বিষাণগড়ের সোনা (ভাদুড়ি) – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

শেয়ার করুনঃ

১৫

পামেলাকে দেখে আমি যে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলুম, সে-কথা বলা-ই বাহুল্য। অন্ধকারে আমার কোয়ার্টার্সের মধ্যে এইভাবে তিনি বসে আছেন কেন? রাত তো কম হয়নি। এত রাতে আমার কাছে তাঁর আবার কী দরকার পড়ল?

বলতুম, “কী ব্যাপার? আপনি এখানে?”

পামেলা হাসলেন। বললেন, “খুব অবাক হয়ে গেছেন, তা-ই না?”

“হওয়াই তো স্বাভাবিক। আলো জ্বালেননি কেন?”

“আপনি গেছেন প্যালেসে, অথচ আপনার কোয়ার্টার্সে আলো জ্বলছে, এইটে দেখে মিশ্রজি হয়তো দোতলায় উঠে আসতে পারতেন। সেটা আমি চাইনি।’

“আলো না-জ্বেলে তা হলে ভালই করেছেন। কিন্তু দরকারটা কী?”

“সেটা বলবার আগে বরং আপনাকেই একটা প্রশ্ন করি। প্যালেসে আপনার ডাক পড়েছিল কেন?”

একে তো মনটা একটু খিঁচড়েই ছিল, তার উপরে এটাও বুঝতে পারছিলুম যে, যে-কোনও কারণেই হোক, ইতিমধ্যেই আমি কিছু-লোকের বিষনজরে পড়েছি, সুতরাং এই চাকরিটার মেয়াদ আর খুব বেশিদিনের নয়। তা হলে আর কোনও কথা গোপন করে লাভ কী। কিন্তু পামেলা তো শুনেছি, এখানকার পোলিটিক্যাল অফিসার রিচার্ড উইলসনের বোন, এঁকে যদি সব কথা খুলে বলি তো ইনি যে আজই সে-কথা এঁর ভাইয়ের কানে তুলে দেবেন না, তারও তো নিশ্চয়তা নেই। তিক্ততা তাতে বাড়বে বই কমবে না। তা হলে?

পামেলা নিশ্চয়ই আমার দ্বিধার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই বললেন, “আপনার সংকোচের কোনও কারণ নেই। সব কথা আমাকে খুলে বলুন। আসলে আমিও আপনাকে দু-একটা কথা বলব বলেই এসেছি, কিন্তু তার আগে আপনার কথাটা আমার জানা দরকার। …না না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, আমি কথা দিচ্ছি, যা বলবেন, তা শুধু আমিই জানব, অন্তত আমার কাছ থেকে আর কেউ তা কখনও জানবে না।”

কী জানি কেন, মনে হল, ইনি আমার সঙ্গে কোনও ছল-চাতুরির খেলা খেলতে আসেননি, এঁকে বিশ্বাস করা চলে। প্যালেসে আজ যা-যা ঘটেছে, সবই তাই খুলে বললুম। এমনকি, যার থেকে সবকিছুর সূচনা, সে-সব ঘটনার কথাও বাদ লিম না।

পামেলা সব শুনে চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “কুলদীপ খুব রেগে গিয়েছে, কেমন?”

“একা ওঁর কথা বলছেন কেন, রেগে রয়েছেন তো মনে হল সবাই। তফাত শুধু এই যে, কুলদীপ সিং যেখানে চেঁচিয়ে তাঁর রাগটা প্রকাশ করছেন, ওঁরা সেখানে চেঁচাচ্ছেন না। মিঃ উইলসন চালাক মানুষ, সম্ভবত বুঝতে পেরেছেন যে, চিৎকার-চেঁচামেচি করে আমার মুখ বন্ধ করা যাবে না। তাই গলার পর্দা উঁচুতে না-তুলে জানিয়ে দিলেন যে, মুখ না খোলাটাই আমার পক্ষে নিরাপদ হবে। প্রোমোশানের কথাটা তো রানি-মা’র কাছে আগেই আমি শুনেছিলুম। তা হঠাৎ যে কেন এই প্রোমোশান আমাকে দেওয়া হল, একই সঙ্গে সেটাও আমাকে জানিয়ে দিতে ভোলেননি।”

“কতভাবেই যে একটা লোককে চুপ করিয়ে রাখা যায়!”

“আমাকে চুপ করাবার ব্যবস্থা হল প্রোমোশানের ঘুষ দিয়ে।”

“অন্যভাবেও করা যেত।” পামেলা রহস্যময় হাসলেন। “তবে আপনার স্বাস্থ্যের পক্ষে সেটা ভাল হত না। তার চেয়ে বরং এ অনেক ভদ্র ব্যবস্থা।”

“বিলক্ষণ। কিন্তু কেন যে আমার মুখ বন্ধ করাবার জন্যে মাসে-মাসে এঁরা আমাকে বাড়তি আরও দেড়শো টাকা করে দিয়ে যাবেন, সেটাই ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। কী, না ছোট রাজকুমার লাঠি দিয়ে পিটিয়ে তিনটে কুকুর মেরেছেন, এটা আমাকে চেপে যেতে হবে। কেন, কেউ এ-কথা জানলে কী ক্ষতি হত তাঁর?”

“তাও বুঝতে পারছেন না? মস্ত ক্ষতি হত। লোকে জেনে যেত যে, রূপ একেবারে বদ্ধ উন্মাদ। আর দিল্লির কানে সেই কথাটা একবার পৌঁছে গেলেই হত সর্বনাশ। ববিকে বঞ্চিত করে তার ছোট ভাইকে সিংহাসনে বসাবার জন্য প্যালেস থেকে জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে তো, তখন আর সেটা সম্ভব হত না।”

আমার যেন ধাঁধা লেগে যাচ্ছিল। বললুম, “ববি… মানে আপনি কি বড় কুমারবাহাদুরের কথা বলছেন?”

পামেলা বললেন, “হ্যাঁ। তাকে তো আপনি দেখেছেন। যদ্দুর জানি, আপনার আলাপও হয়েছে তার সঙ্গে। অবশ্য প্যালেসের নতুন কেয়ারটেকার এসে পৌঁছেছেন শুনে প্রথম রাত্তিরেই সে যেভাবে এসে আপনার সঙ্গে আলাপ জমাবার চেষ্টা করেছিল, তা বোধহয় আপনার পক্ষে বিশেষ স্বস্তিজনক হয়নি।”

বললুম, “ওরেব্বাবা, সে তো এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা।”

“খুব ভয় পেয়েছিলেন?”

“পেয়েছিলুম বই কি! বন্দুক উঁচিয়ে উনি আমার বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন, আর আমি ভয় পাব না?”

“তারপরে আর এসেছিল?”

“এসেছিলেন। রানি-মা যেদিন ডেকে পাঠান, সেইদিন তাঁর কাছ থেকে ঘুরে এসে দেখি, বড় কুমারবাহাদুর আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। বললেন যে, আমি যদি মুরারিপ্রসাদের ধড়মুণ্ডু আলাদা করে দেব বলে তাঁকে কথা দিই, তো সেই মহৎ কাজের জন্যে তাঁর তলোয়ারটা তিনি এক্ষুনি আমাকে দিয়ে দিতে রাজি আছেন। পাঁচ হাজার টাকা ইনামও আমার মিলবে। তবে হ্যাঁ, কাটা মুণ্ডুটা তাঁকে দেখাতে হবে, তা নইলে তিনি এক কানাকড়িও দেবেন না।”

“শুনে কী মনে হল আপনার?”

যা মনে হয়েছিল, তা বলাটা খুব নিরাপদ হবে কি না, বুঝতে পারছিলুম না। তাই পামেলার কথা জবাব না দিয়ে বললুম, “ওই যা, আপনাকে এক কাপ চা পর্যন্ত খেতে বলা হয়নি। এখানে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা নেই, তবে হালে একটা স্টোভ কিনেছি, কিছু চা-পাতা, কনডেন্সড মিল্ক আর চিনিও স্টকে আছে। অনুমতি করেন তো স্টোভটা ধরিয়ে জল বসিয়ে দিই।”

পামেলা উইলসন খর চোখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “মিঃ চ্যাটার্জি, আমি নিশ্চয় এত রাতে আপনার এখানে চা খেতে আ। `নি। যা বলছিলেন, বলুন।”

“কী বলব। বড় রাজকুমার তো হুকুম দিলেন, যাও, ঘ্যাঁচ করে ওর যুণ্ডুটা কেটে নিয়ে এসো। শুনে আমি পড়লুম আতান্তরে। কী আর করি, হাত জোড় করে বললুম, কুমারবাহাদুর, আপনি যখন বলছেন তখন মুণ্ডু নিশ্চয় কাটাই উচিত। কিন্তু কাটি কী করে, আমি তো তরোয়াল চালাতেই জানি না।”

ভেবেছিলুম, আমার যুক্তি শুনে পামেলার মুখে হয়তো হাসি ফুটবে। কিন্তু ফুটল না। যেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, সেইভাবে তাকিয়ে থেকেই বলল, “কথা ঘোরাবার চেষ্টা করছেন কেন মিঃ চ্যাটার্জি? আপনি কি আমার প্রশ্নটার জবাব দিতে চান না?”

বললুম, “যাচ্চলে, প্রশ্নটা তো মনেই নেই।”

“বেশ, তা হলে মনে করিয়ে দিচ্ছি। দু’দিন তো ববিকে আপনি দেখলেন, তার কথাও শুনলেন। তা দেখে-শুনে আপনার কী মনে হল?”

আবার এড়িয়ে গেলুম প্রশ্নাকে। বললুম “কী আর মনে হবে, রাজ-রাজড়ার ব্যাপাব, তাঁরা তো এই ধরনের কথাই বলে থাবে ন, তাতে অবাক হলে চলবে কেন?”

পামেলার চোখ একটু অগেও জ্বলজ্বল করছিল। হঠাৎ সেই চোখের দৃষ্টি যেন নিবে গেল। স্নান গলায় তিনি বললেন, “বুঝতে পেরেছি, আপনি কিছু বলতে চান না। ঠিক আছে, তা হলে বরং আমিই বলি, কেমন? প্রথম দিনই বকে আপনার পাগল বলে সন্দেহ হয়েছিল, আর দ্বিতীয় দিন যখন তার কথা শুনলেন, তখন আপার সন্দেহটা একেবারে পাকা হয়ে গেল, আপনি বুঝে গেলেন যে, সে পাগলই বটে। অর্থাৎ কিনা বিষাণগড়ের দুই কুমারই ঘোর উন্মাদ। কী, ঠিক বলছি তো?”

এবারও আমি কোনও উত্তর দিলুম না। পামেলা বললেন, “কিন্তু না, মিঃ চ্যাটার্জি, আপনার ধারণাটা ঠিক নয়। এই দু’ জনের একজন পাগল ঠিকই, কিন্তু অন্যজন একেবারে স্বাভাবিক। … হ্যাঁ, আমি ববির কথা বলছি। বি পাগল নয়। এ টোটালি হার্মলেস ইয়াং ম্যান, হি উড়নট ইভন কিল এ ফ্লাই। ও শুধু এইসব কথা বলে লোককে চমকে দিতে চায়। কিন্তু লোকে তো তা বোঝে না, তারা ওকে পাগল ভেবে বসে’ তাতে অবশ্য ববিকে যাঁরা হটাতে চান, সেই দলটার খুব সুবিধে হয়ে গেছে। ডিকিকে তাঁরা বোঝাতে পেরেছেন যে, বড়কুমার পাগল, তাই ছোটকুমার রূপেরই সিংহাসনে বসা উচিত।”

“ডিকি মানে…”

“রিচার্ড উইলসন। বিষাণগড়ের পোলিটিক্যাল অফিসার। এ-রাজ্যে সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের প্রতিনিধি। অর্থাৎ আমার দাদা। …কেন, আপনি এ-কথা জানতেন না?”

“জানতুম। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছি না। আপনি তো পোলিটিক্যাল অফিসারের বোন, আর তাই প্যালেসে এই যে ক্ষমতা-দখলের খেলা চলছে, এ-খেলায় তিনি যে-পক্ষে আছেন, আপনারও তো সেই পক্ষেই থাকবার কথা। অথচ আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে যে, আপনি রয়েছেন তাঁর উল্টোদিকে এটা কী করে হয়?”

“না-হবার কী আছে!” অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকিয়ে পামেলা বললেন, “ডিকি যেহেতু অন্যায় করছে, অতএব আমাকেও অন্যায় করতে হবে? আমি আমার নিজের বিবেক-বুদ্ধিমতো চলতে পারব না? এই অন্যায়টা আমি মেনে নেব?”

এমনভাবে পামেলা কথা বলছিলেন বে, আবারও আমার মনে হল যে, এই মহিলা আমার সঙ্গে সত্যিই হয়তো কোনও চালাকির খেলা খেলতে আসেননি। মনে হল, এঁর যেটা বলবার কথা, অন্তত এখনও পর্যন্ত তা উনি খোলাখুলি আমাকে জানিয়েছেন। আর তাই, আমি যা ভাবছি, তাও হয়তো এঁকে খোলাখুলি জানানো যায়।

বললুম, “ন্যায়-অন্যায়ের কথা এ-সব ব্যাপারে যত কম বলা যায়, ততই ভাল। একে তো আমাদের দেশীয় রাজ্যগুলির কোনওটাই যে খুব ন্যায়ের পথে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আমার মনে হয় না, তার উপরে আবার এইসব ছোটখাটো নেটিভ স্টেটগুলির তো কথাই নেই, এদের প্রায় প্রত্যেকটিই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঘোর অন্যায়ের পথে। বিশ্বাস হচ্ছে না? বেশ, এই বিষাণগড়ের কথাই ধরুন। শুনছি, এখানকার রাজারা মূলত রাজস্থানের লোক, সেখানকার রাজবংশের সঙ্গেই এঁদের বিয়ে-শাদি হয়, এঁদের ধমনীতে রাজপুত-রক্তধারা বইছে। ছোট রানি-মা অবশ্য পঞ্জাব থেকে এসেছেন, কিন্তু সেখানকার যে ছোট একটা রাজ্য থেকে এসেছেন, সেটাও হিন্দু-রাজার রাজ্য, আর সেখানকার রাজাও যে রাজপুত, এই সহজ কথাটা ভুলে যাবেন না। তো প্রশ্ন হচ্ছে এটা তো রাজস্থান নয়, তার কাছাকাছি এলাকাও নয়, একেবারে ষোলো-আনা আদিবাসী-অঞ্চল, তা হলে হঠাৎ এখানে এই রাজপুত-রাজবংশের উদ্ভব হল কী করে?”

“আপনার কী মনে হয়?”

“আমার কী মনে হয়, সেটা একটু বাদেই বলব। তার আগে বলি, হিন্দুদের তীর্থ তো গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে, যেমন উত্তর দক্ষিণ আর পশ্চিম, তেমনি পূর্ব ভারতেও রয়েছে এমন অনেক বিখ্যাত মন্দির, হাজার-হাজার লোক যেখানে পুজো দিতে আসে। সেকালেও আসত। এই যেমন পুরীর জগন্নাথ মন্দির। সেকালেও বিস্তর লোক আসত ওখানে। রাজা-রাজড়ারাও আসতেন বই কী। তো ধরুন রাজস্থান কি পঞ্জাব কি ওইরকমই কোনও জায়গার এক রাজামশাইয়ের বুড়ো খুড়ো কি বুড়ি-মা’র তীর্থদর্শনের সাধ হয়েছ। ধরুন, কাছেপিঠে যে-সব তীর্থক্ষেত্র রয়েছে, সেগুলি তাঁর দেখা হয়ে গেছে, এবারে তিনি পুরীতে এসে জগন্নাথ-দর্শন করতে চান। তা তিনি তো আর একা আসবেন না, সঙ্গে বিস্তর লোকলস্কর পাইক-পেয়াদাও থাকবে। আর হ্যাঁ, থাকবে একজন জাঁদরেল গোছের দলপতিও। তো, অনেক ক্ষেত্রে যেমন সৈন্যবাহিনীর কাউকে দলপতি করে পাঠানো হত, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে আবার দলপতি করে পাঠানো হত রাজামশাইয়ের মেজো, সেজো কি ছোটভাইকে।”

“তাতে কী হয়েছে? সে তো খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার।”

হেসে বললুম, “স্বাভাবিক তো বটেই, তবে কিনা তীর্থদর্শনের পালা সাঙ্গ হবার পরে কিন্তু এই দলপতিদের অনেকেই আর দেশে ফিরে যেতেন না।”

“কেন?”

“তাও বুঝতে পারছেন না? ছোটখাটো সেনাপতিই হোক আর রাজামশাইয়ের ভাই-ই হোক, এমনিতে তো তাঁদের রাজা হবার কোনও সম্ভাবনাই নেই, অথচ রাজা সবার শখ রয়েছে ষোলো আনা। তাই কিছু লোককে সঙ্গে দিয়ে বৃদ্ধ খুড়োমশাই কি বুড়ি রানি-মাকে তাঁরা দেশে পাঠিয়ে দিতেন, আর বাছাই করা কিছু লোককে নিয়ে এই দূর-বিদেশেই যিনি যতটা পারেন জায়গা-জমি দখল করে প্রতিষ্ঠা করে ফেলতেন নতুন একটা রাজবংশ। কাজটা যে খুব কঠিন ছিল, তাও তো নয়। সবই তো জঙ্গুলে জায়গা, থাকবার মধ্যে আছে কিছু আদিবাসী। তাদেরও অবশ্য রাজা ছিল, কিন্তু সেই জংলি রাজাকে তাড়িয়ে দিয়ে তাঁর জায়গা-জমি কেড়ে নেওয়া কি খুব শক্ত কাজ? একটু খোঁজ নিন, তা হলেই জানতে পারবেন যে, এখানকার রাজপুত্র-রাজ্যগুলির কোনওটাই খুব প্রাচীন নয়। এই বিষাণগড়ের রাজবংশের বয়সই বা কত হবে মিস উইলসন? মেরেকেটে দুশো কি আড়াইশো বছর। এখানেও নিশ্চয় এক আদিবাসী-রাজা ছিলেন, বাইরে থেকে এসে অন্যায়ভাবে খাঁন জায়গা-জমি দখল করে নেওয়া হয়েছে। তো এই হচ্ছে ব্যাপার। আজ তা হলে হঠাৎ ন্যায়-অন্যায়ের কথা উঠছে কেন? তাও বুঝতুম যদি এঁরা সত্যিকারের স্বাধীন রাজা হতেন। কিন্তু তা তো এঁরা নন, সিংহাসনে যে-ই বসুক, রাজ্য তো আসলে আপনারা অর্থাৎ ইংরেজরাই চালাবেন।”

পামেলা স্থির চোখে আমাকে দেখছিলেন। এবারে চোখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, “আপনার কাছে এসে বোধ হয় আমি ভুলই করেছি। কী জানি কেন আমার “নে হয়েছিল যে, আপনি হয়তো ‘নামাকে সাহায্য করবেন। এটা আরও মনে হয়েছিল রূপকে সেদিন কীভাবে আপনি বাধ’ দিয়েছিলেন তা জানবার পর। ঠিক আছে, আমি তা হলে উঠি।

বললুম, “উঠবেন না, বসুন। আমি কিন্তু এমন কথা এখনও বলিনি যে, যে আপনাকে আমি সাহায্য করব না। তবে কিনা আমি যা বিশ্বাস করি, তাও তো আপনাকে জানানো দরকার।”

“কী বিশ্বাস করেন আপনি?”

“বিশ্বাস করি যে, বিষাণগড়ের সিংহাসনে কে বসল আর কে না-বসল, তা নিয়ে আমার মাথা ঘামানোর কোনও দরকার করে না। কেন করে না জানেন? লাগামটা তো আপনাদের হাতে। আর তাই ববি আর রূপের মধ্যে যে-ই রাজা হোক, তাতে কোনও ক্ষতিবৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। ইট ওন্ট মেক এনি রিয়েল ডিফারেন্স।”

“বাট ইট উইল।”

এমন তীব্র স্বরে, এমন কেটে-কেটে এই শব্দ তিনটিকে উচ্চারণ করলেন পামেলা যে, আমি চমকে গেলুম। বললুম, “এ-কথা কেন বলছেন?”

“এইজন্য বলছি যে, ববিকে আমি ওর তিন বছর বয়েস থেকে দেখছি।”

“আর রূপকে?”

“আমি যখন ববির গভর্নেস হয়ে এই প্যালেসে আসি, রূপের বয়েস তখন দেড় কি দু’বছর। রূপ আর-একটু বড় হবার পর ওর দায়িত্বও আমার হাতে এসে যায়। দুজনকেই আমি সমান আদর দিয়েছি, শাসনও কাউকে কিছু কম করিনি। ববি মা-হারা ছেলে, রূপের মা আছে। কিন্তু তাই বলে যে রূপকে আমি কিছু কম ভালবাসতুম, তা তো নয়। অথচ একটু যখন বড় হল ওরা, তখনই আমি বুঝতে পারলুম যে, দুই ভাইয়ের স্বভাব একেবারে দুই রকমের। ববি সাহসী, রূপ ভিতু। ববি উদার প্রকৃতির ছেলে, রূপ স্বার্থপর। তা ছাড়া ও খুব নিষ্ঠুরও বটে। বাগানে বেড়াতে বেড়াতে লক্ষ করতুম যে, দু’ভাই-ই ফড়িং আর প্রজাপতি ধরবার জন্যে সমানে দৌড়াদৌড়ি করছে। কিন্তু ববি যেমন সেগুলিকে ধরেই আবার উড়িয়ে দিচ্ছে, রূপ তা করছে না। সে সেগুলিকে পিষে পিষে মারছে। এই যে নিষ্ঠুরতা, বয়েস বাড়বার সঙ্গে-সঙ্গে এটা আরও বেড়ে যায়। বাট দেন হি ইজ আ কাওয়ার্ড। আর তাই মারবার জন্যে এমন প্রাণীকে ও বেছে নেয়, বাধা দেওয়ার ক্ষমতাই যার নেই। কিছুদিন আগেই ও হাতুড়ি মেরে একটা সিয়ামিজ বেড়ালের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। রানি-মা’র বেড়াল, কলকাতার এক ডিলারের কাছ থেকে একজোড়া আনানো হয়েছিল, তার একটা তো তাঁর ছেলের হাতে মরল, বাকিটা সারাদিন এখন বাড়িময় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর কী যে কাতরভাবে ডাকছে, সে আর বলবার নয়। কিচ্ছু খায় না, খেতে দিলে মুখ ফিরিয়ে নেয়, মনে হচ্ছে না-খেয়েই সেটা এবার মারা পড়বে। এমন সুন্দর প্রাণীকে কেউ মারতে পারে, তা আমি স্বচক্ষে না-দেখলে বিশ্বাস করতুম না। তারপর তো তিনটে ড্যাশুন্ডকেও মারল। কিন্তু ওই যে বললুম, হি ইজ আ কাওয়ার্ড। তাই মারতে হলে বেড়াল কি ড্যাশুন্ডকেই মারবে। বাড়িতে একজোড়া ডালম্যাশিয়ান কুকুরও তো রয়েছে, কিন্তু কই, তাদের ঘাঁটাবার মতো সাহস তো হয় না।”

একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন পামেলা। তারপর বললেন, “দয়া করে ভাববেন না যে, আমি বায়াস্ড। না, তা আমি নই। ডিকি এখানে পোলিটিক্যাল অফিসার হয়ে আসবার অনেক আগে থেকেই আমি এদের দেখছি। তেইশ বছর বয়েসে গভর্নেস হয়ে এই রাজবাড়িতে আমি এসেছিলুম, আর আজ আমার বয়েস সাঁইত্রিশ। চোদ্দ বছর ধরে এই ছেলে দুটোকে আমি দেখছি। তাই আজ আমি একেবারে ষোলো-আনা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি যে, দেয়ার ইজ আ স্ট্রিক অভ্ ম্যাডনেস ইন রূপ। অথচ ববিকে পাগল বানিয়ে ওকেই কিনা রাজা বানাবার চেষ্টা চলছে। ও যদি সিংহাসনে বসে তো বিষাণগড়ের দুর্গতির আর সীমা থাকবে না, হোয়্যারঅ্যাজ ববি উইল মেক অ্যান একসেলেন্ট রুলার। আমি তো ওকে ভাল করেই জানি, যত রকমের কন্সট্রেন্টই থাক্ না কেন, প্রজাদের যাতে মঙ্গল হয়, তার জন্যে ও সত্যি কিছু করবে।”

বললুম, “ইচ্ছে থাকলেই কি আর এই সেট্‌-আপে তা করা যায়?”

“কেন যাবে না?” পামেলা বললেন, “ইউ মাস্ট হ্যাভ হার্ড অভ্ সার্ সয়াজি রাও গায়কোয়ার অভ্ বরোদা অ্যান্ড মহারাজা মাধব রাও সিন্ধিয়া অভ্ গোয়ালিয়র। এই সেট্-আপের মধ্যেও কি তাঁরা তাঁদের প্রজাদের জন্যে কিছু কম কাজ করেছেন? না মিঃ চ্যাটার্জি, যাঁর কাজ করবার ইচ্ছে থাকে, হাজার বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও তিনি ঠিকই তাঁর কাজ করে যান। তাবৎ দোষ ইংরেজদের ঘাড়ে চাপিয়ে তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকেন না। আপনারা দেখে নেবেন, যদি সিংহাসন পায়, তা হলে ববিও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না।”

হেসে বললুম, “ঠিক আছে, মেনে নিচ্ছি যে, ববি হাত গুটিয়ে বসে থাকার ছেলে নয়, সুযোগ পেলেই ও আস্তিন গুটিয়ে কাজে নেমে পড়বে। কিন্তু তা হলে ও অমন উল্টোপাল্টা কথা বলে কেন? ও-সব কথা শুনলে তো লোকে ওকেই পাগল ভাববে।

“আমি তো বলেছি, ও ওইরকম কথা বলে লোকজনকে চমকে দিতে ভালোবাসে। কিন্তু সেটাও আসল কারণ নয়।”

“আসল কারণটা কী?”

পামেলা আবার খরচোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর গলার স্বর যথাসম্ভব নামিয়ে বললেন, “আসল কারণটা একমাত্র আমি জানি। ভেবেছিলুম, কাউকে সেটা জানাব না। কিন্তু যেমন আপনার তেমনি মিঃ ভাদুড়ির সাহায্য আমার পাওয়াই চাই। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। আপনার আছে. মাঝে-মাঝে তিনি আপনার কাছে আসেনও। রানি-মা’র সঙ্গে কুলদীপের যে কথাবার্তা হয়, তাতে মাঝে-মাঝেই দেখেছি মিঃ ভাদুড়ির প্রসঙ্গ এসে যায়। ওঁদের কথাবার্তার সবটা আমি বুঝি না। তবে যেটুকু বুঝতে পারি, তাতে মনে হয়, মিঃ ভাদুড়ি মাস্ট বি আ ভেরি রিসোর্সফুল ম্যান; যে-কোনও কারণেই হোক, প্যালেসের লোকজনেরা সম্ভবত তাঁকে একটু খাতির করে। একটু ভয়ও পায়। আর তাই তাঁর সাহায্যও আমার পাওয়া দরকার। কী মনে হয় আপনার? সাহায্য করতে তিনি রাজি হবেন?”

“সেটা তো তাঁর ব্যাপার, আমি কী করে বলব?”

“সাহায্য যদি না-ও করেন, আমি যে আদৌ তাঁর সাহায্যপ্রার্থী, সেটা তিনি ফাঁস করবেন না তো?”

“তা কেন করবেন? কোনও ভদ্রলোক তা কখনও করে?”

“বাস্, এইটুকুই আমি জানতে চেয়েছিলুম।” পামেলা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বললেন, “সে ক্ষেত্রে এই এতক্ষণ ধরে আমি যা-যা আপনাকে বলেছি, সবই আপনি তাঁকে বলুন। …না, শুধু বললেই যে হবে, তা নয়, তাঁর সঙ্গে আমার একবার দেখাও করিয়ে দিতে হবে।”

“দু-চার দিনের মধ্যে?”

“এত তাড়াতাড়ি নয়। কুলদীপ মাঝে-মাঝেই দিল্লি যাচ্ছে আজকাল। শুনছি একটা পিটিশান নিয়ে মে মাসেও একবার যাবে। তখন।”

“বেশ, তা-ই হবে। কিন্তু একটা কথা আপনি এখনও বলেননি।”

“ববি কেন পাগলামির ভান করে, এই তো?” আবার একটু চুপ করে রইলেন পামেলা। তারপর বললেন, “ও চায় যে, লোকে ওকে পাগল ভাবুক। কেননা…কেননা একমাত্র তা হলেই ও বেঁচে যাবে। বাট মিঃ চ্যাটার্জি, আই’ম অ্যাফ্রেড…আই’ম ভেরি মাচ অ্যাফ্রেড…”

“কেন?”

“আই থিংক দে হ্যাভ সিন থ্র হিজ গেম! আর সেইজন্যেই …”

“সেইজন্যেই কী?”

“সেইজন্যেই এই প্যালেসে ও আর নিরাপদ নয়। যেমন করেই হোক, এখান থেকে ওকে সরে যেতে হবে।”

“সরে কোথায় যাবে?”

“কেন, রাজস্থানে, মাধোপুর স্টেটে। সেইখানেই তো ওর মামাবাড়ি। মাধোপুর ইজ আ মাচ বিগার স্টেট দ্যান বিষাণগড়। সেখানে ওর দাদামশাই এখনও বেঁচে। তা ছাড়া ওর মামারাও রয়েছেন।”

“সেখানে গিয়ে ও কী করবে?”

একেবারে অবাক হয়ে পামেলা খানিকক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “এও কি একটা প্রশ্ন হল? দে আর ববি’জ ওউন পিপ্‌ল, অ্যান্ড অফকোর্স দে উইল লুক আফটার হিজ ইন্টারেস্ট। তাঁরা কি কিছু জানেন না ভেবেছেন? তাঁরা সবই জানেন। ববিকে যে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করবার চেষ্টা চলছে, তাও তাঁদের জানতে বাকি নে২। অ্যান্ড দে ওন্ট্ টেক ইট লায়িং ডাউন।”

“এত সব তাঁরা জানলেন কী করে?”

পামেলা হাসলেন। বললেন, “তা আমি বলব না। তবে একটা কথা জেনে রাখুন। আই ওয়ার্কড ইন মাধোপুর প্যালেস ফর টু ইয়ার্স। তাঁরাই সেখান থেকে আনাকে এখানে পাঠিয়েছিলেন।”

কথাটা শেষ করেই উঠে দাঁড়ালেন পামেলা। আমার লেখার টেবিলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার এখানে মধ্যপ্রদেশের উপরে খানকয় বই রয়েছে দেখছি। আজকের জন্যে একখানা দিন তো।”

“যেখানা খুশি নিয়ে যান।”

“যে-কোনও একখানা দিন।” আবার হাসলেন পামেলা। “আমি যে আপনার এখানে এসেছিলুম, আর ছিলুমও যে অনেকক্ষণ, সেটা কি আর প্যালেসে কারও অজানা থাকবে ভেবেছেন? এ নিয়ে প্রশ্নও উঠবে। তখন একটা-কিছু কারণ দেখাতে হবে তো। বলব যে, এই বইখানার জন্যে এসেছিলুম।”

যে-বইখানা এগিয়ে দিলুম, সেখানা হাতে নিয়ে চলে যেতে-যেতে দরজার কাছ থেকেই গামেলা আবার ঘুরে দাঁড়ালেন। নিজের হাতব্যাগ থেকে একটা প্যাকেট বার করলেন তিনি, তারপর আমার দিকে সেটা ছুড়ে দিয়ে বললেন, “এটা সাবধানে রাখুন। ভিতরে কী আছে, তা যেন খুলে দেখতে যাবেন না। প্যাকেটটা কালই আপনার বন্ধুকে দিয়ে দেবেন। ওতে যা রইল, তা হয়তো পরে কখনও তাঁর কাজে লাগতে পারে।…আর হ্যাঁ, আর-একটা কথা আপনাকে জানানো দরকার। আমি ইংরেজ নই। তবে ইংরেজদের সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক আছে বটে।”

হতভম্ব হয়ে বললুম, “সে কী, আপনি রিচার্ড উইলসনের বোন নন?”

“বোন অবশ্যই।” রহস্যময় হেসে পামেলা বললেন, “তবে কিনা হাফ-সিস্টার। ডিকি অবশ্য সেটাও স্বীকার করতে চাইবে না। তা না-ই করুক, আমার তা নিয়ে কোনও নালিশ নেই।”

আমি কিছু বলছি না দেখে পামেলা বললেন, “একটু ধাঁধা লেগে যাচ্ছে কেমন?”

বললুম, “তা তো লাগতেই পারে।”

“ঠিক আছে, সবই তা হলে শুনুন। আমাদের বাবা এক, কিন্তু মা আলাদা। ডিকির বাবা যখন আর্মি-অফিসার হয়ে এ-দেশে আসেন, বউ-বাচ্চা তখন তাঁর সঙ্গে আসেনি। তার ফল যা হবার, তা-ই হল, এ-দেশি একটি মেয়ের সঙ্গে তিনি সংসার পেতে বসলেন। তবে কিনা ডিভোর্স পাননি তো, তাই বিয়েটা আর করা হল না। পেলেও করতেন কি না, সেটা অবশ্য সন্দেহের ব্যাপার। এখানকার সাহেবদের মহলে তা হতে ঘোর নিন্দে রটে যেত যে! তো এই হচ্ছে ব্যাপার। দয়া করে আর-কিছু জিজ্ঞেস করবেন না।”

পামেলা উইলসন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *