না।”
“থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাডাম, থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর টাইম।”
নীলাঞ্জনার কাছ থেকে ফেরার পথে ওঁর একটা কথা একেনবাবুর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল– ‘এক হাতে তালি বাজে না। তালে তাল না দিয়েও ম্যানেজ করা যায়। নীলাঞ্জনার দাবি বিকাশ সেন মেড অ্যাডভন্সেস, নীলাঞ্জনা স্টপড দ্যাট। সত্যিই কি তাই? বাধা পেয়েই কি বিকাশ সেন সুবোধ বালক হয়ে গিয়েছিলেন না সেই সম্পর্ক তলে তলে চলছিল সতর্কভাবে? স্বামী আর বিকাশ সেন– দু-জনকেই ম্যানেজ করে তিনি চালাচ্ছিলেন। একটা জিনিস পরিষ্কার, সোজাসুজি অকপট ভাবে স্বামীর সঙ্গে বিকাশবাবুকে নিয়ে ওঁর আলোচনা হয়নি। হয়ে থাকলে নিজের বাড়িতে একেনবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলতে এত আপত্তি হত না। দ্যাট মেকস সেন্স, কিন্তু তাতে ধাঁধার উত্তর মিলছে না। জেলাস হাসব্যান্ড হিতাহিত শূন্য হয়ে স্ত্রীর প্রেমিককে খুন করতে পারে, কিন্তু সেই বডি টেনে নিয়ে সোনাগাছিতে ফেলে আসা অবিশ্বাস্য! সেটা করতে পারে একমাত্র কোল্ড ব্লাডেড মার্ডারার। নীলাঞ্জনার স্বামী যদি সে-রকম চরিত্রের হতেন তাহলে এ ব্যাপার নিয়ে শুধু অশান্তি করে এতদিন কাটিয়ে দিতেন না। নীলাঞ্জনাও অক্ষত থাকতেন না।
এখন পর্যন্ত একেনবাবু স্কুলেস। শুধু নীলাঞ্জনা নয়, মল্লিকার কাছ থেকেও তেমন কোনো তথ্য উদ্ধার হয়নি যার থেকে খুনের মোটিভটা আঁচ করা যায়। মল্লিকার প্রেগন্যান্ট হবার ব্যাপারটাই ধরা যাক। ঠিক আছে, বিকাশ সেন না হয় তার দায়িত্ব এড়াচ্ছিলেন, তাহলেও মলয় বা আর কাউকে দিয়ে এভাবে খুন করে লাভটা কী? গাত্রদাহ মেটানো? নাঃ, তাতে অঙ্কটা ঠিক মেলে না। সন্তান বড় করার জন্যে মল্লিকার প্রয়োজন অর্থের। এতে কোনো অর্থপ্রাপ্তি নেই। বিকাশবাবুকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা মল্লিকা হয়তো করেছিল বন্ধু মলয়কে দিয়ে, এই পর্যন্তই। মাথাফাটা রতনের দিক থেকেও বিকাশবাবুকে মারার কোনো কারণ পাওয়া যাচ্ছে না। হ্যাঁ, একজনই শুধু আর্থিক দিক থেকে লাভবান হয়েছেন তিনি হলেন বিকাশ সেনের স্ত্রী মনীষা। আড়াই কোটি টাকা আজকের যুগে এমন কিছু বড়ো অঙ্ক নয়। বিকাশবাবু খতম হলে প্রেমিককে পাওয়া যাবে সেটা নিশ্চয় আর একটা ইনসেন্টিভ। কিন্তু স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই তো দিব্বি পরকীয়া চালাচ্ছিলেন, অসুবিধাটা কোথায়? যদি বিকাশবাবুকে ছেড়ে প্রেমিকের ঘর করতে চাইতেন, তাহলে তো আইনের পথেও এগোতে পারতেন! তবে জানা নেই মনীষা সেন ডিভোর্স চেয়েছিলেন কি না, আর বিকাশবাবুর তাতে আপত্তি ছিল কিনা। সেক্ষেত্রেও সোনাগাছির ব্যাপারটা মিলছে না। নাঃ, একেনবাবু সত্যিই কনফিউসড।
[আমি প্রতিদিনই যতটুকু লিখি রাত্রে খাবার সময় প্রমথকে শোনাই। প্রমথ শোনে, তবেভাব দেখায় আমি যেন ওর সময় নষ্ট করছি!
একদিন রাগ করে বললাম, “শুনতে চাস, না চাস না?”
“চাই না, তবু শুনব একেনবাবুর কথা ভেবে। তুই যাতে ওঁকে না ডোবাস সেটা তো কাউকে দেখতে হবে।”
এতদিন পর্যন্ত নিজের থেকে কোনো মন্তব্যই প্রমথ করেনি। আজকে হঠাৎ বলল, “এই যে তুই লিখেছিস, একেনবাবু ব্লুলেস, কী করে জানলি? একেনবাবু তোকে বলেছেন?”
“ওটা পোয়েটিক লাইসেন্স, একেনবাবু ঠিক কী ভাবছেন, সেটা কী করে জানব?”
“তোর পোয়েটিক লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া উচিত। হ্যাঁ, তুই এগুলো ভাবতে পারিস, কারণ তোর মাথায় আর যাই থাক গ্রে ম্যাটারের অভাব আছে। কোনো ইন্ট্যালিজেন্ট লোক এভাবে জিনিসটাকে অ্যানালাইজ করবে না।”
“চুপ কর! এ অবস্থায় তুই কী ভাবতিস?”
“নাম্বার ওয়ান, তুই লিখেছিস… নীলাঞ্জনার স্বামী যদি সে-রকম চরিত্রের লোক হতেন’… কী করে একেনবাবু জানলেন নীলাঞ্জনার স্বামীর চরিত্র? একেনবাবুকে যদ্দুর জানি, ভালো করে যাচাই না করে কারোর সম্পর্কে কোনো ধারণা উনি করেন না। নীলাঞ্জনার সঙ্গে কথা বলেই স্বামীর চরিত্র উনি বুঝে গেলেন? আরও লিখেছিস নীলাঞ্জনাও অক্ষত থাকতেন না”। কী আশা করেছিলি তুই, নীলাঞ্জনার সারা গায়ে কালশিটে থাকবে, না ছুরির কাটা দাগ? নাম্বার টু, তোর মনে হয়েছে বিকাশ মারা গেলে মল্লিকার অর্থ-প্রাপ্তির সম্ভাবনা নেই, আর সেটা তুই একেনবাবুর নামে চালিয়েছিস। কেন নেই? ডি-এন-এ অ্যানালিসিস করিয়ে ছেলের পিতৃত্ব প্রমাণ করিয়ে তার জন্যে ও ভরণপোষণ দাবি করতে পারত! বিকাশ বেঁচে থাকলে বরং সেটা করানো সহজ হত না। নাম্বার থ্রি, মনীষার মতো মহিলার ক্ষেত্রেও আড়াই কোটি টাকা তুচ্ছ করার মতো ব্যাপার নয়। আর আড়াই কোটি তো শুধু ইন্সিওরেন্সের টাকা। এ ছাড়াও বাড়ি ও অন্যান্য অ্যাসেট নিশ্চয় আছে। এই টাকা প্লাস যদি প্রেমিককে পাওয়া যায়, তাহলে মন্দ কি? ডিভোর্স করে বিকাশকে ছেড়ে প্রেমিককে বিয়ে করা মানে এর অনেকটাই হারাতে হবে!”
প্রমথর যুক্তি অস্বীকার যায় না। তবে হার মানতে আমি রাজি নই। জিজ্ঞেস করলাম, “হোয়াট অ্যাবাউট সোনাগাছি?”
“দোজ আর ডিটেলস,” বলে প্রমথ শুতে চলে গেল!]
