বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

২১

গেস্ট-হাউসের দোতলার বারান্দায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। নীচে ড্রাইভওয়ে, তার দু’পাশে লন। যে গেট দিয়ে এই বাড়িতে ঢুকতে হয়, সেটা খোলা। গেটের সামনে প্যালেস রোড। রাস্তার এদিকে, এই গেস্ট-হাউসের মতো পরপর কয়েকটা বাগানওয়ালা বাড়ি। বাঁ দিকে ডঃ সিদ্দিকির বাড়ির দোতলার একটা ঘরে এতক্ষণ আলো জ্বলছিল, একটু আগে নিবেছে। ডাইনে যমুনাপ্রসাদ উপাধ্যায়ের বাংলো। বাড়িটা সেই সন্ধে থেকেই অন্ধকার। ভদ্রলোক সম্ভবত তাঁর ছেলের কাছে ফিরে গেছেন।

প্যালেস রোডের ওদিকে একটাও বাড়ি নেই। গোটাকয়েক ঝুপড়িমতো দোকানঘর ছিল, পানবিড়ি সিগারেটের দোকান, ক’দিন আগে পুলিশের লোকেরা এসে সেগুলো ভেঙে দিয়েছে। ফলে রাস্তার একটা ধার এখন একেবারে ফাঁকা। শুধু সারি-সারি কিছু গাছ আর দূরে-দূরে কয়েকটা ল্যাম্পপোস্ট যেমন এদিকে, তেমন ওদিকেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। এখন শুক্লপক্ষ, তাই ল্যাম্পপোস্টের মাথায় আলো জ্বলছে না। চাঁদ উঠেছে, কিন্তু আকাশটা মেঘলা, তাই জ্যোৎস্নার তেমন জোর নেই।

মেঘ অবশ্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে না, ঝোড়ো হাওয়ায় যেমন মুখের আঁচল সরে যায়, ঠিক তেমনি চাঁদের মুখের উপর থেকে মেঘ মাঝে-মাঝে সরে যাচ্ছে। যখন সরে যায়, চাঁদটা তখন হঠাৎ আর-একটু উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। জ্যোৎস্নারও জোর বেড়ে যায় অনেকখানি। তাতে রাস্তার ওদিকটা খানিক স্পষ্ট হয়ে চোখে পড়ে। বোঝা যায়, রাস্তার ও-ধারের খানিকটা জমি সমতল, কিন্তু তারপরেই সেই জমি হঠাৎ ঢালু হয়ে নীচে নেমেছে। জমির শেষে একটা নদীর চিকচিকে জল আর নদীর পাড়ের ঝুপসি একটা গাছও তখন স্পষ্ট দেখা যায়। একটু নজর করে দেখলে এটাও তখন বোঝা যায় যে, গাছের নীচে নদীর দিকে মুখ করে একটি মানুষ একেবারে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

মানুষটি যে ভাদুড়িমশাই, তা আমি জানি। খানিক আগে, রাত বারোটা নাগাদ, এই গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে তিনি সর্সোতিয়া নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। পুলিশ যে আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে, তা আমি জানি। কিন্তু তবু, ঝুঁকি আছে জেনেও, আমি তাঁর সঙ্গে যেতে চেয়েছিলুম। তিনি নেননি। এমনকি, বারান্দায় এসে দাঁড়াতেও তিনি আমাকে নিষেধ করেছিলেন। বলেছিলেন, ঘর থেকে বার না-হওয়াই ভাল। যতক্ষণ না তিনি ফিরে আসছেন, ততক্ষণ যেন আমি ঘরের মধ্যেই চুপচাপ শুয়ে থাকি। তা আধ ঘণ্টার মতো তা আমি ছিলুমও। কিন্তু তারপরে আর পারিনি। উদ্বেগ আর কৌতূহল এতই প্রবল হয়ে ওঠে যে, বাইরে কী হচ্ছে না-হচ্ছে, বুঝবার জন্যে বিছানা ছেড়ে পা টিপে টিপে বারান্দায় এসে দাঁড়াই।

তা এখানেও প্রায় আধঘণ্টা আমি দাঁড়িয়ে আছি। হাতঘড়ির রেডিয়াম-ডায়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলুম, রাত একটা বাজতে পাঁচ। চারদিক একেবারে স্তব্ধ। শুধু গাছপালার ভিতর দিয়ে হাওয়া বয়ে যাওয়ার ঝর্ঝর্ শব্দ ছাড়া অন্য কোনও শব্দ কোথাও নেই। চাঁদটা আবার মেঘের আঁচলে মুখ ঢেকেছে। তাই ভাল করে এখন আর কিছু ঠাহরও করা যাচ্ছে না। দাঁড়িয়ে থাকতে-থাকতেই একটা সময় মনে হল যে, ভাদুড়িমশাই যা-ই ভেবে থাকুন, আজ আর কিছু ঘটবে না। তা হলে আর এইভাবে রাত জেগে লাভ কী? এমনও একবার ভাবলুম যে, ঢের হয়েছে, আর নয়, এবারে নীচে নেমে যাই, রাস্তাটা পার হয়ে ভাদুড়িমশাইকে গিয়ে বলি, ও-সব নদীর বাহার-টাহার দেখা যে স্রেফ বাজে কথা তা আমি জানি; কেউ আসবে না, লোকটা স্রেফ প্রলাপ বকছিল; চলুন, উপরে গিয়ে শুয়ে পড়া যাক।

ঠিক সেই মুহূর্তে মেঘটা আবার সরে গেল। আর চোখ ফিরিয়ে নদীর দিকে তাকানো মাত্র আমার বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠল। স্পষ্ট দেখতে পেলুম, ঢালু জমি বেয়ে আর-একটা লোক নদীর দিকে নেমে যাচ্ছে। ভাদুড়িমশাইকেও চোখে পড়ল। রাস্তার দিকে পিছন ফিরে যেমন দাঁড়িয়ে ছিলেন, এখনও ঠিক সেইভাবেই তিনি—একেবারে নিষ্প্রাণ একটা মূর্তির মতো—নদীর দিকে চোখ রেখে স্থির দাঁড়িয়ে আছেন। পিছনের লোকটিকে তিনি দেখতে পাননি।

একবার ভাবলুম, চেঁচিয়ে উঠি। কিন্তু গলা দিয়ে একটা অস্পষ্ট আওয়াজ পর্যন্ত বার হল না। তা হলে কি ছুটে নীচে নেমে যাব? কিন্তু নড়তে গিয়ে মনে হল, আমার পা দুখানাকে কেউ গজাল ঠুকে মেঝের সঙ্গে আটকে রেখেছে। বুঝতে পারলুম না, যা দেখছি তা সত্যি, নাকি ভয়ঙ্কর কোনও দুঃস্বপ্ন!

কালো আংরাখায় সর্বাঙ্গ ঢাকা, লোকটি ওদিকে নিঃশব্দে নামছে। ভাদুড়িমশাই আর তার মধ্যে ব্যবধান যখন বড়জোর হাত দুয়েকের, তখন আর সে এগোল না। দাঁড়িয়ে গিয়ে আংরাখার ভিতর থেকে তার ডান হাতখানা বার করে আনল। জ্যোৎস্নায় ঝকঝক করে উঠল একটা ছোরার ফলা।

ছোরাটা কিন্তু নেমে এল না। তার আগেই, ধাতুতে-ধাতুতে ঠোকাঠুকি হলে যেমন হয়, সেইরকম, কিন্তু তার চেয়ে অনেক জোরালো, শব্দ হল একটা, আর একই সঙ্গে দেখতে পেলুম যে, আংরাখায়-ঢাকা লোকটার হাতের ছোরা তার হাত থেকে উড়ে গিয়ে বেশ কিছুটা দূরে, ঘাসজমির উপরে ছিটকে পড়ল।

নদীর দিকে মুখ করে যিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, ততক্ষণে তিনিও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু এ কী, তিনি তো ভাদুড়িমশাই নন, তিনি ডঃ সিদ্দিকি। ভাদুড়িমশাই তা হলে কোথায় গেলেন?

হঠাৎই স্বর ফুটল আমার গলায়। চিৎকার করে উঠলুম, “ভাদুড়িমশাই!” আমার সেই বিমূঢ় অবস্থাটা ততক্ষণে কেটে গিয়েছে। তা নইলে আর এক-এক লাফে সিঁড়ির তিনটে-চারটে ধাপ টপ্‌কিয়ে নীচে নামলুম কী করে, আর এক ছুটে রাস্তা পেরিয়ে ডঃ সিদ্দিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ানোই বা কী করে সম্ভব হল?

অন্য আর কোনও দিকেই আমার তখন খেয়াল ছিল না। দু’হাতে ডঃ সিদ্দিকিকে আঁকড়ে ধরে বিকৃত গলায় বললুম, “ভাদুড়িমশাই কোথায়?”

“এই তো আমি!”

চমকে বাঁ দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখলম, কিছু-একটা জিনিসকে হাতে নিয়ে, ঘাসের উপর দিয়ে ভাদুড়িমশাই এগিয়ে আসছেন। কাছে এসে বললেন, “সেই ছোরাটা। রুমালে জড়িয়ে তুলে এনেছি। আমাদের কারও আঙুলের ছাপ এতে না-থাকাই ভাল।”

বললুম, “ছোরাটা যার, আলখাল্লা-পরা সেই লোকটা কোথায়?”

“ওই তো আমার পিছন-দিকে। কেন, দেখতে পাননি?”

দেখব কী, উপর থেকে যখন ছুটে নেমে আসি, তখন কি আর কোনও জ্ঞানগম্যি ছিল আমার! যাঁকে ভাদুড়িমশাই ভেবেছিলুম, আসলে তিনি যে ডঃ সিদ্দিকি, এইটে দেখেই এত বিভ্ৰান্ত বোধ করেছিলুম যে, নজর করে সবকিছু দেখবার মতো অবস্থাই তখন আমার ছিল না।

এবারে পিছন ফিরে দেখলুম, হাত কয়েক দূরে আলখাল্লা-পরা সেই লোকটা সটান ঘাসের উপরে পড়ে আছে। তার মুখও দেখলুম কালো কাপড়ে ঢাকা।

বললুম, “লোকটা কি মরে গেছে?”

“আরে না মশাই, হাতের ছোরাটা ছিটকে যাওয়ায় একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল; তো সেই অবস্থায় আর খুব-একটা দাওয়াই দেবার দরকার হয়নি, পিছন থেকে ছুটে এসে মাথার উপর রিভলভারের বাট দিয়ে একটা ঘা মারতেই বাবুমশাই অজ্ঞান হয়ে গেলেন।”

“কোত্থেকে ছুটে এলেন আপনি?”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “আমার কথা গেরাহ্যি না করে তো দিব্যি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন, আর আমি যে সারাক্ষণ কোথায় দাঁড়িয়ে ছিলুম, সেটাই আপনার চোখে পড়ল না? আমি তো রাস্তার এ-দিকে আসিইনি, ডঃ সিদ্দিকিকে নদীর ধারে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে তারপর গেস্ট-হাউসেরই গেটের পিলারের পিছনে দাঁড়িয়ে ওঁর উপরে নজর রাখছিলুম। তা গুলি চালিয়ে ছোরাটাকে কী রকম উড়িয়ে দিলুম, সেটা দেখলেন তো?”

ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “ভাগ্যিস মেঘ কেটে গিয়ে জ্যোৎস্নার জোরটা তখন বেড়ে গিয়েছিল, নইলে ও-গুলি ছোরায় লাগত না অমার মাথায় লাগত, তার ঠিক কী! বাপ রে, ভাবতে এখনও আমার বুক কাঁপছে!”

বললুম, “খুব জোরে ঠন করে একটা শব্দ হল, সেটা শুনেছিলুম, কিন্তু গুলির শব্দ তো পাইনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কী করে পাবেন। রিফ্লভারে সাইলেন্সার লাগানো রয়েছে না?”

কথা বলতে-বলতেই তাঁর স্যুটকেস খুনে রুমালে জড়ানো ছোরাটা তার মধ্যে রেখে দিলেন ভাদুড়িমশাই। ম্যাকিনটশের পকেট থেকে রিভলভারটাও বার করেছিলেন, কিন্তু কী যেন ভেবে নিয়ে সেটা আর স্যুটকেসে ঢোকালেন না। সেটা পকেটে পুরে স্যুটকেস বন্ধ করলেন। তারপর মাটিতে পড়ে-থাকা লোকটার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আর দেরি করা ঠিক নয়, একটু বাদেই এঁর জ্ঞান ফিরে আসবে। এবারে এঁকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া যাক। কিরণবাবু যা হল্লা জুড়ে দিয়েছিলেন, কেউ কিছু না টের পেয়ে থাকলে বাঁচি।”

ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “চলুন। আমার লাইব্রেরি-ঘর তো খোলাই আছে। এ-ভদ্রলোক আমার বাড়িতে কখনও ঢোকেননি, তাই জ্ঞান ফিরলেও বুঝতে পারবেন না যে, কোথায় এসেছেন।”

“বাড়ির লোকজনেরা ভয় পেয়ে যাবেন না তো?”

“লোক থাকলে তো ভয় পাবে।” ডঃ সিদ্দিকি বললেন, “কেউ নেই। থাকবার মধ্যে গিন্নি ছিলেন, তো তিনি এখন দেরাদুনে তাঁর মেয়ের কাছে আছেন। কাজের লোকদেরও দুপুরের পরেই আজ ছুটি করে দিয়েছি।”

“বাঃ, তা হলে তো ভালই হল। চলুন, তা হলে আপনার বাড়িতেই যাওয়া যাক।” ঘাসের উপর থেকে অজ্ঞান মানুষটিকে ভাদুড়িমশাই তাঁর কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর স্যুটকেসটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “আসুন।”

ডঃ সিদ্দিকির লাইব্রেরি-ঘরে একটা ডিভানের উপরে মানুষটিকে শুইয়ে দেওয়া হল। আমার পক্ষে আর কৌতূহল চেপে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। ডঃ সিদ্দিকিকে জিজ্ঞেস করলুম, “কে লোকটা?”

খুব নিচু গলায় প্রশ্নটা করেছিলুম, কিন্তু ভাদুড়িমশাই তবু শুনতে পেয়ে গেলেন। মুখ না-ফিরিয়ে বললেন, “জিজ্ঞেস করবার দরকার কী, নিজের চোখেই দেখুন।”

এক ঝটকায় লোকটির মুখের কাপড় সরিয়ে দিলেন ভাদুড়িমশাই। আর মুখখানা দেখবা মাত্ৰ আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলুম। ডিভানের উপরে অজ্ঞান যে মানুষটিকে সটান শুইয়ে রাখা হয়েছে, তিনি আর কেউ নন, বিষাণগড়ের দেওয়ান সার ত্রিবিক্রম কপুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *