আসল খুনির সন্ধানে (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

তেরো

তিন সপ্তাহের বেশি হল একেনবাবু কলকাতায় এসেছেন, বিকাশ সেনের মৃত্যুর পিছনে কার মাথা কাজ করছে তার কোনো হদিশই পাননি। শুধু বিকাশ সেন নয়, পর পর আরও তিনটে খুন হয় গেল কিন্তু আসল লোকটি ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেল। শুধু বেঁটেখাটো একটি লোক রমেশবাবুর এই তথ্য থেকে কাউকে সন্দেহ করতে হলে, সেই জালে কলকাতার লাখ লাখ লোক আটকা পড়বে। তবে সার্চটা আরও রিফাইন করা যায়। শুধু বেঁটেখাটো নয়, লোকটি নিঃসন্দেহে মোটামুটি অর্থবান। তিন লাখ টাকা এই যুগে বিরাট অঙ্ক না হলেও হেলাফেলা করে ফেলে দেওয়ার জিনিসও নয়। আরেকটা ব্যাপারও স্পষ্ট যে, খুনের কারণ আর্থিক নয়; যাদের হত্যা করা হয়েছে, তাদের এমন কিছু লুক্কায়িত ধনসম্পদ আছে বলে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর যে সম্ভাবনাটা ধীরে ধীরে দানা বাঁধছিল। শেষ হত্যাকাণ্ডে সেটাও চুরমার হয়ে গেল। শেষ খুনটা করা হল এক বৃদ্ধকে, কোনো যুবককে নয়। হোয়াই? কোনো সদুত্তর নেই। এই প্রথম একেনবাবু মনে হল, উনি একটা পার্ফেক্ট মার্ডারের সম্মুখীন হয়েছেন। খুনের অস্ত্র পাওয়া গেছে, খুনিকে ধরা গেছে, কিন্তু চারটে খুনের পিছনে আসল যে মাথা– তার কোনো চিহ্ন নেই। রমেশবাবু খুন করলেও, তিনি এক্ষেত্রে একটা হাতিয়ার মাত্র। লোকে বন্দুক জোগাড় করে গুলি করে। এক্ষেত্রে বন্দুক হাতে একটা লোক জোগাড় করে তাকে দিয়ে গুলি করানো হয়েছে। আসল খুনি আগাগোড়া যে আড়ালে ছিল, সেই আড়ালেই রয়ে গেছে। রমেশবাবু খুন করেছে টাকার লোভে। কিন্তু যে লোকটা খুনগুলো করাতে এতগুলো টাকা দিয়েছে, সে কেন দিয়েছে, তার মোটিভটা কী? লোকটার অস্তিত্ব জানা গেছে রমেশবাবুর স্বীকারোক্তি থেকে। ম্যাডক্স স্কোয়ারে রমেশবাবুর সঙ্গে তার বার কয়েক দেখা হয়েছে এই তথ্যটুকু ছাড়া আর কিছুই জানা যায়নি।

 

“তুমি কি ছবিটা লাগাবে না? কতদিন বাইরের ঘরের টেবিলে ওটা থাকবে?” একেনবউদির গলায় বিক্তি।

 

“আরে না, লাগাচ্ছি। দেয়ালে তো একটা হুক লাগানো আছেই। ছবিতে শুধু একটা দড়ি বাঁধতে হবে।”

 

“ছবিটা উলটিয়েও দেখোনি তুমি। ওটাতে চেন লাগানো আছে, শুধু টাঙিয়ে দিতে হবে। আরেকটু লম্বা হলে নিজেই লাগাতে পারতাম।”

 

একেনবাবু বেঁটে হলেও একেনবউদির থেকে একটু লম্বা।

 

“ঠিক, চেন তো আছে, এখুনি লাগাচ্ছি।”

 

দেয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দেয়ালের হুকটা কোথায় ঠাহর করে হুকের মধ্যে চেনটা ঢোকাতে দু-একবার চেষ্টা করতে হল। তারপর ছবিটা ডানদিক বাঁ-দিক করে একটু অ্যাডজাস্ট করতে হল। নাঃ, ঠিক মতোই বসেছে।

 

ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একেনবাবুর হঠাৎ মনে পড়ল ওঁর গুরুদেব বনবিহারীবাবুর কথা। তিনি সবসময়ে বলতেন, ভাবার চেষ্টা করো, তদন্ত করতে গিয়ে কী কী জিনিস তুমি দেখেছ, যার মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝোনি। নতুন ভাবে ভাবনা শুরু করো সেখান থেকে। আসল সূত্র সাধারণত সেখানেই লুকিয়ে থাকে। ভাগ্যিস এই ছবিটা নিয়ে উনি তদন্ত করছেন না! এখনও ধরতে পারলেন না, বিনয় দত্ত এ-রকম বিসদৃশ ‘ত্রিভুজ কেন আঁকছিলেন? ছবিতে শুধু একটা বস্তুই অ্যাবস্ট্রাক্ট নয়, সেটা হল কলকাতার আবছা ম্যাপ। কিন্তু তাতে বিনয় দত্তের কোনো কৃতিত্ব নেই, ক্যানভাসের ওপর নিশ্চয় কোনো ফটোগ্রাফি শপকে দিয়ে প্রিন্ট করানো হয়েছে। একেনবাবুর মনে পড়ল নিউ ইয়র্কের মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্টস-এ ইউরোপিয়ান এক আর্টিস্টের আঁকা ছবি দেখেছিলেন– খবরের কাগজের আবছা ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর কালো, লাল আর হলুদের ছোপ, যার মাথামুণ্ডু কিছু নেই। ওটা নাকি অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম! ওই আর্টিস্ট নাকি এ-রকম ছবি এঁকেই বিখ্যাত হয়েছেন। লাখ লাখ টাকা দিয়ে আর্ট কালেক্টাররা ওইসব ছাইভস্ম কেনে! ওই অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেশনিজম-ই হল বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ, যেটা খোকামামা বলে গেল। অভিব্যক্তিবাদ’– কথাটাই তো মনে রাখা কঠিন! মেসেজ আবিষ্কার তো দূরের কথা! প্রমথবাবু ছবি বোঝেন না বলে ওঁকে যতই গালাগাল দিন, একেনবাবুর বিশ্বাস ত্রিভুজের বদলে বিনয় দত্ত লাল-হলুদের ছোপ লাগালেও আর্ট কালেক্টাররা কিনত। কিনত ছবির জন্যে নয়, ছবির তলায় বিনয় দত্তের সইটার জন্যে। লোকে যে-রকম ফ্যাসন ডিজাইনারদের তৈরি রংচঙা উল্কট স্টাইলের পোষাক লাখ লাখ টাকা দিয়ে কিনে সগর্বে গায়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ায়! বিনয় দত্তের অরিজিন্যাল নিজের কাছে থাকা কি চাট্টিখানি কথা!

 

আরেকবার তাকালেন ছবিটার দিকে…

 

দুত্তোর! একেনবাবু ফিরে এলেন নিজের সমস্যায়। এই চার-চারটে মৃত্যুর তদন্ত করতে গিয়ে কী দেখেছেন যেটা দুর্বোধ্য? দুর্বোধ্য হল কানেকশন। এই চারজনের মধ্যে একটা যোগসূত্র নিশ্চয় আছে। একটা কানেকশন তো সরাসরি, সঞ্জয় চৌধুরী অরূপবাবুর মেসোমশাই। বিকাশ সেনকেও অরূপবাবু ছেলেবেলায় চিনতেন, কিন্তু পছন্দ করতেন না, বাজে ক্যারেক্টার বলে। বিকাশ সেনের ক্যারেক্টার নিয়ে একটা সংশয় ওঁর শ্বশুর ব্রজেন রায়ও আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছেন। কিন্তু তন্ময় দত্তকে এই তিনজনের মধ্যে ঢোকানো যাচ্ছে না। তন্ময় দত্ত, বিকাশ সেন আর অরূপ চৌধুরীর একমাত্র সম্ভাব্য যোগসূত্র হচ্ছে। মল্লিকা। সঞ্জয় চৌধুরীর এর মধ্যে আসাটা শুধু রেস্টুরেন্ট চেন-এর পার্টনার হিসেবে, যদি মনে করা যায় খুনগুলির পিছনে শুধু মল্লিকা নয়, দেবু সেনও জড়িত। এই চারটে খুন হল মল্লিকা আর দেবু সেনের অশুভ আঁতাতের ফলে। মল্লিকা তার রাগ চরিতার্থ করল, দেবু সেনের লাভ রেস্টুরেন্ট চেন-এর ইনকাম… অরূপবাবুর মেসোর অবর্তমানে মাসিকে অতি সহজেই ঠকানো যাবে।

 

নাঃ, ব্যাপারটা খুবই কমপ্লিকেটেড।

 

চিন্তায় ছেদ পড়ল একটা ফোনের আওয়াজে। ফোনটা ধরলেন একেনবউদি। ফোন হাতে নিয়ে ঘরে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আজ বিকেলে বাড়িতে থাকবে?”

 

“কেন?”

 

“দোলারা বেড়াতে আসতে চায়।”

 

“আসতে বলো, কোথায় আর যাব?”

 

“বলছে তো থাকবে,” একেনবাবু শুনলেন বোনকে বললেন গিন্নী। “তবে ওর কি মাথার কোনো ঠিক আছে!” আরও কিছু বলছিলেন একেনবউদি, কানে এল না। একটা হোয়াটসঅ্যাপ ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছ থেকে। তন্ময় দত্তর রেসিউম। পরে অবনী গুপ্তরটা আসবে। একেনবাবুর মাথায় একটা অন্য একটা চিন্তা ঢুকেছে।

 

খোকামামাকে ফোন করলেন প্রথমে। “তুমি কোথায় ইন্টারভিউ করেছিলে বিনয় দত্তকে?… শিওর?”

 

পরের ফোনটা রাখাল দত্তকে, “ভাই রাখাল, একটা বিশেষ অ্যাকাউন্টের খবর দরকার।”

 

রাখাল দত্ত একেনবাবুর অনুরোধ শুনে অবাক।

 

“এটা কি স্যার পারা যাবে! উপর মহলের অনেক অ্যাপ্রুভাল লাগবে।”

 

“এটা তোমাকে বার করতেই হবে ভাই, তার জন্যে যা করণীয় সব করো এবং তাড়াতাড়ি।”

 

ভারতবর্ষের সুবিধা হল, আইন কানুন যেমন অনেক আছে, সেগুলোকে পাশ কাটিয়ে অনেক কাজ হাসিলও করা যায়। একেনবাবুর অনুরোধ রাখাল দত্ত রাখলেন। কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের উত্তরটা এসে গেল। উত্তরটা দিয়ে রাখাল দত্ত বললেন, “আরেকটা সুখবর দেব, একটা কানেকশন পেয়েছি। অরূপবাবুর মেসো সঞ্জয় চৌধুরী বহু বছর রাঁচিতেই পোস্টেড ছিলেন। অরূপবাবু বোর্ডিং স্কুল থেকে সেখানেই ছুটি-ছাটাতে যেতেন।”

 

“আমিও ভাই সেটা অনুমান করছিলাম, বিহার ক্যাডারে যখন ছিলেন। এখন রাঁচি না হয় ঝাড়খন্ডে, তখন তো বিহারেই ছিল।”

 

“তা বুঝলাম, কিন্তু তন্ময়বাবু?”

 

“আরে তন্ময়বাবুও ছিলেন, সেটাই জানতে পারলাম ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের হোয়াটসঅ্যাপ পেয়ে। তন্ময়বাবু পড়তেন বিশপ ওয়েস্টকট বয়েজ স্কুল-এ। সেটা রাঁচিতে।”

 

তারমানে বিকাশ, অরূপ আর তন্ময় তিনজনেই সম্ভবত কোনো এক সময়ে রাঁচিতে ছিলেন।”

 

“ব্যাস, তাহলে চলে এসো ভাই।”

 

“আপনার বাড়িতে?”

 

“নইলে আবার কোথায়?”

 

একেনবাবু আবার খোকামামাকে ফোন করলেন, “খোকামামা, যে ট্র্যাজেডির কথা বলছিলে… সেটা নিয়ে আরেকটু জানতে চাই… বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে আর ফেরেনি?… বন্ধুরা কিছু বলতে পারেনি?… পুলিশ?… সেখান থেকে আবার অদৃশ্য?”

 

.

 

রাখাল দত্ত আর স্বামীসহ দোলা প্রায় একই সময়ে বাড়িতে ঢুকল।

 

“এই যে দোলা ম্যাডাম আর অনির্বাণ, এসো, এসো।” বলে অভ্যর্থনা করলেন একেনবাবু। সেই শুনে একেনবউদি বেরিয়ে এসে দেখেন রাখাল দত্তও এসেছেন।

 

চকিতে স্বামীর দিকে তাকালেন একেনবউদি।

 

“আমি রাখালের সঙ্গে একটু বেরোচ্ছি, তুমি দোলা আর অনির্বাণের সঙ্গে গল্প করো। আমরা শিগ্নিরি ফিরে আসব। এসে চা খাব।”

 

একেনবউদি দোলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলি তো, কী বলেছিলাম?”

 

“না, না এক্ষুনি ফিরব, সত্যি।” বলে রাখাল দত্তকে বললেন, “চলো ভাই।”

 

গাড়িতে উঠে রাখাল দত্ত বললেন, “প্লিজ, একটু খুলে বলুন স্যার।”

 

“দাঁড়াও, তার আগে একটা জিনিস কনফার্ম করি।” গাড়ি থেকেই বাড়িতে একটা ফোন করলেন একেনবাবু।

 

“শোনো, দোলাকে বাইরের ঘরের ছবিটা দেখাও, দেখো আমার পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোকটিকে চিনতে পারে কিনা।”

 

একটু বাদেই উত্তেজিত দোলা ফোনটা ধরে বলে, “হ্যাঁ জামাইবাবু, ইনিই সেই ভদ্রলোক, যিনি আমার কাছ থেকে ডিজাইনটা কিনেছিলেন। আপনি এঁকে চেনেন?”

 

“ফিরে এসে কথা হবে,” ফোনটা ছেড়ে দিলেন একেনবাবু।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *