পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলাম দেরি করে। উঠেই দেখি পাহান বসে আছে বারান্দাতে। হলুদ-কালো আর লালরঙা চৌখুপি চৌখুপি কাপড়ের তুলোর কোট আজ তার গায়ে। হাতকাটা।
আকাশ তখনও মেঘলা। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। বাংলোর হাতার কোণের অমলতাস গাছের নীচে আগুন করেছে ওরা অসমান পাথরের ঘের দিয়ে, উনুন বানিয়ে। তার চারপাশে গ্রামের চার-পাঁচজন মাতব্বরমতো লোক দুপা আগুনের দিকে দিয়ে, স্টেশনে কুলিরা যেমন করে দু হাত আর গামছা দিয়ে হাঁটু বেঁধে দুপা শূন্যে তুলে বসে, তেমনই করে বসে-বসে আগুন পোয়াচ্ছে আর চুট্টা খাচ্ছে। পাহানও রোধহয় ওদের ওখানেই ছিল। একটু আগেই বারান্দাতে এসেছে।
পাহান্ বলল, সেলাম হুজৌর।
সেলাম।
আমি বললাম।
কাল রাতেই ফরেস্টারবাবুকে খবর দিয়েছিলাম লন্ঠন নিয়ে গিয়ে। সে আজ কাকভোরে চিপিতে খবর দিয়েছে পাকদণ্ডী দিয়ে গিয়ে, ঘোড়ায় চেপে। সেখান থেকে ফোনে খবর দেওয়া হয়েছে, কাহাতেও যে সঙ্গী ছিল মিঞা ফকরুদ্দিনের সঙ্গে, সেও রাত দশটা নাগাদ খতরার জায়গা থেকে ফিরে চিপিতে পৌঁছে খবর দিয়েছে। আবোলতাবোল বকছে নাকি সে। পাগলই না হয়ে যায়।
তাই?
চায়ের কাপ হাতে ধরে ড্রেসিং-গাউন পরে বারান্দার বেতের চেয়ারে এসে বসে আমি বললাম।
পাহান বলল, মিঞা বদরুদ্দিন আজই ঢের শিকারি নিয়ে গিয়ে বাঘ মারার চেষ্টা করবে। শালার মৃত্যুর বদলা নিতে।
আজই? তবে তো আর আমাকে দরকারই নেই তোমাদের। আমি অন্যদিকেই যাব বরং আজ। দেখি, কিছু মোরগা-তিতিরবটের পাই, তো কাবাব হবে।
পাহান্ বলল, ওতে আর কতটুকু মাংস হবে হুজৌর। একটা বড়কা শম্বর মেরে দিন, শিঙাল। তাতে আমাদের গ্রামের সকলের ভাগেই কিছু কিছু করে মাংস পড়বে। আমরা আপনার মারা শম্বরের শিং ও মাথা, চামড়া এমন করে ছাড়িয়ে নুন দিয়ে ঠিকঠাক করে দেব যে, কলকাতায় গিয়ে সোজা কাঁপারের দোকানে দিয়ে দেবেন।
সেটা আবার কোন দোকান?
তিতির শুধোল।
ঋজুদা হেসে ফেলল। বলল, কাৰ্থবার্টসন হাপার। কলকাতার নামী ট্যাক্সিডার্মিস্ট। পাহান সবই জানত। মালিক ছিলেন এক আর্মেনিয়ান ভদ্রলোক। নাম, মিস্টার ফ্লেভিয়ান। আর ম্যানেজার ছিলেন হালদারবাবু।
পাহান একটা চুট্টা ধরিয়ে বলল, ওরা কিন্তু বাঘ আদৌ মারতে পারবে না হুজৌর। মধ্যে দিয়ে আরও দু-চারজন বাঘেদের হাতে ফও হবে। আর এত ঘন-ঘন মানুষ মারলে, কারও মাংস খেয়ে, ঐ জোড়া-বাঘ শেষে মানুষখেকোই না হয়ে যায়। এই আমার ভয়। বাঘ কি আর টাকা থাকলেই মারা যায়? না, যাত্রাপাটি নিয়ে এসে মারা যায়? বাঘ নিজেও একা-শিকারি, তাকে যে মারবে তাকেও একা-শিকারিই হতে হবে; হতে হবে, তার মতোই ক্ষমতাবান। বুদ্ধিমান। শিকারি কি আর সবাই হতে পারে?
পাহান্ আবারও একবার তার সেই অনুরোধের পুনরাবৃত্তি করে চলে গেল। আমিও ভাবলাম যে মিঞা বদরুদ্দিন অ্যান্ড পার্টি কী করবে না করবে সেটা তাদেরই ব্যাপার কিন্তু সুফকর ব্লক আমার নামে রিসার্ভ করা আছে। এই ব্লকেরই বাঘ যাচ্ছেতাই করবে, মানুষ মারবে আর আমি নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকব সেটা আদৌ উচিত হবে না। তাছাড়া গ্রামের মানুষেরা যখন এমনভাবে বারবার বলছে। তবে বদরুদ্দিনের শিকারীরা আজ আসবে বলে আমার মনে হয় না কারণ আজ সারাদিন তো কবর দিতেই চলে যাবে। সবচেয়ে তাড়াতাড়ি এলেও তারা আগামীকালের আগে আসতে পারবে না বদলা নিতে।
ভাবলাম বটে কিন্তু সেদিন বাঘেদের ডেরাতে যাওয়া হল না। পাহান-এর পীড়াপীড়িতে ওদের জন্যেই শিকারে বেরোতে হল। এরকমই হয়। ম্যান প্রোপোজেস, গড ডিজপোজেস।
চান করে, ব্রেকফাস্ট সেরে তো বেরোলাম হাজো আর বহেড়া বাইগাকে নিয়ে। হিরু পানকা বলল, আমি আজ ছাতুর লিট্টি বানাব ভালবেসে। পাকার বাড়ি থেকে খাঁটি ঘি আনিয়েছি।
ভটকাই বলল, আমরা কিন্তু শম্বর শিকারের গল্প শুনতে চাই না। আগেই বলে দিচ্ছি। তুমি যেন কেমন হয়ে যাচ্ছ ঋজুদা আজকাল।
ঋজুদা বাঁ হাতের পাতা দিয়ে স্বভাবোচিত এক অসহিষ্ণু ভঙ্গি করে ভটকাইকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আরে, সেদিন শুধু শম্বরই শিকার হয়নি, একজোড়া ভালুকের খপ্পরেও পড়েছিলাম, সে…। তা ছাড়া, সব শিকারের গল্পই শোনার মতো হতে পারে। খরগোস শিকারের গল্পও কি হয় না? হাঁস শিকার?
সে যাই হোক স্যার, বাঘে ফেরো।
ভটকাই বলল।
ঠিক আছে।
ঋজুদা হাল ছেড়ে দিয়ে বলল।
পরদিন সারা সকাল ও দুপুরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘুমিয়ে, আর্লি-লাঞ্চ সেরে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
আমরা মানে?
আমরা মানে, আমি, হাজো আর হিরু পানকা। বহেড়া বাইগা বাংলোতেই থাকল।
