আমরা যখন প্রান্তর ছেড়ে আলাদা হয়ে গেলাম তখন কী মনে হওয়াতে আমি ফিসফিস করে বললাম, তোমরা দুজনে বরং একসঙ্গেই থেকো। মাটিতে না বসে, কোনও গাছেই উঠো। তারপরই হাজোকে বললাম, যদি একেবারেই কাছে না পাও, পাশ থেকে না পাও, তবে গুলি মোটেই করবে না। একটি বাঘই যথেষ্ট। তার ওপর দুটি। এবং এদের যা মেজাজ! গুলির শব্দ শোনামাত্রই অন্যজন সঙ্গে-সঙ্গে আক্রমণ করতে পারে। গুলি করার আগেও ঘুণাক্ষরে আমাদের উপস্থিতি জানতে পেলেও আক্রমণ করতে পারে। গুলি করলে, বাঘ মরেছে যে, সে-বিষয়ে পুরোপুরি নিঃসন্দেহ হয়ে তারপরই নামবে গাছ থেকে।
ওরা মাথা নেড়ে আমার কথাতে সায় দিল। আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আমার মনে হল ওরা দুজনে একসঙ্গে থাকলে সঙ্কেতটা কী হবে তা বলা হল না। তখন আর সময়ও ছিল না নতুন করে কিছু বলার।
ওরা দুজনে একসঙ্গে বাঁদিকে গেল আর আমি ডানদিকে। বনের মধ্যে অনেকখানি ডানদিকে গিয়ে পাহাড়ের একেবারে কোল ঘেঁষে ওই জলাটির দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম।
তখনও সন্ধ্যে হতে ঘণ্টাখানেক বাকি কিন্তু নানা পাখি ও জন্তু-জানোয়ারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। খুব সাবধানে মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ খুঁজতে খুঁজতে এবং মাটির ওপরে মনোমতো বসার জায়গা নজর করতে-করতে এগোচ্ছিলাম। রাইফেলটাতে গুলি ভরে নিলেও রাইফেল ডান হাতে ধরা এবং ডান কাঁধের ওপরেই রাখা ছিল।
জায়গাটা দেখলে মনে হয়, চিতাবাঘের আসল জায়গা। বড় বাঘের নয়। ভাবছিলাম, হাজো চিতাবাঘই দেখেনি তো? জোড়ে? চিতাবাঘকে বড় বাঘ বলে ভুল করছে না তো?
অবশ্য ওরা বনশিশু। বনই ওদের খেলাঘর, বনই সব। আমি ভুল করতে পারি, কিন্তু হাজো কি ভুল করবে?
একটু পরেই হঠাৎই নরম মাটিতে একটি বাঘিনীর পায়ের দাগ দেখলাম। বেশ বড় বাঘিনী। এবং তার একটু পরেই বাঘেরও। এবং সেই বাঘটারই। আমার হৃৎপিণ্ড অর্ধেক ভয়ে এবং অর্ধেক আনন্দে বন্ধ হয়ে গেল। নাঃ, হাজো ভুল করেনি!
কোথায় উঠে বসা যায় ভাবছি, ঠিক সেই সময়েই চোখে পড়ল পাহাড়ের গায়ে একটি অসন গাছের ডালে একটি মাচা বাঁধা। এবং সেটি আদৌ পুরনো নয়, কাঠগুলো টাটকা-কাটা। আশ্চর্য! সেই মাচার একটি খুঁটির উপরিভাগ থেকে একটি বড় থামোফ্লাস্ক নীচে ঝুলে আছে। মাচাটা একদিকে বেঁকেও গেছে অনেকখানি। কোনও কিছুর ভারে! খুবই চিন্তায় পড়লাম। রাইফেলটা এক হাতেই রেডি-পজিশানে ধরে এগোতে লাগলাম সেদিকে।
গাছটার ঠিক পেছনেই, একটি বড় কালো পাথর ছিল, ল্যানটানার ঝোপে প্রায় আধ-ঢাকা হয়ে। সেই পাথরটির ওপরে উঠতে-উঠতে ভাবছিলাম যে, যে-জঙ্গলে বাঘ আছে সেখানে এইরকমভাবে গাধার মতো মাচা কেউ বানায়? বাঘ তো এই পাথরে উঠে, আমি যেদিক দিয়ে উঠছি, অথবা পেছন দিক দিয়ে; সহজেই মাচায় বসা শিকারিকে নামিয়ে নিতে অথবা মাচাতেই খতম করে দিতে পারে। যদি সে চায়।
মাচাটা দৃষ্টিগোচর হতেই আমার মাথা ঘুরে গেল। দেখি, তার একপাশে একটি কম্বল, একটু রক্তও লেগে আছে তাতে। রক্তাক্ত জায়গাটা তখনও ভেজা। একটি থ্রি-ফিফটিন রাইফেল, ইন্ডিয়ান অর্ডন্যান্স কোম্পানির।
রাইফেলের বোপ্টটি আস্তে করে খুলে দেখলাম, চেম্বারের মধ্যে একটি ফোঁটা-কার্তুজ। ম্যাগাজিনে আরও চারটে গুলি আছে।
গা-ছমছম করে উঠল।
রাইফেলটি যথাস্থানে নামিয়ে রেখে থামোসটা কাঁধে ঝুলিয়ে যতখানি নিঃশব্দে পারি মাচার দিকে পেছন ফিরতেই, ভয়ে প্রায় চিৎকারই করে উঠতাম, কী করে যে সামলে নিলাম জানি না। এখনও দৃশ্যটার কথা ভাবলে নিজেই নিজের কাঁধ চাপড়াই।
কী দেখলে কী? তিতির উৎকণ্ঠিত হয়ে জিগ্যেস করল।
দেখি, সার্জের কুর্তা আর কালো-পাজামা পরা একজন মানুষ চিত হয়ে শুয়ে আছেন পাহাড়ের দিকে ল্যানটানার ঝোপের ভেতরে। তাঁর হাঁ-করা মুখটি আকাশের দিকে করা। আর তাঁর মাথার বাঁদিকে এবং ঘাড়ে বাঘের দাঁতের দাগ আর চারটি ফুটো। রক্তে পুরো জায়গাটা থিকথিক করছে। কোনও খানদানি ঘরের সৌখিন শিকারী। তবে যুবক নয়। মধ্যবয়সী। শেখার বয়সে শেখেননি। অথচ তোদের বোদ্ধাকাকু যাই বলুন, না-শিখে এসব খেলা, খেলার নয়। শিক্ষানবিশির চেয়ে, অভিজ্ঞতার চেয়ে, শখের পরিমাণ বেশি থাকাতেই বোধ হয় এই বিপত্তি।
ব্যাপারটা কতক্ষণ ঘটেছে তা নির্ভুলভাবে অনুমান করা যাচ্ছে না। আমি চোখ অন্যদিকে ফিরিয়ে ওঁর বুকের শুকনো জায়গাতে হাত ছুঁইয়ে দেখলাম যে, বুক ওই ঠাণ্ডায় তখনও গরমই আছে। বহুমূল্য শাহতুষ-এর আলোয়ানটি ছিন্নভিন্ন হয়ে কোমরে আর পায়ে জড়িয়ে রয়েছে।
ঘটনা তা হলে বেশিক্ষণ ঘটেনি! মাচার নীচে কিন্তু বাঘের থাবার দাগ নেই। শুধুই বাঘিনীর। রক্ত, মাটিতে কোথাওই দেখলাম না। তবে কি গুলি লাগেনি? নাকি রক্ত বেয়ে গড়িয়ে মাটিতে পড়ার আগেই এইসব মুহূর্তবাহী ঘটনাসমূহ ঘটে গেছে পর পর?
এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে দ্রুত। এই পরিবেশে, এই নতুন, হঠাৎ-জানা পরিস্থিতিতে হিরু বা হাজোর সঙ্গে যে কথা বলব তারও কোনও সম্ভাবনা নেই। কী করে কী ঘটল এবং কী ঘটবে, সেই চিন্তায় রীতিমত ঘেমে উঠলাম।
ভেরি গুড। জমে গেছে ঋজুদা। আগে বাড়ো। ঔর আগে।
ঐ টেনশানের মধ্যেও সকলকে চমকে দিয়ে বলে উঠল ভটকাই।
কী ইয়ার্কি হচ্ছে ভটকাই?
আমি আর তিতির একসঙ্গেই বললাম।
ঋজুদা ভটকাইয়ের বাধা পেয়ে চুপ করে গিয়ে, নিভে-যাওয়া পাইপটাতে দেশলাই ঠুকে দুবার ভুড়ভুড়ক করে টান লাগাল। মুখ দেখে মনে হল, এই বিরতিতে খুশিই হয়েছে যেন। অনেকক্ষণ ধরে বলছে তো!
আবার শুরু করল ঋজুদা একটু পরে।
হাজোবৰ্ণিত গুহাটার আরও কাছে এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের একটি খাঁজে, যে-খাঁজটিকে ওপরের গুহা বা তারও সামনের পাথরটি থেকে দেখা যাবে না, সেখানে উঠে বসলাম। মাটি থেকে দশ ফিট মতো ওপরে। বসে, রাইফেলটাকে কোলে শুইয়ে থামোফ্লাস্কটি পাশে রেখে, স্ট্যাচু হয়ে গেলাম।
ঠিক সেই সময়েই আমার শরীরে একটা ঝাঁকুনি এল। থরথর করে কাঁপতে লাগলাম আমি। আর তার সঙ্গে ঠাণ্ডা ঘাম। এতক্ষণ হাঁটাতে, গরমে ঘেমে গেছিলাম। শীত লাগে চলা থামালে। কিন্তু সেই শীত আসার আগেই এই হঠাৎ হিমেল ঘামে ভিজে গেলাম নতুন করে। কে জানে কেন!
বেশ কিছুক্ষণ পরে কাঁপুনিটা ছাড়ল। তার একটু পরই মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলে বৃষ্টিভেজা জানুয়ারির শীত এসে দুকানের পেছন মোচড়াতে লাগল। খুব আস্তে বাঁ হাতটি তুলে টুপিটাকে চেপে বসালাম মাথার ওপরে। এমন সময়ে হঠাৎই একটি হাওয়া বইতে শুরু করল পশ্চিম থেকে পুবে। প্রান্তর থেকে গুহার দিকে। মনে হতে লাগল, হিমকণা বয়ে আনছে হাওয়াটা।
জায়গাটাতে অগণ্য বড় বড় হরজাই গাছ মাথার ওপরে চন্দ্রাতপের সৃষ্টি করেছিল। মনে হচ্ছিল, যেন কোনও অডিটোরিয়ামের ভেতরে বসে আছি। দূরে, জঙ্গলের ফাঁক-ফোকর দিয়ে প্রান্তরের দিক থেকে একটু উজলার আভাস আসছে। সেটিই যেন স্টেজ। সন্ধের আগে সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণীর সানুদেশের এই বনস্থলীর মধ্যে যে কোন্ পুজোর আগমনী বাজছে, তা কে বলবে! আগমনী না বিসর্জন? সেই পুজোর ঘণ্টা কানে বাজে না, বুকের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাজে। তবে এই পুজো কাপালিকের পুজোরই মতো। বড় ভয় করে এই অদেখা বনদেবতার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর এই সংহারমূর্তি দেখে।
ভদ্রলোক কি একাই এসেছিলেন? তাঁর সঙ্গী কি কেউই ছিল না? সঙ্গীকেও কি বাঘ বা বাঘিনী…?
ভাবছিলাম, কিন্তু ভাবতেও ভয় করছে। মাঝে-মাঝেই মনে হচ্ছে ওই বারাশিঙার দল বোধ হয় অস্বাভাবিক বা আধিভৌতিক কোনও ব্যাপার। আমাদের ছলে বলে এখানে নিয়ে আসার জন্যেই বোধ হয় ওই ঘটনা কেউ ঘটিয়েছিল। ফিরে গিয়ে সুফকর-এ হয়তো শুনব, যে বারাশিঙাটি মরে পড়ে ছিল সেও উঠে পড়ে দৌড়ে বনে চলে গেছে। শুকিয়ে গেছে তার ক্ষত। মুছে গেছে তার গা থেকে রক্তের দাগ। কে জানে!
হিরু আর হাজো যে কোনদিকে আছে ঠাহর করা যাচ্ছে না। অবশ্য আমি যে খাঁজে বসেছিলাম সেখান থেকে বেশিদূর দেখাও যায় না। মুরগি, ময়ূর, তিতির, খুদে-খুদে বটেরের ঝাঁক, কোটরা হরিণ, জোড়া ভালুক, সঙ্গে কালো ফুটবলের মতো দুটি ছানা; শম্বরের একটি দল, মস্ত শিঙাল একটি, মাঝারি শিঙাল একটি আর পাঁচটি মেয়ে-শম্বর সবাই জল খেয়ে চলে গেল।
শীতকালে কোনও জানোয়ারদেরই এমন তাড়াতাড়ি তৃষ্ণা পায় না। কে জানে! প্রকৃতির কথা, আবহাওয়ার কথা এরা সব আগেভাগেই বুঝতে পারে। বৃষ্টি থেমে গেছে। এর পরে হয়তো দুযোগ আসবে। যে-কোনও কারণেই হোক তারা সকলেই অন্ধকার হওয়ার আগেই এসেছে।
দূর থেকে একটি চিতাবাঘ ডাকল। তারপর পাহাড়ের ওপর থেকে হনুমানের হু-হা আওয়াজ ভেসে এল। মনে হচ্ছে পাহাড়ের ওপরে কোনও সমতল মালভূমি আছে।
তারপরেই, বুঝলি, ঝুপ করে অন্ধকার নেমে এল। একে কৃষ্ণপক্ষের রাত, তায় আকাশে একটি তারা পর্যন্ত নেই। রাত যত অন্ধকারই হোক না কেন, খোলা জায়গায় তবুও একরকমের চাপা আলোর উদ্ভাস থাকেই। গাঁ-গঞ্জের, জঙ্গল-পাহাড়ের মানুষমাত্রই তা জানেন। কিন্তু এতো ভোলা জায়গা নয়! এ যে জঙ্গলের শামিয়ানার নীচে ঘোরান্ধকারে বসে থাকা!
অন্ধকার চোখে মুখে যেন থাপ্পড় মারছে। দুটি পেঁচা ডাকতে-ডাকতে ঝগড়া করতে করতে অন্ধকার ছেড়ে আলোর দিকে উড়ে গেল। হিরুর সংকেত নয় তো? না, এখন তো সবে সাড়ে পাঁচটা!
প্রান্তরের ওপরে দুটি টিটি পাখি টিটিরটি-টিটিটিটি-টিট্টিটি করে ডাকতে ডাকতে উড়ে বেড়াতে লাগল। কী দেখেছে, তা ওরাই জানে।
বাঘেরা যদি ঐ গুহাতেই থেকে থাকে তবে তারা মালভূমিতে উঠে না গেলে এদিক দিয়েই নামবে মনে হয়। জলের এপাশটা তাদের পায়ের দাগে-দাগে ভরা। বড় বড় গাছে তাদের নখের আঁচড়ের দাগ। আর বাঘেদের শরীরে যে তীব্র গন্ধ আছে, তারই নিশান দিকে-দিকে।
একটি পাহাড়ি ঈগল ওপরের মালভূমির কোণে উঁচু গাছ থেকে উড়ে এসে একটি প্রাচীন শিমুলের ডালে বসল। যখন বসল তখন আর দেখা গেল না। কিন্তু বোঝা গেল তাদের ডানার বিশেষ শব্দে এবং গলার কর্কশ পৌনঃপুনিক তীক্ষ্ণ বাঁশিতে। ডানদিক থেকে, জমাটবাঁধা নিকষকালো তীব্র মিষ্ট-কটু-গন্ধী অন্ধকারকে হঠাৎ নাড়িয়ে দিয়ে একটা কোটরা, তার ভয়ার্ত ব্বাক-ব্যাক ডাকে তার ভয়কে জঙ্গলের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে দিয়ে, চারিয়ে দিয়ে, দৌড়ে চলে গেল জঙ্গলের গভীরে। জলের ধার থেকে।
তারপরেই একেবারে চুপচাপ। কোনওই শব্দ নেই। কে বা কারা যেন বনের সব শব্দ ও গন্ধ চুরি করে নিয়ে তাকে নিঃস্ব করে দিয়ে চলে গেল।
কতক্ষণ সময় কাটল, বোঝা গেল না এমনিতে। তবে আমার হাত-ঘড়ির ডায়ালের রেডিয়ামে তখন সাতটা দেখাচ্ছিল। ঘড়ির দিক থেকে চোখ তুলেছি সবে, এমন সময়ে হঠাৎই আমার মাথার ঠিক ওপরের পাথর থেকে একটি নুড়ি, পাথরে-পাথরে গড়িয়ে একেবারে নাকের সামনে দিয়ে গিয়ে নীচে পড়ল। গড়িয়ে যাওয়ার সময়ে শব্দ হয়েছিল কিন্তু নরম মাটিতে পড়াতে শব্দ হল না।
আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। নিজেই নিজের মুণ্ডপাত করতে লাগলাম।
অনেক ভুল ইতিমধ্যেই হয়ে গেছিল।
প্রথমত, এই ঘন ছায়াচ্ছন্ন চন্দ্রাতপের নীচে এমন মেক-শিফট বন্দোবস্তের মধ্যে হঠকারিতা করে বাঘের জন্যে বসাটাই উচিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, হাজো এবং হিরু জানে না যে, এই বাঘ ও বাঘিনী মানুষও মারছে বা মেরেছে। তৃতীয়ত, অন্ধকার হয়ে যাওয়াতে আমি এবং ওরা কোথায় যে কে বসে রয়েছি তাও বুঝতে পারছিলাম না। বাঘ যদি আমার মাথার ঠিক ওপরের খাঁজে নেমে থাকে এবং যদি ওদের মধ্যে কেউ বাঘের দিকে গুলি করে বসে তবে সে গুলি আমার গায়েও লাগতে পারে। আমার গুলিও ওদের কারও গায়ে লাগতে পারে। চতুর্থত, এইরকম সম্পূর্ণ অচেনা অজানা পরিবেশে, রাতের বেলা আক্ষরিক অর্থে আন্দাজেই জোড়া-বাঘের মোকাবিলা করতে যাওয়ার মতো মুখামি করতে যাওয়াটা অত্যন্তই অনুচিত হয়েছিল।
আর একটু চা নেবে নাকি? তিতির বলল, ঋজুদাকে ইন্টারাপ্ট করে।
ভটকাই বলল, দাও, দাও তিতির। ঋজুদাকে চা দাও। আমাদেরও থাকলে দিতে পারো। একে ঠাণ্ডা, তায় টেনশান। হাত-পা জমে যাচ্ছে। ঠাণ্ডাতে।
ঋজুদা, তিতির চা ঢালতে-ঢালতে, নিভে যাওয়া পাইপটা আরেকবার ধরিয়ে নিল। পাইপ কেন যে মানুষে খায়। এ যেন ধৈর্যর পরীক্ষা!
তারপর, চা-টা খেয়ে নিয়েই আবার শুরু করতে যাচে ঠিক এমন সময় তিতির বলল, তোমার মাথার ওপরের পাথর থেকে নুড়ি গড়িয়ে পড়ল। নাও, তোমাকে কিউ দিয়ে দিলাম। বলো, তারপর থেকে।
হ্যাঁ। তবে আগেই বলেছি, তোদের যে, আমি বসেছিলাম পাথরের একটা খাঁজের ভেতরে। ওপর থেকে সেখানে সাপের পক্ষে আসা অসম্ভব ছিল না, কিন্তু বাঘের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। তাই তখনকার মতো আমার নিজের বিপদের ভয় ছিল না। তবু যে-বাঘ একজন শিকারির ঘাড় মটকেছে কিছুক্ষণ আগেই সেই বাঘই মাথার ওপরে এসে হরকৎ করছে এমনটি জানলে ভয় তো একটু হওয়ারই কথা! তা ছাড়া, আমাকে যদি ঐ খাঁজের আশ্রয় ছেড়ে বেরোতে হতোই তবে তো বাঘবাবাজির এক চাঁটিতেই এত যত্নের কেয়ো-কার্পিন-মাখা টেরিটি-সমেত চাঁদিখানিই কাপু হয়ে যেতে পারত। ইন্তেকাল ঘটে যেত। এমনকী একবার
আলম দুল্লিলাহে য়হ্ দিন সিরাতুল মুস্তকিমা
রব্বিলে আলোমিন সিরাতল লাজিনা
আঃ রহমানে রহিম আমতাম আলেহি…
ইত্যাদি-ইত্যাদি বলে খুদাহর তারিফ পর্যন্ত করার সময় পেতাম না।
কিন্তু রাখে কেষ্ট মারে কে?
