আসল খুনির সন্ধানে (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

ছয়

মাথাফাটা রতনের ডেরা হল যাদবপুর অঞ্চলে একটা রাজনৈতিক দলের পার্টি অফিসের পাশে ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে। এসব জায়গার ঠিকানা থাকে না। রাস্তার ধারে জবরদখল জমিতে বাঁশ আর দরমা দিয়ে বানানো অফিস। ওপরে টিনের চালা। পার্টি ফ্ল্যাগের আধিক্যই অফিসটা চেনার একমাত্র উপায়। পাশে চায়ের দোকানের পিছনটা একটা দরমা দিয়ে ঢাকা যাতে পিছনের নালাটা চোখে না পড়ে। দরমা ঘেঁষে জনা তিনেকের বসার মতো ছোটো কাঠের বেঞ্চ। এ ছাড়া লম্বা একটা বেঞ্চ সাইড দেয়ালে গা ঠেকিয়ে আড়াআড়ি ভাবে বসানো। দোকানের সামনে একটা রং-চটা কাঠের কাউন্টার। সেখানে দুটো বড় বয়াম আর একটা ঝুড়ি। বয়ামে বিস্কুট, কাপ-কেক ইত্যাদি। ঝুড়িতে কিছু শিঙাড়া। কাউন্টারের পাশে একটা গ্যাসের স্টোভে চায়ের কেটলি বসানো। আরও

 

একটা বড় উনুন দোকানের পিছন দিকে। সেটা বোধহয় শিঙাড়া বা ভাজাভুজির জন্য।

 

একেনবাবু যখন সেখানে পৌঁছোলেন তখন সকাল দশটা। দোকানের মালিকের কাছে সুদেব কুন্ডুর খোঁজ করতেই ইশারায় দেখিয়ে দিল।

 

বেশ কয়েকটা গুন্ডা টাইপ লোকের মাঝখানে বসে গোল্ডফ্রেমের চশমা পরা কালো হুমদো লোক। খোঁচাখোঁচা দাড়ি, ব্যাকব্রাশ করা চুল, গলায় সোনার চেন। সোয়েটশার্টের রঙ ক্যাটকেটে হলুদ, পরনে জিনসের একটা প্যান্ট।

 

একেনবাবু এগিয়ে গিয়ে নমস্কার করলেন। “নমস্কার স্যার, আমার নাম একেন সেন। আপনি কি সুদেববাবু?”

 

“এখানে নতুন?”

 

“কী করে বুঝলেন স্যার?”

 

“নইলে প্রশ্নটা করতেন না।” তারপর হাঁক দিয়ে দোকানিকে, “ওরে রেমো, এক কাপ চা দে, বাবু আলাপ করতে এসেছেন। এবার একেনবাবুকে, “থাকা হয় কোথায়?”

 

“আপাতত স্যার, নিউ ইয়র্কে।”

 

“নিউ ইয়র্ক? মানে আমেরিকায়!” মাথাফাটা রতনের চোখে অবিশ্বাস। “আপনার চেহারা আর জামাকাপড় দেখে তো তা মনে হচ্ছে না!”

 

“সালা ঝুট বলছে,” পাশের লোকটা মন্তব্য করল।

 

একেনবাবু অ্যাস ইউসুয়াল ইস্তিরি ছাড়া কোঁচকানো একটা শার্ট আর ওঁর ফেভারিট রঙচটা ঘিয়ে রঙের প্যান্ট পরেছেন। আমেরিকায় থাকলে সাধারণত চেহারায় একটা জেল্লা আসে যা দেশে গিয়েও কিছুদিন পর্যন্ত থাকে। একেনবাবু শুধু তার ব্যতিক্রম।

 

“আসলে স্যার আমার চেহারাটাই এই রকম, গন্স গিফট। আপনি কেন স্যার, সবাই ওই একই কথা বলে। তবে নিউ ইয়র্ক যাবার আগে আমি এখানে পুলিশে ছিলাম, রাখাল দত্তের সঙ্গে কাজ করতাম।”

 

রাখাল দত্ত-র নামটা শুনে মাথাফাটা রতনের আচরণে একটা পরিবর্তন হল।

 

“ও, তাহলে আপনার কথাই সি-আই-ডি-র বড়োবাবু বলছিলেন।”

 

রাখাল দত্ত বড়ো না মেজোবাবু তা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে একেনবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আসলে আমি বিকাশ সেনের মৃত্যু নিয়ে একটু খোঁজখবর করছি। রাখাল বলল আপনি বিকাশ সেনকে চিনতেন।”

 

মাথাফাটা রতনের ভুরুটা কোঁচকাল। “এ তো পুলিশের ব্যাপার, আপনি ফিল্ডে নেমেছেন কেন?”

 

চায়ের কাপে সশব্দে চুমুক দিয়ে একেনবাবু বললেন, “কারণটা একটু প্রাইভেটলি বলতে চাই স্যার।”

 

একেনবাবুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত রতন আরেকবার দেখল। তারপর চেলাদের বলল, “এই সাইডে গিয়ে দাঁড়া তো।”

 

শুধু চেলারা নয়, দোকানিও একটু দূরে গিয়ে দাঁড়াল।

 

একেনবাবু গলাটা নামিয়ে বললেন, “নিউ ইয়র্কে বিকাশবাবুর যিনি বস, তিনি চান না যে বিকাশবাবুর খুন নিয়ে বেশি ঝুটঝামেলা হয়। এই যে আপনার সঙ্গে নার্সিং হোমের প্রোটেকশন নিয়ে বিকাশবাবুর যা কথাবার্তা হয়েছে, সেটা পাবলিক যেন জানতে না পারে।”

 

একেনবাবুর মনে হল কথাটা শুনে রতন একটু যেন বিচলিত। মুখে বলল, “এসব কী বলছেন আপনি!”

 

“ভুলে যান স্যার, এ নিয়ে আর কোনো কথা নয়। পরে বিকাশবাবুর বস এসে আপনার সঙ্গে কথা বলবেন। আমি শুধু বলছি ব্যাপারটা যেন চাপা থাকে।”

 

“আমি কাউকেই কিছু বলিনি।” রতন মুখ ফসকেই বলে ফেলল।

 

“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। পরিবর্তনের যে-রকম হাওয়া বইছে চারিদিকে, পুলিশকে এগুলো বললে নানান ফ্যাসাদ হবে। আপনার থেকে বেশি হবে নার্সিং হোমের মালিকদের।” রতন কী জানি ভাবল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “এই বস আসছেন কবে?”

 

“মাস দুয়েকের মধ্যেই। এলেই যোগাযোগ করবেন আপনার সঙ্গে। আমিই স্যার যোগাযোগ করিয়ে দেব, ঠিক আছে?”

 

“বেশ। আপনার নামটা কী জানি বললেন?”

 

“একেন সেন। রাখালবাবু তো আমার নাম বলেছেন আপনাকে!”

 

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, তা বলেছেন।”

 

“ঠিক আছে স্যার, আমি তাহলে চলি,” বলে এক পা এগিয়ে আবার ঘুরে এসে বললেন, “একটা কথা স্যার, এই নার্সিং হোম নিয়ে কথাবার্তা তো মাত্র এক মাস আগের ব্যাপার, বিকাশবাবু তো আপনার সঙ্গে আগেও একটা ঝামেলা নিয়ে কথা বলেছিলেন– তাই না?”

 

“ও এক জমির ব্যাপারে।” রতন ব্যাপারটা উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করল।

 

“ওসব স্যার, আপনি পুলিশকে বোঝান। বিকাশবাবু যে নানা ঝামেলা পাকিয়েছেন ওঁর বসের কাছেই আমি শুনেছি। এই তো কিছুদিন আগে একটা মেয়ের সঙ্গে গোলমাল পাকিয়েছিলেন… ওঁর বস সে নিয়েও দুর্ভাবনা করছিলেন।”

 

রতন কিছু বলল না।

 

“না স্যার, আপনাকে আর বিরক্ত করব না। বুঝতে পারছি এ নিয়ে আপনি কিছু বলতে চান না।”

 

“লোকটা তো মরে গেছে, ওসব নিয়ে আর ভাবছেন কেন?” রতন ইতস্তত করে বলল।

 

“ভাবছি অন্য কারণে স্যার। বিকাশবাবুর বস খুব লায়ন হার্টেড, মানে খুব বড়ো মনের লোক। বারবার করে আমাকে বলেছেন, বিকাশের কাছে কারো যদি কোনো পাওনা-গন্ডা থাকে, মানে এই ধরনের ব্যাপারে সব কিছু মিটিয়ে দিতে। বিকাশের আত্মার যাতে শান্তি হয়। আপনার কোনো পাওনা না থাকলে তো চুকেই গেল। চলি স্যার।”

 

একেনবাবু হাঁটা দিতে না দিতেই রতন পিছু ডাকল, “শুনুন!”

 

একেনবাবু ফিরে তাকালেন।

 

“মিথ্যে বলব না, বিকাশ সেনের কাছ থেকে দু-হাজার টাকা পেতাম। নার্সিং হোমের ব্যাপারটা আসায় সেটা মাপ করে দিয়েছিলাম।”

 

“নার্সিং হোমের ব্যাপারটা আসবে, বসই ওটা নিয়ে কথা বলবেন। কিন্তু দু-হাজার টাকা পেতেন কেন?”

 

এবার রতন যা বলল, তা হল—

 

মলয় নামে রিজেন্ট পার্কের এক মাস্তান বিকাশ সেনকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছিল। বিকাশ সেন নাকি ওদের পাড়ায় মল্লিকা নামে একটি মেয়েকে প্রেগনেন্ট করেছে। মোটা অঙ্কের টাকা না পেলে বিকাশ সেনকে ও এক্সপোজ করবে। বিকাশ সেন যখন তাতে রাজি হননি, তখন ভয় দেখাচ্ছিল মল্লিকার বাচ্চার দায়িত্ব না নিলে বিকাশ সেনকে খুন করবে। রতনের এলাকায় থেকে কেউ এ-রকম মাতব্বরি করবে সেটা তো মানা যায় না। তাই রতন চেলাদের দিয়ে মলয়কে একটু কড়কে দিয়েছিল।

 

“স্যার, এই মল্লিকা ম্যাডামের সঙ্গে একবার দেখা করতে পারি?”

 

“কেন?”

 

“আমি স্যার, বিকাশবাবুর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। অনেক সময় অনেক কথা নিজের স্ত্রীকে না বললেও নিজের লাভারকে বলা যায়। যদি স্যার ওঁর সঙ্গে কথা বলে বিকাশবাবুর খুনি সম্পর্কে কিছু কু পাই।”

 

“আপনি মিছিমিছি সময় নষ্ট করবেন, ও কিছু জানে না,” রতন বলল।

 

“না জানলে তো চুকেই গেল, তবে একটা কথা বলি স্যার, আমি জানি বিকাশবাবুর মৃত্যুর সঙ্গে আপনি কোনো ভাবেই জড়িত নন, কারণ আপনার সঙ্গে বিকাশবাবুর ডিল হয়েছিল। ওঁর মৃত্যুতে আপনারই ক্ষতি হবার কথা! মুশকিল হল স্যার পুলিশ তো তা জানে না। পুলিশ তো নানান কথা ভাববে।”

 

“কী ভাববে?”

 

“সেটা কি স্যার আমাকে বলবে! কিন্তু আমি যদি খুনের কিনারা করতে পারি, আপনার লাভ বই ক্ষতি নেই স্যার।”

 

রতন কী জানি ভাবল একটু। “ঠিক আছে, কাল এই সময়ে একবার আসবেন।”

 

“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।”

 

বাড়ি ফিরে একেনবাবু দেখলেন একেনবউদি নেই। নিশ্চয় শাশুড়িকে দেখতে গেছে। মা কে কিছুতেই নিজের কাছে এনে রাখতে পারেননি একেনবউদি। কোনো অবস্থাতেই উনি নিজের বাড়ি ছাড়বেন না। এখন নড়াচড়ারও প্রায় ক্ষমতা নেই –তাও। তবে ওঁকে দেখার জন্য চব্বিশ ঘণ্টা কেউ না কেউ থাকে। বাড়িও একই পাড়ায়। একেনবউদিও দিনের মধ্যে অন্তত তিন-চার বার করে দেখে আসেন, সব ঠিক চলছে কিনা।

 

একটু বাদেই একেবউদি ঘরে ঢুকলেন।

 

“কোথায় গিয়েছিলে?”

 

“মা-র কাছে।”

 

“ওটা কী হাতে?”

 

“দেখো না খুলে।”

 

ব্রাউন কাগজে প্যাক করা একটা বড় প্যাকেট। একেনবাবু প্যাকেটটা খুলে দেখেন রশিদের তোলা ছবিটা, বিনয় দত্তের আঁকা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে উনি আর বিনয় দত্ত।

 

“আরে, এটা কোত্থেকে পেলে!” একেনবাবু আশ্চর্য হয়ে বললেন।

 

“প্রমথ ঠাকুরপো সেদিন ফোন করে ছবিটার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি বললাম, ‘আমায় তো দেখায়নি!’ তারপর তোমার বাক্স খুলে দেখি একদম নীচে রয়েছে ছবিটা। বাঁধানোর জন্যে দিয়ে এসেছিলাম।”

 

“শুধু শুধু খরচা করে বাঁধানোর কী দরকার ছিল?”

 

“কেন, বেশ তো ছবিটা চোর চোর মুখে দাঁড়িয়ে আছ একটা ত্রিভুজ আঁকা ছবির সামনে!”

 

“এই দেখো, তোমারও ওটাকে ত্রিভুজ মনে হচ্ছে না? সেদিন আর্টিস্টকে কথাটা বলতেই কয়েকটা লোক এত রেগে গেল যে কী বলব! চোখ দিয়েই আমাকে ভস্ম করে ফেলে!”

 

“ইনিই তো সেই আর্টিস্ট, তাই না?”

 

“হ্যাঁ, বিনয় দত্ত, খুবই বিখ্যাত।”

 

“ফটোর দোকানের ছেলেটাও এই নামটাই বলল। ও নিজেও ছবি-টবি আঁকে, চেনে। দেখো তো, প্রমথ ঠাকুরপো কত যত্ন করে এটা পাঠিয়েছেন। আমাকে বললেন তুমি নাকিওঁর বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ পেন্টিং দেখবে বলে গিয়েছিলে! আচ্ছা, ওগুলো কী ধরনের পেন্টিং?”

 

“কী মুশকিল, আমি জানি নাকি!”

 

“প্রমথ ঠাকুরপো যে বললেন, তোমার কাছে জেনে নিতে!”

 

“প্রমথবাবু না সত্যি!” একেনবাবু স্বগতোক্তি করলেন।

 

“তোমার ভাগ্য এ-রকম সব বন্ধু পেয়েছ।”

 

“সেটা ঠিক,” একেনবাবু মাথা নেড়ে ছবিটা দেখতে দেখতে বললেন, “এক কাপ চা পেলে মন্দ হত না।”

 

“আমাকে দেখলেই বুঝি চায়ের কথা মনে পড়ে।”

 

“আরে না, আরো কতকিছু মনে পড়ে, কিন্তু নির্দোষ জিনিসটা দিয়েই শুরু করছি।”

 

“থাক, বুঝেছি,” বলে একেনবউদি রান্নাঘরের দিকে গেলেন। যাবার আগে বলে গেলেন। “ছবিটাকে বাইরের ঘরের দেয়ালে টাঙিও। বেশ হয়েছে ছবিটা।”

 

“হ্যাঁ হ্যাঁ টাঙাব।”

 

কী ঝামেলা! একেনবাবু মনে মনে ভাবলেন, এখন কোথায় হাতুড়ি, কোথায় পেরেক?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *