ঋজুদার সঙ্গে সুফকর-এ – বুদ্ধদেব গুহ

শেয়ার করুনঃ

গতকাল খবর যা পাওয়া গেছিল গ্রামের বিভিন্ন মানুষ এবং ফরেস্ট গার্ড, নানার কাছে তাতে জানা গেল যে আমার অনুমান মিথ্যে প্রমাণিত করে প্রায় বারোজন শিকারি বিভিন্নরকম দেশি-বিদেশি অস্ত্র নিয়ে পুরো জায়গাটা ঘিরে গাছে-গাছে বসেছিল। মালভূমির ওপরের অন্য প্রান্ত থেকে শুরু করে, মালভূমির দু পাশে স্টপারদের দশ-পনেরো হাত অন্তর গাছে-গাছে বসিয়ে ছুলোয়া করেছিল একশ বিটারদের দিয়ে যাতে বাঘেরা তাড়া খেয়ে মালভূমি থেকে নেমে নীচে আসে, রাইফেল-বন্দুকের নলের সামনে। নীচে এলে, যেদিকেই যাক না কেন, একাধিক শিকারীর সামনে তাদের পড়তেই হত।

তারপর?

বাঘ এসেও ছিল। কিন্তু দুজন শিকারী আগ বাড়িয়ে হড়বড়িয়ে গুলি করে দেয় গাদা বন্দুক দিয়ে। বড় বাঘটির ওপরে। অনেকই দূর থেকে। গুলি লেগেছে কি লাগেনি তা নিশ্চিতভাবে বলতেও পারেনি তারা। বাঘ এক লাফে সোঁতা পার হয়ে বাঁ দিকের বনে ঢুকে গেছিল।

তবে, মস্ত বাঘ। যারা দেখেছে, তারা সকলেই বলেছে। মানে, ঐ বাঘটিই।

অন্য বাঘটা? মানে বাঘিনী?।

সে যে কোথায় ছিল, দেখেনি কেউই। সে বেরোয়ইনি। বা হয়তো তখন মালভূমিতে ছিলই না।

চমৎকার!

মনে মনে বললাম, আমি।

আজও সকাল থেকেই বৃষ্টি। শনশনে হাওয়া। কনে ঠাণ্ডা। পরশুদিনেরই মতো ওয়েদার। পৌঁছলামও গিয়ে অকুস্থলে প্রায় সেই পরশুদিনেরই সময়ে। তবে, আজ আমরা সারারাত থাকব বলে তৈরি হয়েই এসেছি।

সঙ্গে কোনও বেইট নিলে না ঋজুদা? মোষ বা বলদ?

আমি শুধোলাম।

না। ওই বাঘেরা অত্যন্তই সন্দিগ্ধ ছিল। বাঁধা বেইট-এর ধারেকাছেও আসে নাকি কখনও। আর ভুল করে যদি কখনও বাঁধা বেইট মেরেও দেয় তবুও কখনওই ফেরে না মড়িতে। বাঁধা জানোয়ার ধরার নজির নেই এদের। ভারী সেয়ানা। পাহান্ তো সে কথা আমাকে আগেই বলে দিয়েছিল।

তারপর?

ভটকাই বলল, কসেট্রেট ঋজুদা, প্লীজ কনসেনট্রেট।

এবারে তুই কিন্তু সত্যিই ডিসটার্ব করছিস ভটকাই।

ঋজুদা বলল।

সেদিনও আমার পরশুদিনের সেই জায়গাটিতে উঠে বসতে বসতেই অন্ধকার করে এল। ওরা যে কোথায় বসল, মানে অন্য মাচাটা যে কোথায়, তা আজ ঠিকঠাক দেখে নিয়েছিলাম। তবে অন্ধকার হয়ে গেলে এখানে দেখা যাবে না কিছুই। শব্দ শুনেই সব কিছু বুঝতে হবে। শ্রবণেন্দ্রিয়ই হবে একমাত্র ইন্দ্রিয়। সঙ্কেত আজও একই আছে। পরশুরই মতো।

আমি সেই খাঁজটাতে কষ্টেসৃষ্টে উঠে বসেছি পাথরজড়ানো মোটা শিকড়ে পা রেখে-রেখে। সেদিনেরই মতো পাহাড়ি ঈগলটি মালভূমির কোনও উঁচু গাছ থেকে উড়ে এসে বসল আজও একটি প্রাচীন শিমুলের ডালে। তার তীক্ষ্ণ ডাকে সেই সন্ধেরই মতো রাতের হিমেল বনের নিস্তব্ধতাকে ফালাফালা করে দিয়ে অন্ধকারকে নাড়িয়ে-চাড়িয়ে এলোমেলো করে দিল। করে দিয়েই, যখন উড়ে গেল উন্মুক্ত প্রান্তরের দিকে, তখন তাকে দেখা গেল। খরগোশ বা সাপ বা বড় মেঠো ইঁদুরের খোঁজে। এই শীতে সাপ পাবে না হয়তো। তবু, চেষ্টাই তো জীবন।

ঈগলটি চলে যেতেই একটি কোটরা হরিণ ওই চন্দ্রাতপের নীচের কোনও জায়গা থেকেই ভয় পেয়ে ডাকতে-ডাকতে জঙ্গলের গভীরে চলে গেল। হাজো আর হিরুরা যেদিকে বসবে বলে গেছে, সেদিকে। একটু পরই মনে হল যে, কোটটা ওদের মাচার পেছনে পৌঁছে গেছে।

এখন একেবারে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার। চোখেমুখে থাবড়া মারছে পরশু রাতেই মতো। অন্ধকার যেন জলের নীচের জলেরই মতো ভারী। জলের নীচে তলিয়ে গিয়ে চোখের পাতা খুলতে যেমন জোর লাগে এই অন্ধকারেরও তেমনই ভার আছে। চোখ খুলতে বিষম প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে সেই ভার।

হঠাৎই আবারও একটা কোটরা ডাকতে লাগল, যেদিকে হাজোরা বসে ছিল সেদিক থেকেই। আগের কোটরাটাই কি না তা বোঝা গেল না। পরক্ষণেই সে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে ডাকতে-ডাকতে দ্রুত দৌড়ে গেল ওদের মাচার পেছনের গভীরে ঝোপঝাড় ভেঙে। ফারদার এওয়ে ফ্রম দ্য মাচান।

কোটরাটার ডাক থামার কিছুটা পরেই একটা গুলির শব্দ হল। তার পরক্ষণেই আরও একটা সেটা অন্য জায়গা থেকে। তবে প্রথম গুলিটির কাছ থেকেই।

ওরা কিসের ওপরে চাঁদমারি করছে কে জানে?

ভাবছিলাম আমি। কিছুমাত্রই দেখিনি বা শুনিনি আমি।

তারপরই নিস্তব্ধতাটা আরও গম্ভীর হল। কিসের ওপর যে গুলি হল এবং গুলির ফলাফল যে কী হল তাও বোঝার উপায় রইল না কোনও অন্ধকারে গুলি করলই বা কী করে ওরা, দুজনে দুজায়গা থেকে? টর্চ না জ্বেলে? টর্চ সঙ্গে থাকতেও কেন অন্ধকারে গুলি করল?

ওরা অবশ্য জঙ্গলেরই মানুষ। আমাদের চোখের দৃষ্টি-ক্ষমতার সঙ্গে ওদের চোখের দৃষ্টি ক্ষমতার তুলনা চলে না। অন্ধকারেও দেখতে পায় ওরা বনের প্রাণীদেরই মতো। তা ছাড়া, শটগান দিয়ে মারতে অত নির্ভুল নিশানার দরকারও হয় না। আন্দাজেও মারা চলে।

গুলির শব্দ হওয়ার সামান্য পরেই কুলকুচি করার মতো একটি আওয়াজ আমার ডান দিকে, উঠে-যাওয়া পাহাড়ের একেবারে পাড়ের কাছ থেকে হল। বাঘের মুখে রক্ত ওঠার আওয়াজ। মৃত্যুর আগে এরকম শব্দ হয় অনেক সময়ে। বুকে গুলি লাগলে। ওই শব্দটা কোথা থেকে এল তা অনুমান করে নিয়ে বুঝলাম যে, গুলি খুব কাছ থেকে করা হয়েছে, যেই করে থাকুক না কেন। একজন অথবা ওরা দুজনেই পর-পর লক্ষ্যভেদ করাতে বাঘ বা বাঘিনী যে-ই হোক, সে সম্ভবত নড়তেই পারেনি তার জায়গা থেকে। মার, মোক্ষম হয়েছে।

আসলে বুঝলি, এই হিরু, হাজো, এরা শিকারি তো আমাদের চেয়ে অনেক, অনেক গুণই ভাল। শিকার ওদের ধমনীতে বইছে অনাদিকাল থেকে। আমাদের বাহাদুরি বলতে কিছুমাত্রই নেই। আমাদের মতো হাতিয়ার ওদের যদি থাকত তবে আমাদের কোনও দামই থাকত না। তবে এ কথাও সত্যি যে, এইরকম সব আগ্নেয়াস্ত্র ওদের সকলের বা কিছু মানুষের কাছে থাকলে বন্যপ্রাণীও হয়তো অনেকদিন আগেই শেষ হয়ে যেত। ওদের খিদে যে সর্বগ্রাসী। তোদের বোদ্ধাকাকুরা জানেন না যে বন্যপ্রাণী শেষ হয়েছে আসলে বুনোদেরই হাতে। শিক্ষিত শহুরে শিকারীরা আইন মেনে আর কটি প্রাণী শিকার করেছেন তাদের তুলনাতে, সারা ভারতবর্ষে? গাদা বন্দুক, তীর-ধনুক, বিষ, ফলিডল, জাল ইত্যাদি দিয়ে যে-সংখ্যক বন্যপ্রাণী মারা হয়েছে স্বাধীনতার পর তা অবিশ্বাস্যই। মানুষের সংখ্যা এতই বেড়েছে, সঙ্গে মানুষের খিদে এবং লোভও এবং অপ্রয়োজনের প্রয়োজন যে; যা-কিছুই সুন্দর তার সব কিছুকেই শেষ করে দেওয়ার যজ্ঞে মেতে উঠেছে গ্রামীণ ও বন্য সব মানুষই। এইখানেই হিরু এবং হাজোদের সঙ্গে আমাদের তফাত। আমাদের শিক্ষা, আইনের প্রতি জন্মগত শ্রদ্ধাবোধ, বহির্বিশ্ব সম্বন্ধে জ্ঞান; আমাদের হয়তো সংযমী করেছে। অন্তত কিছুটা। সব ব্যাপারেই কোথায় যে থামা উচিত, সেই বোধটি আমাদের মধ্যে আমাদের শিক্ষা অন্তত কিছুমাত্রায় সঞ্চারিত করেছে অবশ্যই।

না-করে থাকলেও, সকলের মধ্যেই করা উচিত।

কন্টিনিউ।

ভটকাই বলে উঠল।

ঋজুদা রীতিমত হকচকিয়ে গেল।

আমি বললাম, বুঝলি ভটকাই ঐ জ্ঞানের কিছুটা তোর সবজান্তা বোন্ধাকাকুকে দিস। বিলিতি রাইফেলের ঘোড়া টানলুম আর বাঘ মারলুম গোছের ধারণা যাদের, তাদেরও জ্ঞানের দরকার।

জ্ঞানের সীমা চিরদিনই ছিল, কিন্তু মূখামির সীমা তো ছিল না। কোনওদিনই!

ভটকাই বলল।

তিতির বলে উঠল, তাই মূর্খদের মধ্যে জ্ঞান বিতরণ না করাই ভাল।

আমি বললাম, নাটকের শেষ অঙ্কে এসে তোরা এমন আরম্ভ করলি! সত্যি! তোদের কোনও সেন্সই নেই। বলো, ঋজুদা।

বলছি। চুপ কর আগে তোরা সকলে।

এই করলাম চুপ।

ভটকাই বলল।

দেখতে দেখতে রাত সোয়া সাতটা বেজে গেল। সন্ধে হয়েছিল, প্রায় পৌনে পাঁচটার সময়ে। পর-পর দুটি গুলির শব্দ এবং শব্দের প্রতিধ্বনি পাহাড়ে মালভূমিতে দৌড়ে গিয়ে থেমে যাওয়ার পর এখন নিস্তব্ধতা আরও গম্ভীর হয়েছে। শীত এবারে একেবারে স্বরাট সম্রাট হয়ে মৌরসিপাট্টা গেড়ে বসেছে। কোনওদিকে কোনও সাড়াশব্দ নেই। শিশির ঝরছে গাছপালা থেকে এখনই। শুধু তারই টুপ টাপ শব্দ। থেমে থেমে হচ্ছে। কোনওরকম জানোয়ারের নড়াচড়ার সঙ্কেতও নেই, কাছে কি দূরে! জংলি ইঁদুর শুধু সির-সির তিরতির শব্দ করে নড়েচড়ে বেড়াচ্ছে বৃষ্টিভেজা লাল-হলুদ-সবুজ, ঝরা-পাতা, ঘাস-পাতার মধ্যে-মধ্যে।

আশ্চর্য!

থার্মোফ্লাস্কটা গতরাতে যেখানে রেখেছিলাম, সেখানেই আছে। তার মানে, এখানে কালকে কোনও শিকারী বসেনি। অথচ বসলে ভাল করত। জায়গাটা খুবই ভাল। থামোফ্লাস্কটাতে কি চা-কফি কিছু ছিল? সাবধানে, নিঃশব্দে খুলে গন্ধ শুকলাম একটু।

নিশ্চয়ই অন্য কিছু হবে। চা-কফি নয়। কড়া পানীয়।

আবার সাবধানে বন্ধ করে রাখলাম। পরের দ্রব্য না বলিয়া লইলে চুরি করা হয় যদিও, তবু হিরু আর হাজো এই বস্তু পেলে একেবারে লাফিয়ে উঠবে এই ঠাণ্ডাতে এই ভেবেই, সযত্নে রাখলাম সেটাকে।

ঘড়িতে ঠিক কটা বেজেছে জানি না। হঠাৎ ওরা পেঁচার ডাক ডাকল, আর শুয়োরের ঘোঁত-ঘোঁত করল।

কিন্তু কেন? আমিও টি-টি পাখির ডাক ডাকলাম। এবং নামার উদ্যোগ করলাম। খাঁজটা থেকে আমি নামতে যাব, টর্চ জ্বালব; ঠিক সেই সময়েই যেখানে ওদের মাচাটা থাকার কথা সেখান থেকে ধপ করে একটা আওয়াজ হল।

বুঝলাম, গাছ থেকে লাফিয়ে নামল কেউ। এবং হাজো চেঁচিয়ে বলল, জলদি আইয়ে হুজৌর। বাঘকো ভূঞ্জ দিয়া গোল্লিসে।

তাহলে হাজোই নামল গাছ থেকে লাফিয়ে!

কিন্তু হাজোর কথা শেষ হল না। একটা আঁ-আঁ-আক্‌ শব্দ যেন ওর কথাকটি গিলে ফেলল। সঙ্গে-সঙ্গেই টর্চটা জ্বেলে সেদিকে ফেললাম। দেখি, বিরাট একটা বাঘ হাজোর কাঁধ আর ডান হাতের মধ্যে কামড়ে ধরেছে। হিরু পানকাও গাছে বসেই সঙ্গে সঙ্গেই টর্চ জ্বালিয়ে আলো ফেলল জো আর বাঘের ওপরে। আর তুমুল গালাগালি করতে লাগল বাঘকে। বিচ্ছিরিভাবে। অশ্লীল ভাষাতে।

গুলি করলে হাজোর গায়ে লেগে যাবার আশঙ্কা ছিল। আসলে ও সেইজন্যেই চিৎকার করে বাঘকে তার দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছিল। ঐ উচ্চাসনে বসে ঐ একই কারণে আমার পক্ষেও গুলি করার উপায় ছিল না।

আমি ফ্লাস্কটা ফেলে রেখে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নীচে নেমে এসেই বাঁ হাতে টর্চ আর ডানহাতে রাইফেল ধরে দৌড়ে গেলাম ওদিকে। দৌড়ে গেলাম এই জন্যে যে, মাচা থেকে গুলি করলেও গুলি হাজোর গায়ে লাগতে পারত।

আমার ওই মারমূর্তি দেখেও বাঘ একটুও ভয় পেল না।

ভয় ব্যাপারটা তাদের চরিত্রেই নেই আদৌ। সে এক ঝলক মুখ ফিরিয়ে দেখেই হাজোকে এক ঝটকায় মাটিতে নামিয়ে আমার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে একবার হুঙ্কার দিল। সেই হুঙ্কার অন্ধকার শীতার্ত রাতের বৃষ্টিভেজা বনপাহাড়ের মধ্যে গহন জঙ্গলের সেই ঘেরাটোপের, চন্দ্রাতপের নীচে যেন নিউক্লিয়ার বোমা ফাটাল।

রেগে-যাওয়া বাঘের গর্জন যে বনে-পাহাড়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে না শুনেছে, সে কখনওই জানবে না যে, সে কী ভয়ানক ব্যাপার! ঘাসপাতা, ঝোপ ঝাড় মহীরূহ, পাহাড় সব যেন ভয়ে কেঁপে কেঁপে উঠল সেই হুঙ্কারে। দুর্গন্ধ থুতু যেন ছিটকে এল আমার মুখে।

আমি ওখানেই শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, (সে আমার কাছেই ছিল। মানে, এমন কাছে যে, তার আর আমার দুজনেরই দুজনকে মারতে কোনও অসুবিধে ছিল না।) রাইফেলটা ডান হাতে তুলে কাঁধ বরাবর করলাম বাঁ হাতে টর্চ ধরে। ফোর-ফিফটি ফোর-হান্ড্রেড জেরি নাম্বার টু রাইফেলটা ভারীও তো কম নয়। তবে শরীরে তখন শক্তিও তেমনই ছিল। নিয়মিত স্কোয়াশ খেলতাম। তেমন-তেমন সময়ে শক্তি যেন উড়েও আসত কোনও অদৃশ্য উৎস থেকে।

হাজোকে মাটিতে নামিয়ে যেই বাঘ আমার দিকে ফিরে দ্বিতীয় বার হুঙ্কার দিয়েছে এবং আমি রাইফেল তুলেছি, তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাঘের প্রায় ঘাড়েরই ওপরের কেঁদ গাছে বসে-থাকা হিরু পানকাও বাঘের ঘাড় লক্ষ্য করে গুলি করল। ততক্ষণে আমার হেভি রাইফেলের সফট-নোজড গুলিও গিয়ে আমারই দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা বাঘের সামনের দুপায়ের মধ্যে এবং গলার ঠিক নীচে, বুকে ঢুকে গেল। কিন্তু হলে কী হয়! তার মুখ যে ছিল আমারই দিকে। রিফ্লেক্স অ্যাকশানে সে আমাকে লক্ষ্য করে লাফ দিল গুলি করার সঙ্গে-সঙ্গেই। কিন্তু হিরুর গুলিটা ঠিক ঘাড় আর মেরুদণ্ডের সংযোগস্থলে গিয়ে পড়াতে তার বাঘত্ব আর ছিল না।

মানুষেরই মতো, বাঘেরও মেরুদণ্ডই চলে গেলে আর কী থাকে? কিছু থাকে কি?

জোড়া বাঘ ছিল কোথায়? তারা দুজনে তোমাদের কাছে এলই বা কোথা থেকে? তোমরা তিন শিকারি জানতেই পেলে না?

ভটকাই শুধোল।

হিরু পানকা ভটকাই-এর কথা শুনে মাথা নাড়তে লাগল। যেন, বলতে চাইল, চুপ করো না বাপু। মেলা কথা বোলো না। কতদিনের সব ঘটনা যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

ঋজুদা বলল, বাঘিনী তো হিরু ও হাজোর গুলি খেয়ে পটকেই গেছিল আগেই। কিন্তু সেইটেই তো কথা! একেই বলে বাঘ! আমরা তিনজন অভিজ্ঞ শিকারী অতি সামান্য একফালি জায়গাতে নজরদারি করছিলাম, তবু টেরই পেলাম না! কী করে বাঘ এল, কোথা দিয়ে এল! এবং একটি নয়, দু দুটি।

ভটকাই বলল, অবশ্য ঘুটঘুটে অন্ধকারে, দেখবেই বা কী করে?

সেটা কোনও কথাই নয়।

ঋজুদা বলল।

ঘুটঘুটে অন্ধকারেও ইঁদুর নড়লেও শব্দ হয়। ঝোপের মধ্যে পাখি সরে বসলেও তার শব্দ কানে আসে বনের মধ্যের নিস্তব্ধ রাতে। গাছের ওপরের হনুমান দীর্ঘশ্বাস ফেললে তাও স্পষ্ট শোনা যায়, কিন্তু শোনা যায় না, যে-জানোয়ারের অত ওজন, যে-জানোয়ার একটি পূর্ণবয়স্ক মোষ বা শম্বর বা বারাশিঙাকে মেরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বা পিঠে চাপিয়ে উঠে যেতে পারে পাহাড়চুড়োয় অথবা নেমে যেতে পারে পাহাড়তলিতে, (মাইলের পর মাইল কখনও কখনও) তারই কোনওই শব্দ পাওয়া যায় না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *