শুরু করল ঋজুদা। শীতকাল। জানুয়ারির শেষ। প্রতি বছরই জানুয়ারির শেষে একপশলা বৃষ্টি হয়ই ভারতের সব বনে জঙ্গলে। তোরা নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিস। আসলে এমন বৃষ্টি ঝড়-বাদল প্রত্যেকটা ঋতু পরিবর্তনের আগেই হয়। থুড়ি, বলা উচিত ছিল যে, হত। আজকাল তো কোথাওই আবহাওয়ার কোনওই মাথামুণ্ডু নেই। আমাদের নিজেদের কৃতিত্বও কম নয় এর পেছনে।
তারপর?
আগের রাতে প্রচণ্ড দুর্যোগ গেছিল। সকালেও ঝোড়ো কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়ার সঙ্গে টিপটিপে বৃষ্টি। এই যে বাংলোর গেট-এর প্রায় সামনেই পাহাড়টা দেখছিস, যখনকার কথা বলছি; তখন এতে ঘন সেগুন-জঙ্গল ছিল। বছর কুড়ি হল ক্লিয়ার-ফেলিং করে এখানে নতুন শালের প্ল্যানটেশান করা হয়েছে। তখনকার সেই সেগুন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা গেম-ট্র্যাক, মানে জানোয়ার-চলা শুড়িপথ, পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে এসেছিল। বাংলোর গেটের প্রায় কাছাকাছি এসে বাংলোটা এড়িয়ে গিয়ে পেছনের গভীর বনে ঢুকে গেছিল পথটা। তারপর সুফকর গ্রামের দিকে।
গ্রামে ফসল লাগলে হরিণ, শম্বর, বারাশিঙারা সব কুথি, চানা, তিল, মকাই এসব খেতে আসত ওই শুড়িপথ বেয়েই, সামনের দিকের ঘন জঙ্গলে ঘেরা পাহাড় থেকে।
তারপর? তিতির বলল।
সকালের চা-জলখাবার খেয়েছিলাম আগের রাতের বাসি খিচুড়ি, কড়কড়ে করে আলু ভাজা আর শুকনো লঙ্কার সঙ্গে। ব্রেকফাস্ট খাবার পরে এই বারান্দাতেই ইজিচেয়ারে বসে পাইপ টানছিলাম। হঠাৎ সেই মাতাল হাওয়া আর সুগন্ধি বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে একটি অদ্ভুত শব্দ আমার কানে এল। চমকে উঠে সোজা হয়ে বসে, যেদিক থেকে শব্দটা এল মনে হল, সেদিকে তাকিয়ে দেখি একটি অতিকায় পুরুষ-বারাশিঙা ওই গেম-ট্র্যাক দিয়েই হড়বড়-খড়বড় করে নেমে আসছে আতঙ্কিত হয়ে।
প্রথমে ভেবেছিলাম জংলী কুকুর বা ঢোল, এই বুঝি তাড়া করেছে তাদের। কিন্তু সে ভুল তক্ষুনি ভেঙে গেল বড় বাঘের প্রলয়ংকর গর্জনে। বনজঙ্গল, ঝোড়ো হাওয়া, সুফকর বাংলো সব যেন থথর করে কেঁপে উঠল বনরাজের ওই গর্জনে। বাঘটা বোধহয় ওদেরই তাড়া করে আসছিল। বারাশিঙারা কাছে আসতেই দেখি, তাদের পেছনেই বাঘ। আর সে বাঘের কী প্রলয়ংকর মূর্তি।
চিন্তা কর একবার, জলখাবার খাবার পরে, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে, ইজিচেয়ারে বসে দিব্যি আরাম করে পাইপ টানছি যখন ঠিক তখনই এমন নিরবচ্ছিন্ন শান্তি-বিঘ্নকারী ঘটনাপ্রবাহ!
তুমি কী করলে?
কী কেলো রে বাবা! বলেই, ভটকাই শুধোল।
কী আর করব। খবরের কাগজের ভাষায়, যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়, তাই হয়ে ইজিচেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে ব্যাপারটা বোঝার জন্যে সেদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম। এবং ঠিক সেই সময়েই বাঘটা অন্য বারাশিঙাগুলোকে প্রায় ঝড়ের বেগে টপকে এসে অতিকায় প্রাচীন পুরুষ শিঙালটার ওপর লাফিয়ে উঠেই তার পিঠ ও পেটের মাঝামাঝি জায়গা একেবারে ফালাফালা করে দিল। যেন কোনও ব্যক্তিগত আক্রোশেই!
অন্যরা দুদ্দাড় করে খুরে খুরে খটাখট শব্দ করে পাথুরে, পিছল, ঘাস-ঢাকা জমি পেরিয়ে প্রায় বাংলার গেটের পাশ দিয়েই ঊর্ধ্বশ্বাসে উড়ে গেল, আর ঠিক সেই সময়েই বাঘটা শিঙালের পিঠ থেকে নেমেই পাশ থেকে কোনাকুনি এক লাফ মেরে তার ঘাড় কামড়ে টুটি টিপে মাটিতে পটকে দিল। এক পান খেয়েই তো অত বড় জানোয়ারটা শিঙের শাখা-প্রশাখা নিয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে অসহায়ভাবে হাত-পা ছুঁড়তে লাগল। তার নাকের পাটা ফুলে উঠল। চোখ দৃটি উজ্জ্বলতর হল। তারপরই দুটি চোখ যেন কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে এল। জিভটা আগেই বেরিয়ে গেছিল। দাঁতে কামড়ানো ছিল। কিছুক্ষণ শ্বাসরুদ্ধ থাকার পর শেষ নিঃশ্বাস বেরিয়ে গেল।
বাঘটা, বারাশিঙাটা যতক্ষণ না মরে গেল ততক্ষণ ওর টুটি কামড়েই শুয়ে রইল ঘাড়ের পাশে। ঘাড়ের কাছে মুখ আর শরীরটা তার পেটের পাশে শুইয়ে, যেন তার সঙ্গে খুবই ভাব-ভালবাসার সম্পর্ক। বারাশিঙাটা নিস্পন্দ হয়নি তখনও। মৃত্যুর পরও অনেকক্ষণ রাইগার-মর্টিস-এর কারণে হাতে-পায়ে স্পন্দন থাকে। মানুষেরও থাকে, এমন হঠাৎ আঘাতে মৃত্যু হলে; মৃত্যুর সময়ে।
কিন্তু বাঘ সেজন্য অপেক্ষা না করে দাঁড়িয়ে উঠে পাহাড়ের দিকে চেয়ে এক প্রচণ্ড হুঙ্কার দিল। ভাবখানা, যেন বলে গেল, আমি এসেছিলাম। তা বলে, আমার খোঁজ করার সাহস যেন কারও না হয়!
পরমুহূর্তেই ওই গেম-ট্রাকেই অদৃশ্য হয়ে গেল সে, বৃষ্টিভেজা ঘন সেগুনের নিবিড় বনের আড়ালে। পুরো ঘটনাটা ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। আমার তোদের বলতে যে সময় নিল তার অর্ধেক সময়ে।
তারপর?
বাঘের ঠিক এরকম হরকত্ আমি তার আগে তো বটেই, তার পরেও কোনওদিনও দেখিনি। বিস্ময়াভিভূত ভাবটা কেটে যেতেই চেয়ারে বসে পাইপটা ধরালাম।
হিরু পানকা তখন কোথায় ছিল? তিতির শুধোল।
হিরু পানকা সেদিন সকালে আজকেরই মতো চৌকিদারের ঘরেই বসে ছিল। সেই সময়ে এই বন-বাংলোর যে চৌকিদার ছিল তার নাম ছিল বহেড়া বাইগা। বেচারা কানে একটু কম শুনত আর জাতে ছিল বাইগা।
বহেড়া আর হিরু দুজনেই দৌড়ে এল আমার কাছে বারান্দাতে বাঘের ঐ তর্জন-গর্জন শুনে।
কী ব্যাপার? আমি শুধোলাম ওদের।
ওরা আতঙ্কিত গলায় সমস্বরে বলল, হুজৌর, এই বাঘটাকে মারতে না পারলে আমাদের সুফকর গ্রামে থাকাই মুশকিল হবে। গ্রামের পেছনের জঙ্গলে মোষের বাথান আছে পাহাড়ীদের। তাদের বাথানে দিন পনেরো আগে রাতে এসে বাথানের দরজা ভেঙে দিয়ে দু-দুটো মোষকে মারে, চারটেকে আহত করে ফেলে যায়। পরে, তাদের মধ্যে তিনটিই মরে যায়।
বলো কী? অতগুলো মোষ একসঙ্গে থাকতেও বাঘ অমন করতে পারল? বাঘকেও তাদের ছিন্নভিন্ন করে দেওয়ার কথা ছিল।
তার কারণ ছিল। মোষেদের তো নড়াচড়া করারই উপায় ছিল না কোনও। এমনই গাদাগাদি ঠাসাঠাসি করে তাদের রেখেছিল পাহাড়ীরা বাথানে। আপনারা, বাঙালিবাবুরা যেমন করে হাঁড়িতে কইমাছ নিয়ে যান।
তাই বলো!
হিরু বলল, এই বাঘ দুটির মস্তী শেষ হতে-হতে আমরাই শেষ হয়ে যাব।
ওরা দুজনে যখন আমার সঙ্গে কথা বলছিল, তখন সুফকর গ্রাম থেকে গ্রামের পনেরো কুড়িজন মানুষ ওই হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা, দমক দমক উঁচ-ফুটোনো হাওয়া আর বৃষ্টি উপেক্ষা করে, লাইন করে বাংলোর হাতায় এসে ঢুকল।
সকলেই একই সঙ্গে কথা বলছে। কারও মুখে চুট্টা, কারও ঠোঁটের নীচে খৈনি, কারও হাতে থেলো হুঁকো। আমি সকলকেই বারান্দায় ভেতরে ডেকে বহেড়া বাইগাকে সকলের জন্য চা করতে বললাম। আদা, দারচিনি আর তেজপাতা দিয়ে। যা ঠাণ্ডা পড়েছিল না সেদিন! এখনও ভাবলে কুঁকড়ে যাই।
তারপর ঋজুদা স্বগতোক্তির মতো বলল, বুঝলি না, ওরাই তো আমাদের দেশের আসল মানুষ। আসল ভারতবাসী। ওরাই হনুমানকে দেবতা বলে পুজো করে। রামের নামে প্রাণ দিয়ে দিতে পারে। আমি তুই; আমরা এই দেশের কজন? রামচরিতমানস, রামায়ণ আর মহাভারতের শিক্ষাই ওদের একমাত্র শিক্ষা। বয়সে ছোট হলেও এমন কি শিশু এবং মেয়েদেরও পাকা পুরুষেরা পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। আত্মীয়স্বজনের মেয়েদেরও। আমাদের মতো চারপাতা ইংরিজি পড়ে তারা সবজান্তা আঁতেল হয় না। যা-কিছুই ভারতীয় তার সবকিছুকেই অস্বীকার করে নিজেদের অন্যরকম বলে প্রমাণ করতে সবসময়ে এমন ধড়ফড় করে না।
আমরা সকলেই চুপ করে রইলাম। ভটকাই ঋজুদা সম্বন্ধে অত কিছু জানে না। কিন্তু আমি আর তিতির জানি যে, স্বদেশ বা স্বদেশের মানুষের কথা উঠলেই ঋজুদার চোখ কেমন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। গলার স্বর গাঢ় ও গম্ভীর হয়ে ওঠে।
ঋজুদা বলল, জানিস, মাঝে-মাঝেই ভাবি, যদি ছেলেবেলা থেকেই শিকার না করতাম বনে-পাহাড়ে, নদী-বিলে, আমার এই বিরাট দেশের সাধারণ মানুষদের সঙ্গে এমন কাছ থেকে সমান্তরাল জমিতে দাঁড়িয়ে মেশবার সুযোগ না হত, তবে হয়তো আমিও কলকাতা শহরে বাস করা অনেক ভারতীয় নামী দামি মানুষদেরই মতো স্বদেশের সঙ্গে কোনওরকম প্রকৃত সম্পর্করহিত হতাম। লজ্জাবোধ যে আমাদের নেই, তার জন্য লজ্জিত হতাম না, কর্তব্যবোধ যে রাখি না, সেজন্য বিবেকদংশিত হতাম না। তোরা সবাই, প্রত্যেকেই, পুরোপুরি দিশি-মানুষ হোস, বুঝলি রে! নিজের দেশকে ভাল করে জানিস। নিজের দেশের মানুষকে ভালবাসিস।
ওরা তারপর কী বলল? মানে, গাঁয়ের মানুষেরা?
তিতির শুধোল, ঋজুদাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে।
ওরা বলল, বাঘ একটা নয়, দুটো আছে।
ওই সময়ে দুটো কেন একসঙ্গে? পেয়ার?
সুফকর গ্রামের লোকেরা তারপরে সমস্বরে বলল, ওই বাঘ দুটোকে না মারা গেলে ছেলে-মেয়ে গাই-বলদ নিয়ে সুর গ্রামে থাকাই ওদের পক্ষে আর সম্ভব হবে না। মেরে যদি আমি দিতে পারি তো ওরা চিরজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।
গ্রামের পাহান্ যে, সে সুন্দর সৌম্য পুরুষ। তার দুকানে পেতলের মাকড়ি। হাতে পেতলের বালা। বুনোট তুলোর জামা গায়ে। বহুবর্ণ চৌখুপি কাপড়ে বানানো সেই জামার আস্তরণ। হাতে তার কুচকুচে কালো থেলো হুঁকো। চুল সাদা ধবধবে। গোঁফ সল্ট-অ্যান্ড-পেপার। তার সঙ্গে সেই প্রথম আলাপ আমার। পাহান বলল, আমার বয়স হল চার কুড়ি। এই বন-পাহাড়ে আজ অবধি অসংখ্য বাঘ দেখেছি, কিন্তু আমি বাঘেদের এই ধরনের হরকত কখনওই দেখিনি। অজীব বাত বোস সাহাব।
তুমি কী বললে ওদের উত্তরে? ঋজুদা?
কী আর বলব! বললাম, রাতে ওই মৃত বারাশিঙাটার ওপরে বসব এবং বাঘ মেরে দেব। আমার পারমিটে একটি বাঘ, একটি চিতা এবং একটি করে শম্বর ও বারাশিঙাও ছিল। আর বন-শুয়োরতো ছিলই, যত খুশি। তোমাদের এতবার করে আমাকে অনুরোধ করতে হবে না।
ওরা হাতজোড় করে বলল, যদি দয়া করেন।
লজ্জিত হয়ে আমি বললাম, দয়া-টয়ার কথা আসছে কিসে? আমি তো শিকার করতেই এসেছি। অবশ্য পারমিটে থাকলেই কী। কোনও শিকারীই পারমিটে যা থাকে তার সবই শিকার করেন না। অবশ্য শিকারও তো আর বাঁধা থাকে না। অনেক সময়ে এমনও হয় যে, পনেরোদিন আপ্রাণ চেষ্টা করেও পারমিটে উল্লিখিত জানোয়ারের একটির সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারা যায় না। জানোয়ারদের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট লালবাজারের ইন্টেলিজেন্স ডিপার্টমেন্ট থেকেও অনেক দড়।
তুমি কিন্তু আবার অন্যদিকে চলে যাচ্ছ। ভটকাই বলল।
সরি।
বলো ঋজুদা, আগে বাড়ো।
পাহান, হিরু পানকা আর বহেড়া বাইগা প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল যে, এই বাঘ ও বাঘিনী কখনওই কোনও মড়িতে ফিরে আসে না। মড়িতেই যদি ফিরে আসত, তবে ওরা, যারা অনাদিকাল থেকে শিকার করেই জীবিকা নির্বাহ করছে, আর গাদা বন্দুক বা একনলা কার্তুজ-বন্দুক বা বিষমাখানো তীর নিয়ে; গাছে বসে কি এতদিনে জোড়া বাঘকে পটকে দিতে পারত না?
ওই বাঘ দুটো বনদেওতার বাঘ। পাহান বলল গম্ভীর গলাতে।
তারপর বলল, মানে, তাদের এতদিনের হরৎ দেখে তেমনই মনে হচ্ছে। নইলে কেউই তাদের মারতে পারছে না কেন?
আমি চুপ করে শুনলাম। সংস্কার এমনই একটা জিনিস, অনেকটা গলায়-বেঁধা মাছের কাঁটার মতো; যখন যাবার তখন এমনিই যাবে। জোর করে তুলতে গেলেই চিত্তির!
তারপর ওদেরই মধ্যে একজন বলল, আরে! খামোখা তার-এ গিয়ে লাভ কী! কথা কম বলো! হুজৌরকে বলতে দাও। শোনো, উনি কী বলেন!!
আমি বললাম, তোমরা কী বলো তাই শুনি।
আমরা বলি, নরম মাটিতে বাঘের পায়ের দাগ এখনও টাটকা আছে। এখনই বাঘেদের পিছা করে তাদের মারা উচিত। যত মাইল যেতে হয়, সে যমের দুয়ারে যেতে হলেও গিয়ে এদের সামনা করা উচিত। নইলে এই দুই বাঘ মারা কোনদিনও সম্ভব হবে না। আমাদেরই উদ্বাস্তু হতে হবে। এদের এইরকম বদমায়েশি চলছে দীর্ঘদিন হল। গত বছরও নভেম্বর মাসে এরা এইরকম করেছে। নানু বাইগা তো মারাই গেল ওদের হাতে। নাগপুর থেকে মালহোত্রা সাহেব এসেছিলেন। অনেক চেষ্টা করেও মারতে পারলেন না। ফিরে গেলেন কুড়ি দিন পরে।
আমি ইজিচেয়ারের ওপরে আবার সোজা হয়ে বসলাম। ইতিমধ্যে বহেড়া বাইগা তো চা নিয়ে এল সকলের জন্য।
তখন জানিনি যে, কথাটা এমন সত্যি হবে। ওই বাঘেদেরই সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নির্বিঘ্ন করার জন্যে সেই সকালের অনেক সকাল পরে তাদের বাবা-ঠাকুরদাদার ভিটেমাটি ছেড়ে তাদের উদ্বাস্তু হয়েই চলে যেতে হবে! বললাম, তোমাদের এই গ্রামে কটা এবং কী কী বন্দুক আছে? পাশী কি বেপাশী? আমি ফরেস্টার সাহেব বা পুলিশ সাহেব, কাউকেই বলব না।
পাশী দোনলা বন্দুক আছে একমাত্র রাজুপ্রসাদের। কিন্তু সে তো ডাকাতের মোকাবিলার জন্যেই বন্দুক রাখে। বাঘের জন্যে তো নয়! সে বন্দুক দেবে না।
হিরু বলল।
তবে তার বন্দুক ডাকাতি করেই নিতে হবে। তার বন্দুক ছাড়া আর কারও আছে?
আছে। কিন্তু বেপাশী। গাদা বন্দুকও আছে দুটি। কিন্তু তা দিয়ে পায়ে হেঁটে অমন দৃশমনের মতো জোড়া-বাঘকে চোট করতে কি সাহস হয়? এক চোট-এর বেশি তো করা যাবে না। তারপর? হায় রাম!
যা বললে তোমরা তাতে আমারও মনে হয় যে, এখুনি বেরিয়ে পড়ে বাঘেদের রাহান-সাহান-এর খবর করাটা অত্যন্ত দরকার। তোমরা এবারে যাও। রাজুপ্রসাদের বন্দুকটি ডাকাতি করেই হোক, আর যে করেই হোক, নিয়ে এসো। আর কার্তুজও। বল্ আর এল. জি. এনো শুধু। যে-কোনও বস্ হলেই চলবে। কনটাক্ট, রোটাক্স, লেথাল, স্ফেরিক্যাল। আলফামাক্স এর যদি থাকে, তাই আনবে। কার্তুজ যেন টাটকা হয়। বাজে কার্তুজ নিয়ে বাঘের পেছনে যাওয়া মানেই আত্মহত্যা করা। দাম আমি দিয়ে দেব, বলে দেবে রাজুপ্রসাদকে। দাম যদি না নিতে চায়, তা হলে পরে টাটকা কাট্রিজ পাঠিয়ে দেব কলকাতায় ফিরে।
আমার কথা শুনে পাহানের নির্দেশে ওরা সবাই চলে গেল তখনকার মতো।
পাহান বলল, আমিও যাব তোমার সঙ্গে।
তোমায় যেতে হবে না পাহান। বয়স হয়েছে।
কিসের বয়স? মোটে তো আশি। যে বছর দুটো দাঁতাল হাতিতে লড়াই। হয়েছিল মোতিনালার ধারে, সে বছরেই তো জন্মেছিলাম আমি। আমি শরীরে এখনও পঁচিশ বছরের জোয়ানের বল রাখি। প্রমাণ চাও? পাঞ্জা লড়বে?
আমি বে-ইজ্জৎ হবার ভয়ে পেছিয়ে গিয়ে বললাম, তা ঠিক আছে। কিন্তু এই ঝড়-বৃষ্টি ঠাণ্ডাতে কী দরকার। তাছাড়া আমার কিন্তু কথা বলে সময় নষ্ট করার সময় নেই। আমি যাই। এবারে, তৈরি হই গিয়ে।
বলেই, ঘরের ভেতর যেতে গিয়েও বললাম, আমার সঙ্গে শুধু হিরু পানকা গেলেই হবে। রাজুপ্রসাদের বন্দুক না পেলেও চলবে। আমার কাছে তো এক্সট্রা ডাবল-ব্যারেল বন্দুক একটা আছেই। তবে বড় গুলি মাত্র দুটি রয়েছে। মুরগি, তিতির মারার জন্যেই বন্দুকটাকে এনেছিলাম। নইলে, বড় জানোয়ার তো রাইফেলেই মারি। আর কারোরই যাবার দরকার নেই।
পাহান বলল, না না, তা কী হয়। আমাদের গ্রামেরই তো এত বড় বিপদ। আমাদের তংক করে মারছে শয়তান দুটো। আর গ্রামেরই কেউ যাবে না, তা কী হয়! আমার নাতি অবশ্যই যাবে আপনার সঙ্গে হুজৌর। তার নাম হাজো। চিতার মতো ক্ষিপ্র সে। বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ তার চোখ। বন্দুকে, তীর-ধনুকে তার আন্দাজ একেবারে নির্ভুল।
আমি লোক বেশি বাড়াতে চাইছি না পাহান। পায়ে হেঁটে বাঘকে পিছা করে বাঘের বাড়িতে গিয়ে তাকে মারতে হবে। তাও একটি বাঘ নয়, দু-দুটি বাঘ। তুমি তো বোঝো সবই!তুমিও তো শিকারী কিছু ছোট মাপের নও! আমার চেয়ে অনেক বেশি তোমাদের অভিজ্ঞতা।
সবই বুঝি। কিন্তু বড়জোর কী হবে, আমার নাতি হাজো মারা যাবে; এই তো! তা গেলে যাবে। আমার আরও চার নাতি আছে। শত্রুর সঙ্গে, অন্যায়ের সঙ্গে, দুশমনের সঙ্গে লড়তে গিয়ে যদি কেউ মরেই তার জন্যে তো শোক করার কিছু নেই। আনন্দই করব আমরা। ও নিয়ে আপনি মাথা ঘামাবেন না হুজৌর। উলটে ভাবুন, আপনার যদি কিছু হয়? সুফকর গ্রামের মানুষ কারও কাছেই কি মুখ দেখাতে পারবে আর?
আরে, আমার কিছুই হবে না। আমার মাংস বাঘের কেন, শকুনেরও অখাদ্য।
পাহান বলল, আমি আসছি একটু।
ঠিক আছে।
ঘরে গিয়ে ফোর-ফিফটি ফোর হান্ড্রেড জেফ্রী নাম্বার টু ডাবল ব্যারেল রাইফেলটাকে একবার পুল-থু করে নিলাম। জার্কিন পরে নিলাম চামড়ার।
বৃষ্টি যদি চলতেই থাকে তবু যতক্ষণ না বাইরেটা ভিজে সপসপে হচ্ছে ততক্ষণ ভেতরটা গরম থাকবে। পাঁচ ব্যাটারির বন্ড-এর টর্চটাও ব্যাগে নিলাম। ফেরার তো কোনওই ঠিক নেই। কোমরের বেল্টের কাছে লাগানো হোলস্টারে আমার পিস্তলটাতে গুলি ভরে নিলাম। ম্যাগাজিনে। একটি বাদে। পুরো আটটি গুলি ভরলে অনেক সময় আটকে যায় গুলি। টুপি নিলাম। টোব্যাকোর পাউচ। পাইপ।
ততক্ষণে হিরুও তৈরি হয়ে গিয়েছে। প্লায়ে গামবুট। তার ওপরে ডাকব্যাক-এর ওয়াটারপ্রুফ। তাকে হঠাৎই এমন সাহেব-রোগাক্রান্ত দেখে বললাম, এক্ষুনি ওসব ছেড়ে আসতে। খালি পায়েই যাওয়া ভাল। কারণ, হিরু এমনিতে জুতো কখনওই পরে না। ওই পোশাকে বনে ঢুকলে আধ মাইল দূর থেকেই জেনে যাবে বাঘেরা, মিঃ পাক্কা আসছেন তার জুতোর কপাত্ঠপাত শব্দে।
ইতিমধ্যে রাজুপ্রসাদের বন্দুক হাতে একটি ভারী সুন্দর ছেলে এসে হাজির। তার পেছনে-পেছনে অন্যরাও। ছেলেটির মাথায় বড়-বড় বাবরি চুল, ঘাড় অবধি নেমে এসেছে। কেষ্ঠ ঠাকুরের মতো গায়ের রং। খুব ভাল কাম নাচে বোধ হয়। টিকলো নাক। টানা-টানা চোখ। তার পরনে ধুতি আর গায়ে একটি খাকি ফুলশার্ট। কারও দেওয়া। মুখে হাসি।
মনে হল, সবসময়ই ওই হাসিটি ও পরে থাকে।
পাহান বলল, এই আমার নাতি, হাজো।
ঘড়িতে দেখলাম প্রায় এগারোটা বাজে। আর কথা না বাড়িয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম।
গ্রামের লোকেরা বিদায় জানাতে পাহাড়ের কিছুটা পর্যন্ত এল সঙ্গে সঙ্গে।
