হিরু পানকা দুহাতের তেলোতে একদলা খৈনী মেরে চটাপট করে দু তালি দিয়েই নীচের ঠোঁটের আর নীচের পাটির দাঁতের মধ্যে গুঁজে দিয়ে বলল, হাঁ। উসকো বা যো হুয়াথা, ওহি বাতাইয়ে না বোস সাহাব।
ঋজুদা হিরু পানকার দিকে চেয়ে বলল, ওহি তো বতা রহা হ্যায় হিরু।
হিরু পানকাও যে বাংলা একটু একটু বোঝে তা জেনে আমরা সকলেই বেশ অবাক হলাম। আমাদের মুখ দেখে মন পড়ে নিয়ে ঋজুদা বলল, আরে এই কাহা-কিসলির পেছনে কনসার্ভেটর দত্ত সাহেবের অবদান ছিল অসামান্য। পরে দত্ত সাহেব চিফ-কনসার্ভেটর তো হয়েই ছিলেন তারও পরে দিল্লিতে সবচেয়ে বড় সাহেব হয়েছিলেন। ওরা সবাই দত্ত সাহেব এবং আরও অনেক বাঙালি অফিসারের সঙ্গে কাজ করেছে, তাঁদের খিদমদগারী করেছে। তাই বাংলা একটু-আধটু অনেকেই বোঝে। বাঙালি শিকারিও আসতেন অনেকেই, আমারই মতো।
বলো, তারপর।
আমি বললাম।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছি। রাইফেলের স্মল অব দ্য বাট-এ ডানহাতের পাতা আর ট্রিগার গার্ড-এ তর্জনী ছোঁয়ানো রয়েছে। বাঁহাতে ব্যারেলের নীচের দিকটা শক্ত করে ধরে আছি। ঐ শীতেও হাতের পাতা ঘেমে উঠেছে। ততক্ষণে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেছে আবার এদিকেই। আটটা হতে হবে হয়তো এল। বৃষ্টি থেকে জানে।
এদিকে কোনও সময়ে আটটা তো বাজবেই। ঘড়িকে তো ঠেকিয়ে রাখা যাবে না মোটেই। আটটা বাজলে ওদের সঙ্কেতও দিতে হবে। তারপর তিনজনে মিলে বাঘেদের খাদ্যও হতে হবে হয়তো।
এমন সময়ে হঠাৎই একটা জোর হাওয়া এল। বৃষ্টি থেমে গেছিল অনেকক্ষণই। শীতকাল। কোথা থেকে অমন হাওয়া এল কে জানে। আফ্রিকার উপজাতি বান্টুদের দেবতা উকুলুকুলু, না সিংভূম জেলার মুণ্ডাদের মূয়া ভূতেই এমন খেল দেখাচ্ছে, বোঝা গেল না।
সেই হাওয়াটা প্রান্তরের দিক থেকে এসে বনের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে আমার সমান্তরালে পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে যেন নিঃশব্দে চুরচুর হয়ে, আজকালকার মোটরগাড়ির অ্যাসিডেন্টে-ভাঙা উইন্ডস্ক্রিনের মতোই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ল। আর সঙ্গে-সঙ্গে আরম্ভ হল বিদ্যুৎ-চমক।
এরকম বিদ্যুৎ-চমক ছেলেবেলায় একবার দেখেছিলাম গারো পাহাড়ের রাজধানী তুরা থেকে গৌহাটিতে নেমে আসবার সময়ে। জেঠুমনি সঙ্গে ছিলেন। চমকাতে থাকল তো চমকাতেই থাকল। এক মুহূর্ত অন্ধকার থাকে, তো পাঁচ মুহূর্ত আলো।
আটটা বাজা অবধি আর অপেক্ষা না করে আমি খুব জোরেই টিটি পাখির ডাক ডেকে উঠলাম। যেন পাখি, অতর্কিতে ভয় পেয়ে ডেকে উঠেছে। সঙ্গে-সঙ্গেই হাজোর পেঁচা বলল, দুরগুম, দুরগুম, দুরগুম্ আর হিরুর শুয়োরও ঘোঁতঘোঁতানি তুলে জাহির করল যে, সেও সামিল।
দুর্গা! দুর্গা! মনে-মনে বলে, পাথরের খাঁজটি থেকে নামতে যাব এমন সময়ে মালভূমির ওপরেই, কিন্তু আমরা যেখানে ছিলাম সেখান থেকে প্রায় একশো মিটার দূরের বড় গাছের ডালে-ডালে হুটোপাটি তুলে হনুমানের দল হু-উ-প হু-হুউপ হু-উ-প করে ডেকে উঠল। আর একটা কোটরা, আরও দূরে; মালভূমির ওপরেই, হনুমানদের গাছের দিক থেকে মালভূমির অন্য প্রান্তের দিকে ডাকতে-ডাকতে দৌড়ে যেতে লাগল।
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সাবধানে তো নামলাম নীচে। তারপর টর্চও জ্বালোম। কিন্তু টর্চের প্রয়োজন ছিল না। তিনজনে একত্র হয়ে ওই চন্দ্রাতপের ঘেরাটোপ ছেড়ে অতি ধীরে-ধীরে সাবধানে এগিয়ে গিয়ে প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়ালাম। অবশ্য হনুমানদের ডাক আর কোটরার ডাক নির্ভুলভাবেই বলে দিচ্ছিল যে, বাঘ বা জোড়া-বাঘ মালভূমির অন্য দিকে চলে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, যদিও একটু আগেই কোনও অজ্ঞাত কারণে তারা আমাদের এদিকেই এসেছিল। তবে আমাদের অস্তিত্ব অবশ্য টের না পাওয়ারই কথা তাদের।
প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়াতেই বারোধ হয়ে গেল। সে কী অপূর্ব দৃশ্য। চতুর্দিকে বিস্তৃত ঘন সবুজ বৃষ্টিভেজা প্রান্তরে সেই শব্দহীন অবিশ্রান্ত বিদ্যুৎ-চমকের বিভা নিঃশব্দে যে কী শালীন স্নিগ্ধ শোভা এনে দিল তা ঠিকভাবে তোদের কাছে প্রকাশ করি এমন ভাষা আমার নেই।
বলেই, থেমে গেল ঋজুদা।
তিতির সম্মোহিতর মতো বলল, তারপর?
