শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

পনের

প্রমথ অনেক রাত্রে বাড়ি ফেরাতে বাবু পিন্টোর কাছে যাওয়ার গল্পটা ওকে আর জানানো হয়নি। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেও প্রমথকে দেখলাম না। দুপুরে যখন লাঞ্চ খেতে এল, তখন বাবু পিন্টোর গল্প করলাম। ভেবেছিলাম প্রমথ প্রচন্ড খ্যাপাবে। কিন্তু কিছুই বলল না। আসলে একটা এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে ও বড্ড হাবুডুবু খাচ্ছে। লাঞ্চ খেয়েই আবার ল্যাবে চলে গেল।

লাইব্রেরিতে কতগুলো বই ফেরৎ দিতে হবে, আমি সেগুলো নিয়ে বেরোলাম। রাস্তায় হঠাৎ দেখা রোহিত রয়ের সঙ্গে। প্রথমে চিনতে পারিনি। দূর থেকে দেখি একজন আমার দিকে তাকতে তাকাতে আসছে। আমারও চেনা চেনা লাগছে লোকটাকে। হঠাৎ মুখোমুখি এসে পড়তেই মনে পড়ে গেল –রোহিত, রোহিত রয়। ‘হ্যালো’ বলে হাত বাড়িয়ে দিতে আমি হ্যান্ডশেক করলাম।

রোহিত কপট গাম্ভীর্য দেখিয়ে বললেন, “আপনাকে নমস্কার করা উচিত ছিল। সরি, আই ফরগট।”

আমি হেসে ফেললাম। “ইউ আর এক্সকিউজড। তারপর কী খবর?”

একথা সেকথা হল। জিজ্ঞেস করলাম, ওঁর গার্লফ্রেন্ড ফিরে গেছেন কিনা।

“অনেকদিন আগে। এর মধ্যে আমি ইংল্যান্ড ঘুরে এলাম। থাইল্যান্ড আর ইন্ডিয়াতেও গিয়েছিলাম কয়েকদিনের জন্য।”

“কী আশ্চর্য! আমরাও ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলাম বেশ কিছুদিনের জন্য। তা ইন্ডিয়াতে গেলেন কেন, বেড়াতে না কাজে?”

“বিজনেস এন্ড প্লেসার –দুটোই। ইন্ডিয়া সবসময়েই আমার কাছে প্লেজার।”

“ইন্ডিয়ার কোথায়?”

“একটা শর্ট অ্যাসাইনমেন্ট ছিল দিল্লী, জয়পুর, আর আগ্রায়। পাঁচদিন মাত্র ছিলাম। আপনারা কোথায় ছিলেন?”

“বেশির ভাগ সময়েই কলকাতা। দু’দিনের জন্য শান্তিনিকেতন গিয়েছিলাম।”

“দুটোই চমৎকার জায়গা।”

“আপনি গিয়েছেন?”

“ও ইয়েস। ইন ফ্যাক্ট রিচার্ডের সঙ্গেই গিয়েছিলাম –বহু বছর হয়ে গেল। তারপর আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে রোহিত প্রশ্ন করলেন, “আপনি বল্লভ শাহ- কে চেনেন?”

আমি মনে করতে পারলাম না। “কী সূত্রে চিনতে পারি বলুন তো?”

“এ বিজনেসম্যান ফ্রম গুজরাত?”

“কিসের ব্যবসা?”

“কিসের ব্যবসা নয় –হোটেলের ব্যবসা, ডায়মন্ডের দোকান, অ্যান্টিকের দোকান। আমার ধারণা ছিল এভরিবডি নোজ হিম।”

“নট এভরিবডি,” আমি হেসে বললাম।

“জাস্ট কিডিং। ভেরি ইন্টারেস্টিং ম্যান, রোহিত বললেন। “আমরা একই প্লেনে ইন্ডিয়া থেকে ফিরলাম।”

কিন্তু কেন বল্লভ শাহ এত ইন্টারেস্টিং সেটা জানতে পারার আগেই রোহিত আমাকে অবাক করে দিয়ে বললেন, “আপনাদের সঙ্গে বাবুর দেখা হয়েছে শুনলাম?”

“বাবু পিন্টোর কথা বলছেন?”

“হ্যাঁ, আপনি কী করে জানলেন! আপনি তো মনে হচ্ছে একেনবাবুর থেকে অনেক ভালো ডিটেকটিভ!”

রোহিত গম্ভীর ভাবে বললেন, “আই হ্যাভ সোর্সেস।” তারপর হেসে ফেললেন, “না, বাবুই আমাকে বলল। আমার খুব পরিচিত ও। ভালোকথা, এখন যাচ্ছেন কোথায়?”

“পাবলিক লাইব্রেরিতে।”

“আমাকেও ওদিকে যেতে হবে। একটু ওয়েট করতে পারবেন? এই সামনে আমার অ্যাপার্টমেন্ট, সেলফোনটা ফেলে এসেছি।”

“শিওর।”

“তাহলে আসুন,” বলে আমাকে নিয়ে যেখানে ঢুকলেন সেখানে আমি আগে এসেছি। বাবু পিন্টোর অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স।

“আপনিও এখানে থাকেন?”

“নাউ ইউ গেট দ্য কানেকশন!” রোহিত চাবি দিয়ে মেইলবক্স থেকে চিঠিপত্র বার করতে করতে বললেন। চিঠিগুলো বগলে চেপে ধরে দেখি আরেকটা মেইলবক্স খুলছেন। আমার দিকে তাকিয়ে চোখটা একটু টিপে বলল, “আরেক জনের মেইল চুরি করছি।”

“চুরি তো লুকিয়ে লুকিয়ে করতে হয় বলে জানতাম।”

“ট্রু।” রবার ব্যান্ড আটকানো চিঠির গুচ্ছ দেখিয়ে বলল, “এগুলো বাবুর। কাল বাইরে গেছে কয়েকদিনের জন্য, তাই ওর চিঠি তোলার দায়িত্ব এখন আমার।”

“আর আপনি না থাকলে উনি আপনার মেইল তোলেন?”

“রাইট। সুতরাং ওকেই খাটতে হয় বেশি।”

“আই ক্যান ইম্যাজিন,” আমি বললাম। “কিন্তু আগে থেকে জানিয়ে দিলে পোস্ট অফিসও তো ডেলিভারি না করে পিক-আপের জন্য জমা রাখে।”

“তা রাখে, কিন্তু এক মাসের বেশী নয়। আর আমি মাঝে মাঝেই পাঁচ ছ সপ্তাহের জন্য হাওয়া হই। বাবুও অনেক সময় দু’মাস ইজরায়েলে গিয়ে বসে থাকে।”

“যখন দুজনেই বাইরে থাকেন তখন কি করেন?”

“এই কমপ্লেক্সেই এক বুড়ি মহিলা আছেন, তাঁকে ধরি। কিন্তু তিনি বড় উলটোপালটা করেন। চিঠি তোলেন ঠিকই, কিন্তু গুছিয়ে কোথায় রেখেছেন সবসময়ে মনে করতে পারেন না। একবার যা সমস্যায় পড়েছিলাম!… এক মিনিট, চিঠিগুলো অ্যাপার্টমেন্টে রেখে আসি,” বলে রোহিত উপরে গেলেন।

একটু বাদেই নেমে এলেন। তারপর গল্প করতে করতে আমরা বাস-স্ট্যান্ডের দিকে রওনা হলাম। কথায় কথায় সুভদ্রামাসির মা’র ছবিটার কথা উঠল।

“কেমন হয়েছে ছবিটা?” রোহিত জানতে চাইলেন।

“চমৎকার। আমার মা-কেও এক কপি দিয়েছি, তিনি তো মুগ্ধ! প্রচুর সময় লেগেছে নিশ্চয় ওটাকে ঠিকঠাক করতে?”

“তা কিছুটা লেগেছে। তবে আমার একটা চমৎকার সফটওয়্যার আছে, আর সেই সঙ্গে একজন কম্পিটেন্ট হেল্পার।”

“আমিও দেশ থেকে একটা ছবি এনেছি। একজনকে দিলাম ডিজিটালি এনহ্যান্স করার জন্য। বলতে কি, আমার ধারণাই ছিল না, পুরোনো ছবি থেকে এত ভালো ছবি তৈরি করা যায়।”

“ওয়েল, ইট ইজ নেভার অ্যাকিউরেট। কিন্তু কে সেটা বুঝতে পারছে! যেটা মোস্ট ইম্পর্টেন্ট, সেটা হল সুভদ্রা-র ছবি পছন্দ হয়েছে, আর ভালো লাগছে আপনার মা-ও খুশি হয়েছেন দেখে। তবে ইন্টারেস্টিংলি ওই ছবি নিয়ে একজনের কাছ থেকে দুটো ক্রেজি ই মেইল পেয়েছি।”

“তাই নাকি?”

“ও ইয়েস। ছবিটা আমার ওয়েবসাইটে আছে, সেটা দেখেই পাঠিয়েছে।”

“ক্রেজি মানে?”

উত্তর শোনা হল না। হঠাৎ রোহিতের মোবাইল বেজে উঠল। রোহিত, ‘এক্সকিউজ মি, বলে ফোন ধরলেন। তারপর ‘হ্যালো, ইয়েস,’ বলে দুয়েকটা কথা বলার পর ফোন পকেটে পুরে বললেন, “আই অ্যাম সরি। একটা জরুরি কাজ এসে পড়েছে, আমাকে এখুনি ট্রাইবেকায় যেতে হবে।” বলেই হাত দেখিয়ে একটা চলন্ত ট্যাক্সি থামিয়ে, “সি ইউ সুন, “ বলে আমাকে খানিকটা হতবাক করেই তাতে উঠে পড়লেন।

পাবলিক লাইব্রেরীতে আমার জন্য আরেকটা সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল। বই ফেরত দিয়ে বেরোতেই দেখি একেনবাবুও বেরোচ্ছেন!

“আপনি এখানে কি করছিলেন?”

“এই কিছু পুরোনো পত্রিকা দেখছিলাম স্যার।”

“হঠাৎ?”

“এমনি স্যার।”

“না, এমনি তো আপনি কিছু করেন না। সব সময়েই কিছু না কিছু আপনার মাথায় ঘুরছে।”

“কি মুশকিল স্যার, আমিও তো রিসার্চ করি। আপনার মতো কঠিন অঙ্ক বা প্রমথবাবুর মতো বিদঘুঁটে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন নিয়ে না হলেও।”

“আপনার সাহস তো কম নয়– প্রমথর রিসার্চকে বিদঘুঁটে বলছেন!”

“ওটা স্যার কমপ্লিমেন্ট –বিদঘুঁটে জিনিসকে সরল করে বোঝানোই তো পন্ডিতদের কাজ।”

“বেশ বেশ। যা খুঁজছিলেন, তার কিছু পেলেন?”

“কে জানে স্যার। তা আপনি এখানে কি করতে?”

“বই ফেরত দিতে এসেছিলাম।”

“আর কিছু না থাকলে চলুন স্যার, একটু কফি খাওয়া যাক।”

“আপনি খাওয়াবেন?”

কথাটা শুনে মনে হল একেনবাবু একটু দমে গেলেন।

“আপনাকে খ্যাপাচ্ছিলাম,” আমি বললাম, “ডাচ ট্রিট।”

একেনবাবু মানলেন না। “কী যে বলেন স্যার, আপনাকে একটু কফি খাওয়াতে পারব না!”

আমরা হাঁটতে হাঁটতে একটা কফিশপ-এ ঢুকলাম। কফি অর্ডার করে একেনবাবুকে রোহিত রয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্প বললাম। একেনবাবু আবার গল্প খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শোনেন। প্রশ্ন করলেন, “ক্রেজি ইমেইল বলতে উনি কি মিন করলেন স্যার?”

“আমার কোনো ধারণাই নেই। জানার আগেই একটা ফোন আসায় ওঁকে চলে যেতে হল।”

“ভেরি ইন্টারেস্টিং স্যার।”

“আচ্ছা আপনার কি মনে হয় ঐ মূর্তি নিয়ে কেউ কিছু লিখেছে?”

“কোন মূর্তি স্যার?”

“যেটা ছবিতে ছিল, গোল্ড-সিলভারের নারী- মূর্তি।”

একেনবাবু মাথার পেছনটা চুলকোতে চুলকোতে প্রশ্ন করলেন, “কী লিখতে পারে?”

“তা কী করে বলব। কিন্তু মূর্তিটা পুরোনো। তার একটা হিস্ট্রি থাকতে পারে।” বলতে বলতেই একটা চিন্তা ঝিলিক দিল। “আপনি কি মনে করেন মূর্তিটা কোনো মিউজিয়াম থেকে ওই ক্যালিন্সো না কার নাম বলছিলেন –সে চুরি করেছিল?”

“ক্যালিস্টো এমিরোজিয়ল্ট, আর্ট-চোর?”

“এক্সাক্টলি, তার বোনই তো সুভদ্রামাসির পূর্বপুরুষকে বিয়ে করেছিল।”

“আপনি আমার ভাত মারবেন স্যার, কিন্তু ভেরি ইন্টারেস্টিং পসিবিলিটি।”

“আজকে সুভদ্রামাসিকে ফোন করে একটু খোঁজ নেব। রোহিত রয়ের কাছেও জানতে হবে, ঠিক কী ছিল ওই ই-মেইলে।”

“গুড আইডিয়া স্যার। ভালোকথা, ক্যালিস্টোর কথা তুললেন –আজকে একটা ইন্টারেস্টিং ম্যাগাজিন পড়ছিলাম। যে সব দামি দামি জিনিসের খোঁজ আর পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের হিস্ট্রি। একেবারে ফ্যাসিনেটিং স্যার। সেইখানে ‘দ্য লাইট’-এর কথাও ছিল।”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম, “দ্য লাইট?”

“দ্য লাইট ডায়মন্ড স্যার। মনে নেই রিচার্ড সাহবের নোটবইটাতে ছিল?”

এবার আমার মনে পড়ল। “ও হ্যাঁ, নিশ্চয় মনে আছে। আপনিই তো সেদিন বলছিলেন।”

“দ্য লাইট- এর ছবিও ছিল। এইটুকু হিরে, কিন্তু এস্টিমেটেড প্রাইস এখন দু মিলিয়ন ডলার, মানে প্রায় ন’কোটি টাকা! অকল্পনীয় স্যার।”

“দু’শো ডলার হলেও আমি কিনতাম না। লোকে কেন যে এত ফ্যাসিনেটেড হয়, আমার কোনো ধারণাই নেই।”

“আমিও একমত স্যার। তবে যে কথা বলতে যাচ্ছিলাম, মারা যাবার কয়েকদিন আগে নাকি ক্যালিস্টো এক জেলরক্ষীকে বলেছিল, ডায়মন্ডটা কোথায় আছে –বুদ্ধি থাকলে যে কেউ বুঝতে পারবে। জেলরক্ষী সেটা শুনে জেলারকে জানায়।

জেলার এসে ক্যালিস্টোকে প্রশ্ন করলে তার উত্তরে নাকি ক্যালিস্টো শুধু বলে, ‘দ্য অ্যানসার ইস ইন দ্য টাইটল।”

“তার মানেটা কী?”

“আই হ্যাভ নো ফ্লু স্যার।”

“একটা মানে আমি বুঝতে পারছি।”

“কী স্যার?”

“যেহেতু এখনও ওটা পাওয়া যায়নি, সুতরাং আমরা সবাই বুদ্ধু!”

“এটা ভালো বলেছেন স্যার।”

ওয়েট্রেস ইতিমধ্যে এসে আমাদের কফি দিয়ে গেল। কফির ব্যাপারে আমি একটু খুঁতখুঁতে, কিন্তু দেখলাম, কফি ভালোই করেছে। আমাদের সামনে একটা টিভি।

সেখানে ভারত আর চীনের শিল্পায়ন নিয়ে বিরাট আলোচনা চলছে।

একেনবাবু বললেন, “যাই বলুন স্যার, আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। এই ধরুন সাধারণ ফোন, সেগুলো পর্যন্ত ঠিকমত কাজ করে না। বাড়ির ফোনের কথা ছেড়ে দিন, বোলপুরের পুলিশ অফিসের ফোনই কাজ করছে না!”

“আপনি ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন নাকি?”

“হ্যাঁ স্যার। না পেয়ে, শেষে মোবাইলে ধরতে হল।”

“তাহলে? মোবাইল টেকনোলজি তো পৌঁছেছে এবং কাজও করছে।”

“তা করছে। কিন্তু স্যার টেকনোলজিতে আমাদের নয়, সায়েবদের।”

“এক এক যুগে এক এক জাতি ওপরে ওঠে।”

“ওসব মন ভোলানো কথা স্যার। আমরা চিরদিনই পিছিয়ে।”

“কী বলছেন! হিন্দুরা এক সময়ে বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প –সব কিছুতেই পৃথিবীকে পথ দেখিয়েছে। এই শূন্য-র কনসেপ্ট –সেটাতো হিন্দুদেরই সৃষ্টি।”

“এটা দারুন বলেছেন স্যার,” কথাটা একেনবাবুর মনে ধরল। বেশ কিছুক্ষণ তারিয়ে তারিয়ে কফি খেলেন। তারপর বললেন, “সত্যি স্যার, এমন চমৎকার সব কথা বলেন না আপনি। ঠিক সেইজন্যেই ইংরেজি অ্যালফাবেটের ‘ও’ আর শূন্য এক, কিন্তু আমাদের অক্ষরগুলো দেখুন –শূন্যের সঙ্গে অন্য কোনো অক্ষরের মিল পাবেন না।”

এই থিওরি আগে আমি শুনিনি। কিন্তু একেনবাবু আমার কথাটা মেনেছেন দেখে তৃপ্তি পেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *