শান্তিনিকেতনে অশান্তি (একেনবাবু) – সুজন দাশগুপ্ত

শেয়ার করুনঃ

দশ

সুভদ্রামাসির জন্য মা একটা আচারের শিশি পাঠিয়েছিল, আর সেই সঙ্গে একটা চিঠি। ভাবছিলাম সে দুটো বাক্সে পুরে পার্সেল করে পাঠিয়ে দেব। ইতিমধ্যে আমরা ফিরেছি কিনা জানতে সুভদ্রামাসি ফোন করলেন। মা’র খবর নিলেন। আচার পার্সেলে পাঠাব শুনে বললেন, “না, না, তোমরা বরং একদিন সময় করে এসো–তখন এনো৷”।

প্রমথ বা একেনবাবু কাউকেই নারাজ দেখলাম না। আমি শিওর তার কারণ সেদিন সুভদ্রামাসির কুক সুজাতার ফ্যান্টাস্টিক রান্না। শনিবারে আমার বিশেষ কাজ ছিল না। একেনবাবুও সেদিন ফ্রি! প্রমথ আর ফ্রান্সিস্কা সিনেমা যাবে প্ল্যান করছিল। আগের বার ফ্রান্সিস্কা সুভদ্রামাসির বাড়ি যাবে বলেও যেতে পারেনি। তাই এবার বলল, সিনেমা নয়, আমাদের সঙ্গেই যাবে। আমি সুভদ্রামাসিকে ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমরা আসছি। ফ্রান্সিস্কার কথা আগেরবার উনি শুনেছিলেন। শুনে সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন আমাদের মধ্যে অন্ততঃ একজনের গার্লফ্রেন্ড হয়েছে।

আচার পেয়ে সুভদ্রামাসি খুব খুশি হলেন। বললেন, “তোমার মা জানে লেবুর আচার আমার ভীষণ পছন্দ। মাসিমা, মানে তোমার দিদিমা, এটা অপূর্ব বানাতেন। ছেলেবেলায় মাসিমার কাছে গেলেই লেবুর আচার আমার বরাদ্দ ছিল। তোমার মাও ভালো বানায়।”

মা-র চিঠিটা দিলাম। মা খুব সেন্টিমেন্টাল হয়ে গিয়েছিল দিদিমা আর সুভদ্রামাসির মা’র কমবয়সি ছবি দেখে। পার্কিৰ্মন্স হবার পর থেকে, মা ভালো করে আর লিখতে পারে না। দুয়েকটা পুরোনো কথা তাই আমাকে দিয়ে লিখিয়েছিল। কলকাতার অনেক গল্প হল। আমাদের শান্তিনিকেতনে যাবার কথা আর শিশিরবাবুর মৃত্যুর ঘটনাও কথা প্রসঙ্গে এল। সুভদ্রামাসি বললেন, শিশিরবাবু নামটা ওঁর চেনা চেনা লাগছে, রিচার্ডের কাছেই বোধহয় শুনেছেন। কিন্তু কী সূত্রে মনে করতে পারলেন না। কলকাতায় থাকাকালীন শান্তিনিকেতনে রিচার্ড একবার বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানেই নিশ্চয় শিশিরবাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল।

খাবারের আয়োজন এবারও দারুণ। আমরা পরম তৃপ্তি করে খেলাম। ফ্রান্সিস্কাকে নিয়ে আমাদের একটু চিন্তা ছিল। ও শুধু সবকিছু খেল তাই নয়, কিছুক্ষণের মধ্যেই সুভদ্রামাসির ফেভারিট পার্সন হয়ে গেল! খাবার পর সুভদ্রামাসি ওকে শাড়ি গয়না দেখালেন।

শাড়ি পরা শিখতে চায় শুনে, একটা শাড়ি আর একটা ব্লাউজ বার করে ওকে পরিয়েও দিলেন। ব্লাউজটা পুরোনো –সুভদ্রামাসির কমবয়সের ব্লাউজ। বেশ ফিট করে গেল ফ্রান্সিস্কার। দেশের আচ্ছাদনে সুন্দর লাগছিল ওকে দেখতে। প্রমথ বিমুগ্ধ।

একেনবাবু গম্ভীরভাবে মন্তব্য করলেন, “যাই বলুন স্যার, শাড়ির অ্যাপিলই আলাদা।”

ফ্রান্সিস্কার মা নেই, আর সুভদ্রামাসির সন্তান নেই। তাই বোধহয় একজন আরেকজনের অভাব পূরণ করল। সুভদ্রামাসি পরম উৎসাহে ওকে বাড়ি দেখাতে লাগলেন। ফ্রান্সিস্কাও ওঁর হাত ধরে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। কোন জিনিসটা কী, কত পুরোনো, কোত্থেকে এসেছে তার বিস্তারিত খবর নিল। তবে আমার মাঝে মাঝে ভয় করছিল। সুভদ্রামাসির ব্যালেন্স এখন আর ভালো নেই, যদিও ফ্রান্সিস্কা ওঁর হাত ধরে আছে। কিন্তু কাঁচের বড়ো বড়ো ফুলদানি, জার ইত্যাদি নামিয়ে যখন উনি দেখাচ্ছিলেন, ভয় করছিল হাত থেকে ফসকে রক্তারক্তি না ঘটে। একবার তো বলেই ফেললাম।

সুভদ্রামাসি হাসতে হাসতে বললেন, “ভাবিস না, যখন ব্যালেন্স ছিল তখনও ভেঙেছি, হাত-পাও কেটেছি। তবে তোরা তো আছিস, কেটে-ছড়ে রক্তারক্তি হলে বুড়ি মাসিকে না হয় একটু রক্ত-টক্ত দিস।”

আমি বললাম, “যাঃ, ঠাট্টা করো না।”

সুভদ্রামাসি দেখলাম খুব মুডে আছেন। বললেন, “কেন দিবি না নাকি?”

ওঁর আমি মুডটা নষ্ট করতে চাইলাম না। বললাম, “নিশ্চয় দেব, যদি তুমি নিতে পার।”

“পারব না কেন, রক্তের ব্যাপারে আমার মস্ত সুবিধা, আমি হলাম ইউনিভার্সাল রিসিভার।”

প্রমথ বলে উঠল, “এখন আর ইউনিভার্সাল রিসিভার কেউ নয় মাসি –আরও বহু ফ্যাক্টর নিয়ে ডাক্তারদের মাথা ঘামাতে হয়।”

ফ্রান্সিস্কা বুদ্ধিমতী। আমাদের কথাবার্তা ঠিক না বুঝলেও আমার উদ্বিগ্নতার কারণটা আঁচ করতে পারল। এরপর দেখলাম সুভদ্রামাসিকে কিছু নামাতে না দিয়ে নিজেই সাবধানে নামিয়ে নামিয়ে দেখছে। ফ্রান্সিস্কা যখন বাড়িঘর দেখতে ব্যস্ত, আমরা তিনজন ফ্যামিলি রুমে কফি নিয়ে বসলাম। কী করণে যাদবপুরের প্রসঙ্গ ওঠায়, আমি আর প্রমথ পুরোনো দিনের কথায় মশগুল হয়ে গেলাম। একেনবাবু দেখলাম উঠে গিয়ে সুভদ্রামাসিদের জিনিওলজির অ্যালবামে চোখ বোলাচ্ছেন আর মাঝে মাঝে বইয়ের আলমারি থেকে স্টুয়ার্টমেসোর কালচারাল অ্যান্থপলজির বই ঘাঁটছেন।

কিছুক্ষণ বাদে ফ্রান্সিস্কা সুভদ্রামাসিকে নিয়ে ফিরে এল আর এসেই মাসিকে বলল গান গাইতে।

সুভদ্রামাসি বললেন, “দেখো কান্ড, এখন কি আর তেমন গাইতে পারি!”

ফ্রান্সিস্কা চোখ গোল গোল করে আমাদের বলল, “তোমরা জানো, মা’র গানের রেকর্ড আছে?”

তথ্যটা জানা ছিল না। আর এও জানা ছিল না এর মধ্যেই ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে সুভদ্রামাসি মা-মেয়ের সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছেন! যাইহোক, ফ্রান্সিস্কার অনুরোধ এড়াতে না পেরে সুভদ্রা মাসি দুটো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইলেন। এখনও গলা অপূর্ব।

আমি বললাম, “সত্যি সুভদ্রামাসি, তুমি আর রেকর্ড করাও না কেন?”

“দূর, কবে চর্চা ছেড়ে দিয়েছি।”

তবে বুঝলাম একটু-আধটু চর্চা এখন করতে হবে, কারণ ফ্রান্সিস্কার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে, প্রতিমাসে একবার সুভদ্রামাসির কাছে এসে ফ্রান্সিস্কা রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখবে।

আমি বললাম, “চমৎকার আইডিয়া, আমরাও আসব।”

প্রমথ বলল, “ও কিন্তু আসবে খাবার লোভে।”

“সেটা তো আনন্দের কথা। মাসির বাড়িতে তো খেতেই আসে সবাই। ও যখন গান শিখবে, তোমরা না হয় গল্প গুজব কোরো। বেসমেন্টে একটা পুল টেবিলও আছে।”

ফেরার পথে ফ্রান্সিস্কা একেবারে উচ্ছ্বসিত। “শি ইজ সো লাভিং, বার বার বলল কথাটা। “উই জাস্ট গট কানেক্টড লাইক দ্যাট! আর বাড়িটা দেখেছো কী টেস্টফুলি ডেকোরেটেড?”

কথার পিঠে কথা বলা একেনবাবুর স্ট্রং পয়েন্ট নয়। উনি বললেন, “আপনি যে গান গান, সেটা কিন্তু জানতাম না ম্যাডাম।”

একেনবাবুর কাছে ‘ম্যাডাম’ শুনে প্রথমবার ফ্রান্সিস্কার মুখের অবস্থা হয়েছিল দেখার মতো। যদিও একেনবাবুর মোটামুটি একটা পিকচার আগে থেকেই প্রমথ ফ্রান্সিস্কাকে দিয়েছিল। প্রথম পরিচয়ের পর একাধিক বার একেনবাবুকে ‘ম্যাডাম’ বলা থেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছে ফ্রান্সিস্কা। একেনবাবু প্রত্যেকবারই জিব কেটে বলেছেন, “সরি ম্যাডাম, ওটা আমার মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে। আজকাল আমরাও যেমন ওঁর স্যার নিয়ে মাথা ঘামাই না। ফ্রান্সিস্কাও ম্যাডাম শব্দটা ইগনোর করে।

ফ্রান্সিস্কা বলল, “কলেজে আমার মিউজিক মাইনর ছিল। যদিও ফাঁকি দিয়েছি খুব।”

“আপনি ম্যাডাম, অসাধারণ ট্যালেন্টেড। স্কি, গান,পড়াশুনা –সত্যি অ্যামেজিং!”

ফ্রাড্ডিস্কা একটু লাল হয়ে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ, ডিটেকটিভ!”

ফ্রান্সিস্কা একেনবাবুকে পছন্দ করে। সব সময় ডিটেকটিভ বলেই ডাকে। তারপর বলল, “আচ্ছা ডিটেকটিভ, তুমি মা-র বাড়িতে ঐ মূর্তিটা দেখেছ? ওটা অপূর্ব সুন্দর, না?”

“ইয়েস।”

“মা বললেন, ওটা চুরি হয়ে গিয়েছিল। পরে চোর ফেরত পাঠিয়ে দেয়। আই ওয়াজ সো সারপ্রাইজড! ওই রকম মূর্তি যদি সত্যিই কেউ চুরি করে, তাহলে ফেরত পাঠিয়ে দেবে কেন! তোমার কি মনে হয়?”

“আমি আপনার সঙ্গে একমত। ভেরি কনফিউজিং!”

“আই থিঙ্ক ইউ শুড সলভ দিস মিস্ট্রি।”

“দাঁড়াও, দাঁড়াও,” প্রমথ বলল, “একেনবাবু দশদিন আগে একটা মার্ডার সলভ করতেই হিমসিম খাচ্ছেন –আর এটা তো ষাট বছরের আগের চুরি।”

“মার্ডার নিয়ে পুলিশ ভাবুক। বাট দিস ওয়ান ইজি সো ইন্টারেস্টিং। আমি রিয়েলি ফ্যাসিনেটেড মূর্তিটা দেখে। বাই দ্য ওয়ে, ডু ইউ নো, মা কি বলেছে?”

“না।”

“ঐ মূর্তিটা উনি আমায় দিয়ে যাবেন।” বিজয়িনীর মতো মুখ করে ফ্রান্সিস্কা বলল।

“নো ওয়ান্ডার তুমি ওকে তেল দিচ্ছিলে,” প্রমথ বলল। “মা মা বলে ডাকা, গান শিখব বলা। নাউ আই আন্ডারস্ট্যান্ড।”

ফ্রান্সিস্কা প্রমথর হাতে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, “ডোন্ট বি সিলি!”

.

বাড়ি ফিরে প্রভাসের একটা সংক্ষিপ্ত ইমেইল পেলাম। শিশিরবাবুর ইনভেস্টিগেশনটা চলছে। ওদের বিয়ের দিন ঠিক হয়েছে –ফেব্রুয়ারীর ১৫ তারিখে। আমাকে মিস করবে বলে দুঃখ করেছে।

খবরটা জানাতেই প্রমথ অ্যাস ইউসুয়াল খোঁচা দিল, “এটা কি গুড নিউজ না ব্যাড নিউজ?”

“ডোন্ট বি স্টুপিড।”

একবার ভুল করে বন্দনার প্রতি আমার দুর্বলতার কথাটা প্রমথকে বলে ফেলেছিলাম, তার জের এখনও পোয়াতে হচ্ছে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *