আসল খুনির সন্ধানে (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

চোদ্দ 

কাজের লোকটি বলছিল, এখন বাবুর সঙ্গে দেখা হবে না। তাকে হাঁকিয়ে দিয়ে রাখাল দত্ত আর একেনবাবু বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন। বিনয় দত্ত বাইরের ঘরে বসে একটা বই পড়ছিলেন। সামনে কফি টেবিলে দেশ-বিদেশের কয়েকটি ম্যাগাজিন। এইভাবে দু-জনকে ঢুকতে দেখে বিরক্ত হয়ে বললেন, “কী চাই?”

 

একেনবাবু বললেন, “স্যার, আমাকে আপনার মনে আছে কিনা জানি না, নিউ ইয়র্কের এশিয়া সোসাইটিতে আপনি যেদিন ছবি আঁকছিলেন, আমি সেখানে ছিলাম।”

 

বিনয় দত্ত ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। বোধহয় মনে পড়ল ঘটনাটা। বললেন, “ও হ্যাঁ, আপনিই তো আমার ছবি দেখে বলেছিলেন, আমি ‘ত্রিভুজ আঁকছি।”

 

“আপনার ঠিকই মনে আছে স্যার।”

 

“তা এখন কী মনে করে?”

 

“আমি স্যার বলতে এসেছি আপনি ‘ত্রিভুজ আঁকেননি, ওটা সিম্বলিক ছবি।”

 

“আমার সব ছবিই সিম্বলিক।” বিনয় দত্তের স্বরে একটু বিরক্তি।

 

“তা তো বটেই স্যার, আপনি তো ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট অতি-ভক্তিবাদ’ গ্রুপের।”

 

“অভিব্যক্তিবাদ”, সংশোধন করলেন বিনয় দত্ত, “কিন্তু আমি লেবেল-এ বিশ্বাস করি না। আপনি কী বলতে চান বলুন।”

 

“ও হ্যাঁ স্যার, আমি বলতে এসেছি আমি একজন গোয়েন্দা। এমনিতে ছবি-টবি বুঝি না, কিন্তু এবার ছবিটার আসল মানে বুঝেছি।”

 

“বুঝতে পেরেছেন?” একটু শ্লেষের সঙ্গে বিনয় দত্ত কথা বললেন। “কী নাম আপনার?”

 

“একেন্দ্র সেন স্যার, সংক্ষেপে একেন।”

 

“একেনবাবু! নামটা তো চেনা চেনা লাগছে! এবার বলুন, কী বুঝলেন?”

 

“ঠিক নিজের চেষ্টায় বুঝিনি স্যার, বুঝেছি আপনার বলা একটা কথা থেকে।”

 

“আমার বলা কথা!”

 

“আপনি স্যার একজনকে ইন্টারভিউয়ে বলেছিলেন, “আপনার বোন ছিলেন আপনার মিউজ।”

 

“কী উলটোপালটা কথা বলছেন!”

 

“উলটোপালটা নয় স্যার। আপনার সব ছবির মতন এই ছবিটার ইনস্পিরেশনও আপনার বোন। তাই ওটা স্যার ঠিক সাধারণ ‘ত্রিভুজ’ নয়, একটা মেসেজ, যেগুলো বোঝা যাবে ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুগুলো কোথায় রয়েছে দেখে। কলকাতার ম্যাপে আঁকা সোনাগাছি থেকে ওয়াটগঞ্জ, ওয়াটগঞ্জ থেকে কালীঘাট, কালীঘাট থেকে সোনাগাছি।”

 

বিনয় দত্তের মুখটা ক্ষণকালের জন্য একটু যেন ফ্যাকাশে হল। “হোয়াট ননসেন্স!” তারপর রাখাল দত্তের দিকে তাকিয়ে বিনয় দত্ত প্রশ্ন করলেন, “এন্ড, হু আর ইউ?”

 

“আমি পুলিশের লোক স্যার, সি আই ডি-র।”

 

“আপনারা দু-জন এখানে কীসের জন্য?” বিনয় দত্তের গলাটা যেন একটু ভাঙা শোনাল।

 

“ব্যাপারটা হল স্যার, কলকাতার তিনটে রেডলাইট এরিয়াকে আপনি লাল রং দিয়ে সিম্বলিকালি যোগ করেছেন। কিন্তু স্যার কীসের সিম্বল?”।

 

একটু চুপ করে থেকে বিনয় দত্ত বললেন, “আপনিই বলুন, আপনি তো মনে হচ্ছে আমার থেকে বেশি জানেন!”

 

“এই তিনটে জায়গায় বিকাশ সেন, তন্ময় দত্ত, অরূপ চৌধুরী আর অরূপ চৌধুরীর মেসোমশাইয়ের ডেডবডি পড়ে থাকবে, সেটাই আপনি ছবির ভেতর দিয়ে সবাইকে জানাচ্ছিলেন। আর খুনের কন্ট্রাক্ট দিয়েছিলেন রমেশবাবুকে।”

 

“আর ইউ ম্যাড অর হোয়াট! হোয়াই শুড আই ডু দ্যাট?”

 

“কারণ স্যার, এই তিনজন যখন ছাত্র ছিল, তখন এরা সবাই মিলে আপনার বোনকে রেপ করেন। গ্রামবাসীরা অচৈতন্য মেয়েটিকে পুলিশের কাছে নিয়ে যায়। কিন্তু পুলিশকর্তা নিজের স্ত্রী-র বোনপো এরমধ্যে জড়িত বুঝে মেয়েটিকে পাচার করে দেয় কলকাতার কোনো বেশ্যাপল্লীতে। সেই অন্যায় আর অত্যাচারের প্রতিশোধ নিতে এদের প্রত্যেককে খুন করে কলকাতার এক-একটা রেডলাইট এরিয়ায় ফেলে রাখার নির্দেশ দেন।”

 

“এই অদ্ভুত গল্প আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন?” রাখাল দত্তের দিকে তাকিয়ে বিনয়বাবু কথাটা বললেন। “বহুবছর আগে আমার বোন বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিক করতে গিয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিল– এটাই শুধু ঘটনা।”

 

“না স্যার, বন্ধুদের আপনি চিনতেন, শুধু আসল ঘটনাটা বহুদিন জানতেন না।”

 

বিনয় দত্ত চুপ করে রইলেন।

 

একেনবাবু বলে চললেন, “হঠাৎ একটা মেলায় গিয়ে মেয়েদের কামিজে আঁকা একটা ডিজাইন দেখলেন। ওই ডিজাইনটা আপনার নিজের সৃষ্টি। আপনি নিজে এঁকেছিলেন বোনের কামিজের উপরে, যে কামিজ পরে আপনার বোন নিরুদ্দেশ হন। ভাইয়ের আঁকা সেই কামিজটা আপনার বোন সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। মারা যাবার আগে দিয়ে যান উদ্ধার আশ্রমের এক ভলান্টিয়ারকে। তারপর আপনার বোন যে উদ্ধার আশ্রমে শেষ জীবন কাটিয়েছেন, সেখানে গিয়ে আশ্রমবাসিনীদের নানান কাহিনি থেকে, আপনার বোনের কাহিনিও আপনি খুঁজে পান। তখনই বুঝতে পারেন, রাঁচির সেই পুলিশের কর্তা অরূপ চৌধুরীর মেসোমশাই আপনার বোনকে পাচার করার ব্যাপারে জড়িত।… স্যার, আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে তিন লক্ষ টাকা ক্যাশ করা হয়েছে এই মাসে, সেগুলো কোথায় গেছে? ওগুলো কি রমেশবাবুর কাছে যায়নি? আপনার রাগ, কষ্ট, দুঃখ সবই আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু স্যার, এ ভাবে প্রতিশোধ নেওয়া যায় না। বলুন স্যার, আমি কি ভুল বলছি?”

 

একেনবাবুর কথা শেষ হল। বিনয় দত্ত নির্বাক হয়ে বসে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “কুড়ি বছর, কুড়ি বছর ধরে আমি আমার বোনকে খুঁজে বেরিয়েছি। ফুলের মতন নিষ্পাপ বোন ছিল আমার। বোনের সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে তিন-তিনটে পশু তাকে নষ্ট করেছে। আর শয়তান সঞ্জয় চৌধুরী তাকে রক্ষা তো করেইনি, উলটে নিজের শালির পুত্র আর তার বন্ধুদের বাঁচাতে তিল তিল করে আমার বোনকে হত্যা করেছে। ডু ইউ থিঙ্ক দিস অ্যানিম্যালস ডিসার্ভ টু লিভ? ডু ইউ?”

 

একেনবাবু আর রাখাল দত্ত নির্বাক।

 

“চুপ করে আছেন কেন? বলুন, এই সব পশুগুলো বেঁচে থাকবে– এটাই আপনাদের বিচার?”

 

“কিন্তু স্যার…” একেনবাবু কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।

 

বিনয় দত্ত থামিয়ে দিলেন, “না, কোনো কিন্তু নয়। এদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকারই নেই। এগুলো হত্যা নয়, ন্যায়ের বিচারে এগুলো হল শাস্তি। আর কিছু জানতে চান একেনবাবু?”

 

একেনবাবু আস্তে আস্তে বললেন, “না স্যার, আপনি তো সব বলেই দিলেন। তবু একটা প্রশ্ন করি, আপনি রমেশবাবুকে খুনের পর সংখ্যা লেখা এক-একটা কাগজ ভিক্টিমের কাছে রেখে আসতে বলেছিলেন। স্বীকার করি স্যার, তার অর্থ চট করে বুঝিনি। পরে ক্লিয়ার হল চারজনকে হত্যা করা হবে। সেটা কেন করলেন স্যার?”

 

“ওটা ওই শয়তান পুলিশ সঞ্জয় চৌধুরীর জন্য। শয়তান বুঝতে পারবে ওর দিন ঘনিয়ে আসছে। একটু মাথা খাটাতে হবে, কিন্তু বুঝবে তিনজনের পরে আসছে ওর পালা। ভয়ে ভয়ে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাবে। এটা ওর এক্সট্রা শাস্তি, অন্যদের থেকে হাজার গুণ অন্যায় ওই স্কাউন্ট্রেলটা করেছে।”

 

রাখাল দত্তকে তাঁর কাজ করতেই হবে। বলল, “আপনাকে অ্যারেস্ট করা হচ্ছে, আসুন স্যার আমার সঙ্গে।”

 

একেনবাবু খেয়াল করলেন কফি টেবিলের ম্যাগজিনগুলির মধ্যে নিউ ইয়র্কার’-ও আছে। কেন মেসেজ দেবার জন্য নিউ ইয়র্কার’ ম্যাগাজিনটা বাছলেন, সেটা আর জিজ্ঞাসা করা হল না। ওটা অবশ্য ইম্পর্টেন্ট নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *