শীতের রাতের আশ্চর্য নিঃশব্দ বিদ্যুতের কোনও বিরতিই নেই। কোটি-কোটি ওয়াট-এর সেই দেবদুর্লভ নীলচে-সবুজ আলোর বুকের কোরকটিকেই, হালকা-সবুজ ঘাসে-ভরা প্রান্তরের আর সীমান্তের গাঢ়-সবুজ অরণ্যানীর গায়ে; কারও অদৃশ্য হাত যেন সহস্র আঙুলে মাখিয়ে দিচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে সেই গা-শিউরানো দৃশ্য দেখতে দেখতে আমরা হাঁটতে লাগলাম সুফকর-এর দিকে। তখন সেই তিনমূর্তিকে যদি কেউ দেখতে পেত, তবে সে অবশ্যই ভাবত যে; স্বর্গপুরীর কোনও রঙ্গমঞ্চে উঁচুদরের কোনও নতুন-আঙ্গিকের একাঙ্ক নাটকের মূকাভিনয় চলেছে।
সুফকর-এর বাংলোতে যখন আমরা খুব তাড়াতাড়ি হেঁটে ফিরলাম তখন রাত প্রায় বারোটা বাজে।
বহেড়া বাইগা মুরগীর মাংস গরম করে দিল মুহূর্তের মধ্যে। আর করে দিল গরম-গরম হাত-রুটি। হিরুদেরও খাইয়ে দিলাম জোর করে। ইতিমধ্যেই বারাশিঙাটার মাংস গ্রামের সকলে ভাগ করে নিয়েছিল, বাঘের নখ-লাগা, মুখলাগা জায়গাগুলো ফেলে দিয়ে। এই শিকারই হল বন-পাহাড়ের মানুষদের একমাত্র অ্যানিম্যাল প্রোটিন। বুঝলি। তাও নমাসে ছমাসে একবার জোটে কোনও শিকারী এলে। কারণ, ভারতের বনে-জঙ্গলে, পাহাড়ে-করে মাংসর নামই শিকার। কারণ, শিকার করা মাংস ছাড়া অন্য কোনওরকম মাংসর কথা তাদের ধারনার বাইরে। পয়সা দিয়ে কিনে মাংস খায় এমন সামর্থ্য ওদের কারোরই ছিল না। তোরা সকলেই কম ক্যালোরির খাবারের জন্যে হন্যে হয়ে থাকিস ফিগার-ফিগার করে,আর এই হিরুরা, আর হাজারো অপুষ্টি রোগে ভোগে ভিটামিন আর প্রোটিনের অভাবে। বুঝলি তিতির। কী প্যারাডক্স।
ভটকাই বলল, সত্যই কইছে দাদায়। বড় বিচিত্র এই দ্যাশ!
ওর কথার ধরনে হেসে ফেললাম আমরা। ঋজুদাও হাসল ফিক করে। ভটকাই নিজে পেডিগ্রীড ঘটি কিন্তু ঋজুদা পেডিগ্রীধারী বাঙাল বলেই রসিকতাটা করল।
ঋজুদা থেমে গিয়ে পাইপ ধরাল।
মিস্টার ভটকাই বলল, এতবার থামলে গল্পের টেম্পোটাই যে মাটি হয়ে যায় ঋজুদা। মিস্টার রুদ্র রায় যে কী করে তোমার গল্প শোনে আর তোমাকে নিয়ে কী করে বই লেখে; তা সে মক্কেলই জানে।
ঋজুদা আমার রেসকুতে এল না বলে আমিই বললাম, সেকথা রুদ্র রায়কেই ভাবতে দে।
তা তো একশোবার। আমি ও লাইনেই নেই। লিখলে পদ্য লিখব, মানে ছড়া।
হ্যাঁ। সে আর কঠিন কাজ কী।
আমি বললাম, টন্টিং টোন-এ।
তিতির কথার পিঠে কথা বসিয়ে ভটকাইকে বলল, বলো দেখি, ছড়াই একখানা? অত্ত সোজা!
কার সঙ্গে কথা বলছ, ভেবে বলবে। আমার ক্লাসের ছেলেরা আমার নাম দিয়েছে বিচিত্রবীর্য। শব্দটির মানে জানো?
ভটকাই অন্য দিকে মুখ করে, তিতিরকে বিন্দুমাত্র ইস্পট্যান্স না দিয়ে বলল।
সে তো একটি চরিত্রের নাম…মহাভারতের…
আমি বললাম।
সে কথার জবাব না দিয়ে ভটকাই সত্যিই মুখে-মুখে ছড়া বানিয়ে দিল আমাকে নিয়ে :
ইট-চাপা লাল-ঘাস রুদদুর রায়
গায়ে দিয়ে আঁটো-জামা শিকারেতে যায়।
থেমে থেমে, ভয়ে ভয়ে, পথেতে চলে।
ঋজুদার ল্যাংবোট সকলে বলে।
রংরুট হেঁটে চলে কাঁধে বন্দুক
পাছে বাঘ, পথে পড়ে; মনে নেই সুখ।
তিতির বলল, ফাইন! কনগ্রাস।
বলেই হাত বাড়িয়ে দিল ভটকাই-এর দিকে।
ঋজুদা মুখ থেকে পাইপটা নামিয়ে হাসল।
আমার মুখ লাল হয়ে গেল। ভটকাই-এর অফট- রিপিটেড কথাই ওকে ফেরত দিয়ে বললাম, ওকে। ওয়ান মাঘ গান, বাট উইনটার উইল কাম এগেইন।
ঋজুদা হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, সেটা কী?
কী আবার। এক মাঘে শীত যায় না। এই রুদুর বাবুদের মতো ইংরিজি-মিডিয়াম স্কুলে-পড়া হাফ-সায়েব হাফবাঙালিরা তো বাংলা প্রবাদটা জানেই না। তাই সময় পেলেই ওদের শেখাই। ইংরিজির ক্যাপসুল-এ ভরে দিয়ে।
তিতির বলল, এটাকে ইংরিজি ক্যাপসুল-এ ভরে দাও তো দেখি?
কোনটা?
হকচকিয়ে গিয়ে বলল ভটকাই।
একদিনের বোস্টম, ভাতকে বলে পেরসাদ।
ভটকাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, খেলব না। ডোন্ট হিট মি বিলো দ্য বেল্ট।
আমি দু আঙুলে ময়দা চটকানোর মতো ভঙ্গি করে বললাম, ওরে ওরে ভটকাই। আয় তোরে চটকাই।
ঋজুদা ও তিতির হো হো করে হেসে উঠল।
হাসি থামলে বললাম, ছড়াকার সকলেই, ভেবো না তোমার একারই বিশেষ পারদর্শিতা আছে এতে।
ভটকাই বলল, ঠিক আছে। পরে কখনও ছড়া-কম্পিটিশন হবে।
থাক। অন্য কথা বল। এনাফ ইজ এনাফ।
তিতির বলল।
আমি বললাম, ঋজুদার গল্পের রেশই তো নষ্ট করে দিলি।
এবারে শুরু করো ঋজুদা। লাঞ্চ তো কানহাতে ফিরেই। তার আগে গল্প শেষ করো। তুমি এমন এমন জায়গাতে থামো যে, কোনও মানেই হয় না। এদিকে ইতিমধ্যেই খিদে-খিদে পাচ্ছে।
তিতির বলল।
ইয়েস। এটা তিতির ঠিকই বলেছে। গল্পের টানটাই নষ্ট হয়ে যায়।
ভটকাই বলল।