তখনকার মতো বাঘ বাঘিনী, মৃত মানুষ এবং আমাদের বিপদের কথাও সম্পূর্ণ ভুলে গিয়ে অতি সাবধানে সেই প্রান্তরে দাঁড়িয়ে আবিষ্ট হয়ে চেয়ে রইলাম ঈশ্বরের সেই নীল-সবুজে মেশা প্রচণ্ড শক্তিসম্পন্ন রংমশালের দিকে। আহা, কী অবর্ণনীয় সেই দৃশ্যর অনুভূতি, তোদের কী বলব!
তিতির বলল, শিকারে না এলে কি তা দেখতে পেতে?
পেতামই না তো! শিকার তো একটা বাহানা, ছুতো; অ্যালিবাই। শিকারে ট্রিগার টানাটাই হচ্ছে লিস্ট ইমপট্যান্ট। শিকারের এই সব আনুষঙ্গিকই তো সব। সঙ্গী, সাথী, পটভূমি, প্রকৃতি, বন্য প্রাণীদের কুদরতি হরকৎ, এই সবই তো আসল। তোদের বোদ্ধাকাকু এইটাই হয়তো বোঝে না।
ছাড়ো তো!
সবাই যদি সব বুঝতো তাহলে দুঃখ ছিল কি?
বলেই বলল, আবার অন্য লাইনে চলে যাচ্ছ ঋজুদা! আগে বাড়ো।
মিস্টার ভটকাই দৈবাদেশ দিলেন।
হ্যাঁ। হাজো আর হিরু এসে আমার সঙ্গে মিলিত হবার পরেই হাজো বলল, বড়া ভুখ লাগা হুজৌর।
মনে-মনে বললাম, তা তো লাগবেই! আমারও কি আর লাগেনি?
মুখে বললাম, চলো, ফেরা যাক এবারে সুফকর-এর দিকে। আজকের মতো।
কিন্তু মানুষটির কী হবে? মানে ঐ মৃতদেহের?
আমিই প্রশ্ন করলাম ওদের দুজনকে।
বলল, ঋজুদা।
কোন মানুষটি? ওরা দুজনে সমস্বরে বলল।
ওহো! নিজের ভুল বুঝতে পেরে বললাম, তোমাদের বলা হয়নি। আমি যেখানে বসেছিলাম, তার পাশেই একজন মানুষের লাশ পড়ে আছে। বাঘে মেরেছে মাচারই ওপরে।
তাই?
হ্যাঁ কিন্তু কে সে?
তা, আমরা জানব কী করে?
দেখতে কেমন?
মানুষটির চেহারার ও পোশাকের বর্ণনা দিলাম আমি ওদের। বললাম, বড়া খানদান-এর মুসলমান।
ওরা বর্ণনা শুনেই চিনে ফেলল।
বলল, বুঝেছি, বুঝেছি। ইনি চিপির রহিস আদমি মহম্মদ বদরুদ্দিনের বড় শ্যালক হচ্ছেন। এঁর নাম ফকরুদ্দিন। প্রতি বছরই তো এই সময়ে উনি আসেন। শিকারের খুব শখ। কিন্তু গুলিতে জানোয়ারে কোনওদিনই যোগাযোগ হয় না। আমরা কতবার ছুলোয়া করেছি জঙ্গল, ওঁর জন্য। অথচ উনি নাকি চাঁদমারিতে উস্তাদ। অনেক মিডেল পেয়েছেন। খরগোস দেখলেও এমনই উত্তেজিত হয়ে পড়েন যে খরগোস-এর গায়েও গুলি ঠেকাতে পারেন না।
ভটকাই বলল, এই ইনফরমেশানটাও বোদ্ধাকাকুকে দেওয়া দরকার। বাঘ তো দূরের কথা, খরগোস মারাও সোজা কথা নয়।
হাজো বলল, তবে মানুষটি বড় ভাল। দিলদার। ইসস তার এই হাল করল বাঘে!
