শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত
তেরো
একটা কথা বলতে ভুলে গেছি। এবার দেশ থেকে ফেরার সময় বাড়ির পুরোনো অ্যালবামটা নিয়ে এসেছি। সেখানে বাবার বেশ কয়েকটা ছবি আছে। মা-র খুব ইচ্ছে বাবার একটা ছবি ডিজিটালি এনহ্যান্স করি, যেরকম সুভদ্রামাসি ওঁর মা আর আমার দিদিমার ছবিটা করেছেন। আমি রোহিত রয়কে ধরব ঠিক করেছিলাম, কিন্তু দেখলাম একেনবাবু আরেকজন এক্সপার্টের খোঁজ পেয়েছেন। তাকে দিয়ে বউয়ের একটা ছবি ফ্রেম করিয়ে নাইট স্ট্যান্ডের উপর রেখেছেন।
আমি বললাম, “একেনবাবু এই লোকটিকে আমারও লাগবে। বাবার কয়েকটা ছবি এনেছি।”
“নিশ্চয় স্যার।”
“কত নিল আপনার কাছ থেকে?”
একেনবাবু কিছু বলার আগেই প্রমথ বলল, “ক্ষেপেছিস, উনি গাঁটের পয়সা খরচা এসব করবেন। নিশ্চয় পরস্মৈপদী।”
“কি, সত্যি নাকি?”
“আসলে স্যার, এখনও দেওয়া হয়নি কিছু। মানে স্টুয়ার্ট সাহেবের খুব চেনা জানা লোক আর কি।”
“তাহলে বুঝে নে,” প্রমথ বলল।
“সে যাই হোক, খুব বেশি না হলেই হল। দুটো কপি করিয়ে নেব তাহলে। একটা আমার কাছে রাখব।”
“আমায় দিন না ছবি, আমি করিয়ে আনব।”
“কোন ছবিটা করি বলুন তো,” বলে আমি অ্যালবাম খুললাম। তারমধ্যে মা’কে সুভদ্রামাসির দেওয়া ছবিরও একটা কপি ছিল; কলকাতার স্টুডিও থেকে কপি করে এনেছিলাম নিজের কাছে রাখব বলে।
একেনবাবু সেটা দেখে বললেন, “যাই বলুন স্যার, ক্যাপ্টেন স্টুয়ার্টের ফোটো স্পেশালিস্টের কাজ আরও ভালো।”
আমি বললাম, “এটা কিন্তু অরিজিন্যাল নয়, অরিজিন্যালটা মায়ের কাছে।”
“না, না এটাও খারাপ নয়। কিন্তু আমার ফ্যামিলির ছবিটা খুব ন্যাচারাল হয়েছে।”
“নিজের বউয়ের ছবি তো ভালো লাগবেই। শুধু শুধু ফোটো-স্পেশালিস্টকে গালমন্দ করছেন কেন!” প্রমথ মন্তব্য করল।
“চুপ কর তো, একটা ছবি সিলেক্ট কর এখান থেকে –যেটা বড়ো করা যায়।”
“আমি বলি স্যার, অ্যালবামটা ওঁর কাছে নিয়ে চলুন। কোনটে বড়ো করলে ভালো হবে। উনি বলতে পারবেন।”
“ভদ্রলোক থাকেন কোথায়?”
“খুব দূরে নয়, থার্টি নাইন্থ স্ট্রীট আর নাইন্থ অ্যাভেনিউয়ের কাছে।”
একেনবাবু ফোন করে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিলেন। ঠিক হল ওখানে গিয়ে ছবিটা দিয়ে কোথাও লাঞ্চ খেয়ে আমরা ফিরব।
.
আজকে বেশ ঠান্ডা পড়েছে। স্টুয়ার্ট সাহেবের ফোটো-স্পেশালিস্টকে ছবি দিয়ে কাছেই একটা ছোট স্যান্ডউইচ শপ ছিল –সেখানে ঢুকলাম। একেনবাবু প্রথমেই যা করেন –মেনুতে চোখ বুলিয়ে আর্তনাদ করলেন।
“এ একেবারে মার্ডার স্যার। এইটুকু তো দোকান, কিন্তু দামের বহর দেখেছেন?”
ফ্র্যাঙ্কলি, খুব একটা বেশি দাম মেনুতে দেখলাম না। নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটানে দামগুলো একটু চড়াই হয়।
“আপনি একটা কাজ করুন না, প্রমথ বলল, “মোড়ের মাথায় হট ডগের ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। সেখানে চলে যান।”
“লাঞ্চ ইজ অন মি,” আমি ঘোষণা করলাম।
একেনবাবু একটু লজ্জা পেলেন, “না, না, সে কি স্যার, সব ডাচ ট্রিট।”
কথাটা একেনবাবু শিখেছেন ফ্রান্সিস্কার কাছ থেকে। ও একদিন এসেছিল, সেদিন প্রমথ বাইরে। আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম বাইরে কোথাও খাওয়ার। ফ্রান্সিস্কা বলেছিল, “ও কে, কিন্তু ডাচ ট্রিট।”
একেনবাবু আমার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকাতে, আমি বলেছিলাম, “হিজ হিজ, হুজ হুজ।”
কথাটা খুব মনে ধরেছিল। পরে আমায় জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আচ্ছা, কথাটা এল কোত্থেকে? ডাচরা কি খুব ইন্ডিপেন্ডেন্ট –কেউ কারোর কাছ থেকে কিছু নিতে চায় না।”
“আই হ্যাভ নো ক্রু। আপনি বরং ফ্রান্সিস্কাকে জিজ্ঞেস করুন।”
“নাঃ, উনি তো সুইস। ইউরোপের লোকেদের মধ্যে অনেক রাইভ্যালরি থাকে স্যার। অনেস্ট অ্যাসেসমেন্ট পাব না।”
“কেন, আপনি তো ফ্রন্সিস্কাকে খুব পছন্দ করেন। ওকে অবিশ্বাস করবেন?”
“আরে ছি, ছি, স্যার, আপনি একেবারে হিউমার বোঝেন না।”
“ঠিকই, কী করে বুঝব যে আপনি গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে হিউমারিস্ট হবার চেষ্টা করছেন।”
ডাচ ট্রিটের কথা ভেবেই বোধহয় একেনবাবু শুধু কফি আর একটা ডোনাট অর্ডার করলেন। জোর করেও ওঁকে দিয়ে অমলেট বা কোনো স্যান্ডউইচ অর্ডার করাতে পারলাম না। আমি আর প্রমথ অর্ডার দিলাম দুটো বড়ো চীজ বার্গার আর ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের।
খেতে খেতে প্রমথ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা রবীন্দ্রনাথের লেখা শীতের উপর ক’টা গান তোর মনে আছে?”
“কেন বলত?”
“কারণ অল্পই লিখেছেন। ঋতু নিয়ে ওঁর লেখায় খালি পাবি বর্ষা। হ্যাঁ, বসন্তও আছে, কিছু শরৎ আর কিছু গ্রীষ্ম –ব্যাস। বর্ষাকালে ঘরবন্দী হয়ে থাকতেন, আর এন্তার লিখতেন। ভদ্রলোক নিউ ইয়র্কে থাকলে দেখতিস কলম দিয়ে শীতের গানের ফুলঝুরি বেরত।”
প্রমথর মতো নিরস লোকের কাছে বর্ষার রূপ নিয়ে আলোচনা করা অর্থহীন। তবে ওর লজিকের বিরুদ্ধে বড়ো কোনো আগরুমেন্ট আমার মাথায় এল না। বাস্তবিকই খেয়ে দেয়ে আবার এই ঠান্ডায় রাস্তায় বেরতে হবে ভাবতেও গায়ে জ্বর আসে।
একেনবাবু এদিকে মন দিয়ে আমাদের বাড়ির অ্যালবামের পাতা উলটে উলটে ছবিগুলো দেখছেন। মাঝে মাঝেই ‘এটা কার ছবি, তিনি কোথায়, “কি করেন, ইত্যাদি প্রশ্ন ছুঁড়ছেন। ছবিতে আমার দিদিমার কয়েকটা ছবি ছিল। কিন্তু সেগুলো বেশি বয়সের। একেনবাবু বললেন, “যাই বলুন স্যার, আপনার দিদিমা কিন্তু ওঁর সৌন্দর্য ঠিক ধরে রেখেছিলেন!”
প্রমথ বলল, “এই তেলটা আপনি বাপিকে কেন দিচ্ছেন –যাতে ও বিল পে করে?”
“না,না স্যার সিরিয়াসলি। মাসিমার দেওয়া ছবিতে যেমন দেখতে ছিলেন, প্রায় সেই একই চেহারা ধরে রেখেছেন অনেক পরে তোলা এই ছবিগুলোতে।” বলে অ্যালবামের পাতাটা আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন।
আমি একেনবাবুর সঙ্গে এ বিষয়ে একমত। সত্যি দিদিমা চিরদিনই খুব সুন্দরী ছিলেন।
“কি নাম ছিল স্যার আপনার দিদিমার?”
“নয়নতারা।”
“আপনার মা আর সুভদ্রামাসির জেনারেশন অফ ফ্রেন্ডশিপ।”
এটা প্রশ্ন না কমেন্ট বুঝলাম না। হ্যাঁ, তা ঠিক।”
“সুভদ্রামাসির মা’র নাম কী ছিল স্যার?”
“বোধ হয় নলিনী। বোধ হয় কেন, নলিনীই –এবারই মা-র কাছে শুনেছি।”
“আপনার মায়ের নাম স্যার?”
“সুরমা।”
“বাঃ।”
“তার মানে?”
“নয়নতারা-নলিনী আর সুভদ্রা-সুরমা। বেশ ন-য়ে স-য়ে মিল স্যার।”
“আপনি মশাই সামথিং!” প্রমথ বলল।
“কেন স্যার?”
“কী ফালতু জিনিস নিয়ে টাইম ওয়েস্ট করতে পারেন?”
আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম, “এই, তুই আমার মা-দিদিমার নাম ফালতু বলছিস কেন?”
“তাই বলছি নাকি! শুধু একেনবাবুর এই ন-ত্ব স-ত্ব-র সমালোচনা করছি।”
এই সব আগরম বাগরম বকতে বকতে আমাদের খাওয়া শেষ হল। খাবার শেষে আমিই জোর করে বিল পেমেন্টে করলাম। একেনবাবু মাথা ঝাঁকিয়ে থ্যাঙ্ক ইউ, “থ্যাঙ্ক ইউ স্যার’ এতবার বললেন যে সবাই নির্ঘাৎ ভাবছিল আমি ওঁকে মিলয়ন ডলার দান করেছি!
এমন সময়ে একটা বিশ্রি ব্যাপার ঘটল। আমরা রাস্তার দিকে বসে ছিলাম। দু’ জন টিনএজার এসে আমাদের দিকে তাকিয়ে অসভ্যের মতো আঙুল দেখিয়ে অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করল। প্রমথ রেগে দাঁড়িয়ে উঠতেই ওদের একজন জানলার কাঁচের উপর মার্কার পেন দিয়ে চার অক্ষরের একটা অশ্লীল শব্দ লিখে দৌড়ে পালাল। সব কিছু ঘটে গেল কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। ওয়েটারটি তখনও কাছেই ছিল। ওদের এই অসভ্যতা দেখা মাত্র ম্যানেজারকে বলাতে তিনি ছুটে বাইরে গেলেন। ছেলেগুলো ইতিমধ্যে অদৃশ্য হয়েছে। অত্যন্ত বিরক্ত মুখে ফিরে এসে ভদ্রলোক একটা স্কুইজি নিয়ে বাইরে গিয়ে লেখাটা মুছতে লাগলেন।
ওয়েটার বলল, “এটা মাঝেমাঝেই ঘটে, ইদানিং কতগুলো দুষ্টু ছেলের এটাই হচ্ছে খেলা।”
ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকতেই ক্যাশিয়ার মেয়েটি বলল, “ও ভাবে তাড়া করতে যেও না, ওদের কাছে ছুরি-টুরি থাকতে পারে।”
ম্যানেজার ভদ্রলোক তখনও রাগে গগ করছে। “নেক্সট টাইম গুলি করে ওদের খুলি উঠিয়ে দেব।”
এই সব কমিেশনের মধ্যে আমিও উঠে দাঁড়িয়েছি। একেনবাবু দেখলাম চুপ করে বাইরের দিকে তাকিয়ে কী জানি ভাবছেন।
“কি মশাই, উঠবেন?”
“হ্যাঁ স্যার, চলুন।”
“কী ভাবছিলেন এত?”
“পরে বলব স্যার।”
একেনবাবু যদি একবার বলেন পরে বলব –সেটা পরেই বলবেন। ওকে খুঁচিয়ে, বুঝিয়ে, বকে, অপমান করে –কোনোমতেই কিছু আদায় করা যাবে না।
