শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
তিন
কলকাতায় পৌঁছে ক’দিন এবাড়ি ওবাড়ি দৌড়াদৌড়ি করতে করতে কেটে গেল। আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সংখ্যা অল্প নয়। প্রায় দু-বছর বাদে আসছি, তাই মা জোর করে সবার সঙ্গে দেখা করতে নিয়ে গেলেন। পেটপুরে প্রচুর নলেনগুড়ের সন্দেশ, জলভরা, রসগোল্লা, সরভাজা, আর রাবড়ি খেলাম। তারপরেই শুরু হল ঝামেলা। মা সুর ধরলেন, “এবার একেবারে বিয়ে করে আমেরিকায় ফিরে যা।” আমি যত বলছি, আমার বিয়ে করার এখন কোনো ইচ্ছে নেই। মা তত চেপে ধরেন। মা’র ধারণা আমি এবার বিয়ে না করলে কোনো আমেরিকান মেয়েকে বিয়ে করে বসব। “দেখ, আমি ভালো ইংরেজি জানি না, তোর বউয়ের সঙ্গে ইংরেজিতে যেন কথা বলতে না হয়।”
শেষমেষ আমি বলতে বাধ্য হলাম, “তুমি যদি এরকম শুরু কর, তাহলে আমি টিকিট চেঞ্জ করে কালকেই চলে যাব।”
মা খুব কষ্ট পেলেন কথাটা শুনে, কিন্তু এছাড়া মাকে থামানোর আর কোনো উপায় ছিল না। মা বললেন, “ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর বলব না।”
কিন্তু হালটা যে ছাড়েননি সেটা বুঝলাম। কারণ একটু বাদেই বললেন, “চল আজ বিকেলে সুলতার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। তোকেও দেখতে চেয়েছে।”
সুলতামাসির মেয়ে বন্দনা আমার থেকে বছর তিনেকের ছোটো। এক সময়ে সুলতামাসিরা আমাদের পাশের বাড়িতে থাকতেন। ছেলেবেলায় বন্দনা আর আমি একসঙ্গে অনেক খেলাধুলো করেছি। পরে সুলতামাসিরা যোধপুর পার্কে চলে গেলেও প্রায়ই আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হত। হয় আমরা যেতাম অথবা ওঁরা আসতেন।
খেলাধুলোর বয়স পার হবার পর বন্দনার সঙ্গে গল্প-আড্ডা অনেক হয়েছে। ভারী সহজ, স্বচ্ছ মেয়ে। সোজাসুজি কথা বলে। কিছু কিছু মেয়ে আছে যারা বড় হতে হতে ব্লসম করে। বন্দনা সেরকম। ছোটোবেলায় বোঝা যেত না, কিন্তু বছর তেরো-চোদ্দতেই ও দারুণ রূপসি হয়ে উঠল। যাদবপুরে আমি যখন এম.এসসি পড়ছি, তখন ও ইংলিশ অনার্স নিয়ে বি.এ পড়ছে। আমাদের ক্লাসের একটা ছেলে ওকে খুব জ্বালাচ্ছিল। বন্দনা আমাকে একদিন সেকথা বলাতে আমি বললাম, “তোকে দেখে সবাই পাগল হয়ে যায়, কী করবি বল?”
“কই, তুমি তো পাগল হও না?”
“সে তো তোকে ছোটোবেলা থেকে দেখেছি বলে। ছোটোবেলায় মাথায় দুটো বিনুনি। করে হাঁড়ির মতো একটা মুখ নিয়ে ঘুরে বেড়াতিস। সেটা চোখ বুজে একবার ভেবে নিলেই মোহ কেটে যায়!”
সেই শুনে বন্দনা ভীষণ হাসল। “খুব বিচ্ছিরি চেহারা ছিল আমার –তাই না?”
“ভীষণ,” আমি গম্ভীর মুখ করে বললাম।
“তোমারও তো কদম ফুলের মত খাড়া খাড়া চুল ছিল।”
“সে তো এখনও আছে।”
বন্দনা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “নাঃ, এখন আর অতটা নেই।”
হঠাৎ আমার কী যে হল জানি না! বললাম, “বন্দনা, আমার সঙ্গে প্রেম করবি?”
বন্দনার মুখটা কেমন যেন হয়ে গেল, চোখটা ছলছল করে উঠল। বলল, “তুমি আমার বন্ধু, বাপিদা! তোমাকে হারাতে চাই না।”
সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়েছিলাম। “যাঃ, তোর সঙ্গে ফাজলামি করছিলাম।”
আমি জানি বন্দনা বুঝেছিল, সেটা ফাজলামি নয়। আর আমিও বুঝেছিলাম বন্দনার মনের কথা। ও কোনো কথাই কখনো অস্পষ্ট করে বলেনি।
তার কিছুদিন বাদেই আমি আমেরিকায় চলে এলাম। তারপর এক আধবারই দেখা হয়েছে। ও এম.এ পাশ করে মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে ঢুকেছিল। পরে সেটা ছেড়ে দিয়ে শুনেছি একটা বুটিক শপ খুলেছে।
অনেকদিন বাদে সুলতামাসিদের বাড়ি গিয়ে আমার ভালোই লাগল। মেসোমশাই সবে রিটায়ার করেছেন। এখন মাথায় ঢুকেছে একটা পোলট্রি ফার্ম করবেন। বেশ কিছু বইপত্র জোগাড় করে পড়ে ফেলেছেন। মেমারি-তে ওঁর দেশের বাড়িতে ফার্মটা করা হবে। সুলতামাসির তাতে প্রবল আপত্তি। মেসোমশাই সত্যিই কতটা ফার্ম করতে চান, না সুলতামাসিকে জ্বালাতে চান –সেটা অবশ্যই একটা প্রশ্ন। কিন্তু চায়ের আড্ডাটা ভালোই জমল।
চা খাওয়ার পর বন্দনা একটু ভিতরে যেতে সুলতামাসি বললেন, “বাপি, আমাদের সবার ইচ্ছে, তোমার আর বন্দনার বিয়ে হোক। কিন্তু তোমরা এযুগের ছেলেমেয়ে –তোমাদের তো আমরা জোর করতে পারব না। বন্দনার বহু সম্বন্ধ এসেছে, কিন্তু ও রাজি হয়নি। আমার ধারণা তোমাকে বিয়ে করতে আপত্তি করবে না। এখন তোমার ওকে পছন্দ হবে কিনা সেটাই প্রশ্ন।”
আমি এরকম সরাসরি প্রস্তাবে যথেষ্ট হতচকিত হলাম। তবে বুঝতে পারলাম যে সুলতামাসি এটা মার সঙ্গে পরামর্শ করেই করেছেন। ওঁরা জানেন না, কিন্তু বন্দনার মনের কথাটা আমি খুব স্পষ্টই জানি। এই অবস্থায় সবচেয়ে সহজ পথটাই আমি নিলাম। বললাম, “সুলতামাসি, মা’কে বলেছি এই মুহূর্তে আমি বিয়ের কথা ভাবছি না।”
“তোমাকে এক্ষুনি আমরা বিয়ে করতে বলছিও না,” সুলতামাসি বললেন।
আমি এবার একটু মুশকিলে পড়লাম।
“দেখো, তোমরা দুজনে কথা বলো। তোমরা যা চাইবে তাই হবে।” বলে সুলতামাসি, মা আর মেসোমশাই অদৃশ্য হলেন।
এইরকম সমস্যায় আমি পড়ব বলে প্রস্তুত হয়ে আসিনি। কি করণীয় ভাবছি, তখন বন্দনা ঘরে ঢুকল।
“একি তুমি একা বসে আছ, আর সবাই কোথায়?”
“আর সবাই আমাকে সমস্যা দিয়ে চলে গেছেন।”
“কী সমস্যা?”
“তোকে বিয়ে করতে চাই কিনা জানতে চান।”
“তুমি কি বললে?” বন্দনার মুখটা ফ্যাকাশে, গলার স্বরেও একটা চাপা উত্তেজনা।
আমি বললাম, “এই মুহূর্তে আমার কাউকে বিয়ে করার প্ল্যান নেই।”
বন্দনা আমার হাত দুটো চেপে ধরল, “থ্যাঙ্ক ইউ।”
“তার মানে?”
“তোমাকে ‘না’ বলতে আমার খুব কষ্ট হত বাপিদা!”
“তুই কি বিয়ে করবি না ঠিক করেছিস?” বন্দনা চুপ করে রইল।
এইবার আমি ধরতে পারলাম। “লাকি ম্যানটা কে?”
বন্দনা লাল হল। “কী করে বুঝলে কেউ আছে, আমারও তো তোমার মতো এখনই বিয়ে না করার প্ল্যান থাকতে পারে।”
“না পারে না, নইলে গালটা টমাটোর লাল হত না। বল, নামটা কি?”
বন্দনা লাজুক মুখে বলল, “প্রভাস মিত্র।”
“কী করেন এই প্রভাস মিত্র?”
“শান্তিনিকেতনে ইংরেজি পড়াচ্ছে।”
“প্তাহলে সমস্যাটা কী?”
“সমস্যাটা কুল-ঠিকুজির। বিশ্বাস করতে পারো?”
“মাই গড! তুই ব্রাহ্মণ আর ও কায়স্থ বলে, না কুষ্ঠি মিলছে না?”
“আরও গভীর। কায়স্থর বাড়িতে মানুষ হওয়া রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা ছেলে।”
“ননসেন্স! ও যে চমৎকার ছেলে –সে তো আমি ওকে না দেখেও বুঝতে পারছি।”
“কী করে?”
“কারণ তুই ওকে পছন্দ করেছিস!”
বন্দনা কাছে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল, “আই মিস ইউ বাপিদা!”
বন্দনা কী মেখেছে জানি না। কিন্তু সেই সুগন্ধের সঙ্গে ওর শরীরের ঘ্রাণ আর নৈকট্য মুহূর্তের জন্য আমাকে আচ্ছন্ন করল। কিন্তু ঘোর কাটিয়ে আমি বললাম, “ভালো কথা, আমি আর প্রমথ কাল শান্তিনিকেতনে যাচ্ছি।”
“সত্যি! তাহলে ওর সঙ্গে দেখা কোরো, খুব খুশি হবে।”
“তুইও চল না।”
“না, মেলার ভীড়ে যেতে আমার ভালো লাগে না। আমি মেলা শেষ হলে যাব।”
সুলতামাসিকে সেদিন কী ভাবে এড়িয়েছিলাম –সেটা এ কাহিনির সঙ্গে যোগ করব না। প্রভাস এই গল্পের সঙ্গে যুক্ত, তাই বন্দনার কথাটা একটু ফলাও করেই বলা হয়ে গেল। শুধু এটুকু বলি যে পরে বন্দনার হয়ে আমিও ওকালতি করলাম সুলতামাসি আর মেসোমশাইয়ের সঙ্গে। মনে হল যে ওঁরা এবার হাল ছেড়েছেন। ওঁদের ধারণা ছিল, আমি এলে হয়তো একটা কিছু হয়ে যাবে। আমিও ওঁদের মেয়ের সঙ্গে সুর মেলাব– সেটা বোঝেননি। আমার মায়ের উপরও রাগ হল। মা প্রভাস মিত্রের ব্যাপারটা জানতেন না। সব শুনে সুলতামাসির উপরই চটে উঠলেন।
“আচ্ছা, এই ব্যাপারটা জানা সত্ত্বেও, কেন তোর সঙ্গে সম্বন্ধ করার চেষ্টা করছিল?”
আমি মাকে খোঁটা দিলাম, “তোমারও তো সন্দেহ আমি কোনো আমেরিকান মেয়ের সঙ্গে ঘুরছি, কই তুমি তো তাতে হাল ছাড়ছ না!”
“তুই সত্যিই ঘুরছিস?”
মা’র করুণ মুখ দেখে আমার খারাপ লাগল। মাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, “না, তোমাকে খ্যাপাচ্ছি!”
