বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৬

পরদিন সকালেই ভাদুড়িমশাইয়ের ফ্ল্যাটে গিয়ে সব কথা তাঁকে জানালুম। কিন্তু তিনি যে খুব বিস্মিত হয়েছেন, তা মনে হল না। দেখলুম তিনি হাসছেন।

বললুম, “কী ব্যাপার বলুন তো? প্যালেসে নাকি আপনার খুব খাতির। শুনলুম, ওরা নাকি আপনাকে একটু ভয়ও করে। সত্যি?”

ভাদুড়িমশাই আমার প্রশ্নের কোনও জবাব দিলেন না। বললেন, “কিরণবাবু, মোটামুটি বছরখানেক হল আমি এখানে আছি। এর আগে আরও দু-দুটো জায়গায় আমি কাম্বারল্যান্ড ইনস্যুরেন্সের ব্রাঞ্জ ম্যানেজার ছিলুম। কোথায় ছিলুম জানেন?”

“না তো।”

‘পঞ্জাবের ধুল্সর আর রাজস্থানের মাধোপুরে।”

“অর্থাৎ মহারাজা ধূর্জটিনারায়ণের দুই শ্বশুরবাড়ির স্টেটে?”

“হ্যাঁ।” ভাদুড়িমশাই হাসলেন, “কোম্পানির হেড অফিস তো লন্ডনে। সেখান থেকে দিল্লি-অফিসকে বলা হয়েছিল যে, বিষাণগড়ে যে একজন চৌখস লাক পাঠানো দরকার, এটা তাঁরাও জানেন, কিন্তু যাঁকেই সেখানে পাঠানো হোক, তার আগে অন্তত কিছুদিনের জন্যে তাঁকে যেন ধুল্সর আর মাধোপুর ব্রাঞ্চ থেকে ঘুরিয়ে আনা হয়।”

শহরের পুব দিকে ছোট একটা পাহাড়। মার্কেট রোড থেকে একটা রাস্তা সেই পাহাড়ের দিকে চলে গেছে। রাস্তাটার নাম হিলক রোড। সেইখানেই একটা বাড়ির একতলায় চলে কাম্বারল্যান্ড ইনস্যুরেন্সের ব্রাঞ্চ-অফিসের কাজকর্ম, আর দোতলায় এই কোয়ার্টার্স। ভাদুড়িশাই ন’টা নাগাদ একতলায় নামেন।

কালুম, “একতলায় আপনার আপিসেও তো দু-চারবার এসেছি। তেমন কিছু ব্যস্ত আপিস বলে কখনও মনে হয়নি। আপনাদের বিজনেসের ভল্যুম নিশ্চয় এখানে খুব বেশি হবে না। তা হলে হঠাৎ একজন চৌখস লোক পাঠাবার দরকার হল কেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “আপনার কথাটা একদিক থেকে সত্যি ঠিকই, আবার অন্য দিক থেকে সত্যি নয়। এখানে লাইফ ইনস্যুরেন্সের কাজ একেবারে যৎসামান্য, কিন্তু বার্গলারি, ডেকয়টি, ফায়ার ইত্যাদি বাবদেও তো আমরা বিমার ব্যবস্থা রেখেছি, তাতে যে ডিক্লেয়ার্ড ভ্যালুর রিস্ক আমাদের কভার করতে হয়, এখানে তার টোটাল অঙ্কটা কত, তা আপনি ভাবতে পারেন?”

“কত?”

“বহু কোটি টাকা। আর তার সাড়ে পনরো আনা-ই হচ্ছে বিষাণগড় প্যালেসের।”

“বলেন কী মশাই?”

“একটুও বাড়িয়ে বলছি না। এদের যে কী পরিমাণ জুয়েলারি রয়েছে, তা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না। শুধু সোনার গয়না নয়, মণিমুক্তোও রয়েছে অজস্র। বেশি কথায় যাব ন।, আপাতত শুধু একটা হিরের কথা বলি। স্রেফ এই একটা হিরেরই ডিক্লেয়ার্ড ভ্যালু হচ্ছে দু’কোটি টাকা। আগে অবশ্য সওয়া কোটি টাকা দাম ধরা ছিল, কিন্তু গত বছর হঠাৎ ওঁরা বলে বসলেন যে, ওটার দাম এখন থেকে দু’কোটি টাকা ধার্য করা হোক। আমরা বললুম, প্রিমিয়ামও কিন্তু তার ফলে অনেক বেড়ে যাবে। তো ওঁরা তাতেও গররাজি হলেন না। বললেন, সে তো বাড়বেই, ডিক্লেয়ার্ড ভ্যালু যখন বাড়ছে, তখন প্রিমিয়াম তো বাড়তেই পারে। তা এরপরে আর কথা কী। তখন যিনি এখানে ব্রাঞ্চ-ম্যানেজার ছিলেন, তিনি ফর্ম এগিয়ে দিলেন, আর রাজবাড়ির তরফে যাঁকে ওকালতনামা দিয়ে এখানে পাঠানো হয়েছিল, তক্ষুনি সেই ফর্ম ফিল আপ করে সই করলেন তিনি। তাতে হিরেটার দাম লিখে দিলেন দু কোটি টাকা।

আমার বাক্‌স্ফুর্তি হচ্ছিল না। ঢোক গিলে কোনওরকমে বললুম, “ওরেব্বাবা!”

ভাদুড়িমশাই হেসে বললেন, “মাথা ঘুরে যাচ্ছে তো? তা মশাই, মিথ্যে কথা বলব না, বিষাণগড়ের এই খবর শুনে মাথা ঘুরে গিয়েছিল আমাদের দিল্লি অফিসের কর্তাদেরও। দে স্মেল্ট এ র্যাট, অ্যান্ড ইনফর্মড লন্ডন।”

“অর্থাৎ কিনা কোম্পানির সন্দেহ হল যে, এর মধ্যে একটা গণ্ডগোল রয়েছে, কেমন?”

“সন্দেহ তো হতেই পারে। দেখুন মশাই, কোনও ক্লায়েন্ট যখন তার ইনসিওর-করা জি। সৈপত্রের মধ্যে কোনও একটা পার্টিকুলার আইটেমের দাম নিজের থেকেই হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় তখনই আমরা সন্দেহ করি যে, ডালমে কুছ কালা হ্যায়। আমাদের সন্দেহ হয় যে, ইনসিওর-করা বস্তুটি এবারে হাপিস হবে, আর ক্লায়েন্ট সেই বাবদে আমাদের কাছ থেকে আরও বেশি অঙ্কের ওই টাকাটা ক্লেম করবে।”

“কে হাপিস করবে?”

“ক্লায়েন্ট নিজেই। কেন, নিজের পাটের গুদামে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তারপর ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়েছে, এমন ঘটনার কথা কি কখনও শোনেননি নাকি? এ-সব ক্ষেত্রে কী করা হয়, তাও জানেন নিশ্চয়? পুড়ে যাওয়া পাটের যা দাম, তার চেয়ে ঢের বেশি দাম লিখিয়ে রাখা হয় কোম্পানির কাছে। আর এ-ক্ষেত্রে তো আগুন লাগাবারও দরকার হচ্ছে না। ক্লায়েন্ট নিজেই তার জিনিসটাকে কোথাও পাচার করে দেবে, তারপর সেটা যে চুরি হয়েছে, থানায় এই মর্মে ডায়েরি করিয়ে ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছে ক্লেম করবে তার দাম।”

“কিন্তু ক্লেমটা জেনুইন কি না সেটাও তো আপনারা তদন্ত করে দেখবেন?”

“তা দেখব বই কী, নিশ্চয় দেখব। ইনকুয়ারির কথা বলছেন তো? সেটাও থারীতি হবে। কিন্তু সে-সব সত্ত্বেও যে ডিজঅনেস্ট ক্লায়েন্ট তার ক্লেম-করা টাকা অনেক ক্ষেত্রে পেয়ে যাবে, তাও ঠিক। পাবে, তার কারণ ইনকুয়ারি যাদের দিয়ে করানো হবে, তারা একটা আলাদা ফার্মের লোক হতে পারে ঠিকই তবে কিনা সর্বক্ষেত্রে তারাও কিছু ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির নয়। তা ছাড়া, ইনস্যুরেন্স কোম্পানির নিজস্ব লোকজনেরাও কি আর সক্কলেই খুব অনেস্ট? ক্লায়েন্টের সঙ্গে ষড় থাকা সম্ভব তাদেরও। তারাও হয়তো ক্লায়েন্টের টাকা খেয়েছে।”

“অর্থাৎ সর্ষের মধ্যেই ভূত?”

“তা থাকে বই কী। অন্তত আছে বলেই আমাদের কর্তাদের হয়তো সন্দেহ হয়েছিল।”

“আর সেইজন্যেই এখানকার ব্রাঞ্চ-ম্যানেজারকে সরিয়ে দিয়ে তাঁর জায়গায় আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে?”

ভাদুড়িমশাই হাসলেন। বললেন, “তা কী করে বলব? আমি শুধু একটা কথাই বলতে পারি। সেটা এই যে, এখানে আসবার আগে যে আমি মাধোপুরে আর ধুলসরে ছিলম, প্যালেসের লোকেরা তা খুব ভালই জানে। আপনি ওই যে বলছিলেন না, প্যালেসের লোকেরা আমাকে খাতির করে, একটু নাকি ভয়ও পায়, তো সেটা হয়তো এইজন্যেই। তবে হ্যাঁ, আর-একজন লোককেও ওরা নিশ্চয় ভয় পেত, যদি জানত যে, সে আসলে আমারই লোক। সে কিন্তু প্যালেসের মধ্যে আছে।”

“বলেন কী?”

“ঠিকই বলছি। দয়া করে এ নিয়ে আর টু-শব্দটি করবেন না, করলে শুধু যে আমাদেরই প্ল্যানটা বানচাল হবে, তা নয়, আপনারও বিপদ ঘটবে। কিন্তু আর নয়, এ-সব কথা এখন থাক, পামেলার কথা বলুন। সে কবে আমার সঙ্গে দেখা করবে?”

“শিগগির নয়। মে মাসে কুলদীপ সিংয়ের দিল্লি যাবার কথা আছে, তার আগে দেখা করতে চাইছে না।”

“অর্থাৎ কুলদীপকে সে ভয় পাচ্ছে কেমন?”

“তা-ই তো মনে হল।”

“আশ্চর্য!” ভাদুড়িমশাই বললেন, “কুলদীপকে দেখছি অনেকেই ভয় পায়। আমাদের এই অফিসেও দু’চারজন দেখেছি ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে থাকে। সে যাক্ গে, সুযোগ-সুবিধে মতো পামেলাকে বলে দেবেন, মে মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, আমার ইনফরমেশন যদি ঠিক হয় তো এপ্রিলেই কুলদীপ একবার আপনাদের রানি-মা’কে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি যাবে। সম্ভব হলে তখনই আসুক।…কিন্তু আপনার হাতে ওটা কী? কাগজপত্রের প্যাকেট বলে মনে হচ্ছে? পোস্ট করতে হবে?”

বললুম, “ওই যা, আসল কথাটাই ভুলে মেরে দিয়েছি। আপনার কাছে পৌঁছে দেবার জন্যে পামেলা আমাকে প্যাকেটটা দিয়েছে। বলল, এটা হয়তো আপনার কাজে লাগতে পারে।”

প্যাকেটটা ভাদুড়িমশাইয়ের দিকে এগিয়ে দিলুম। তিনি সেটা হাতে নিয়ে বললেন, “ওরেব্বাবা, এ তো সিলমোহর করা দেখছি!”

সিলমোহন ভেঙে প্যাকেট খুলে তিনি তার ভিতর থেকে যা বার করে আনলেন, তা আর কিছুই নয়, এক তাড়া ফোটোগ্রাফ। কার ফোটোগ্রাফ, ভাদুড়িমশাইকে সেগুলি পাঠানো হয়েছে কেন, কিছুই বুঝতে পারলুম না। ভাদুড়িমশাই প্রতিটি ফোটোগ্রাফ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন, তারপর আবার সেগুলিকে প্যাকেটের মধ্যে ঢুকিয়ে রেখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “কী মশাই, দেখবার জন্যে খুব কৌতূহল হচ্ছে নাকি?”

বললুম, “একেবারেই না। কাল রাতে এই প্যাকেটটা আমাকে দিয়ে পামেলা যা বলেছিল, তার তো একটাই মাত্র অর্থ হয়, দে আর মেন্ট ফর ইয়োর আইজ ওলি।”

“থাক, তা হলে আর আপনার দেখে কাজ নেই। কিন্তু কী আছে এর মধ্যে, সেটা অন্তত জেনে রাখুন।”

“কী আছে?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ডাইনামাইট। অর্থাৎ সেই বস্তু, যা দিনে পাহাড় পর্যন্ত উড়িয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু না, আর গল্প নয়, ন’টা বাজে, এবারে আমি একতলায় নামব। আপনারও তো দফতরে বাবার সময় হল।”

বললুম, “আজ মহারাজা ধূর্জটিনারায়ণের জন্মদিন না? আজ আমাদের ছুটি।”

.

এপ্রিল আর মে মোটামুটি শান্তিতেই কেটে গেল। ভাদুড়িমশাই ঠিকই বলেছিলেন। এপ্রিল মাসেই রানি-মা’কে সঙ্গে নিয়ে দিল্লি গেলেন কুলদীপ সিং, আবার ফিরেও এলেন দিন পনেরো বাদে। পামেলা তারই মধ্যে একদিন গিয়ে ভাদুড়িমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে এসেছেন, তবে দুজনের মধ্যে কী কথা হয়েছে, তা আমি জানি না। পামেলাকে সাহায্য করতে ভাদুড়িমশাই রাজি হয়েছেন কি না, তা না।

বেশ গরম পড়ে গেছে। দুপুরটা তো তেতে একেবারে আগুন হয়ে যায়। বিকেলেও তার জের চলতে থাকে। ভোরবেলাটা অবশ্য এখনও মোটামুটি ঠাণ্ডা। তারপর একটু বেলা হতেই সূর্যদেব সেই যে ডাণ্ডা ঘোরাতে শুরু করেন, পৃথিবীর চাঁদি একেবারে ফেটে চৌচির হবার উপক্রম হয়। তবে সন্ধেটা বড় মনোরম। ভোরবেলাতেও অবশ্য হাঁটতে বার হই। কিন্তু বেশিক্ষণের জন্য নয়। সন্ধেবেলায় লছমি সঙ্গে থাকে। তাকে নিয়ে সর্সোতিয়ার ধারে গিয়ে বসি। ভাদুড়িমশাই আর ডঃ সিদ্দিকির সঙ্গে তখন দেখা হয়।

ইদানীং আবার যমুনাপ্রসাদ উপাধ্যায়ও মাঝে-মাঝে আমাদের সান্ধ্য আড্ডায় এসে যোগ দিচ্ছেন। ভদ্রলোক এককালে বিষাণগড়ের রাজবৈদ্য ছিলেন। ধূর্জটিনারায়ণের মৃত্যুর পর থেকে যেহেতু প্যালেসে তাঁর খাতিরও অনেক কমে গেছে, তাই বছরের বেশির ভাগ সময়ই এখন পুনায় তাঁর ছেলের কাছে থাকেন। বিষাণগড়ে আসেন মাঝেমধ্যে। বাড়িঘর সবই তো এখানে, তাই জায়গাটাকে একেবারে ছেড়ে থাকতেও পারেন না।

ভদ্রলোকের গল্পের স্টক অফুরন্ত। শুনতে-শুনতে অনেক সময় বেশ রাত হয়ে যায়। লছমি ঘুমিয়ে পড়ে। তাঁকে কাঁধে তুলে বাড়ি ফিরি। ভাদুড়িমশাই আমাকে প্যালেসের দেউড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেন। মাঝে-মাঝেই ভাদু।ড়মশাই বলেন, “বেড়াতে বেরিয়ে এত রাত করবেন না, কিরণবাবু। একটু তাড়াতাড়ি ফিরে যাবার চেষ্টা করবেন।”

সেদিনও তিনি এই কথাটা আবার বললেন। তাতে আমি বললুম, “কেন, ভয় কীসের? সেই যে হরদেও মারা গিয়েছিল, তার পরে তো আর কিছু ঘটেনি।”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “ঘটতে কতক্ষণ। একটু সাবধানে থাকুন মশাই।”

বললুম, “কী গরম পড়েছে দেখছেন তো। সন্ধের পর ওই যে একটু নদীর ধারে গিয়ে বসি, শরীর যেন জুড়িয়ে যায়। চট করে আর ঘরে ফিরতে ইচ্ছে করে না।”

ভাদুড়িমশাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাজবাড়ির কম্পাউন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়লুম। মিশ্রজি বারান্দায় বসে ছিলেন। আমাকে দেখে বললেন, “আজও দেরি করলি বেটা?”

ঘুমন্ত লছমিকে তাঁর কোলে তুলে দিয়ে লজ্জিত গলায় বললুম, “একটু দেরি হয়ে গেল। মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে, এখন ঘুম থেকে তুলে ওকে খাওয়াতে নিশ্চয় দিদির খুব কষ্ট হবে।”

যমুনা দেবী আমাদের কথাবার্তা শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। বললেন, “আমার কষ্ট নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না ভাইয়া, দয়া করে একটু নিজের কথা ভাবো। এই যে এত রাত অব্দি বাইরে থাকো, এটা ভাল নয়।”

হেসে বললুম, “ভাদুড়িমশাইও তা-ই বলছিলেন বটে।”

“ভাদুড়িদাদা ঠিকই বলছেন।” মিশ্রজির কাছ থেকে ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে যমুনা দেবী ভিতরে চলে গেলেন।

ভাদুড়িমশাই যে ঠিকই বলেছেন, কিছুদিন বাদেই সেটা বোন গেল।

এপ্রিল আর মে মাসে ঝড়বৃষ্টি হবার কথা, কিন্তু তাও বিশেষ হয়নি, ফলে গরম একেবারে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। মিশ্রজি বললেন, “আর ক’টা দিন একটু সহ্য কর বেটা, জুনের প্রথম হপ্তায় তো বর্ষা আসে, তখন দেখবি সব একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে।”

তা বর্ষা নামল পনরোই জুন। অমন বর্ষা কলকাতায় কখনও দেখিনি। দু-তিন দিন ধরে নাগাড়ে বৃষ্টি। তাও মুষলধারে। ঘাস মরে হলদে হয়ে গিয়েছিল, তাদের পাতা ঢাকা পড়েছিল ধুলোর পুরু সরে। কিন্তু দেখতে-দেখতে যেন পালটে গেল সবকিছু। যেদিকে তাকাই, সবই একেবারে ঝকঝকে সবুজ, সর্সোতিয়াতেও ঢল নেমেছে। বর্ষার তোড়ে কৃষ্ণচূড়া আর শিমুলের রক্তিম বাহার হঠাৎ মুছে গিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্যালেস রোড ধরে ভোরবেলায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় যে, ভারী মিষ্টি একটা গন্ধের দেওয়াল ঠেলে আমাকে হাঁটতে হচ্ছে। তাতে বুঝতে পারি যে, সড়কের পুব দিককার বাংলো বাড়িগুলির প্রত্যেকটার বাগানেই বেল আর জুঁই ফুটেছে অজস্র।

তারিখটা ভুলে যাইনি। আঠাশে জুন। সেদিনও ঘুম থেকে উঠে, চোখেমুখে জল দিয়েই হাঁটতে বেরিয়ে পড়েছিলুম। তখনও আলো ফোটেনি, শুধু রাতের অন্ধকার ধীরে-ধীরে ফিকে হয়ে আসছে, পুবের আকাশে কালোর বদলে পড়তে আরম্ভ করেছে নীলচে ইস্পাত-রঙের পোচড়া।

রাত্তিরে জোর বৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু জায়গাটা তো পাহাড়িয়া, তাই কোথাও জল জমেনি। শুধু মনে হচ্ছিল যে, হোস পাইপে তোড়ে জল ঢেলে প্যালেস রোডকে আরও ঝকঝকে করে রাখা হয়েছে।

পথ একেবারে নির্জন। এটা শৌখিন পাড়া। বুঝতে পারছিলুম যে, এখনও এখানে কেউ ঘুম থেকে ওঠেনি। শেষ-রাত্তিরে বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় একটু ঠান্ডাও পড়েছে তো, হয়তো সেইজন্যেই সবাই একেবারে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে।

হাঁটতে-হাঁটতে স্টেট গেস্ট-হাউস পর্যন্ত পৌঁছেই চমকে উঠতে হল। নদীর ধার, ঢালু ঘাস- জমির উপরে, উবু হয়ে কেউ বসে আছে। দু-এক মুহূর্ত পরেই লোকটি উঠে দাঁড়াল, আর তখনই বুঝতে পারলুম যে, তিনি ভাদুড়িমশাই।

বললুম, “কী ব্যাপার মশাই, ওখানে কী দেখছেন?”

ভাদুড়িমশাই বললেন, “কিরণবাবু? ভালই হল। এদিকে একবার আসুন তো।”

আমি হাঁটছিলুম প্যালেন রোডের পুবদিককার পেভমেন্ট ধরে। রাস্তা পেরিয়ে নদীর দিকের পেভমেন্টে চলে এলুম। আর পরক্ষণেই যা চোখে পড়ল, তাতে একেবারে হিম হয়ে গেল আমার রক্ত।

দেখলুম, ঢালু ঘাসজমির উপরে ছড়িয়ে পড়ে আছে তিনটি মানুষ। যেভাবে পড়ে আছে, তাতেই বুঝলুম যে, তারা ঘুমোচ্ছে না, তাদের একজনের শরীরেও প্রাণ নেই। পাশেই এলোমেলোভাবে পড়ে আছে তিনটে লাঠি। লাঠির ডগায় একটা করে পুঁটলি বাঁধা।

বুকের মধ্যে হাতুড়ি পিটবার শব্দ হচ্ছে, জিভ শুকিয়ে গিয়েছে, খানিকক্ষণ সেদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম, তারপর কোনওক্রমে জিজ্ঞেস করলুম, “এরা কারা?”

আমার কথার কোনও উত্তর দিলেন না ভাদুড়িমশাই। ডান পাটা কালি চপ্পলের ভিতর থেকে বার করে নিলেন তিনি, তারপব সেই পায়ের সাদা মোজাটাকে খুলে নিয়ে মোজাটা ডান হাতে পরে নিলেন। পরক্ষণে পুঁটলি তিনটির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে তার ভিতরকার জিনিসগুলোকে বার করে আনলেন। সেগুলি পরীক্ষা করতে করতেই আমার দিকে তাকালেন একবার। বললেন, “ও-সব কথা পরে হবে। গেস্ট হাউসে ঢুকে থানায় এক্ষুনি ফোন করুন। বলুন, সর্সোতিয়ার ধারে তিনটে ডেডবি পড়ে আছে। দেরি না-করে ওরা কাউকে পাঠিয়ে দিক। …যান্, যান, আর দেরি করবেন না।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *