ম্যানহাটানের ম্যাডম্যান (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
(১২)
কলেজে আমার ঘরে ঢোকার মুখে যে অফিস রয়েছে সেখানেই বেভ বসে। সাধারণত, আমি চট করে ‘হায়’ বলে ঘরে ঢুকি। আজকে তা না করে বেভের ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ালাম। টেবিলের ওপর হাতটা রেখে বললাম, “হ্যালো।”
বেভ কম্পিউটারে কিছু একটা টাইপ করছিল। সেটা থামিয়ে মুখ তুলে উত্তর দিল, “হ্যালো।”
কয়েক সেকেন্ড চলে গেল কী ভাবে কথাটা শুরু করব ভাবতে গিয়ে।
বেভের চোখ ভাসা ভাসা, “ইয়েস?”
হঠাৎই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, “একটা পার্সোনাল কোয়েশ্চেন করতে পারি?”
“পারো, তবে আমার সেক্স-লাইফ নিয়ে কোনও কোয়েশ্চেন নয়।” তারপর একটু দুষ্টু হেসে যোগ করল, “অন্তত আরেকটু পরিচয় না হওয়া পর্যন্ত।”
নো ওয়ান্ডার রামসুন্দর রেড্ডী কেন সতর্ক করেছিল! লাল হচ্ছি দেখে আলতো করে আমার হাতটা ছুঁল বেভ।
“জাস্ট কিডিং, কী কোয়েশ্চেন বলো?”
“কিশোরের কাছে শুনেছি, তোমার আন্ট মিশেল হোবোকেন-এ থাকেন। উনি কি কোনও স্যুপ কিচেনের সঙ্গে যুক্ত?”
“ইয়েস,” বেভের মুখ-চোখের ভাব হঠাৎ পালটে গেল। সহজ খুশিতে ঝকমক করে উঠল। “তুমি আন্টি মিশেলকে চেন? আমি ওর কাছেই বড় হয়েছি। আমার মায়ের মতো।”
“আই নো অফ হার। আমার একজন পরিচিত ওঁকে চিনতেন।”
“হু ইজ হি অর ইজ ইট শি?”
“ইজ নয় ওয়াজ, হি ইজ ডেড।”
“ওয়েট এ মিনিট, তুমি কি সেই ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট ম্যানেজারের কথা বলছ?”
“হ্যাঁ, অশোক দুবে।”
“ও মাই গড! আন্টি মিশেল এত আপসেট হয়েছে ওঁর মৃত্যুর খবরে… কিছুতেই ভাবতে পারছে না, ওরকম একজন চমৎকার ইয়ং ম্যানকে কে খুন করল!”
“হোপফুলি সেটা জানা যাবে, আমার পরিচিত একজন ভালো প্রাইভেট ডিটেকটিভ অশোকের মৃত্যুর তদন্ত করছেন।”
“সত্যি? খুব ভালো কথা, আন্টি মিশেল শুনলে খুশি হবে। হোবাকেনের পুলিশের উপর ওর একেবারেই ভরসা নেই।”
“ওঁর সঙ্গে একবার হয়তো আমাদের কথা বলার দরকার হতে পারে। উনি কি রাজি হবেন?”
“কেন হবে না, আমাকে আগে থাকতে জানিও, আমি বলে রাখব। আর কিছু?”
“আপাতত আর কিছু নয়।”
“তাহলে কি পরে?” চোখে আবার সেই দুষ্টুমির ঝিলিক।
আমি একটু হেসে আমার ঘরের দিকে পা বাড়াতে যাচ্ছি, বেভের গলার স্বর হঠাৎ নিচু হয়ে গেল। “থ্যাঙ্ক ইউ ফর স্টপিং বাই, এন্ড সেইং হ্যালো টু মি।”
ঠাট্টা নয়, আন্তরিক ভাবেই কথাটা বলল। কিছু কিছু মেয়ে আছে, যারা ছেলেদের একটু খেলাতে ভালোবাসে– ওয়ান্টস টু প্লে উইথ মেন, কিন্তু মনের ভেতরটা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। কে জানে, বেভ হয়তো সে রকম ধরনেরই মেয়ে।
.
বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখলাম একেনবাবু আর প্রমথ ইন্টারনেটে কী জানি দেখছে।
“কী দেখছিস?” কাঁধের ব্যাগটা নামাতে নামাতে জিজ্ঞেস করলাম।
“সিন্ধ ডাক-এর দাম,” প্রমথ উত্তর দিল।
“নামটা সিন্ডে ডক,” আমি বললাম। “ফিলাটেলিস্ট কর্নারে ওই নামটাই শুনেছি।”
“জায়গাটার নাম সিন্ধ, সিন্ডে নয়। আর পোস্টাল সার্ভিসকে বলা হয় ডাক– ডক নয়। তোকে তো সায়েবরা ব্যাপি ডে বলে ডাকে– তোর নাম কি ব্যাপি ডে?”
প্রমথর সঙ্গে তর্ক করার কোনও অর্থ হয় না। সংসারে দু’ধরণের লোক আছে। একদল, যারা ভাবে তারা জানে। আরেকদল, যারা জানে তারা জানে। প্রমথ হল দ্বিতীয় দলের লোক। প্রথম দলের লোকদের তবু যুক্তি দিয়ে বোঝানো যায়, দ্বিতীয় দলের সঙ্গে সে চেষ্টা বৃথা।
চোখে কিছু একটা পড়েছিল, সেটা ধুতে বাথরুমে গেলাম। ফিরে এসে প্রমথকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী আবিষ্কার করলি?”
“কোন আবিষ্কারের কথা জিজ্ঞেস করছিস? আবিষ্কার তো প্রতিদিনই কিছু না কিছু করি।”
“চ্যাংড়ামি করিস না, স্ট্যাম্পের দামের কথা জানতে চাইছি।”
“তেমন দামি নয়। ছাপ-মারা স্ট্যাম্প হলে বড়জোর আট ন’হাজার ডলার। ছাপ-মারাই তো বলেছিল, তাই না?”
“হ্যাঁ, লজেন্স ক্যানসেল বা ওই জাতীয় কিছু।”
“ওই হল, মানে পোস্ট অফিসে ক্যানসেল হওয়া স্ট্যাম্প, মিন্ট কনডিশন নয়। মিন্ট কনডিশন হলে আরও বেশি হত।”
“কিন্তু আট ন’হাজার ডলার কম হল নাকি?”
“ও, তার মানে তুই হলে ওই টাকার জন্যে একটা লোককে খুন করতিস?”
“আমার প্রশ্ন উঠছে কেন? আমি কোটি টাকা পেলেও কাউকে খুন করব না।”
“শুনুন একেনবাবু, একটু আগে তো আপনি বাপিবাবুর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হচ্ছিলেন– কী বিনয়ী, কী ভদ্র! এখন শুনলেন তো নিজের মরালিটি নিয়ে কিরকম বড়াই করছে!”
“যাই বলুন স্যার, আমি কিন্তু কনফিউসড,” একেনবাবু বললেন।
“কনফিউশনটা কিসে?” প্রমথ এবার একেনবাবুকে নিয়ে পড়ল। “সিন্ধ ডাক নিয়ে, ন’হাজার ডলার কম কি বেশি নিয়ে, না বাপি কোটি টাকা পেলেও খুন করবে না– তাই নিয়ে?”
“তা নয় স্যার, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের সঙ্গে এই নিয়ে একটু কথা হচ্ছিল। ওঁর কাছ থেকে খবর পেলাম, হোবোকেনের কাছে গোটা ছয়েক স্ট্যাম্প ডিলার আছে। নিউ হেরিটেজ হোটেলের কাছাকাছিও আছে অনেকগুলো। তাদের কাছে না গিয়ে এতদূরে অশোকবাবু এলেন কেন?”
“হয়তো এদিকে কারোর সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন,” আমি বললাম।
“পসিবল স্যার, কিন্তু প্রবাবল নয়। সত্যিই যদি টাকার জন্যে স্ট্যাম্প চুরি করে থাকেন, তাহলে সেই দামি স্ট্যাম্প সঙ্গে নিয়ে নানান জায়গায় ঘোরাঘুরি করবেন, এটা বিশ্বাস করা কঠিন।”
“আপনি কী বলতে চান?” প্রমথ প্রশ্ন করল।
“হয়তো আমরা ভুল দিকে এগোচ্ছি স্যার। যিনি স্ট্যাম্প বিক্রি করতে এসেছিলেন, তিনি অন্য লোক। এই স্ট্যাম্পের সঙ্গে অশোকবাবুর কোনও সম্পর্কই নেই।”
“দাঁড়ান দাঁড়ান, তা কী করে সম্ভব! দোকানদার তাহলে অশোকের নাম করল কেন?” আমি অবাক হয়ে বললাম।
“আই হ্যাভ নো ফ্লু স্যার, আই অ্যাম টোটালি কনফিউসড।”
“তার মানে তো আপনি ব্যাক টু স্কোয়ার ওয়ান,” প্রমথ বলল। “যেই তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই আছেন।”
“তাই তো দাঁড়াচ্ছে স্যার।”
“তাহলে এখন কী করবেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“দেখি স্যার, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের কাছ থেকে যদি কোনও খবর পাই।”
“আর কী খবর দেবেন?”
“উনি খোঁজ নিচ্ছেন নিউ ইয়র্কের স্ট্যাম্প ডিলারদের কেউ দিন পনেরোর মধ্যে এই সিন্ধ ডাক স্ট্যাম্প কেনাবেচা করেছে কিনা।”
‘যদি করে থাকে?” প্রমথ প্রশ্ন করল।
“বেচাকেনার ব্যাপারটা ১৩ তারিখে আগে হলে তিনি অশোক, পরে হলে অশোকের খুনি।”
“তার মানেটা কী দাঁড়াল? সিন্ধ ডাক স্ট্যাম্পটা বিক্রি করতে যে ফিলাটেলিস্ট কর্নারে এসেছিল, সে অশোক নয়, অশোকের খুনি? তাই বলতে চান?”
একেনবাবু নির্বিকার ভাবে বললেন, “জানি না স্যার, কারণ কবে এসেছিলেন সেই ডেটা পয়েন্ট মিসিং। কিন্তু ভেরি কনফিউসিং।”
“ফটোটার কথা ভুলে যাচ্ছেন কেন? বিপাশা তো ফটোটার কথাই বলেছিল, স্ট্যাম্পের কথা নয়। ছবিটা যদি স্টাইচেনের হয়, তাহলে তো লক্ষ লক্ষ ডলারের ব্যাপার!” আমি বললাম।
“তাও ঠিক স্যার।”
“তাহলে?”
“সেটা আরেকটা কনফিউইসিং ব্যাপার স্যার। স্টাইচেনের ছবির দাম এখন হয়তো অনেক হতে পারে, কিন্তু ত্রিপুরার মহারাজ যখন ওটা বিপাশা মিত্রের ঠাকুরদার বাবাকে দিয়েছিলেন, তখন তার দাম কি এত ছিল? রঙিন ছবি তো অনেকেই তুলতেন সেকালে। চিঠিতে ‘একটা অমূল্য ধন পাঠালাম’ লিখলেন কেন?”
“ওই চিঠিটা হয় তো একটা ঠাট্টা,” আমি বললাম। “কথাটা মহারাজ হয়তো মজা করেই লিখেছিলেন। আমরা সেটা নিয়ে এত অ্যানালিসিস করছি দেখে উনি স্বর্গে বসে হাসছেন।”
“এটা মোক্ষম বলেছেন স্যার, চিঠিটাকে বেশি ভ্যালু দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু স্ট্যাম্প আর ফটোটা স্যার ফেলনা নয়। ওগুলো যদি দামি হয়, তাহলে চিঠিতে যাই লেখা থাকুক ওগুলো দামিই থাকবে।”
“মানছি, কিন্তু স্ট্যাম্পের ব্যাপারে যদি বা কিছু লিড পেয়েছি, ফটোর ব্যাপারে তো কিছুই পাওয়া যায়নি?”
“তা যায়নি স্যার।”
“আমার একটা নতুন চিন্তা মাথা এসেছে,” প্রমথ ঘোষণা করল।
“কী স্যার?”
“অশোকের খুনি অশোককে খুন করতে চায়নি, চেয়েছিল বাপিকে খুন করতে। দেবরাজবাবু বললেন না, বাপির মতো চেহারা ছিল অশোকের? বাপি ছাত্রদের যেরকম আজেবাজে গ্রেড দেয়, ওর তো শত্রুর অভাব থাকা উচিত নয়। আপনি সেই অ্যাঙ্গেল থেকে ব্যাপারটা দেখুন।”
“আপনি না স্যার, সত্যি!” একেনবাবু বেশ অ্যামিউজড স্বরে বললেন।
আমি প্রমথকে ধমকে বললাম, “আজেবাজে না বকে, একটু সিরিয়াস হ।”
তারপর বেভের সঙ্গে আমার সকালের কথাবার্তা জানিয়ে একেনবাবুকে জিজ্ঞেস করলাম, “একবার এই মিশেলের সঙ্গে কথা বলতে চান?”
“আমি বেভের সঙ্গেও কথা বলতে চাই, খাসা চেহারা মেয়েটার, প্রমথর উত্তর।
“চ্যাংড়ামি করিস না! কি একেনবাবু, বেভকে বলব?”
“বলুন না স্যার, ক্ষতি তো কিছু নেই। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা বলা হয়নি, ম্যাডাম ক্যাথি ক্যাসেলের সঙ্গে কথা হয়েছে। উনি মিস্টার ক্যাসেলের মৃত্যুর ব্যাপারে আমাদের একটু সাহায্য চান।”
“কী সাহায্য?”
“সত্যি কথা বলতে কি স্যার, ওঁর কথা পরিষ্কার বুঝলাম না। মনে হয় ভোকাল কর্ডের কোনো সমস্যা আছে। যাই হোক, কাল বিকেলে পাঁচটা নাগাদ ওঁর কাছে যাব বলেছি। ম্যাডাম একটা ঠিকানা বললেন, ধরতে পারলাম না। তবে সতীশবাবু, মানে মিস্টার সতীশ কুমার এর মধ্যে ফোন করে সব ডিটেলস দিয়ে দেবেন বললেন। আপনারা পারবেন আসতে?”
