ঋজুদার সঙ্গে সুফকর-এ – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

আলো থাকলেও তাকে দেখা যায় না। পৃথিবীর সব আলোছায়ার রহস্যই শিশুকাল থেকেই আয়ত্ত করতে হয় প্রতিটি বাঘের। সব শব্দ-গন্ধের রহস্যও। পৃথিবীতে শিকারি যদি কেউ থাকে, সব শিকারির সেরা শিকারি; সে আমাদের ভারতের বন-জঙ্গলের বাঘ!

হাজোর কী হল? আর ওই লোকটির। কুতা-পাজামা পরা শিকারীর? তাঁর মৃতদেহ তো নিয়ে গেছিল গোর দেওয়ার জন্য।

তিতির শুধোল।

হ্যাঁ।

ঋজুদা বলল।

এইজন্যেই বিখ্যাত ব্যারিস্টার শিকারী কুমুদনাথ চৌধুরী বারবার লিখে গিয়েছিলেন তাঁর বইয়ে যে, রাতে বাঘকে গুলি করে কখনই মাচা থেকে নেমো না। অথচ তাঁকেও বাঘেই খেয়েছিল ওড়িশার কালাহান্ডির জঙ্গলে এবং রাতের বেলা বাঘকে গুলি করে মাচা থেকে নামতেই।

বলো ঋজুদা। তাই নয়!

তিতির বলল।

তাই তো।

ঋজুদা বলল।

ভটকাই বলল, হাজোকে কুমুদ চৌধুরীর বইটা আগে পড়িয়ে নেওয়া উচিত ছিল।

আমি বললাম, বাকিটা শোন। এত ফাজলামি ভাল লাগে না।

তারপর কী করলে?

তিতির বলল।

আমি আর হিরু হাজোকে বয়ে নিয়ে এলাম বাইরের প্রান্তরে কয়েকটি পাথরের আড়ালে, যাতে হাওয়াটা কম লাগে অথচ খোলা হাওয়াও লাগে এমন জায়গাতে। ওকে একটি চ্যাটালো পাথরের ওপর শুইয়ে দিয়ে হিরুকে বললাম, সোজা দৌড় লাগাও। হাজোর টর্চটাও নিয়ে যাও। আর…।

আর, বললাম, আমি যে খাঁজে বসে ছিলাম তাতে একটি ফ্লাস্ক আছে, সেটি নিয়ে এসে হাজোর মুখে ঢেলে দাও কিছুটা। শকটা কেটে যাবে। যদি অবশ্য এখনও প্রাণে বেঁচে থাকে। হাজোর জ্ঞান ছিল না তখন। তারপর বাকিটা তুমি সঙ্গে নিয়ে দৌড়তে থাকে। সুফকর থেকে খাঁটিয়া নিয়ে এসো, লোকজন নিয়ে এসো। গ্রামের মধ্যে যা পাও ওষুধপত্র বদ্যি, তাই নিয়ে এসো।

হিরু গেল এক দৌড়ে ফ্লাস্কের খোঁজে টর্চ হাতে, আমি কাঠকুঠো জোগাড় করে নিয়ে এসে এই জঙ্গলের মধ্যেই পাথরের আড়াল দেখে নিয়ে একটু আগুন করলাম। বড় শীত। ছেলেটা যে বাঁচবে, তা মনে হচ্ছে না। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সারা শরীর; চারধার।

মানুষের রক্তে বড় বদগন্ধ। বুঝলি। সারাজীবন অনেক পশুপাখির রক্ত মেখেছি। দু হাতে, কিন্তু মানুষের রক্তের মতো বিচ্ছিরি বদবু জিনিস আর কিছুই নেই।

তারপর?

তারপর আর কী? হিরু ফিরে এসে মুখে ঢেলে দিল ওই ওষুধ। অনেকখানি। ফ্লাস্ক থেকে। কিন্তু হাজোর মুখে ঢালামাত্রই সেই তরল পদার্থ তার কাঁধের পাশের বাঘের দাঁত ফুটোনোতে যে ফুটো হয়েছিল, তা দিয়ে গড়িয়ে বাইরে চলে এল।

কথাটা বলতে বলতে ঋজুদা যেন অনেক বছর আগে দেখা সেই দৃশ্যটা মনে করে শিউরে উঠল। বাঘের দাঁতের কথা তোমরা, যারা কিছুমাত্রও জানো তারাই অনুমান করতে পারবে দৃশ্যটা।

তারপর ঋজুদা বলল, আমি হিরুকে বললাম, দৌড়োও হিরু পানকা। যত জোরে পারো দৌড়োও।

হিরু পানকা ফটাফট শব্দ করে আরেকবার খৈনী মেরে মুখে দিল। পুরনো দিনের উত্তেজনাময় দুঃসাহসিকতা তাকে রোমাঞ্চিত করছিল।

ঋজুদাও আবার পাইপে আগুন দিল। একটুক্ষণ পাইপ টেনে, তারপর যেন সেই রাতকে চোখের সামনে স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছে, এমনভাবেই আবার বলা শুরু করল।

হিরু দৌড়ে যাচ্ছিল প্রান্তরের মধ্যে দিয়ে। দৌড়তে-দৌড়তে নিশ্চয়ই মাঝে-মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ে ফ্লাস্ক থেকে একটু করে উগ্রগন্ধের সেই ওষুধ খাচ্ছিল। দূর থেকে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম ওর টর্চের আলোটা একটা ছোট্ট বৃত্ত রচনা করে অন্ধকারে লাফাতে লাফাতে যাচ্ছিল ওর সামনে-সামনে। যেন, গ্রাম-বাংলার জলা-কাদা অঞ্চলে রাতের অন্ধকারে আলেয়ার আলো।

পাইপটা ধরালাম আগুন থেকে একটি জ্বলন্ত কাঠি নিয়ে আগুনের সামনে বসে। হাজোর দুটি চোখই বন্ধ ছিল। খেয়েদেয়ে দুপুর দুটোতে সুফকর থেকে বেরিয়েছিলাম। তখন কী ছিল হাজো এখন কী হল!

যাঁরা শিকার সম্বন্ধে কিছুমাত্রই জানেন না, তাঁরাই শুধু বলতে পারেন শিকার? ফুঃ!

হাজো বেঁচে গেছিল?

তিতির শুধোল!

হ্যাঁ। প্রাণে বেঁচে গেছিল। থ্যাঙ্কস্ টু ডক্টর জ্যামখিন্ডিকার। তবে ন মাস জব্বলপুরের হাসপাতালেই ছিল। রাখে কেষ্ট মারে কে! সেই হাজো এখন হাটচান্দ্রার লাক্ষার কোম্পানিতে কাজ করে। যেখানে ঠুঠা বাইগা কাজ করত। বিয়ে করেছে। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। কোয়ার্টার পেয়েছে। চল, কাল নিয়ে যাব তোদের হাজোর কাছে।

তুমি কী বলো, হিরু? যাবে?

জি, হুজৌর। চলুন, আমিও যাব। দেখা হয়নি বহুদিন।

চলো। তোমাকেও নিয়ে যাব।

আচ্ছা ঋজুদা, এই বাঘ-বাঘিনীর, মানে, সুফকর-এর জোড়া বাঘের আশ্চর্য ব্যবহারের তো কোনওই ব্যাখ্যা দিলে না?

তা দিতে হলে বাঘেদের বিহেভরিয়াল সায়ান্স নিয়ে একদিন পড়তে হয়। হবেও। অন্য কোনও সময়ে।

তারপর পাইপে দুটান লাগিয়ে বলল, ঐ জোড়া বাঘের ব্যাপার-স্যাপার সত্যিই আগাগোড়াই রহস্যময়। তবে তোর বোদ্ধা কাকুকে বলে দিস যে, যাঁরা বাঘ মারতেন আগে, আইন মেনে; তাঁদের চরিত্রের সঙ্গে বাঘেদের চরিত্রেরও কিছু মিল থাকতই! লার্জ-হার্টেড জেন্টমেন ছিলেন তাঁরাও, বাঘেদেরই মতো।

তারপর?

ঐ বাঘ আর বাঘিনীকে মেরে মস্ত বড় একটি উপকার আমরা করেছিলাম ঐ অঞ্চলের, না জেনেই; তা ভেবে আজও খুব ভাল লাগে।

কী উপকার ঋজুদা?

আমি শুধোলাম।

ঐ রাতেই ওই বাঘ ও বাঘিনী দুটিকেই না মারতে পারলে হয়তো মানুষখেকোই হয়ে যেত তারা।

এ কথা বলছ কেন?

ঐ অঞ্চলে আগে কখনও মানুষ খেয়েছিল কি না তারা, তা স্পষ্ট জানা যায়নি। কিন্তু বাঘিনীর পেট থেকে একটি আংটি বেরিয়েছিল। মেয়েদের আংটি। ঐ জোড়া বাঘের ব্যবহার সত্যিই আশ্চর্য করেছিল আমাকে! বাঘেদের ঠিক এমন ব্যবহার মধ্যপ্রদেশ কেন, আর কোথাওই দেখিনি। এখনও মনে করলে অবাক লাগে।

আর-এক কাপ করে চা হয়ে যাক, কী বলো ঋজুদা। তারপর ঐ পাহাড়টাতে গিয়ে তোমার গল্পের প্রান্তরটা দেখে আসা যাবে।

মিস্টার ভটকাই বলল।

আমি আর তিতির এখন সুফকর-এর জোড়া বাঘের চেয়েও, সত্যি কথা বলতে কী; বেশি বিপজ্জনক মনে করছি, মিঃ ভটকাইকেই!

তিতির এমন চোখে তাকাল ভটকাইয়ের দিকে, যেন ওকে ভস্মই করে দেবে।

ঋজুদা বলল, ভালই হয়েছে ভটকাই। এক কাপ করে চা বরং হয়েই যাক। শীতটা বড় জাঁকিয়ে পড়েছে। হিরু পানকাকেও দিতে ভুলিস না এক কাপ।

হিরু দুহাতে খৈনী মারতে মারতে, অতীতের স্মৃতিচারণ এমন করে করার জন্যে স্মিতহাসি দিয়ে, নীরবে যেন ধন্যবাদ জানাল ঋজুদাকে!

এবং ধন্যবাদ জানাল চায়ের জন্যেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *