টাঁড়বাঘোয়া (ঋজুদা) – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

তোমরা কেউ বাড়কাকানা থেকে চৌপান যে রেল লাইনটি চলে গেছে পালামৌর গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সেই পথে গেছ কি না জানি না। না-গিয়ে থাকলে একবার যেও। দু’পাশে অমন সুন্দর দৃশ্যের রেলপথ খুব কমই আছে। শাল, মহুয়া, আসন, পন্নন, কেঁদ, পিয়াশাল, ঢৌওয়া, পলাশ, শিমুল আরও কত কী নাম জানা এবং নাম না-জানা গাছ-গাছালি। ছিপছিপে, ছিমছাম ঝিরঝিরে নদী। মৌন মুনির মতো সব মন-ভরা পাহাড়। মাইলের পর মাইল ঢালে, উপত্যকায়, গড়িয়ে-যাওয়া সবুজ জামদানী শালের মতো জঙ্গল। এক এক ঋতুতে তাদের এক এক রূপ।

এই রেলপথে লাপরা বলে একটি ছোট্ট স্টেশান আছে। তার এক পাশে খিলাড়ি, অন্য পাশে মহুয়ামিলন। মহুয়ামিলনের পর টোরী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই লারা স্টেশানটির নাম ছিল আন্ডা-হল্ট। ব্রিটিশ টমি আর অ্যামেরিকান সৈন্য ভর্তি মিলিটারী ট্রেন এখানে থামতো রোজ ভোরে–প্রাতঃরাশ-এর জন্য।

যখনকার কথা বলছি, তখন তোমরা অনেকেই হয়তো জন্মাওনি। যে সময়কার এবং যে সব জায়গার কথা বলতে বসেছি, সেই সময় এবং সেই সব সুন্দর দিন ও পরিবেশ বিলীয়মান দিগন্তের মতোই দ্রুত মিলিয়ে যাচ্ছে, মুছে যাচ্ছে। তাই হয়তো মনে থাকতে থাকতে এসব তোমাদের বলে ফেলাই ভাল।

লাপরার কাছে চট্টি নদী বলে একটি নদী আছে। ভারী সুন্দর নদীটি। পিকনিক করতে যেতেন অনেকে দল বেঁধে। সেই সময় লাতে এ্যাংলো ইন্ডিয়ানরা একটি কলোনী করেছিলেন। ফুটফুটে মেয়েরা গোলাপী গাউন পরে, মাথায় টুপী চড়িয়ে গরুর গাড়ি চালিয়ে যেত লাল ধুলোর পথ বেয়ে, ক্ষেতে চাষ করত, পাহাড়ী নদীতে বাঁধ বেঁধে সেচ করত সেই জমি। পালামৌর ঐসব রাঁচী অঞ্চলের এমনই মজা ছিল যে, গরমের সময়েও কখনও রুক্ষ হত না। প্রায় সব সময়ই সবুজ, ছায়াশীতল থাকত। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝিও রাতে পাতলা কম্বল দিতে হত গায়ে। সন্ধের পর বাইরে বসলে সোয়েটার বা শালের দরকার হত।

আমি তখন কলেজে পড়ি। ফারস্ট ইয়ার। কলেজের গরমের ছুটিতে মহুয়ামিলন আর লাপরার মাঝামাঝি একটি জায়গাতে গিয়ে উঠেছি। সঙ্গে আমার সাকরেদ টেড। টেড-এর বাবা আমার বাবার সঙ্গে এক অফিসে কাজ করতেন। অস্ট্রিয়াতে টীরল বলে একটি বড় সুন্দর প্রদেশ আছে। সেখানেই তার পৈতৃক নিবাস। কিন্তু তার বাবার সঙ্গে ভারতবর্ষেই টেড ছিল অনেক বছর। জন্মেও ছিল সে এখানে। আমরা দুজনে অভিন্ন-হৃদয় বন্ধু ছিলাম! বনে-জঙ্গলে টেড-এর সঙ্গে যে কত ঘুরেছি আর শিকার করেছি সেই সময়–সেসব কথা এখন মনে হয় স্বপ্ন।

এখন টেড আছে কানাডাতে। ছোটবেলায় ভারতবর্ষের জঙ্গলে ঘুরে তার জঙ্গলের নেশা ধরে গেছিল, তাই কানাডার জঙ্গলে বিরাট কাঠের কারবার ফেঁদেছে সে বড় হয়ে। তিন চার বছর অন্তর টেড আমাকে প্রায় জোর করেই নিয়ে যায়। টিকিট কেটে পাঠায় ওখান থেকে। কানাডার বনে জঙ্গলে এখন আমিই ওর সাগরেদ হয়ে ঘুরে বেড়াই।

সেদিন বিকেলে, একটা ছোট্ট পাহাড় ছুলোয়া করিয়ে ময়ূর তিতির ও মুরগী উড়িয়েছিলাম আমরা। তবে, খানেওয়ালা মাত্র আমরা দুজন। সঙ্গে আছে টিরিদাদা। টিরি ওঁরাও। তিনি একাধারে আমাদের অনুচর, বাবুর্চি, গান-বেয়ারার বা বন্দুকবাহক এবং লোকাল গার্জেন। তাই অনেক পাখি উড়লেও তিনজনে দিন-দুই খাওয়ার মতো দুটো মোরগ আর দুটো তিতির শুধু মেরেছিলাম আমরা।

ময়ূর মারতাম না কখনও আমাদের কেউই। একবার শুধু, কেমন খেতে লাগে তা দেখবার জন্যে অনেকদিন আগে মেরেছিলাম একটা। তোমরা বোধহয় অনেকেই জানো না, ময়ূরের মাংস হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাদু ও নরম হোয়াইট মীট।

টিরিদাদা রান্না-টান্না করছে, আমরা বাংলোর বাইরে বেতের চেয়ারে বসে গল্প করছি। কাল-পরশু সবে অমাবস্যা গেছে। তখনও চাঁদ ওঠেনি, ফুরফুর করে হাওয়া দিয়েছে। মহুয়া আর করৌঞ্জের গন্ধ ভেসে আসছে সেই হাওয়াতে। অন্ধকার বন থেকে ডিউ-উ-ডু-ইট পাখি ডাকছে। কোনও জানোয়ার দেখে থাকবে হয়তো ওরা।

এমন সময় দেখি মশাল জ্বালিয়ে আট দশজন লোক দূরের পাকদণ্ডী পথ বেয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে জোরে জোরে কথা বলতে বলতে আমাদের বাংলোর দিকেই আসছে।

সন্ধের পর এই জঙ্গুলে জায়গায় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউই বড় একটা ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোয় না। এত লোক এক সঙ্গে কোথা থেকে আসছে সেই কথা ভাবতে ভাবতে আমরা চেয়ে রইলাম নাচতে-থাকা মশালের আলোগুলোর দিকে।

বিকেলে মুরগী মারার সময় যারা ছুলোয়া করেছিল, তারা মহুয়ামিলনের আশেপাশের বস্তীরই সব ছোট ছেলে। তাদের আমরা এক আনা করে পয়সা দিতাম, তিন-চার ঘন্টা ছুলোয়ার জন্যে। তখনকার এক আনা অবশ্য এখনকার পাঁচ টাকার সমান। তাই ভীড় করে আসত ওরা ছুলোয়া করার জন্যে। সেদিনই টেডের বন্দুকের ছাগুলি ঝরঝর করে একটা কেলাউন্দা ঝোঁপের গায়ে গিয়ে লাগে, তার পাশেই ছিল একটি ছেলে। এমন বোকার মতো বেজায়গায় এসে পড়েছিল ছেলেটা যে, একটু হলে তার গায়েই গুলি লেগে যেত। তার গায়ের পাশে গুলি লাগতে সে অনেকক্ষণ হতভম্ব হয়ে মাটিতে বসে ছিল। টিরিদাদা গিয়ে তাকে তুলে ধরে, টিকি নাড়িয়ে তার যে কিছুই হয়নি একথা বুঝিয়ে তার ঠোঁটের ফাঁকে একটু খৈনী দিয়ে দিয়েছিল। অতটুকু ছেলে খৈনী খায় দেখে আমরা অবাক হয়ে গেছিলাম।

এই লোকগুলো আসছে কেন কে জানে। ছেলেটার গায়ে সত্যি সত্যিই কি গুলি লেগেছিল? শিকারে গিয়ে মাঝে মাঝে এমন এমন সব ঘটনা ঘটে যে, তখন মনে হয় বন্দুক রাইফেলে আর জীবনে হাত দেব না। আমার ছোট ভাই-এর একটা ফুসফুস তো কেটে বাদই দিতে হল! এক বে-আক্কেল সঙ্গীর বেনজীর, বন্দুকের পাখি-মারা-ছরা তার একটা ফুসফুসকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল।

সবই জানা আছে। মানাও। তবুও কিছুদিন যেতে না যেতেই জঙ্গল আবার হাতছানি দেয়। কানে ফিসফিস্ করে জঙ্গলের কানাকানি, পাখির ডাক, শম্বরের গভীর রাতের দূরাগত ঢংক ঢাংক আওয়াজ, চিতাবাঘের গোঙানী। আর নাকে ভেসে আসে জঙ্গলের মিশ্র গন্ধ। ফোটা-কার্তুজের বারুদের গন্ধের সঙ্গে মিশে ঘুমের মধ্যে, ভিড়ের মধ্যে, পড়াশুনার মধ্যে অশরীরী হাওয়ার মতো জঙ্গল যেন হাত বোলায় গায়ে মাথায়। তাই আবারও বেরিয়ে পড়তে হয়। নানারকম বিপদ আছে বলেই হয়তো জঙ্গল এত ভাল লাগে।

লোকগুলো গেট পেরিয়ে বাংলোর হাতায় ঢুকে পড়ে একেবারে কাছে এসে আমাদের সামনে মাটিতে বসে পড়ল। বুঝলাম, অনেক পথ হেঁটে এসেছে ওরা। ওদের মধ্যে যে সর্দার গোছের, সেই শুধু দাঁড়িয়েছিল। সে বলল যে, তারা পলাশবনা বলে একটা গ্রাম থেকে আসছে অনেকখানি হেঁটে। তাদের বস্তীতে একটা মানুষখেকো বাঘের উপদ্রব আরম্ভ হয়েছে। গ্রামকে ওরা বলে বস্তী। পনেরো দিন আগে কাঠ কুড়োতে যাওয়া একটি মেয়েকে সেই বাঘে ধরেছিল। ওরা ভেবেছিল যে, বাচ্চা মেয়েটা বুঝি হঠাৎ ভুল করেই গিয়ে পড়েছিল ভীষণ গরমে ক্লান্ত হয়ে-যাওয়া ছায়ায় বিশ্রাম-নেওয়া বাঘের সামনে। কিন্তু আজই বিকেলে গ্রামের মধ্যে ঢুকে অনেকের চোখের সামনেই কুয়োতলা থেকে আবার একজন বুড়িকে তুলে নিয়ে গেছে বাঘটা। তাই বাঘটা যে মানুষখেকোই সে বিষয়ে তাদের কোনও সন্দেহ নেই আর!

কথাবার্তা শুনে টিরিদাদা এসে দাঁড়িয়েছিল আমাদের পেছনে।

আমি বললাম, দাঁড়িয়ে কী দেখছ টিরিদাদা? এতদূর থেকে এসেছে ওরা, ওদের প্যাঁড়া দাও, জল দাও, জল খাওয়াও। ওদের জন্যে খাওয়ারও একটু বন্দোবস্ত করো। তুমি তো একা এত লোকের খাবার বানাতে পারবে না! ওদের জল-টল খাওয়া হলে ডেকে নাও ওদের, তারপর সকলে মিলেই হাতে হাতে রুটি বানিয়ে ফেল। নইলে ভাত করো। ঝামেলা কম হবে। মাংস তো আছেই। যা আছে তাতে হয়ে যাবে।

টিরি বলল, নিজের খাওয়া আর সকলের খাওয়া-খাওয়া করেই তুমি মরলে।

টেড হিন্দী বোঝে। বলতেও পারে। টিরিকে বলল, তুম বহত বকবকাতা হ্যায়।

আমি সর্দারকে শুধোলাম, বুড়ির মৃতদেহ কি তোমরা উদ্ধার করতে পেরেছ?

না বাবু, ও বলল।

কেন? সকলে মিলে আলো-টালো নিয়ে গেলে না কেন? গ্রামে কি একটাও বন্দুক নেই?

আছে। টিকায়েতের আছে। তার বিলিতি বন্দুক আছে একনলা। তার কাছে গেছিলাম আমরা। কিন্তু সে বলল, একটা মরা বুড়ির জন্য রাতবিরেতে নিজের প্রাণ খোয়তে রাজি নয় সে। কাল দিনেরবেলা আমাদের গিয়ে দেখে আসতে বলেছে। বুড়ির সবটুকু যদি বাঘ খেয়ে না ফেলে থাকে, তাহলে সেইখানে ভাল বড় গাছ দেখে মাচা বাঁধতে বলেছে আমাদের। সেই মাচায় বসবে বিকেলে গিয়ে। এবং বলেছে বাঘটাকে মারবে।

টেড বলল, তাহলে তো বন্দোবস্ত হয়েই গেছে। তোমরা আমাদের কাছে এই এতখানি পথ ঠেঙ্গিয়ে আসতে গেলে কেন?

সর্দার বলল, এই টিকায়েতই তো গতবছরে নতুন বন্দুক কেনার পর বাঘ। মারবে বলে গরমের সময়ে জলের পাশে বসে ছিল। বাঘ যখন জল খেতে এসেছিল, তখন তাকে গুলিও করে বিকেল বেলায়। ঐ তো যত ঝামেলার ঝাড়।

আমি বললাম, খারাপটা সে কি করল তোমাদের?

সর্দার বলল, বাঘটা মারতে পারলে তো হতই। বাঘ হুঙ্কার ছেড়েই পালিয়ে গেছিল গায়ের গুলি ঝেড়ে ফেলে দিয়ে।

সর্দার একটু চুপ করে থেকে বলল, কী আর বলব, আজ প্রায় সাত-আট বছর হল বাঘটা এই অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করত, কারও কোনও ক্ষতি করত না কখনও, এমন কি গ্রামের গরু-মোষও মারেনি। শুধু টিকায়েতের বেতো-ঘোড়া মেরেছিল একটা।

ওদের মধ্যে একজন সর্দারকে শুধরে দিয়ে বলল, একবার শুধু একটা গাধা মেরেছিল বস্তীর ধোপার।

সঙ্গে সঙ্গে সর্দার তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, আমাদের মনে হয় টিকায়েতের ঐ গুলিতে আহত হয়েই, বাঘটার শরীরে জোর কমে গেছে। তাই তো বোধহয় ও আর জঙ্গলের জানোয়ার ধরতে পারে না। সেইজন্যেই এখন মানুষ ধরা আরম্ভ করেছে। ওকে বস্তীর সকলেই চেনে, কারণ পলাশবনার ছোট বড় প্রায় সকলেই কখনও না কখনও দেখেছে ওকে।

একটু থেমে বুড়ো সর্দার বলল, আমরা আগে ওকে আদর করে ডাকতাম টাঁড়বাঘোয়া বলে। অনেকে পিলাবাবাও বলত। আমাদের বস্তীর আর জঙ্গলের মধ্যের খোলা টাঁড়ের মধ্যে দিয়ে প্রায়ই সকালে অথবা সন্ধেয় ওকে ধীর সুস্থে যেতে দেখা যেত।

বুড়োর কথা শুনে টেড আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। বিহারের হাজারীবাগ পালামৌ জেলাতে বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠকে বলে টাঁড়। টাঁড়ের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করত বলেই ওরা টাঁড়বাঘোয়া বলে ডাকত বাঘটাকে। মানে টাঁড়ের বাঘ। বাঘ সাধারণতঃ ফাঁকা জায়গায় বেরোয় না দিনের বেলা। কিন্তু এ বাঘটা সকাল সন্ধের আলোতে মাঠের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করত বলেই ওরকম নাম হয়েছিল বোধহয়।

টেড বলল, কত বড় বাঘটা?

সর্দার বলল, দিখকে আপকো দিমাগ খারাপ হো জায়গা হজৌর। ইতনা বড়কা। বলে, নিজের বুকের কাছে হাত তুলে দেখিয়ে বলল।

আমি বললাম, বাঘটাকে পিলাবাবা বলে ডাকত কেন কেউ কেউ, তা বললে না তো?

বুড়ো বলল, হলুদ রঙের ছিল বাঘটা, ইয়া ইয়া দাড়ি গোঁফওয়ালা, তাই অনেকে বলত পিলাবাবা। হিন্দীতে পিলা মানে হলুদ। বিহারের বাঘের গায়ের রঙ সচরাচর পাটকিলে হয়। টাঁড়বাঘোয়ার রঙ হলুদ বলেই তার অমন নাম।

টেড জিগগেস করল, তোমাদের গ্রাম কত মাইল হবে এখান থেকে।

ওরা এবার একসঙ্গে সকলে কথা বলে উঠল।

বলল, জঙ্গলে জঙ্গলে গেলে লাহোরের দিকে দশ মাইল। পি-ডাব্লু-ডির রাস্তায় গেলে কুড়ি মাইল–তাও রাস্তা ছেড়ে আবার পাঁচ-ছ’ মাইল হাঁটতে হবে।

আমি বললাম, তোমাদের গ্রামে আমাদের থাকতে দিতে পারবে তো? কোনও খালি ঘর-টর আছে?

বুড়ির ঘরই তো আছে, ওরা বলল।

তারপর বলল, বুড়ির কেউই ছিল না। এক নাতি ছিল, গত বছরে এমনই এক গরমের দিনে একটা বিরাট কালো গহুম সাপ তাকে কামড়ে দেয়। ওঝা কিছুই করতে পারল না। মরে গেল সে।

তারপর বলল, আপনারা গেলে আমরা আমাদের নিজেদের ঘরও ছেড়ে দেব। আপনাদের কোনও কষ্ট দেব না। দয়া করে চলুন আপনারা মালিক।

কলেজে-পড়া সবে-গোঁফ-ওঠা আমাদের, এমন বার বার মালিক মালিক বলাতে আমাদের খুবই ভাল লাগতে লাগল। বেশ বড় বড় হাব-ভাব দেখাতে লাগলাম। আবার একটু লজ্জাও করতে লাগল। এখনও নিজেদের মালিকই হতে পারলাম না, তো এতজন লোকের মালিক! টিরিদাদাকে ডেকে, ওদের সকলকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতে বললাম।

ওরা যখন চলে গেল তখন আমি আর টেড পরামর্শ করতে বসলাম।

এর আগে আমাদের দুজনের কেউই কোনও মানুষখেকো বাঘ মারিনি। আমি তো বড় বাঘও মারিনি। টেড অবশ্য মেরেছিল একটা, ওড়িশার চাঁদকার জঙ্গলে, যখন ও ক্লাস টেন-এ পড়ে। দিনের বেলা, মাচা থেকে।

টেড অনেকবার আমাকে বলেছে আগে, বাঘটা এমন বিনা ঝামেলায় মরে গেল যে, একটুও মনে হল না যে বাঘ মারা কঠিন। থ্রি-সেভেনটি-ফাইভ ম্যাগনা রাইফেলের গুলি ঘাড়ে লেগেছিল সাত হাত দূর থেকে। বাঘটা মুখ থুবড়ে পড়েই ভীষণ কাঁপতে লাগল। মনে হল, ম্যালেরিয়া হয়েছে, গায়ে কম্বল চাপা দিলেই জ্বর ছেড়ে যাবে। তা নয়, ঘাড়ের ফুটো দিয়ে প্রথমে কালচে, তারপর লাল রক্ত বেরোতে লাগল আর বাঘটা হাত পা টানটান করে ঘুমিয়ে পড়ল। যেন রাত জেগে পরীক্ষার পড়া পড়ে খুবই ঘুম জমেছিল ওর চোখে। যেন সাধ মিটিয়ে ঘুমোবে এবারে।

টেডের প্রথম বাঘ অমন লক্ষ্মী ছেলের মতো মরলেও টেড ও আমি খুব ভালই জানতাম যে বাঘ কী জিনিস! বড় বাঘের সঙ্গে মোলকাৎ আমাদের বহুবার হয়েছে-জঙ্গলে, পায়ে হেঁটে। যেই না চোখের দিকে তাকিয়েছে বাঘ, অমনি মনে হয়েছে যে, এ্যাডিশনাল ম্যাথমেটিকস-এর পরীক্ষা যে ভীষণই খারাপ দিয়েছি অথচ কাউকে বাড়িতে সে খবরটা এ পর্যন্ত জানাইনি তাও যেন বাঘটা একমুহূর্তে জেনে গেল। বাঘ চোখের দিকে চাইলেই মনে হয় যে, বুকের ভিতরটা পর্যন্ত দেখে ফেলল।

একে বাঘ। তায় আবার মানুষখেকো।

টেড বলল, বাড়িতে টেলিগ্রাম করে বাবার পারমিশান চাইব? তুইও চা। আফটার অল ম্যানইটার বাঘ বলে কথা।

আমি বললাম, তোর যেমন বুদ্ধি! পারমিশান চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্ট টেলিগ্রাম আসবে, কাম ব্যাক ইমিডিয়েটলি।

টেড বলল, সেকথা ঠিকই বলেছিস। বাবা-মার পারমিশান নিয়ে কে আর কবে এরকম মহৎ কর্ম করেছে বল।

আমি বললাম, কোনও খারাপ কর্মও কখনও করেনি কেউ, কী বল?

ও বলল, তাও যা বলেছিস।

তারপর বলল, থাকতেন আমার মা বেঁচে! মা দেখতিস রিটার্ন-টেলিগ্রাম করতেন, বাঘের চামড়া না-নিয়ে ফিরলে, তোমারই পিঠের চামড়া তুলব। বাবাও অবশ্য আগে সেরকমই ছিলেন। তবে জানিস তো, মা চলে গেলেন এত অল্প বয়সে, আমার তো আর ভাই-বোন নেই, আমিই একা; বাবা এখন বড় নরম হয়ে গেছেন আমার ব্যাপারে। নইলে বাবা ঠিকই উৎসাহ দিতেন।

আমি বললাম, তোর বাবা-মা তো আর বাঙালী নন। তুই তো রবীন্দ্রনাথ পড়িসনি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, সাতকোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী, রেখেছো বাঙালী করে মানুষ করোনি।

টেড বলল, আমরা ভীষণ বাজে কথা বলছি। এবার কাজের কথা বল।

বলেই বলল, টস করবি?

আমি বললাম, দুসসস। টস্ করা মানেই একজন জিতবে অন্যজন হারবে। হারাহারির মধ্যে আমি নেই। তুইও থাকিস না। আমরা হারতে আসিনি। কখনও হারব না আমরা। জিতবই। আমরা যাচ্ছি। ডিসাইডেড।

টেড কিছুক্ষণ বাইরের অন্ধকার রাতে তাকিয়ে থেকে আমার দিকে ওর হাতটা বাড়িয়ে দিল।

ওর টেনিস-খেলা শক্ত হাতের মধ্যে আমার হাতটা নিয়ে বলল, সো, দ্য পুওর ম্যানইটার ইজ ওলরেডী ডেড।

বলেই হাসল।

আমি ওর হাতটা আমার হাতে ধরে হাসলাম।

বললাম, ইয়েস। হি ইজ। অ্যাজ ডেড অ্যাজ হ্যাম।

টেড বলল, অ্যাই! হি বললি কেন? বাঘ কী বাঘিনী আমরা তো জানি না এখনও! গিয়েই জানব।

আমি বললাম, ঠিক।

টিরিদাদা এসে বলল, ওদের প্যাঁড়া আর জল খাইয়েছি। রুটি বানানো শুরু হয়ে গেছে। দেড় ঘণ্টার মধ্যেই খাওয়া-দাওয়া শেষ হবে। ভাতফাত খেতে ভালবাসে না ওরা। পনেরো মিনিটের মধ্যেই পেট খালি-খালি লাগে নাকি ভাত খেলে।

টিরিদাদাকে উদ্দেশ্য করে টেড বলল, বাঁধা-ছাঁদা করে আমরাও ওদের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ব। আজ রাতারাতিই ওদের গ্রামে পৌঁছুতে হবে। বুড়িকে খাওয়ার পরও যে পলাশবনা গ্রামেই মৌরসী-পাট্টা গেড়ে বসে থাকবে বাঘ তার তো কোনও গ্যারান্টি নেই।

টিরিদাদা আপত্তির গলায় বলল, এই রাতে! সাপখোপ আছে।

আমি বললাম, ভূত প্রেতও আছে টিরিদাদা!

টিরিদাদা বলল, ব্যস, ব্যস। রাতের বেলা আবার ওদের নাম করা কেন? বড় বেয়াদব হয়েছ।

টেড হাসল। বলল, শোনো টিরি; ওদের সঙ্গে তুমিও খেয়ে নেবে ভাল করে, আর আমাদের খাবারটা এখানেই দিয়ে যেও সকলের খাওয়া হয়ে গেলে।

টিরিদাদা বলল, মোরগ আর তিতিরগুলো সবই কেটে ফেললাম। তারপর এক বালটি পানি আর একগাদা লংকা ফেলে এমন ঝোল বানাচ্ছি যে, যারা তোমাদের প্রাণে মারার জন্যে নিতে এসেছে তাদের প্রাণ আজ আমার হাতেই যাবে। ওদের কারোরই বাঘের মুখ অবধি পৌঁছতে হবে না হয়তো আর এই ঝোল খাবার পর।

টেড হাসল।

তারপর বলল, তুমি আজকাল কথা বড় বেশি বকছ, কাজ কম করছ টিরি। যাও, পালাও এখান থেকে।

টিরিদাদা সত্যি সত্যিই চটে গেছে মনে হল এবার।

বলল, তোমাদের দুজনের কারও যদি কিছু হয় তাহলে আমি তোমাদের বাবাদের কাছে কোন্ জবাবদিহিটা করব, সে কথা একবারও ভেবেছ? সবে কলেজে উঠেছ, এখন ভাল করে গোঁফ পর্যন্ত ওঠেনি, সব একেবারে লায়েক হয়ে গেছ দেখি তোমরা! লায়েক! কেন যে মরতে আমি এখানে ফেঁসেছিলাম! সঙ্গে এসেছিলাম!

আমি বললাম, আমরা বন্ড লিখে সই করে দিয়ে যাব যে, আমাদের মৃত্যুর জন্যে টাঁড়বাঘোয়াই দায়ী, টিরিদাদা দায়ী নয়।

টাঁড়বাঘোয়া? সেটা আবার কী?

টিরিদাদা কাঁচা পাকা ভুরু তুলে শুধোল।

টেড বলল, বাঘটার নাম গো, বাঘটার নাম। এত বড় বাঘ যে, দেখলে দিমাগই খারাপ হয়ে যাবে।

টিরিদাদা বলল, আমার দিমাগ বাঘ না দেখেই খারাপ হচ্ছে। ভাল লাগছে না একটুও। আমার মন একেবারেই সায় দিচ্ছে না। কী বিপদেই যে পড়লাম!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *