শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

আট

নিউ ইয়র্কে ফিরে দেখলাম প্রমথ যে ভয়টা করেছিল –ঠিক তাই। একেনবাবু। অ্যাপার্টমেন্টটাকে একটা নর্দমা বানিয়ে রেখেছেন। সিঙ্কটায় নোংরা বাসন স্তূপ হয়ে আছে। কফি টেবিলে অন্ততঃ আট-দশ দিনের নিউ ইয়র্ক টাইমস ডাঁই করে রাখা। বসার ঘরের চারিদিকে জামা-কাপড় ছড়ানো –ওঁর শোবার ঘরের কথা বাদই দিলাম। একেনবাবুর এক্সকিউজ হল –উনি ঠিক করেছিলেন গতকাল সারাদিন বাড়ি ঘরদোর একটু গোছাবেন, কিন্তু হঠাৎ ওঁকে একটা সেমিনারে যেতে হয়েছে…।

প্রমথ বলল, “আপনি ঘর পরিষ্কার কি শুধু আমাদের জন্য করছিলেন? নিজে পিগ-এর মতো ছাড়া থাকতে পারেন না?”

“না, না, তা কেন স্যার। আসলে কি জানেন, পরিষ্কার করলেই তো আবার নোংরা হয়। তাই প্রতিদিন না করে, মাঝেমাঝে করব ভেবেছিলাম।”

প্রমথ রান্নাঘর নিয়ে পড়ল। আমি আর একেনবাবু বাইরের ঘরটা গোছাতে শুরু করলাম। তার ফাঁকে ফাঁকে একেনবাবুকে শিশিরবাবুর মৃত্যুর ঘটনাটা বিস্তারিত ভাবে বললাম।

প্রমথ রান্নাঘর থেকে খোঁটা দিল। “সলভ করুন না মিস্ট্রিটা, মুখে তো অনেক হ্যাঁনা করেছি ত্যানা করেছি বলেন।”

“আচ্ছা, দেখুন তো স্যার, কবে আমি বললাম ওসব কথা!” আমাকে সাক্ষী মানলেন একেনবাবু।

“না তা বলেননি। কিন্তু সত্যি একটু ভাবুন তো ব্যাপারটা নিয়ে।”

“আপনার কী মনে হয় স্যার?”

“আমার মনে হয় এর মধ্যে কিছু একটা গোলমাল আছে। শিশিরবাবু বড়োেলোক নন। সাধারণ চোরের পক্ষে অন্য কোনো পয়সাওয়ালা লোকের বাড়িতে হানা দেওয়াটা অনেক বুদ্ধিমানের কাজ হত।”

“তা হত স্যার। কিন্তু শিশিরবাবুর বাড়িতে ঢোকাটা যতটা সহজ ছিল, অন্য বাড়িতে হয়তো অতটা সহজ ছিল না.. মানে, আমি যা শুনলাম। বাড়ির কাজের লোকটা ছিল ছুটিতে, শিশিরবাবু নিজে লাঠি হাতে খুট খুট করে চলেন –সুতরাং, হাতেনাতে ধরা পরার সম্ভাবনাটা কম। একটু ভেবে দেখুন তো স্যার, ওঁর বাড়িতে কী থাকতে পারে যেটা খুব দামি?”

“দামি যা যা ছিল –যেমন, নন্দলাল, রামকিঙ্কর আর যামিনী রায়ের অরিজিনাল পেন্টিং, তার কোনোটাও চুরি যায়নি!”

“সেগুলোর দাম তো বেশ কয়েক লাখ টাকা, তাই না?”

“রাইট।”

“দ্যাটস কনফিউজিং!”

“কনফিউজিং বলে কনফিউজিং! এছাড়া আর কি থাকতে পারে একজন বৃদ্ধ প্রফেসরের বাড়িতে?”

“ঠিক কথা স্যার, আসুন একটু বসা যাক।” বলে একেনবাবু সোফায় গিয়ে বসলেন।

আমিও ওঁর সঙ্গে একটু বিশ্রাম নিতে বসলাম।

কিছুক্ষণ পা নাচিয়ে একেনবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা স্যার, এই প্রভাসবাবু লোকটি কেমন? রিলায়বেল মনে হল?”

“কেন, আপনি প্রভাসকে সন্দেহ করছেন নাকি!”

“না না, এই সব ব্যাপারে অনেক সময়ে চেনা-পরিচিত লোকরা জড়িত থাকে কিনা, তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।”

প্রমথ ইতিমধ্যে কিচেন থেকে বেরিয়ে এসেছে। “তাহলে আমাকে আর বাপিকেও সন্দেহ করুন না, আমরা এমন কি রিলায়বেল?”

একেনবাবু নির্বিকারভাবে বললেন, “আপনারা তো স্যার শিশিরবাবুর চেনা জানা নন।”

প্রমথ ছাড়ল না। “প্রভাস যদি শিশিরবাবুর মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে আমাদের নিয়ে গেল কেন?”

“কী মুশকিল স্যার, এর উত্তরটা তো আপনারাই দিতে পারবেন! ভেবে দেখুন স্যার, উনি আপনাদের নিয়ে শিশিরবাবুর বাড়ি গেলেন। গিয়ে সবাই দেখলেন শিশিরবাবু ডেড। আপনারা ধরেই নিলেন যে প্রভাসবাবুও এই প্রথম ডেডবডিটা দেখছেন আর আপনারা হয়ে গেলেন তার সাক্ষী। ঐ বাড়িতে পুলিশ যদি ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেয়, তাহলে শুধু প্রভাসবাবুর প্রিন্ট পাবে না, আপনাদেরও পাবে। আর আপনারা তো পুলিশকে বলেইছেন আপনারা সবাই একসঙ্গে গিয়েছিলেন ওঁর বাড়িতে। কেস ক্লোজড।”

“দাঁড়ান মশাই, একটু আস্তে,” প্রমথ বলল। “প্রথমত, কোনো ছবি চুরি যায়নি। তাহলে আর কী মহামূল্য জিনিস ও বাড়িতে থাকতে পারে?”

“কেন স্যার, বই!”

“তার মানে?”

“আপনারাই তো বললেন স্যার শিশিরবাবু রিটায়ার্ড অধ্যাপক –বইপত্র নিয়ে পড়ে থাকতেন। কিছু কিছু পুরোনো বইয়ের দাম তো সাংঘাতিক হয়। হয় না স্যার?”

“কোয়েশ্চেন না মেরে উত্তরটা দিন না,” প্রমথ বিরক্ত হয়ে বলল।

“আমার নিজেরই জানা ছিল না স্যার। সেদিন ক্রিস্টির একটা ক্যাটালগে দেখলাম স্যামুয়েল জনসনের ১৭৫৫ সালের ডিকশনারি বিক্রি হচ্ছে ২৫ হাজার ডলারে। তারমানে প্রায় পনেরো লাখ টাকা –জাস্ট একটা পুরোনো বই, এমন কি অটোগ্রাফ করাও নয়। অটোগ্রাফড বই হলে কত দাম হত ভাবুন?”

কেন জানি না, আমার বুকটা ধ্বক করে উঠল। পুরোনো বইয়ের মূল্য সাধারণ চোর বুঝব না, কিন্তু প্রভাসের মতো লোক বুঝবে। বন্দনা বিয়ে করবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই। প্রভাস যদি সত্যিই এই খুনের সঙ্গে জড়িত থাকে… আমি ভাবতে পারছিলাম না, ঠিক কী করা উচিত হবে।

হঠাৎ শুনলাম প্রমথ বলছে, “ননসেন্স! পাশের বাড়ির ডাক্তার পরীক্ষা করে বললেন, আমরা আসার কিছুক্ষণ আগেই শিশিরবাবু মারা গেছেন। প্রভাস আমাদের সঙ্গে সারা সকাল গল্প করছিল। সেটা কী করে হয়? এখন আপনি যদি বলেন যে ঐ ডাক্তারও প্রভাসের সঙ্গে জড়িত –তাহলে অবশ্য অন্যকথা।”

বাঁচিয়েছে, আমি মনে মনে ভাবলাম। কিন্তু হঠাৎ একটা খটকাও লাগল। কেন, প্রভাস ঘরে না ঢুকেই উধশ্বাসে পাশের বাড়ি ছুটে গেল। আর ডাক্তার চৌধুরিও কেন সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে এলেন। ওঁরও এ ব্যাপারে জড়িত থাকা কি সম্ভব?

“কমপ্লিকেটেড ব্যাপার স্যার।” একেনবাবু সোফায় বসে আবার পা নাচাতে লাগলেন। “তবে ডাক্তারবাবুকেও সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখা যায় না।”

হঠাৎ মনে হল বইয়ের জন্য কখনোই উনি খুন হতে পারেন না। একেনবাবুকে বললাম, “প্রভাসের কাছে ওঁর অনেক বই-ই রয়েছে। বইয়ের জন্য সে এমন একটা কাজ করতে যাবে কেন। চাইলেই তো উনি ওকে বই দিতেন।”

“এগুলো তো আপনার শোনা কথা স্যার, আর সবই প্রভাসবাবুর কাছ থেকে তাই?”

একেনবাবুর কথা শুনে সত্যিই দমে গেলাম।

প্রমথ জিজ্ঞেস করল, “কী মশাই, সমাধান করতে পারবেন?”

“খেপেছেন স্যার, দশ হাজার মাইল দূরে বসে!”

“সেটা না পারলে কিরকম ডিটেকটিভ মশাই আপনি!”

“শুনছেন স্যার, প্রমথবাবুর কথা?”

“শুনছি, কিন্তু এখন করণীয়টা কি বলুন?”

“আপাতত এক কাপ কফি খাওয়া যাক স্যার।”

এবার আমার একেনবাবুর ওপর রাগ হল। বললাম, “দেখুন, প্রভাস বিয়ে করছে আমার অতি পরিচিত মেয়ে বন্দনাকে। ও যদি সত্যিই খুনি হয়, তাহলে এ বিয়ে হতে পারে না। আপনাকে এটা নিয়ে কাজে লাগতে হবে।”

“আরে কী মুশকিল, উনি মার্ডারার হতে যাবেন কেন?”

“সন্দেহের কথাটা তো আপনিই তুললেন!”

“স্যার, আপনাদের নিয়ে আর পারা যায় না!”

এবার প্রমথ বলল, “না সিরিয়াসলি, আপনি এই কেসটা নিয়ে একটু ভাবুন। কী, ভাববেন তো?”

“না ভাবলে কি আপনারা আস্ত রাখবেন। তাহলে আরেকবার শুনি, ভালো করে শুনি সব কিছু। তবে কফি পেলে স্যার, মাথাটা একটু খেলত।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *