শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
উনিশ
একেনবাবু যখন গভীর ভাবে কিছু চিন্তা করেন, তখন ভীষণ পা নাড়ান। আমার ধারণা ওঁর চিন্তার গতির প্রোপোরশানালি পা নাড়াটা বাড়ে। সেদিন যখন ঘন ঘন পা নাড়ছেন। ওঁর ফাইল থেকে একটা কাগজ হঠাৎ নীচে পড়ে গেল। আমি পাশে বসে পরীক্ষার খাতা গ্রেড করছিলাম। পায়ের কাছে কাগজটা পড়ায়, নীচু হয়ে তুলতেই বেশ কয়েকটা নাম চোখে পড়ল। আব্দুল, টম ক্যাসেডি, হাওয়ার্ড লংফেলো… এই তিন জনের সঙ্গে আরও কয়েকটা নাম দেখে বুঝলাম, এদের সবাইকে সম্ভবত রোহিত রায়ের খুনি বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
“এটা কি সাসপেক্ট লিস্ট?” বলে আমি কাগজটা এগিয়ে দিতেই একেনবাবু ব্যস্তসমস্ত হয়ে ওটা ফাইলে ঢুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু তার আগেই একটা নাম আমার চোখে পড়েছে, সেটা সুভদ্রামাসির নাম!
একেনবাবুকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, “সুভদ্রামাসির নাম এখানে কেন?”
একেনবাবু একটু চুপ করে বললেন, “আপনাকে বলিনি স্যার, কারণ সন্দেহ আর সত্যর মধ্যে তো অনেক তফাৎ।”
“ব্যাপারটা পরিষ্কার করে বলুন, কেন আপনি বা পুলিশ ওঁকে সন্দেহ করছেন?”
“আমাদের কাজটা নচ্ছার স্যার। সবাইকে সন্দেহ করতে হয়।”
“আপনি এড়িয়ে যাচ্ছেন কথাটা। আমার নামও কি লিস্টে আছে?”
“কী যে বলেন স্যার!”
“তাহলে সুভদ্রামাসির নাম কেন আছে?”
“আপনাকে বলছি স্যার, কিন্তু আপসেট হবেন না। আপনার কাছে শুনেছি স্যার, মাসিমার ছেলে স্কুল যাবার সময়ে গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে মারা যায়। কিন্তু আপনি জানেন কিনা জানি না, সেই গাড়ি যিনি চালাচ্ছিলেন তিনি রোহিত রয়।”
“কিন্তু সে তো ষোলো বছর আগের ঘটনা… একটা অ্যাকসিডেন্ট! আর সুভদ্রামাসি রোহিত রায়কে ছেলের মতোই ভালোবাসতেন। তাহলে এই সন্দেহটা আসছে কোত্থেকে?”
“মিস্টার রোহিত রয়ের মা ম্যাডাম হিলডার কাছ থেকে।”
“তার মানে?”
“ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের লোক ম্যাডাম হিলডার সঙ্গে জার্মানিতে যোগাযোগ করেছেন। তাঁর বয়ান অনুসারে মাসিমা ওঁর ছেলেকে সবসময় আগলে আগলে রাখতেন। ছেলে যখন নার্সারি স্কুলে যেতে শুরু করল, তখন স্কুলে যাওয়া নিয়ে একটা সমস্যা হল। মাসিমা স্কুলবাসে ছেলেকে পাঠাতে চান না। তিনি নিজেও নিউ ইয়র্ক শহরের ভেতর গাড়ি চালাতে ভয় পান। সুতরাং রিচার্ডমেসো ছেলেকে পৌঁছে দিতেন। যেদিন পারতেন না, সেদিন ম্যাডাম হিলডা কাজে যাওয়ার পথে বাচ্চাটিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে যেতেন। মিস্টার রোহিত রয় সেই সময়ে সবে গাড়ি চালানো শিখেছেন। মাসিমা বারবার করে ম্যাডাম হিলডাকে বলে দিয়েছিলেন, ওঁর ছেলে গাড়িতে থাকলে রোহিত যেন গাড়ি না চালায়। যেদিন অ্যাকসিডেন্ট হয় সেদিন মিস্টার রোহিত রয় গাড়িতে উঠে মাকে জোর করতে থাকেন তিনি গাড়ি চালাবেন। ম্যাডাম হিলডা ছেলের আবদার ফেলতে না পেরে রাজি হন। তারপরেই ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। পুলিশ যখন আসে, তখন ম্যাডাম হিলডা ছেলেকে বাঁচাতে নিজে গাড়ি চালাচ্ছিলেন বলেন। মাসিমা ছেলের মৃত্যুর পর পাগলের মতো হয়ে যান। কিছুদিন ওঁকে হাসপাতালেও থাকতে হয়। মিস্টার রোহিত রয়ের বাবার হার্ট অ্যাটাকও তার অল্প ক’দিনের মধ্যেই হয় এবং উনি তাতে মারা যান। তার পরপরই ছেলেকে নিয়ে ম্যাডাম হিলডা জার্মানিতে চলে যান।”
“তাহলে সে নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে কেন?”
“কারণ ম্যাডাম হিলডাকে মিস্টার রয় কয়েকদিন আগে বলেছিলেন যে উনি সুভদ্রামাসিকে সত্যটা জানাবেন।”
“কেন?”
“কারণ খুব স্পষ্ট নয়।”
“রোহিত কবে কথাটা বললেন সুভদ্রামাসিকে?”
“সেটা জানি না স্যার। আদৌ বলেছিলেন কিনা তাও জানি না।”
“তাহলে?”
“কিন্তু যদি বলে থাকেন। তাহলে পুরোনো ক্ষতটা আবার নতুন করে দেখা দেবে। রোহিত ওঁর কোলের ছেলেটির মৃত্যুর জন্য দায়ী –একথা যতই তিনি ভাববেন, ততই শোকে দিশাহারা হবেন। মাসিমার মনে হতে পারে, এই অন্যায় এবং এতদিনের এই ছলনা ক্ষমার অযোগ্য। এখন শুধু কল্পনার খাতিরেই ধরুন, মাসিমা খুব ভোরে মিস্টার রয়ের অ্যাপার্টমেন্টে আসেন।”
“সিকিউরিটি গার্ডের নজর এড়িয়ে?”
“এক সময়ে ঐ অ্যাপার্টমেন্টেটা মাসিমাদেরই ছিল। তার একটা চাবি মাসিমার কাছে থেকে যেতে পারে। সেটা ব্যবহার করে গার্ডদের চোখ এড়িয়ে স্বচ্ছন্দেই রেসিডেন্টদের স্পেশাল দরজা দিয়ে ঢুকে সোজা এলিভেটরে উঠতে পারেন। সেক্ষেত্রে রোহিত সকালে মাসিমাকে দেখে অবাক হবে। তারপর কফি বানিয়ে গল্প করার জন্য বসবে। মাসিমা এই সময়ে অতর্কিতভাবে হ্যান্ডগান বার করে গুলি করে দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে যাবেন। বাড়ি পৌঁছে মিথ্যে অজুহাতে ম্যাডাম এঞ্জেলিকাকে ফোন করবেন, মিস্টার রয়ের সকালে আসার কথা ছিল, কিন্তু আসেননি –এই বলে। এটা কি একেবারেই অসম্ভব?”।
আমি বলতে যাচ্ছিলাম, অসম্ভব! কিন্তু হঠাৎ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল –সেদিন যখন সুভদ্রামাসির বাড়ি থেকে চলে আসছি, তখন কেমন সহজে উনি পেছন পেছন হেঁটে আসছিলেন। একেনবাবু ‘আপনি আসছেন কেন’ বলাতে থতমত খেয়ে কেমন নড়বড়ে হয়ে গেলেন! আরেকটা ব্যাপারও মনে ঝিলিক দিল, কেন সেদিন ছেলে বাবুর মৃত্যু নিয়ে সুভদ্রামাসি এত কান্নাকাটি করছিলেন? রোহিত রয়ের মৃত্যুর সঙ্গে তার আসল যোগটা কোথায়? দুজনেই সন্তানসম বলে, না ছেলের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিয়ে ইমোশনকে কন্ট্রোল রাখতে পারেননি? আরেকটা প্রশ্নও আমার মাথায় নতুন করে জাগল, কী করে সেদিন ফোন করে একেনবাবুকে বললেন রোহিত মার্ডারড হয়েছে। এটা তো সুভদ্রামাসির জানার কথা নয়! এঞ্জেলিকা যদি ওঁকে হত্যাকান্ড বলে থাকেন তাহলে অন্যকথা। কিন্তু বলেছিলেন কি?
আমাকে বিচলিত দেখে একেনবাবু বললেন, “জানি স্যার আপনি আপসেট হবেন, সেইজন্যই কিছু বলতে চাইনি।”
“যা বললেন তা আমার পক্ষে চিন্তা করাও কঠিন। আপনি কি সত্যিই বিশ্বাস করেন সুভদ্রামাসি এই মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত?”
“না স্যার। কিন্তু তদন্তের কাজে কোনো কিছুই উপেক্ষা করা উচিত নয়।”
“এবার জিজ্ঞেস করি, কেন করেন না? আপনি যা বললেন, তাতে তো আমারই বিশ্বাস টলে যাচ্ছে।”
“প্রথমত, মিস্টার রয়ের ব্যালাস্টিক টেস্টের রিপোর্ট অনুযায়ী গুলিটা টোয়েন্টি-টু ক্যালিবারের, কিন্তু কপালের ক্ষতটা তার তুলনায় অনেক বড়ো। অর্থাৎ একসেন্ট্রিকভাবে চক্কর চক্কর খেতে খেতে গুলিটা ঢুকেছে এবং বুলেটে কোনো মার্কিং পাওয়া যায়নি।”
“বুলেটে দাগ থাকে নাকি?”
“সাধারণত থাকে স্যার। তার থেকে ধরতে পারা যায়, কোন হ্যান্ডগান থেকে ফায়ার করা হয়েছে। এটা স্পেশাল হ্যান্ডগান। মাসিমা পেশাদার খুনি নন যে খুন করার জন্য এরকম হ্যান্ডগান জোগাড় করবেন। দ্বিতীয়ত, হত্যাকান্ডটা সম্ভবত ঘটেছে আটটা থেকে ন’টার মধ্যে।”
“সেটা জানা গেল কি করে?”
“কারণ পাশের অ্যাপার্টমেন্টে বাথরুম রিমডেল করা হচ্ছিল। সাড়ে সাতটায় হ্যাঁন্ডিম্যানরা এসে টাইল ভাঙছিল। আটটা নাগাদ মিস্টার রয় ভীষণ আওয়াজ হচ্ছে বলে সিকিউরিটিকে কমপ্লেইন করেছিলেন। নটার সময়ে হ্যাঁন্ডিম্যানরা পনেরো মিনিটের কফিব্রেক নেয়। মিস্টার লংফেলো ন’টা-পাঁচের একটু পরে এসে ওঁকে মৃত দেখেন।” ।
একেনবাবু বলে চললেন, “যদি ধরি মৃত্যু আটটাতেই ঘটেছে। সেক্ষেত্রেও ঐ সময়ে ম্যানহাটান থেকে বেরিয়ে সুভদ্রামাসির পক্ষে সাড়ে দশটার আগে বাড়ি পৌঁছে ম্যাডাম এঞ্জেলিকাকে ফোন করা সম্ভব নয়।”
“নয় কেন?”
“কারণ ওই দিন লিঙ্কন টানেল আর জর্জ ওয়াশিংটন ব্রিজ দুটোই জ্যাম ছিল –দু’ঘন্টার বেশি লাগছিল শুধু ব্রিজ পার হতে।”
তখন আমার মনে পড়ল ব্রিজ জ্যামের কথাটা সুভদ্রামাসিও বলেছিলেন সেদিন ফোনে।
“কিন্তু ফোন তো মোবাইল থেকেও করতে পারতেন?”
“তা পারতেন স্যার। কিন্তু ম্যাডাম এঞ্জেলিকার কাছে যে ফোনটা এসেছিল, সেটা ওঁর বাড়ি থেকে। তৃতীয়ত,…”।
আমি একেনবাবুকে থামিয়ে দিলাম, “আর বলতে হবে না। কিন্তু আমায় বলুন, সুভদ্রামাসি যদি সন্দেহের তালিকায় থাকেন, তাহলে সুভদ্রামাসির বন্ধু এঞ্জেলিকা বা রোহিতের বন্ধু আপনার সেই জিনিওলজিস্ট বাবু পিন্টো নেই কেন?”
“নেই, সেটা তো বলিনি স্যার। সন্দেহের প্রশ্ন নয়, সম্ভাবনার প্রশ্ন। পুলিশ এখন পর্যন্ত জনা পঞ্চাশ লোককে জিজ্ঞেসাবাদ করেছে। আমার লিস্টে তো অল্প নামই আছে।”
“আপনার লিস্ট আর পুলিশের লিস্ট আলাদা মানে? আমার তো ধারণা আপনি পুলিশের সঙ্গে আছেন এই ইনভেস্টিগেশনে?”
“কী যে বলেন স্যার, এটা পুলিশের ব্যাপার। ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্ট মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে পরামর্শ করেন –এই যা। তাও করেন, কারণ ভারতীয় কম্যুনিটি-এর মধ্যে জড়িত থাকতে পারে বলে। রোহিত রয় অবশ্য পুরো ভারতীয় নন, তবে আধা- ভারতীয় তো নিশ্চয়।”
সুভদ্রামাসির প্রসঙ্গে আর কোনো কথা হলো না। হঠাৎ আমার নজরে পড়ল একটা কার্ড। সেটাও নিশ্চয় ঐ কাগজটার সঙ্গেই মাটিতে পড়েছিল। আমি কার্ডটা তুলে দেখলাম ওটা রিচার্ডমেসোর ভিজিটিং কার্ড। কার্ডটা পুরোনো, যখন উনি ম্যানহাটানে থাকতেন। ওঁর ইউনিভার্সিটি আর ম্যানহাটানের অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা দুটোই সেখানে আছে। আমি কার্ডটা একেনবাবুকে দিয়ে বললাম, “এটাও কাগজের সঙ্গে নীচে পড়েছিল। ধরে নিচ্ছি। রিচার্ডমেসো আপনার সন্দেহের তালিকায় নেই।”
একেনবাবু রসিকতা তেমন বোঝেন না। বললেন, “ছি ছি স্যার, কি যে বলেন! ওটা যেদিন মেসোমশাইয়ের নোটবই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম, তখনই পড়ে গিয়েছিল। তুলে এই ফোল্ডারে রেখেছিলাম মাসিমাকে ফেরৎ দেব বলে, দেখুন আবার পড়ে গেল!”
“এটা না পেলেও মাসিমার খুব একটা এসে যাবে না।”
“তা হোক স্যার, একটা স্মৃতিচিহ তো বটে,” কথাটা বলেই উনি বাথরুমে চলে গেলেন।
