শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

ছয়

শ্যামলবাবুরা এলেন প্রায় দশটার সময়। তাঁদের সঙ্গে মাস্টারমশাই শিশিরবাবুকে নিয়ে খানিকক্ষণ কথা হল। শ্যামলবাবুর স্ত্রী রিতা দেখলাম বেশ ভয় পেয়েছেন। প্রভাসকে জিজ্ঞেস করলেন, “এরকম মার্ডার এখানে হয়?”

“সচারাচর হয় না। তবে মার্ডার কিনা এখনও তো জানা যায়নি।”

“কে জানে আমার কিন্তু ভীষণ ভয় করছে। এখানকার বাড়িগুলো আবার সব এক তলা আর আমাদের খাটও একেবারে জানলার পাশে।”

“ধ্যাৎ, তুমি বড় বেশি ভয় পাও,” শ্যামলবাবু বললেন। “আমরা এখানে এতগুলো লোক রয়েছি। কি বলেন?” আমাদের সমর্থন চাইলেন শ্যামলবাবু। সেটা কতটা স্ত্রীকে সাহস দেবার জন্য, কতটা নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্য, সেটা প্রশ্ন।

রাত হয়ে গেছে, এঁরা আর বেশিক্ষণ বসলেন না, শুতে চলে গেলেন। একটু বাদেই ঘরের ভেতর থেকে জানলা বন্ধ করার শব্দ পেলাম। কিছু অস্পষ্ট কথাবার্তা ভেসে এল, আর তার পরই শুনলাম খাট সরানোর আওয়াজ। আমরা নিজেরা কে কখন ঘুমোলাম খেয়াল নেই। প্রমথ কম্বল মুড়ি দিয়ে গল্প করছিল। হঠাৎ সোফাতে শুয়েই নাক ডাকতে শুরু করল। প্রভাস একটা কুশন নিয়ে, সেটা মাথায় দিয়ে চৌকিতে লম্বা হল। আমি শোবার ঘর থেকে ওকে একটা কম্বা এনে দিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লাম।

পরদিন আমার ঘুম ভাঙল বেলা করেই। দেখলাম সবাই উঠে পড়েছে। প্রভাস বাড়ি চলে গেছে। বলে গেছে দুপুরের দিকে আবার আসবে। সবার এক প্রস্থ চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আমি ওঠাতে বনমালী সবার জন্যেই আবার চা নিয়ে এল। চা শেষ করার আগেই সাইকেল করে পুলিশের একটি লোক এসে হাজির। হাতে একটা ফাইল।

“কী ব্যাপার?”

“ওসি সাহেব পাঠিয়ে দিলেন। আপনাদের স্টেটমেন্টগুলোতে সই করতে হবে।”

দু’টো স্টেটমেন্ট –একটা প্রমথর, একটা আমার। পড়ে দেখলাম, যা বলেছি তাই আছে। যদিও ইংরেজি ভাষাটাকে দুয়েক জায়গায় মার্ডার করা হয়েছে। আমার নিজের ইংরেজি জ্ঞান বিরাট সে দাবি করতে পারব না। কিন্তু তাও ভুল ইংরেজি দেখলে বড় অস্বস্তি হয়। আমি স্টেটমেন্টের উপর কলম চালাতে যাচ্ছি দেখে প্রমথ বলল, “বেশি ওস্তাদি করিস না, চটে গেলে ঝামেলায় পড়বি।” কথাটা অসঙ্গত নয়। দুজনেই স্টেটমেন্টে সই করে দিলাম।

“কিছু কিনারা হল?” প্রমথ পুলিশটিকে জিজ্ঞাসা করল।

“ওসি সাহেব জানেন,” বলে লোকটা চলে গেল।

চা-টা খেয়ে শ্যামলবাবুদের সঙ্গেই মেলায় ঘুরতে গেলাম। কাল এখানে আসার পর থেকে যে হুজুৎ গেছে! যার জন্য শান্তিনিকেতনে এসেছি –সেটাই দেখা হয়ে ওঠেনি। বড়ো রাস্তায় পৌঁছতেই দেখলাম দল বেঁধে লোকেরা মেলার দিকে যাচ্ছে। যারা হাঁটতে রাজি নয়, তারা উঠেছে সাইকেল রিকশায়। রিকশার দাপট তবু সহ্য করা যায়। কিন্তু অসহ্য লাগে যখন মোটর গাড়ি হাঁকিয়ে লোকেরা মেলায় আসে। এমনিতেই এখানে ধুলো বেশি। এক একটা গাড়ি যায়, নাকে রুমাল চেপে তার জের সামলাতে সামলাতে আরেকটা গাড়ি এসে পড়ে। মেলায় ঢুকে গাড়ির কবল থেকে অন্তত বাঁচলাম।

আজকে দেখলাম মেলার মাঠে প্রচুর জল ঢালা হয়েছে। নাকে রুমাল চেপে ঘোরার প্রয়োজন নেই। তবে কী ভিড় কী ভিড়! খাবার দোকানের স্টলগুলো করতে দেওয়া হয়েছে মেলার একপ্রান্তে। সেখানে খাওয়া দাওয়ার সঙ্গে চলছে বাঙালিদের ফেভারিট পাস্ট টাইম –আচ্ছা। শুনেছি এককালে এই মেলায় আশেপাশের গ্রামের লোক আর বহু সাঁওতাল কেনা-বেচা করতে আসত। মেলা প্রাঙ্গণে বসত তাদের পসরা সাজিয়ে। এটা বাস্তবিকই ছিল একটা গ্রামের মেলা। সেরকম অল্প কয়েকজনকে মেলায় ঢোকার মুখে দেখলাম। কিন্তু সংখ্যায় তাদের হাতে গোনা যায়। মেলার ভেতরে দোকানের পর দোকান শহুরে বুটিক। আর সেই সঙ্গে ইলেকট্রনিক্স, ইন্সিওরেন্স, স্টেশনারি, মোটর সাইকেল, কীসের স্টল নেই! দোকানগুলো থেকে একটু দূরে –একটা বিশাল শামিয়ানা খাটানো। সেখানে বাউল গানের আসর বসেছে। একটা বড়ো স্টেজ জুড়ে বসেছে বাউলের দল। সামনে একটা দাঁড়ানো মাইক। সেখানে একতারা বাজিয়ে একটি কমবয়সি বাউল গাইছে, আর গুবগুবি বাজিয়ে সঙ্গ দিচ্ছে একজন বুড়ো বাউল। প্রমথ, শ্যামলবাবু, বা রিতা কেউই বাউল গানে ইন্টারেস্টেড নন। আমার ভালো লাগে। বললাম, “তোরা এগো, আমি একটু বাদেই আসছি।”

আমি মোটেই সংগীত রসিক নই, কিন্তু নাচের সঙ্গে গানগুলো মন্দ লাগছিল না। মিনিট পাঁচেকও দাঁড়াইনি, কে যেন পেছন থেকে আমার কাঁধে হাত দিয়েছে। ফিরে দেখি প্রভাস। “তুমি এখানে কখন এলে?”

“এই এক্ষুণি।”

“আজ সকালে পুলিশের একটি লোক এসেছিল। আমাদের স্টেটমেন্টে সই করিয়ে নিয়ে গেল!”

“হ্যাঁ, আমি সকালে ওসি-র ওখানে গিয়েছিলাম। তখন শুনলাম যে আপনাদের কাছে স্টেটমেন্ট সই করাতে লোক গেছে।”

“রহস্যের সমাধান কিছু হল?”

“মনে হয় না কিছু হবে বলে। এগুলো হল ওদের রুটিন এনকোয়ারি। আপাততঃ ওঁদের চিন্তা পৌষমেলায় কোনো ঝামেলা যেন না হয়। অনেক ভি আই পি-রা মেলায় আসেন। তাঁদের কিছু হলে, উপর মহলে অনেক জবাবদিহি করতে হবে।”

“কিন্তু এটা তো মার্ডারও হতে পারে?”

“হতেই পারে। কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না। তবে হ্যাঁ, উনি যদি বড়োসড়ো রাজনৈতিক নেতা বা সেলিব্রিটি হতেন –তাহলে অন্যকথা।”

“কিছু চুরি গেছে?”

“বলতে পারব না। তবে দামি যে দুয়েকটা জিনিস বাড়িতে ছিল –সেগুলোর কোনোটাই খোয়া যায় নি।”

আমার মুখে বিস্ময়ের ভাব লক্ষ্য করে প্রভাস বলল, “আমি অরিজিনাল পেন্টিংগুলোর কথা বলছি –নন্দলাল, রামকিঙ্কর আর যামিনী রায়ের আাঁকা ছবিগুলো।”

“এছাড়া অন্যকিছু?”

“ও.সি বললেন, কি ছিল না জানলে, কী চুরি হল জানা যাবে কি করে?” যাইহোক, উনি রাজি হয়েছেন আমার সঙ্গে একবার মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে যাবেন। যদি অস্বাভাবিক কিছু আমার নজরে পড়ে।”

“মানে ওঁর ইন্টারেস্ট তুমি ব্যাপারটাতে ইন্টারেস্ট নিচ্ছ বলে।”

“আমার ধারণা তাই। ওসি জানেন ভাইস-চ্যান্সেলার আমাকে খুব স্নেহ করেন। ভাইস-চ্যান্সেলার আর ওঁদের আই.জি হলেন ক্লাসমেট। ওঁরা সবাই অনেক ভেবেচিন্তে চলেন!”

হয়তো এটা নিয়ে সত্যিই মাথা ঘামানোর কিছু নেই। শিশিরবাবুর মৃত্যু হয়তো স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। দরজা খুলে ঢুকে কোনো কারণে উলটে পড়ে মাথায় চোট লেগেছিল। তবু মনে হল, একেনবাবু আমাদের সঙ্গে এলে ভালো হত। এদিকে সম্পূর্ণ আধখ্যাপা, কিন্তু রহস্যের মধ্যে এসে পড়লেই, ওঁর মাথাটা যেন মিরাকেলের মত কাজ করে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *