সেই গেম-ট্র্যাকটাতে পড়তেই দেখা গেল যে একটি বাঘেরই পায়ের দাগ আছে সেখানে। খুব বড়, পুরুষ বাঘ। যাকে দেখেছি। একা এসেছে। এই বারাশিঙার দলকে প্রায় ধাওয়া করেই এসেছে বাঘটা বহুদূর থেকে। অথচ কেন যে, তা আদৌ বোঝা গেল না।
আমাদের বাঘ জানোয়ারদের দূর থেকে ধাওয়া করে, আফ্রিকার সিংহ বা চিতার মতো কখনওই মারে না। তাছাড়া, খাওয়ার জন্যে ধাওয়া যে আদৌ করেনি, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। মারার পর খায় না এবং পরেও তারা কোনও মড়িতেই যদি ফিরে না আসে, তা হলে বুঝতে হবে মারার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই খাওয়া নয়। তাও যদি-বা বোঝা গেল যে, বাঘ ব্যতিক্রমী ব্যবহার করছে, তা বারাশিঙার দলই বা জঙ্গলের দুপাশে দলছুট হয়ে ভেঙে ছড়িয়ে কেন গেল না? কোনও মাংসাশী জানোয়ার তাড়া করেছে বলেই যে তাদেরও লাইন করেই দৌড়ে পালাতে হবে, জঙ্গলের আইনে এমন বে-নিয়ম আছে বলেও তো কখনও জানিনি!
বাঘের ও বারাশিঙাদের পায়ের চিহ্ন দেখবার পর আমি, হিরু পানকা আর হাজো মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে মুখে না বলে নিরুচ্চারে সেই কথাই বললাম।
একটু উঠেই পাহাড়টা ঢালু হয়ে গড়িয়ে নেমে গেছে একটি উপত্যকাতে। এখানে হয়তো আগে কোনও হরজাই জঙ্গল ছিল। কখনও ক্লিয়ার-ফেলিং হয়েছিল। তারপরই কোনও অজ্ঞাত কারণে অথবা হয়তো শম্বর-বারাশিঙার বিচরণভূমি করে গড়ে তোলার জন্যেই এখানে আর কোনও বড় গাছ লাগানো হয়নি বনবিভাগ থেকে।
একটু থেমে, নিভে যাওয়া পাইপটা ধরিয়ে নিয়ে ঋজুদা বলল, তবে তোরা এত এত বন ঘুরে একটা জিনিস নিশ্চয়ই লক্ষ করেছিস যে, বনবিভাগ কী করবেন না করবেন তার জন্যে বনদেবীর মাথাব্যথা নেই আদৌ। তিনি এলাকা ফাঁকা পেলেই নিপুণ জমিদারের মতো সঙ্গে সঙ্গে সেই এলাকার জবরদখল নিয়ে নেন। দিকে দিকে সবুজ আর লাল আর বেগুনির পতাকা তুলে দেন।
তারপর কী হল বলো?
বৃষ্টিভেজা নরম চাপ-চাপ দূর্বা ঘাসের আর ঘাসবনের ওপর দিয়ে, ভেতর দিয়ে, হাওয়া বয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য নদীর মতো। আর আমার সামনে দুই আদিবাসী শিকারী, তাদের সুন্দর সুঠাম শরীর নিয়ে সামনের মাটিতে চোখ রেখে সাবলীল ছন্দে হেঁটে যাচ্ছে একলয়ে, একতালে। মনে হচ্ছে, আমরা যেন কোনও অনাদিকালের শিকারযাত্রায় চলেছি। যেন প্রাগৈতিহাসিক দিনের কোনও গুহাগাত্রে সিঁদুরে-লাল রঙে আঁকা তিনজন শিকারি গুহা ছেড়ে নেমে এই শীতের বনের বৃষ্টিভেজা প্রান্তরে, বাঘের থাবা বা তার চলার চিহ্ন নয়; অন্য। কোনও ভয়াবহ প্রাগৈতিহাসিক অপদেবতারই পদচিহ্ন অনুসরণ করে চলেছি, তাকে ধরাশায়ী করব বলে। যুগ-যুগান্ত ধরেই যেন চলেছি আমরা।
তারপর?
ঋজুদাকে থামতে দেখে আমি বললাম।
বাঘ যদি সোজা যেত, তবে তার পথ শেষ হত গিয়ে প্রান্তর পেরিয়ে অন্য শুড়িপথে। আর পথ পেরুনোর পর, গভীর সেগুন জঙ্গলে। অথচ কোনও বাঘেরই স্বভাব নয় এমন আড়াল বর্জিত প্রান্তর দিয়ে দিনমানে হাঁটা। এই বাঘ আদৌ স্বাভাবিক নয় যে, তা বোঝাই যাচ্ছে।
হাজো হঠাৎ থেমে পড়ে আমার দিকে চাইল। তারপরই হাসল, একেবারে স্বর্গীয়, দেবদূলর্ভ হাসি। সঙ্গে-সঙ্গে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেল। হাওয়া থেমে গেল। যেন হাজোর হাসিতে খুশি হয়েই।
হাজো ডান দিকে ঘুরেই দ্রুত এগোল। এদিকে প্রান্তরটি মিশেছে গিয়ে একটি পাহাড়শ্রেণীর সানুদেশে। ইতিমধ্যে, দেখতে-দেখতে আমরা চার ঘণ্টা হেঁটে এসেছি প্রায়। এখন বেলা প্রায় দুটো বাজে। পদচিহ্ন দেখে এগোতে অনেক সময়ে এক মাইল পথ পেরোতেও বহু ঘণ্টা লেগে যায়। রক্তের চিহ্ন অনুসরণ করার সময়েও তাই। চিহ্ন যখন লোপাট হয়ে যায়, তখন তাকে খুঁজে বের করতে সময় লাগে। মনোযোগ দিয়ে চেয়ে দেখতে হয়, উল্টোনো ঘাসে, ঝোপের ছেঁড়া পাতায়; রক্তের ফোঁটায়। চার ঘণ্টা পরে দূরত্ব অতিক্রান্ত হয় হয়তো এক কি.মি.।
হাজো এবার কথা বলল, ডান হাতের তর্জনী ঐ নীল পাহাড়শ্রেণীর দিকে নির্দেশ করে। বলল, বাঘ ঐ দিকেই গেছে। ঐ পাহাড়ে গুহাও আছে অনেক। ঐখানেই ডেরা ওদের।
এদিকে প্রান্তরে নেমে আসার পর থেকেই ঘন ঘাসের জন্যে বাঘের পায়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল না আর। ঘাসে-পাতায় তার চলে যাওয়ার ক্বচিৎ চিহ্ন। তার থাবার নীচে ঘাস বা মাটি উপড়ে বা উলটে যাওয়ার আভাস। এখন এমন করেই পিছু নিতে হবে।
আমি হতাশ হয়ে গেলাম।
ওদের দুজনকে বললাম, এইভাবে কি বাঘ শিকার হয়? তাও একটি নয়, দুটি। তোমরা একেবারে পাগলামি করছ। ঐ পাহাড়তলিতে পৌঁছে ঘন হরজাই বনের মধ্যে ঢুকতে-ঢুকতেই তো অন্ধকার হয়ে যাবে। আসলে সূর্য তো আজকে নেই। অন্ধকারে কোথায় পায়ের দাগ খুঁজতে যাবে? দেখাই তো যাবে না কিছু।
ওরা নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। হাজোর মুখে বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল।
উঠতি-যুবকেরা তাদের উৎসাহের বাড়াবাড়িতে এবং অভিজ্ঞতার অভাবেও বয়স্কদের অনেক সময়েই যেমন বোকা-বোকা বিদ্রূপ করে, সেইরকমই বিদ্রুপের হাসি। এতে অভিজ্ঞদের গা জ্বলে। ভটকাই-এর এ কথাটা জেনে রাখা উচিত। বিশেষ করে, ভটকাইএরই। আমি আর তিতির ঋজুদার এই কথাতে দ্রুত মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলাম। তবে কি ভটকাইএর দিন ফুরোল? কথাটা ভেবেই বড় আনন্দ হল মনে।
হিরু পানকা কিন্তু কিছুই না বলে চুপ করে ঐ ঘন বন আর পাহাড়ের দিকেই চেয়ে রইল।
তুমি বকে দিলে না কেন? হাজোকে?
নির্লজ্জ ভটকাই ইন্টারাপ্ট করে বলল।
যে-সম্পর্কে সম্মান নেই সেখানে বকাঝকা করতে যাওয়া মানেই নিজেকে আরও অসম্মানিত করা।
হাজোর মুখ দেখে মনে হল, ও নিশ্চয়ই মনে করেছে যে, আমি ভয় পেয়েছি। ভয় যে আমি, এই অধম ঋজু বোস কখনও-কখনও পাইনি বা ভবিষ্যতেও পাব না এমন নয়। আমি তো অতিমানব নই! ভয়ের কারণ ঘটলে, ভয় বিলক্ষণই পাই। তবে বাহাদুরিপ্রবণতা, অবিমৃষ্যকারিতা আর সাহস তো এক কথা নয়।
কী বললে কথাটা? অবিমিস্ৰকারিতা?
তিতির শুধোল।
ভটকাই তিতিরকে স্নাব করে বলল, মিস্রি-ফিস্রি নয়। ষ এর ব্যাপার। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মেয়ে, তুমি ইন্টারাপ্ট কোরো না। বানানটা লিখে দেব। সংসদের বেঙ্গলি টু বেঙ্গলি অভিধানে দেখে নিয়ে আগে বাড়ো ঋজুদা।
ভটকাই সত্যিই একেবারে ইকরিজিবল হয়ে উঠছে। অথচ ঋজুদাও তেমন কিছুই বলে না। ভটকাইয়ের মধ্যে কোথায় যেন এক ধরনের অথরিটির ব্যাপারও আছে। মনে হয়, ঋজুদা সেটা সপ্রশংস চোখে দেখে। আমার ভয়টা সেই কারণেই। এতদিনের ঋজুদাকে কি রুদ্রর কাছ থেকে কেড়েই নেবে এই নন-ডেসক্রিপ্ট–ভটকাই, যাকে আমি এনে ঋজুদার কাছে হাজির করেছিলাম। এই নইলে বাঙালি। যার হাতে খায় তার হাতেই কামড়ায়।
হাজো যখন কথা শুনবে বলে মনে হল না, তখন হিরুকে শুধোলাম, কী করবে?
হিরু বলল, এমনি-এমনি ফিরে গেলে গাঁয়ের লোকে কী বলবে?
কী বলবে আমার দাদু, পাহান্?
হাজো বলল। উত্তেজিত গলায়।
বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, বাঘ-বাঘিনী কি সেখানে বাঁধা আছে? না, গুহার সামনে থিতু হয়ে বসে আছে কখন তোমরা গিয়ে তাদের গুলি ঠুকবে সেই অপেক্ষায়? তোমাদের মধ্যপ্রদেশের বাঘেরা যে এমন গুলিভোর তা তো আগে জানা ছিল না।
হিরু বলল, না হুজৌর, সে কথা নয়। ফিরে গেলে, ওরা আপনাকে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু আমাদের গাঁয়ে টেকাই দায় হবে টিটকিরির চোটে। আপনি তো চলে যাবেন সময় ফুরোলেই। রাজুপ্রসাদও আর কোনওদিন বন্দুক দেবে না হাজোকে। আপনার জন্যেই দিয়েছিল।
টিটকিরি খাবে এই ভয়ে প্রাণটাই দেবে? টিটকিরি দেখছি বাঘের চেয়েও ভয়াবহ।
আপনি সঙ্গে আছেন, প্রাণ নেয় কে? আগে তো মান হুজৌর। তার অনেক পরে তো জান।
কী করতে চাও এখন?
এগিয়ে যেতে চাই। হাজো বলল।
বলেই বলল, আমি জানি, জঙ্গলে ঢোকার পরই পাহাড়ের পায়ের কাছে একটি দোলা মতো জায়গা আছে। গরমের সময়েও সেখানে জল থাকে। বাঘেরা সেখানে গলা ডুবিয়ে বসে থাকে। তার পরেই পাহাড়ে একটা গুহাও আছে। ওই বাঘ-বাঘিনী সম্ভবত ওখানেই থাকে। জলে, অন্য কোনও জানোয়ার এলে গুহার সামনের চ্যাটালো পাথরে বসে-বসেই ওরা দেখতে পায়, কোন জানোয়ার এল বা গেল। তারপর পাহাড় ঘুরে এসে পেছন দিক দিয়ে তাকে অনুসরণ করে।
শেষ কবে দেখেছ বাঘেদের ঐখানে। কখনও কি নিজ চোখে দেখেছ?
মাত্র পাঁচদিন আগেই। আমার মামাবাড়ির পথ এই পাহাড়েরই তলে-তলে। জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। সুফকর থেকে পাঁচ ক্রোশ পথ। সেদিন আমি মামাবাড়ি থেকে ফিরছিলাম। বেরোতে দেরী হওয়াতে বিকেল হয়ে গেছিল। পশ্চিমের আলো এসে পড়েছিল পুবে। সেই দিনশেষের নরম আলোতে দেখি বাঘ আর বাঘিনী ইয়া-ইয়া গোঁফ নিয়ে পাথরের ওপরে বসে-বসে কী যেন ভাবছে। মনে হচ্ছিল যেন, ছবি। এতটুকু নড়াচড়া নেই। আমি বলি কী, ওই জলে পৌঁছে যদি আমরা তার পাশে পায়ের দাগ দেখতে পাই তা হলেই তো বুঝতে পারব যে, যে-বাঘকে অনুসরণ করে আমরা এসেছি সেই বাঘই এই বাঘ কি না। মানে, মদ্দাটার পায়ের ছাপ যদি একইরকম হয়। বুঝলেন তো হুজৌর!
মনে-মনে দ্রুত একটা হিসাব নিলাম সময়ের। হাজো যা বলছে তা যদি সত্যি হয় তা হলে অন্ধকার নামার আগেই আমরা ঐ জায়গাটাতে পৌঁছতে পারব। যদি সুযোগ পাওয়া যায় একটা। না পেলে, না-হয় ফিরেই যাব। বৃষ্টি অনেকক্ষণই থেমে গেছে। ফিরে যেতে কোনও কষ্ট বা অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। টর্চ ওদের দুজনের কাছেও আছে।
কী করবেন হুজৌর?
হিরু পানকা বলল।
চলো, হাজো কী বলছে দেখাই যাক।
জয়ের আনন্দে হাজার মুখ হাসিতে ভরে গেল।
তোমরাও কি বারাশিঙাদেরই মতো প্রসেশন করেই বাঘের গুহাতে ঢুকতে চাইছিলে নাকি?
তিতির শুধোল।
ঋজুদা বলল, না, সে বিষয়েও পরামর্শ করে নিলাম। পাইপটা ধরিয়ে একবার বুদ্ধির গোড়াতে ধোঁয়াও দিয়ে নিলাম। ঠিক হল, প্রান্তর ছেড়ে জঙ্গলে ঢোকার অনেক আগেই আমরা তিন দিকে ছড়িয়ে যাব। ঐ বাঘের পায়ের দাগ আমরা তিনজনে দেখেছি। অতএব সেই দাগ দেখলেই চিনতে পারব। যদি ঐ বাঘটিই হয়, তবে আমরা তিনজনে সুবিধেমত তিনটি জায়গাতে, গাছেই হোক কি মাটিতে বা পাথরেই হোক, বসে চোখ-কান খোলা রেখে শুনব, দেখব। সুযোগ যদি পাওয়া যায় তবে গুলি করার চেষ্টাও করা হবে। কিন্তু ওখানে থাকব ঠিক রাত আটটা অবধিই। তার পরে এক মিনিটও নয়। জঙ্গলে গরু-খোঁজার মতো করে বাঘ খোঁজার অভ্যেস আমার নেই।
ওদের ঘড়ি ছিল না, আমার ছিল। ওদের বললাম, ঘড়ির রেডিয়াম লাগানো ডায়ালে আটটা বাজলেই আমি টি টি পাখির ডাক ডেকে উঠব। আর হাজো উত্তর দেবে পেঁচার ডাক ডেকে। হিরু উত্তর দেবে শুয়োরের ঘোঁতঘোঁতানি আওয়াজ করে। তারপর যে জায়গাতে আমরা প্রান্তর ছেড়ে জঙ্গলে ঢুকব ঠিক সেই জায়গাতেই আবার ফিরে আসব। সেখান থেকে তিনজনে একসঙ্গে হয়ে সুফকরে ফেরার পথ ধরব।