হিরু বলল, কিন্তু ফকরুদ্দিন মিঞা তো আর বাঘ মারার পার্টি নয় আদৌ! তিনি বাঘ মারতে এলেনই বা কেন? খামোখা প্রাণটাই গেল।
হাজো বলল, বাঘ আছে জেনে কি আর এসেছিলেন? ভেবেছিলেন জলের পাশে শম্বর বা বারাশিঙা মওকামতো ধড়কে দেবেন। চিপিতে ভোজ হবে।
আমার ব্লক-এ সে আসেই বা কী করে? এই ব্লক তো আমারই রিজার্ভ করা।
আমি বিরক্ত হয়ে শুধোলাম।
ঋজুদা বলল।
হুজৌর, এখানে মিঞা বদরুদ্দিনেরই রাজ। মস্ত বড়লোক সে। বাঘ তো কিছুই নয়। বদরুদ্দিনের শ্যালক ফকরুদ্দিন ইচ্ছে করলে ফরেস্টার, রেঞ্জার, মায় আপনাকেও মেরে তার হাভেলির ঘন সবুজরঙা দেয়ালে আপনার চামড়া বাঁধিয়ে রাখতে পারে। বদরু মিঞার শ্যালকের গায়ে হাত দেয় কে? কারও ঘাড়েই অত মাথা নেই।
আচ্ছা! এ কথা বাঘ বেচারা জানত না নিশ্চয়ই। তাই…।
তারপরই ভাবলাম, মরে-যাওয়া মানুষের ওপর রাগ করাটা ঠিক নয়।
তা হলে তো বদরুদ্দিন না কাকে বললে; একটা খবর এখুনি দিতে হয়। পুলিশকে খবর দিতে হয়। নইলে পরে তোমরা এবং আমিও ঝামেলাতে পড়ে যাব।
পুলিশে খবর দিলেই তো বাঘে ছুঁলে আঠারো-ঘা। বনের বাঘে ছোঁয়াতে তো মামুজান জানে-মরেও বেঁচে গেছেন আর পুলিশে ছুঁলে আমরা যে জানে বেঁচেও মরে যাব। তখন আমাদের জন্যে তো আর মামুনীজান কাঁদবে না!
তাহলে কী করবে? মানুষটাকে হায়েনা-শেয়ালে তো এমনিতেই ছিঁড়ে খাবে। এমন করে কি ফেলে যাওয়া যায়? মানুষ তো!
এদিকে হায়েনা-শেয়াল নেই। তবে শকুন আছে। কিন্তু এই ঘন জঙ্গলের নীচে শকুনের দৃষ্টি পৌঁছবে না। রাতে তো পৌঁছবেই না।
সে যাই হোক, কিছু একটা করো। পুলিশ জানলে আমাদের নিয়ে টানাটানি তো করবেই, কিন্তু না জানালেও তো নয়।
না, সরাসরি গিয়ে বলার দরকার নেই। গ্রামে ফিরে গিয়ে পাহাকে বলব। সেই ফরেস্ট গার্ডকে বলে যা হয় করবে।
হিরু বলল।
তাই ভাল। নানাকে সকলেই মানে।
সেটাই ভাল।
হাজোও বলল।
সঙ্গে আর কে ছিল? মানুষটার? মাচা তো দেখেছিলাম আরও একটা। তোমরা যেদিকে ছিলে, সেদিকে। কি, তোমরা দ্যাখোনি?
আমি ওদের শুধোলাম।
ঋজুদা বলল।
দেখেছি। ছিল, নিশ্চয়ই কেউ। হুজৌর, আমরা তো সেই মাচাতেই বসে ছিলাম। মাচাটি ভাল। কোনও শিকারির বসার চিহ্নও পেলাম। কিন্তু শিকারিকে পেলাম না।
তবে কি বাঘ? বাঘেরা, তাকেও নিয়ে গেছে?
যেতে পারে।
তখন এই হিরু পানকাই বলল, চলুন না হুজৌর, গিয়ে আরেকবার ভাল করে দেখে আসি।
আমি বললাম, বাঘকে যদি কাল মারতে চাও, তবে আজ আর ওখানে গিয়ে হল্লাগুল্লা কোরো না। তা ছাড়া, আমার মনে হয় তোমরা যার মাচাতে বসেছিলে সেই মাচার শিকারি পালিয়েছে। বাঘে তাকে ধরলে, তার চিহ্ন থাকত। মাচার আশেপাশে। মাচার ওপরেও। তোমরাও কি আর বুঝতে পারতে না? সেই গিয়ে অনেকক্ষণ আগে খবর দিয়েছে নিশ্চয়ই, এই অঘটনের।
চলো, এবারে এগোনো যাক।
হাজো বলল।
